x

প্রকাশিত

অর্জন আর বর্জনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ সিদ্ধান্তের নিরিখে দোলাচলে।সেখানে প্রতিবাদও ভঙ্গুর।আর যথার্থ প্রতিবাদের থেকে উঠে আসে টায়ার পোড়ার গন্ধ।আঘাত প্রত্যাঘাতের মাঝখানে জন্মদাগও মুছে যায়।সংশোধনাগার থেকে ঠিকানার দূরত্ব ভাবেনি কেউ।ভাবেনি হাজার চুরাশির মা’র প্রয়াণ কোন কঠিন বাস্তবকে পর্যায়ক্রমিক প্রহসনে রূপান্তরিত করেছে।একটা চরিত্র কত বছর বেঁচে থাকে ?কলম যাকে চরিত্রের স্বীকৃতি দেয় তেমন পোস্টমর্টমের পড়ও আরও কয়েকযুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে কলমই। অভয়ারণ্যেও ঘেরাটোপ! সেই আপ্তবাক্য -

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

ভাববার সময় এসেছে। প্রতিবাদটা কোথা থেকে আসে—বোধ ?মস্তিষ্ক ?মুঠো? না বাহুবল?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

বিদিশা সরকার

বুধবার, আগস্ট ১৫, ২০১৮

পিনাকি

sobdermichil | আগস্ট ১৫, ২০১৮ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
অশ্বত্থামা হতঃ - ইতি কুঞ্জরঃ

এই সময় রাত নিজের নিঃশ্বাস চেপে রেখেছে । এমন শব্দহীন নিস্তব্ধতাকে , গর্ভবতী নীরবতা বলা যায় । চারপাশের অন্ধকার , কুরুক্ষেত্রের খোলা ভূমিকে আরও ভয়ানক করে তুলেছে । হতাশা আর মৃত্যুর সীমাহীন ভূমি অসীমতার উপলব্ধি নিয়ে শুয়ে আছে । গিলে খাবে ভারতবর্ষকে । ধীরে – ধীরে এক যুগের অবসান আসন্ন । কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ইতিমধ্যে এক প্রাচীন বিশ্বস্ত বটবৃক্ষের পতন হয়ে গিয়েছে ! তাঁর অবর্তমানে যুদ্ধ ভূমি অনেকটাই রিক্ত । তাও যুদ্ধ চলবে । কুরুক্ষেত্রের এক বিশেষ স্থানে পিতামহের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছে । তীরের ভয়ানক তীক্ষ্ণ ফলা , তাঁকে এমন ভাবে বিঁধেছে , নিজের আক্রান্ত আর ক্ষত –বিক্ষত দেহ নিয়ে ভুমির উপর শয়ন করেছেন । 

পিতামহ ভীষ্মের অন্তিম ইচ্ছা, যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত নিজের প্রাণ টিকিয়ে রাখা। এই ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে দুপক্ষই যথেষ্ট ব্যবস্থা করেছে । নিরাপত্তা রক্ষী , সর্বক্ষণের জন্য দাসী , নামকরা বৈদ্য ---- ঘিরে রেখেছে । এক গভীর আর গর্ত খনন করে , তাকে ঘিরে দেওয়াল তুলে দেওয়া হচ্ছে । এখানেই বিশেষ পদ্ধতির ব্যবহার করা হবে । আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাথে হাতে -হাত রেখে মহারথী ভীষ্মের জীবনকে দীর্ঘায়ত করবার চেষ্টা চলছে । এই বদ্ধ পরিখার ভিতর বাতাসের আদ্রতা , তাপমাত্রা --- যাতে মরণাপন্ন রুগীর অনুকূল হয় ; সেই সাথে বিশেষ স্পর্শ কাতর পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য আধুনিক সরঞ্জাম এর মজুত করা হচ্ছে । 

এই কর্মকাণ্ডকে খুব দ্রুত সমাপ্তির রূপ দেওয়ার জন্য , সহস্র কারিগর কাজ করে চলেছে । 

দূরে , বেশ কিছুটা দূরে ; রাতের ছায়ায় এক বৃদ্ধ ব্রাক্ষ্মণ দাঁড়িয়ে আছেন । তাঁর দু’চোখ ভরা প্রতীক্ষার অবসানের ইঙ্গিত ।এত দিন বাদে সে কৌরব পক্ষের প্রধান সেনাপতি নির্বাচিত হয়েছেন । মহারথী ভীষ্মের অবর্তমানে হস্তিনাপুরের হয়ে কুরুক্ষেত্রে সেনাপতিত্ব করবার স্বপ্ন সফল হতে চলেছে । মাত্র দশ দিনের , অন্তিম সূর্য মুহূর্ত অবসানে , দিনের শেষেই এমন পরিস্থিতি এসে আত্মসমর্পণ করবে ! নিজেও বুঝতে পারেননি । বুকে পাথরের মতন যে কষ্টটা চেপে আছে , তাকে এই অপেক্ষার অনুভূতি দ্বারা পরিমাপ করা যাবে না । 

নিজের অবস্থান নিয়ে নিজেও সন্দিহান । দুর্ভাগ্য বশত নয় , সৌভাগ্যের প্রত্যাশী হয়েই আজ সে প্রিয় শিষ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন । এমন শিবিরে সে আছেন , যেখানে সম্মান নেই । শুধু এক বেতনভূক দায়িত্ববান মহারথী । 

হস্তিনাপুরের হয়ে গুরু দ্রোণ নিজের সবটুকু উজাড় করে দেবেন । এই সবটুকু দেওয়ার অঙ্গীকার তিনি করেছিলেন , তাইবলে তা পালন করতে পারছেন ? উল্টো দিকে শত্রু পাণ্ডবদের প্রতি তাঁর মোহ আজও অটুট । বিচিত্র মানুষের জীবন । বিচিত্র সেই জীবনের বাঁক , নদীর মতনই সে পরিস্তিতির সাথে - সাথে পাল্টিয়ে যায় । এখন যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হচ্ছে , পাণ্ডবদের অস্ত্র ধরতে শিখিয়ে ছিলেন তিনি । নিজের জীবনে সবকিছুর থেকেও প্রিয় যে , সেই অর্জুন ---- আজ প্রধান প্রতিপক্ষ । দ্রোণাচার্য নিজেও জানেন , নিজের হাতে পাণ্ডবদের হত্যা করতে পারবেন না । দুর্যোধনের হয়ে --- পাণ্ডবদের পরাজয়ের কারণ হবেন । একজন যোদ্ধার কাছে , ক্ষত্রিয়ের কাছে শত্রুর নিকট আত্মসমর্পণই ---- আসল মৃত্যু । পরাজিত পাণ্ডব আর মৃত পাণ্ডবদের মধ্যে তফাৎ নেই ।

দ্রোণাচার্য এইসব কথা গুলো ভাবতে - ভাবতে একান্ত ভাবে নির্জন স্থানে চলে এসেছেন । এই রাতের অনবরত সীমাহীন নিস্তব্ধতা উপলব্ধি করছেন । দিনের আলোর সাথে এই রণভূমি --- বহু যোদ্ধা , রথী , সৈনিকদের আর্তনাদ , অস্ত্রের ঘর্ষণের ঝংকারে মৃত্যু গহ্বর মনে হয় । এখনে শুধুই মৃত্যুই অপেক্ষা করছে । সূর্য ডুবে যায় । ঘরে ফিরতে থাকা পাখিদের মতনই , যুদ্ধ বিমোহিত মানুষ গুলো নিজেদের হিংসা , ক্রোধ , অপমানকে --- লুকিয়ে রাখে । দিনের আলোয় সেইসব গোপন লালসার সন্ধান কেউ পায়না । সারাদিনের হিসেব তুলে রাখা থাকে , রাতের অবসরে জন্য । নিঃশব্দে ঝরে যাওয়া পাতার মতন যে প্রাণ চলে গিয়েছে—তারই উদ্দেশ্যে অশ্রুর অঞ্জলি বর্ষিত হয় । কুরুক্ষেত্রের এটাই দিনলিপি ।

চোখে হাত দিয়ে , বৃদ্ধ ব্রাক্ষ্মণের টের পেলেন - ভিজে যাওয়া চোখে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে । অতীতের এক সুন্দর বসন্ত দিনের ছবি দেখা যাচ্ছে । তখন দ্রোণাচার্যের বয়স বেশী নয় , মধ্যবয়স্ক । সেই সময়ে জীবনে এক সুন্দর মুহূর্ত এসে গিয়েছে । 


এই স্থান , নির্জনে ঈশ্বর চিন্তা র উপযুক্ত পরিবেশ । ব্রাক্ষ্মণের কাছে এমন স্থান উপযুক্ত । মানুষের মনে রাগের জন্ম নিলে , সে প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ওঠে । দ্রুপদের কাছে , এমন ব্যবহার দ্রোণ আশা করেননি । এক ব্রাক্ষ্মণের আর ক্ষত্রিয় মিত্র হতে পারেন না --- এই কথা সে বুঝে গিয়েছে । নিজেকে সামাজ বদ্ধ মানুষ হিসেবেই দেখেন । তাঁর কাছে এখন বিকল্প পথ আছে ? নিজের অপমান মেনে নিলেও , পুত্র অশ্বত্থামার যে প্রতিনিয়ত অপমান হয়ে চলেছে ! এক স্নেহময় আর দায়িত্ববান পিতা হিসেবে নিজেকের এই দায়িত্ব অস্বীকার করবে কেমন করে ? এই সমাজ যেমন ভাবেই শ্রেণী বিভাগ করুক না কেন , আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনই কোন মানুষের সামাজিক সম্মানের পরিবর্তন করতে পারে । তাই তিনি দুর্যোধনের সমস্ত রকমের পাপ কর্মের সাথে ছিলেন । পাণ্ডবদের অন্যায় ভাবে বনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল ।বারো বছরের বনবাসের দশ বছর কেটে গিয়েছে । অন্যায় ভাবে দ্যূত ক্রিয়ায় সব কিছু কেড়ে নেওয়া হয়েছে । দ্রোপদির বস্ত্রহরণ এর পাপ দেখেও দ্রোণের হাত স্থির ছিল ! দুই বছর শেষ হলেই , অন্তিম অজ্ঞাতবাস শুরু হবে । দ্রোণ টের পাচ্ছেন , পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাস শেষ হলেও , দুর্যোধন সব কিছু অস্বীকার করবে আর রাজ্য ফিরিয়ে দেবে না । যুদ্ধ অনিবার্য । অর্জুন এর জন্যই দিব্যাস্ত্র খুঁজতে ভারত ভ্রমণে গিয়েছে । দ্রোণের কাছে এই যুদ্ধ অন্তিম নির্ণায়ক । তাই নতুন অস্ত্রের সন্ধানে ভারত পর্যটনে বেড়িয়ে পড়লেন । 

দ্রোণাচার্য ভাবছিলেন , একান্তে চিন্তা করে কোন পথ পাওয়া যায় নাকি । যে পথ থেকে তিনি নিজের যুদ্ধ কৌশলকে আরও সক্ষম করে তুলতে পারেন । গুরু পরশুরামের অস্ত্র শিক্ষা , তাঁকে ক্ষত্রিয়দের কাছে অনন্য অস্ত্র শিক্ষক হিসেবে হয়ত জায়গা করে দিয়েছে , তিনি চাইছেন আরও নতুন কিছু বিদ্যা আয়ত্ত করতে – যাতে দ্রোণই একমাত্র বিকল্প হয়ে ওঠেন । 

উত্তর ভারতে আর এমন শিক্ষা অবশিষ্ট নেই , যা দিয়ে তিনি যুদ্ধ কৌশলে নতুনত্ব আনতে পারেন । উত্তর ভারতীয় ক্ষত্রিয়রা সেখানকার উপজাতিদের সাথে এখনো যুদ্ধে লিপ্ত । উপজাতিদের যুদ্ধ কৌশলের বিকল্প তাদের কাছে নেই । দ্রোণ জানেন , এই উপজাতীয়দের যুদ্ধ কৌশল যদি আয়ত্ত করা যায় , যুদ্ধে অর্জুনকে রুখতে পারবেন । অর্জুনের অধ্যবসায় তিনি জানেন ।সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে উঠেছে , সততা , পরিশ্রম আর নতুনের সন্ধানের তীব্র ইচ্ছা থেকে ।

এত কিছু ভেবেই , দ্রোণ উপজাতিদের একান্ত গোপন যুদ্ধ কৌশল শিখবার জন্যই সুদূর দাক্ষিণাত্যে ছুটে এসেছেন । উপজাতিরা নিজেদের গোষ্ঠীর বাইরে কোন মানুষকে বিশ্বাস করেনা , আর সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ ছাড়া কোন বিদ্যাই আয়ত্ত করা সম্ভব নয় ।

দ্রোণাচার্য এতক্ষণ চোখ বন্ধ করে , অতীতের কথা ভাবছিলেন । 

সামনে সরু স্রোতের শান্ত নদী বয়ে চলেছে ; দেখে মনে হচ্ছে কোন রমণীর আঁচল বিছিয়ে শুকোতে দিয়েছে -- বনভূমির বুকের উপর । এখানে জঙ্গল শান্ত । পাখিদের স্বর , বাদ্যযন্ত্রের নরম সুরের মতনই কান ছুঁয়ে চলেছে । দূরের পাহাড়টা , কুয়াশার চাঁদরে ঝাপসা। এখন ভোরের নরম আলো মেখেছে প্রকৃতি। দ্রোণ চেয়ে রয়েছেন । অনেক দূরের অতীতের মতন ঝাপসা চূড়াটার দিকে। চোখে বেয়ে জল নামছে ! এই অশ্রু কেন ? নিজের পাপের জন্য ! আপন জনের স্মৃতির জন্য ! ভবিষ্যতের জন্য ! চোখ বন্ধ করলেন । 

কানে আসল ঘুঙুরের শব্দ , চোখ মেলে দেখলেন -- তার দিকে এক নারী তাকিয়ে আছে ! নিম্মাঙ্গে কাপড় আর বুকে অন্তর্বাস রয়েছে , দু’হাতে বিশেষ ধরণের বালা , খোপা করা চুলের গোছা সাজানো -- পাহাড়ি বাহারি ফুলে । সেই ফুলের গন্ধ দ্রোণের ঘ্রাণকে মদিরার নেশার মতনই আকৃষ্ট করেছে । পায়ে ঘুঙুর , শব্দের উৎস বুঝতে অসুবিধা হল না। দ্রোণ চেয়ে আছেন । মহিলা মধ্যবয়সীর , তবে দ্রোণের তুলনায় কম । এই অঞ্চল উপজাতিদের বাসভূমি । সংগ্রহে যে মানচিত্র রয়েছে , সেখানে এই অঞ্চলের কথাই বলা হয়েছে । 

দ্রোণের গোপন পরিকল্পনা এদের রহস্যময় যুদ্ধ কৌশল শিখে নেওয়া । মনে খানিক উদ্বেগ ভাসছে । কেননা , উপজাতিরা নিজেদের স্থানে কোন বহিরাগতদের সহ্য করতে পারেনা । কিছু বুঝবার আগেই রমণী বলল – আর্য আপনি উত্তরাপথ থেকে এসেছেন ? 

কিছুটা অবাকই হয়ে গেলেন ! মহিলা আর্য ভাষায় প্রশ্নটা করল । একজন উপজাতীয় নারীর মুখে এই ভাষা শুনে , দ্রোণাচার্য শুধু অবাকই হলেন না , মনে -মনে পরিচয় করবার জন্য আগ্রহ বোধ করলেন । কেননা , তিনি আর্য আভিজাত্যে লালিত ,সেই ঐতিহ্যের বিপরীতে কখনই হাঁটতে রাজী নন । ম্লেচ্ছ ভাষা মুখে উচ্চারণ করতেও কুণ্ঠিত হন । এই ভাষা অবশ্য তাঁকে শিখতেই হবে । 

হাত জোর করে বললেন - নিতান্তই ভ্রমণের উদ্দেশ্যে , আর দেশ দেখার জন্যই এখানে আসা । একান্তে সাধনা করব । নিজের বিষয়ে অধ্যায়ণ করব । 

মহিলা , দ্রোণের পায়ের কাছে বসল । একজন ভিন দেশী পুরুষের সামনে , উন্মুক্ত বক্ষ আর গুণ্ঠনহীন মুখে বসে রয়েছে । এমন স্বাধীনচেতা ব্যবহারে দ্রোণের বুঝতে অসুবিধা হলনা , এখানকার মহিলারা স্বাধীন ভাবে চলাফেরা করে । 

-আপনার নাম ?

-আমি ব্রাক্ষ্মণ মন্দপালের পুত্র দ্রোণ । উত্তরাপথে এক হতভাগ্য দরিদ্র ব্রাক্ষ্মণ পরিবারে জন্ম । নিজের ভাগ্যকে খুঁজে চলেছি । 

-যদিও আপনি আমার থেকে বয়সে ও জ্ঞানে অনেকটাই প্রাজ্ঞ । আপনার চেহারা দেখে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছেনা , উন্নত বংশের ছাপ বহন করে চলেছেন । আমি আমার জীবনের উপলব্ধি থেকে বলতে পারি , ভাগ্যকে খুঁজতে হয় সততা আর পরিশ্রম দিয়ে । ক্ষুধায় কাতর মানুষের কাছে ক্ষিধে আর খাদ্য দুটোই গুরুত্বপূর্ণ । তবে সবচেয়ে বেশী মূল্যবান ক্ষিধেই । 

-কেন ?

দ্রোণের মুখে সূর্যের সরল আল আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে । বনস্পতির ছায়ায় সে আর আরও স্নিগ্ধ হয়ে উঠল । মহিলা হাসল । ভরা বুক , শ্রাবণের মেঘের মতনই কাম পিপাসি । সে বুক কেঁপে উঠতেই , দ্রোণের শরীরে কাঁপন লাগছে ! নিজেকে সম্বরণ করে নিলেন , বললেন –আমায় বিস্তার করে বলুন । দেবী ...

-ক্ষিধে থাকে বলেই মানুষ খাদ্যের কাছে ছুটে যায় । খাদ্য সংগ্রহ করবার তাগিদ অনুভব করে । নিজের মধ্যে সেই আক্রমণাত্মক আদর্শ আনতে হবে । দেখবেন একদিন নিজের কর্মভূমিতে , পূজিত হবে । 

-আমি নিজের প্রিয় শিষ্যের চোখে নেমে গিয়েছি দেবী । 

-এমন কেন বলছেন ?

-সে অনেক কথা । আপাতত আমাদের এখানেই থামতে হবে । 

-কেন ?

-আমি শেষ রাতেই এই প্রান্তে এসে পৌঁছিয়েছি । ক্লান্ত । ক্ষিধেও পেয়েছে । নিজের হাতে রান্না করতে হবে যে । কাঠ সংগ্রহ করতে যাব । 

-আপনি যদি আমার গৃহে থাকেন , অসুবিধা হবে ?

-একদম নয় । আমার মতন একজন ভিনদেশীকে আশ্রয় দেবেন ! 

-আমরা মানুষকে বিশ্বাস করি । আপনি আমাদের আতিথ্য নিন । আমরা আপনার জন্য আলাদা ব্যবস্থা করে দেব । প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এর ব্যবস্থা করব । আপনাকে খাদ্য সংগ্রহের দায়িত্ব নিতে হবে না। আপনি হয়ত ধর্মীয় কারণেই অন্য জাতির হাতের রান্না খাবেন না ।

-আপনি জানলেন কেমন করে ?

-যেমন ভাবে আপনার ভাষা জেনেছি । 

-মানে ?

-আমিও উত্তরাপথের এক সম্ভ্রান্ত নর্তকী বংশের কন্যা । বহু ব্রাক্ষ্মণ সন্তানের যাতায়াত ছিল আমাদের পরিবারে। তারপর এখানে চলে আসা , সে অনেক গল্প । সবকিছু বলব । এখন শুনুন আপনি নিজের রন্ধন নিজেই করে নেবেন । আমরা শুধু আপনার যাতে কোন অসুবিধা না হয় , সেই দায়িত্ব নিতে চাই । 

দ্রোণ মাথা নিচু করে সম্মতি জানালেন । 


মদনিকা বুকের অন্তর্বাস পড়ছিল । পাশে নগ্ন হয়ে শুয়ে আছে কঞ্জর । দু’হাত মাথার পিছনে রেখে , মদনিকার দিকে তাকিয়ে । নির্মেদ দেহ , গায়ের চাপা রং । পীঠ পর্যন্ত শুকনো চুলের বাহার । স্তন দুটো নিটোল । কিছুক্ষণ আগে কামড়ের দাগ -- ক্ষত হয়ে ফুটে উঠেছে । সেখানে হাত রেখে মদনিকা বলল - ইস , আবার আজ আমাকে পাতার প্রলেপ দিতে হবে !

-দেবে । ক্ষতি নেই ।

-তোমার নেই , আমার আছে । এই বয়সে এক কন্যার মা হয়েও , এই সব খুব লজ্জা !

-তোমার কবে থেকে এতো লজ্জা হল ? সঙ্গমে আমার থেকে তোমার আক্রমণই বেশী । এই দেখো আমার পীঠে , তোমার নখের চিহ্ন ।

-আমারটা দেখো , সন্দুকে যখনই পাতার প্রলেপের কথা বলব , তখনই মিটিমিটি হাসবে । ছিঃ।

-দেখো , কেউ যদি হাসে তাতে আমি আমার ব্যবহারে পরিবর্তন আনতে পারব না। 

কিছুক্ষণ মদনিকা , কঞ্জরের দিকে তাকিয়ে বলল – আসল কথাটা শুনবে ?

-কোন কথা ? 

-তুমিতো শুনতেই চাইলে না । শুরু করবার আগেই আমাকে সঙ্গমে বাধ্য করলে ।

-হ্যাঁ কিছু একটা বলবার জন্য ...

-আমি আমাদের তাক্ষীর জন্য উপযুক্ত স্বামী নির্বাচন করেছি । 

কঞ্জর এই কথা শুনে উঠে বসল । বলল – এত তাড়াতাড়ি ? মানে পাত্র পেলে কোথায় ! 

মদনিকা বলল - দু’দিন আগে এক তেজস্বী ব্রাক্ষ্মণ আমাদের আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন । মনে আছে ?

-উনি ? হ্যাঁ , উত্তরাপথ থেকে এসেছেন । মনে আছে । তুমি খুলে বলতো । এই ব্যাপারে আমার রহস্য একদম ভালো লাগছে না । 

মদনিকা পা টেনে , কঞ্জরের কাঁধে মাথা রেখে , ঘনিষ্ঠ হয়ে বসল । ওরা দু’জনেই ভূমিতে যে শয্যা প্রস্তুত করা হয়ে , তারউপর শুয়ে আছে । বাইরে দুপুরের নির্জনতা । এখানে প্রকৃতি সবসময় শান্ত নিজের মতন । 

মদনিকা আর কঞ্জরের একটা অতীত আছে । এইক্ষণে মদনিকা যে প্রস্তাব দিতে চলেছে , তার সাথে অতীতের সেই কাহিনী আরও বাস্তব হয়ে উঠবে । পাঠককে সেই পর্বে প্রবেশের আগে , আজ থেকে দশ বছর আগে , কৈলাস পর্বতের নির্জন সময়ে ফিরে যেতে হবে । তখন ছিল বসন্ত ঋতু । গাছে-গাছে পাখিদের সাথে ফুলেদের চুপিচুপি কথা , তাই বলছিল । কামনার রঙে চারিদিকে বনের ভিতর শুধুই সম্ভোগের প্রকাশ । টলটলে নীল সরোবর ভরে গিয়েছে পদ্ম ফুলে। নীল জলে ভাসছে রঙিন পদ্ম । সবুজ পাতায় মোমের মতন জলবিন্দু ! বসন্তের সুগন্ধ বাতাসে চারিদিক উতলা হয়ে উঠেছে । সরোবরের শেষ ধাপে এক নগ্ন পুরুষ মাথা রেখেছে এক কিশোরীর বুকে । খোলা বুকে মাথা রেখে চুমু দিচ্ছিল । 

এই স্থান নির্জন । এই স্থান একান্ত । এখানে নিভৃতে সঙ্গমে বাধা নেই । পুরুষটি কিশোরীর বয়েসের তুলনায় দ্বিগুণ বয়স্ক । কুবেরের একান্ত অনুচর সদাগর বণিক বিদ্যুতরূপ । সে নিজের পত্নীর সাথে একান্তে সময় কাটাচ্ছেন । 

এই সময় ওরা দু’জনে উপভোগ করছিল । কিছুটা দূরে দুজন লোক অপেক্ষারত , তাদের মুখে ফুটে উঠছে উত্তেজনা । একজন রোগা পুরুষ বিদ্যুৎরূপের উপর অতর্কিতে আক্রমণ করে বসল !

এমন ঘটনায় আচমকাই বেশ হকচকিয়ে গিয়েছিল , এই দেহরক্ষীহীন স্থানে এমন আক্রমণ হবে ভাবতেও পারেনি । বিদ্যুত পাশে অগোছালো ভাবে থাকা কাপড় পড়ে নিল । কিশোরী লজ্জায় খোলা বুক হাত দিয়ে ঢাকল । 

-তুই কে ?

বিদ্যুতরূপের গলায় ঝাঁঝ । সামনের পুরুষটি জোর গলায় বলল – আপনি আমাদের বনভূমি দখল করে নিয়েছেন । এতদিন আমরা পাখি বিক্রি করে আমাদের জীবিকা চালাতাম । আপনারা অর্থবান । নিজেদের প্রতিপত্তি বিস্তার করে বনভূমি দখল করে নিচ্ছেন ! আমরা ভূমিপুত্র । আমাদের স্থান আমরা ছাড়বনা । আমাদের জঙ্গল আমাদেরই । আমি কঙ্ক ।

বিদ্যুতের মুখ থেকে মদের গন্ধ আসছে , জিহ্বা জড়িয়েছে । 

-কঙ্ক ! নাম শোনা শোনা মনে হচ্ছে ? তোরাই ...

-হ্যাঁ আপনাদের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহী ভূমিপুত্রের দলটি লড়াই করছে । আমিই সেই দলের নেতা।

-তোর এত বড় সাহস , আমার সামনে দাঁড়িয়ে ! তোরা আমার ব্যবসার অনেক ক্ষতি করেছিস । 

-আপনি আমাদের বনভূমি ছেড়ে দিন ।

-ওখানে আমি নগর বানাবো । নতুন সভ্যতার জন্ম দেব ।

-আমাদের বাসস্থানের সরলতা হারিয়ে যাবে । আমরা যাব কোথায় ? এই দেশ জ আপনাদের তার থেকেও অনেক বেশি আমাদের । তাও কেন আমাদের জীবিকা নষ্ট করছেন । 

-বেশ করেছি । জঙ্গল আমাদের দখলে । কুবের সমস্ত কিছু নিয়ে নেবেন ।

কঙ্ক হাতে বর্শা তুলবার আগেই , বিদ্যুত খুব দ্রুত ক্ষুর চালিয়ে দিল ! এই ছোট্ট ঘাতক অস্ত্রটি তার সাথেই থাকে । কিশোরী দেখল -- সামনের কালো রঙের জেদি পুরুষটির গলা দিয়ে রক্ত পড়ছে ফিনকি দিয়ে !

কঙ্ক নিথর দেহ সরোবরের সামনে পড়ে রইল । লাল রক্তের স্রোত নীল জলে মিশছে । 

এই দৃশ্য দেখে কিশোরী জ্ঞান হারাতে বসেছিল । বিদ্যুতরূপ আর কিশোরী বাদে , কঙ্কর ম্রিত্যুর মৃত্যুর দৃশ্য দেখল তার ভাই কঞ্জর । সে শোকে নিজেকে ধরে রাখতে পারল না । আক্রমণ করে বসল । 

সেইদিনের কিশোরীই আজকের মদনিকা । 

মদনিকা বলল – আমি নর্তকীর বংশের মেয়ে , বিদ্যুতরূপ আমার প্রভু ছিলেন । কুবের ব্যবসা করে দখল করা নারী সম্পদ , তাঁর অনুচরদের মধ্যে ভাগ করে দিতেন । তেমন ভাবেই উত্তরাপথ থেকে চলে আসা । সেই দিন তুমি আমকে উদ্ধার করেছিলে । আমি স্থায়ী আস্তানা পেলাম । পরিচয় পেলাম ।সম্মান পেলাম । সকলের কাছেই নিজের আত্মমর্যাদা প্রিয় ।

আজ দশ বছর পর সেই অতীতের মুক্তির আলো যেন মদনিকার মুখে ভেসে উঠেছে । জানালার কাছে গিয়ে , বাইরের দিকে মুখ করে বলল - দ্রোণ ব্রাক্ষ্মণ হলেও ক্ষত্রিয়দের সাথে তাঁর ওঠাবসা । শুনেছি উত্তরাপথের হস্তিনাপুরের সাথে তাঁর সম্পর্ক বেশ গভীর । ওখানে খুব তাড়াতাড়িই যুদ্ধ হবে ।

-যুদ্ধ ?

-হ্যাঁ গৃহযুদ্ধ । এই সেই সুযোগ । বনবাসী ভূমিপুত্ররা বহু দিন ধরে এমনই সুযোগ খুঁজছিল । দ্রোণকে যেমন ভাবেই হোক আমাদের দিকে আনতেই হবে । তাক্ষীকে সে পত্নী হিসেবে গ্রহণ করবে ।

কঞ্জর উঠে , মদনিকার পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো । 

-অসম্ভব । ব্রাক্ষ্মণ কখনই উপজাতি ভূমিকন্যাকে পত্নী হিসেবে মেনে নিতে পারেন না । তাছাড়া তিনি বৃদ্ধ । 

মদনিকা বলল – কে বলল ?

-মানে ?

-সে এখনও দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনে সক্ষম আছে । আমরা মেয়েরা সব বুঝি । আমাকে সে বলেছে , হস্তিনাপুরকে যুদ্ধে জয়ী করবার জন্য আমাদের সাহায্য চায় । আমরা আমাদের গোপন অস্ত্র দিয়ে তাঁকে সাহায্য করব । যুদ্ধ শেষে হস্তিনাপুর জয়ী হলে , যুবরাজ দুর্যোধনকে বলে আমাদের জমির লড়াইয়ে সহায়তা করবেন । তাক্ষীকে নিজের পত্নী হিসেবে মেনে নিতে অসুবিধা নেই । পাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাস শুরু হলেই , সে আমাদের এখানে আসবে । তাক্ষীর সাথে সময় কাটাবে । আমাদের শুধু ওদের গর্ভজাত সন্তান চাই , যারা ভবিষ্যতে নেতৃত্ব দেবে । বনবাসী ভূমিপুত্রদের নায়ক হবে । তত দিনে মেয়েটা রজঃস্বলা হয়ে উঠবে । আশা রাখছি । 



কুরুক্ষেত্র থেকে বেশ কিছুটা দূরে নির্জন স্থানে দ্রোণাচার্য দাঁড়িয়ে । তাঁকে ঘিরে রয়েছে অন্ধকার রাতের নিস্তব্ধতা । কেউ আসবে । সেই অপেক্ষা তাঁর মুখে উঠেছে । 

রণভূমিতে কাল সূর্য উঠবার সাথে - সাথে হস্তিনাপুর নতুন সেনাপতি পাবে । গোটা ভারতবর্ষ দেখবে , শিষ্য আর গুরুর লড়াই । দ্রোণ এই সব কথা ভাবতে –ভাবতে মাটিতে বসে পড়লেন । নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছিল । 

নরম অথচ দৃঢ় হাত , বৃদ্ধ ব্রাক্ষ্মণের কাঁধ স্পর্শ করল ! 

ঘাড় ঘোরাতেই , মুখে হাসি ফুটল । বললেন – যাদব শ্রেষ্ঠ , দ্বারকানাথ প্রণাম নেবেন ।

কৃষ্ণের ঠোঁটে ঠাণ্ডা হাসি । - আপনি কেমন আছেন ?

-আমার অবস্থায় থাকলে আপনি কেমন থাকতেন ?

-এটা ব্যক্তি আর পরিস্থিতির উপর নির্ভর করছে । আমাদের পরিস্থিতি এক হতে পারে । কিন্তু ব্যক্তি আমরা আলাদা । বুঝলেন ?

-আপনি আমার বার্তা পেয়ে এসেছেন , আমি সম্মানিত ।

-গুরু দ্রোণ আমরা দুই বিপক্ষ শিবিরের সেনা । আমি জানি আপনি হস্তিনাপুরের জন্য নয় , নিজের বংশ , পুত্রের পরিচয়ের জন্য হস্তিনাপুরের হয়ে লড়ছেন । আমরা কেউই আমাদের শত্রু নই । আসুন আমরা দেওয়া -নেওয়ার হিসেবটা আগে বুঝে নিলাম । 

-মানে ?

-দেখুন , আমি গুপ্তচর মারফৎ আপনার গোপন বিবাহের কথা জেনেছি । আপনি দক্ষিনাপথে মদনিকা নামে এক উপজাতীয় নর্তকী বংশের কন্যাকে বিবাহ করেছেন । ক্ষত্রিয়দের সাথে বনবাসী ভূমিপুত্রদের দীর্ঘ দিনের সংঘর্ষ তা রীতিমতন দাবানল হয়ে উঠেছে । তাই আপনি ক্ষত্রিয় সমাজেরও শত্রু । এই কথা যদি ক্ষত্রিয় সমাজ জানতে পারে , আপনার সম্মান থাকবেনা। শুধু তাই নয় হস্তিনাপুরের সেনাবাহিনীর প্রধান হওয়ার যে স্বপ্ন আপনি দেখেছেন --- তাও ধূলিসাৎ হয়ে যাবে । 

দ্রোণ দু’হাত দিয়ে কৃষ্ণের পা ধরতে গেলেন । কৃষ্ণ পা সরিয়ে নিয়ে -- হাত ধরে ফেলল ।বলল - ছিঃ । আপনি জ্ঞানী । এই কাজ করে আমাকে কেন ছোট করছেন ! আপনি গোপন অস্ত্র শিক্ষার জন্য এই বিবাহে রাজি ছিলেন । আমি অন্যায় দেখিনা । 

-কৃষ্ণ , আসল কথা হচ্ছে মদনিকার কন্যা তাক্ষী গর্ভবতী । আমার সন্তানের মা সে । আমি চাইনা অশ্বত্থামার কাছে ছোট হতে । আমি এই কন্যাকে বিবাহ করেছিলাম শুধুই লেনদেনের শর্তে । কুরুক্ষেত্রে অর্জুনকে রুখতে , আমার উপজাতীয় যুদ্ধ কৌশল ব্যবহার করবার উদ্দেশ্য ছিল ।ব্যক্তিগত ভাবে আমার কাছে তার বিন্দুমাত্র কদর নেই । সে আমার সন্তানকে জন্ম দিতে চলেছে। এই কুরুক্ষেত্রের দিকেই আসছে । মদনিকা গোপন বার্তা য় জানিয়েছে , আমাদের এই গৃহযুদ্ধ প্রকৃত সময় ভূমিপুত্রদের জন্য । তারা আচমকাই আক্রমণ করতে প্রস্তুত ।

কৃষ্ণ বলল – আপনি কার পক্ষে ?

-ক্ষমতার । নিজের ঔরসজাত সন্তানকে অস্বীকার করছি । বনবাসী ভূমিপুত্রদের লড়াই একান্ত তাদের। আমি ক্ষত্রিয়দের পক্ষে । ভারতবর্ষে যে আদি বনভূমিতে সম্পদ রয়েছে তা নিয়ে ভবিষ্যতে ক্ষত্রিয় আর বনবাসী ভূমিপুত্রদের মধ্যে যুদ্ধ অনিবার্য । খুব ভালোভাবে এই সত্য আমিও টের পেয়েছি , যুদ্ধে যেই পক্ষই জয়ী হোক , ভারতবর্ষে ক্ষত্রিয় আর ব্রাক্ষ্মণদের প্রভাব প্রতিপত্তির পথে বাঁধা হতে পারে ----- বনবাসী ভূমিপুত্ররা । তাক্ষীর সন্তান আগামী দিনে , আমাদের বিরুদ্ধেই অস্ত্র তুলবে । সে ক্ষত্রিয়দের কাছে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে পারে । আমি আমার শ্রেণির পক্ষে । 

-আপনি আমাদের কাছে কি চাইছেন ?

-কৃষ্ণ , অর্জুন আমার পরম প্রিয় বিশ্বাসযোগ্য পাত্র । তুমি চতুর রাজনীতিবিদ । তাক্ষীকে গোপনে হত্যা করবার দায়িত্ব তোমাকে দিলাম । আমি বাইরের কোন মানুষকে বিশ্বাস করতে পারব না। 

-সে যে গর্ভবতী !

-সে এখন শত্রু শিবিরের প্রধান অস্ত্র । তাক্ষীকে আর আমার পত্নী , নারী হিসেবে দেখো না । 

-আপনি যে কথা দিয়েছিলেন ।

-তাইতো তাকে গোপনে হত্যা করবার ভার তোমাদের দিলাম । তাকে বিয়ে করেছি । আমার সন্তানের মা হতে চলেছে । এইসব কিছুর থেকেও আজ সে আমার শত্রু । যুদ্ধে শত্রুপক্ষ কে পরাজিত করাটাই আমার ধর্ম । 

-আর আমরা ?

-আমি পাণ্ডবদের মধ্যে কোন ভাইকেই হত্যা করব না । নিশ্চিন্তে থাকো । শুধু এটা দেখো আমার এই গোপন পাপ যেন আমার পুত্র অশ্বত্থামাও না জানতে পারে । যদি জেনে যায় , আত্মহত্যা করা ছাড়া আমার উপায় নেই । 

দ্রোণ কৃষ্ণের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল ।

কৃষ্ণের গভীর চোখে তখন অন্য গণিতের ইঙ্গিত । দ্রোণাচার্যের প্রস্তাব সে গ্রহণ করল । অর্জুনকেই এই গোপন দায়িত্ব নিতে হবে । 

রাত বাড়ছে । ঝি ঝি পোকার শব্দ নীরবতার উৎসবকে উদযাপন করছে । গভীর নীল আকাশে , সাদা চাঁদের বুকে , মেঘের পাতলা আস্তরণ – ভেসে চলেছে । এই বড় প্রান্তরে দুজন বিপক্ষ শিবিরের যোদ্ধা , মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে । তাঁদের হাতে অস্ত্র নেই । শুধুই অতীত আর ভবিষ্যতের সমীকরণ । এই সমীকরণই তাঁদের অমোঘ আত্ম রক্ষার কৌশল । এই রণভূমিতে বিশ্বাস বলে কোন শব্দ নেই । 

ক্ষমতা দখলের যুদ্ধে নীতিও থাকতে নেই । 


পিনাকি
পিনাকি
chakrabortypinaki50@gmail.com


Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.