x

আসন্ন সঙ্কলন

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

শনিবার, জুন ৩০, ২০১৮

পিনাকি

sobdermichil | জুন ৩০, ২০১৮ |
ব্রহ্মরাক্ষস ও চণ্ডালের গল্প

ধুতি তুলে, হাঁটুর উপর কিচ্ছুক্ষণ চুলকে নিল, গণেশ ভাউরাও চেইরি। মহারাষ্ট্রের ইয়াভাতমাল জেলার, এক হতদরিদ্র গ্রামের, আলোবিহীন , মাটির দাওয়ায় বসে হুঁকায় টান মারলেন --- বয়স সত্তর , রুগ্ন , কালো কুচকুচে গায়ের রং , ক্লান্ত চোখে ঘুম নেই । চাঁদের আলোয় , খণ্ড –খণ্ড মেঘের আনাগোনায় - সন্ধ্যার আকাশটা রাতের আকাশ হয়ে উঠছে ! ছড়িয়ে থাকা গ্রামের এক পাশে বিস্তীর্ণ চাষাবাদের জমি , আরেক পাশে চাষীদের ভাঙা – ভাঙা ঘর । খড়ের ছাউনির ভিতর দিয়ে চাঁদের আলো ঢুকছে । 

গরমে বেশ কষ্ট । গ্রাম থেকে পায়ে হেঁটে চল্লিশ মিনিট গেলেই নলকূপ ; গ্রামের লোকেরা জল ভরে নিয়ে আসে । নিজস্ব পাতকুয়া থাকলেও শুকিয়ে গিয়েছে , নতুন খনন শুরু হবে । গ্রাম পঞ্চায়েত কথা দিয়েছেন - চাষের জমিতে ফসল জলের জন্যই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে । তাই জলের ব্যবস্থা করে দেবেন । 

গণেশ দাওয়ায় বসে , নিজেকে নিয়ে ভাবছিলেন । এই চিন্তা নিজের পরিবারের তিনটি মেয়ে (বিবাহযোগ্যা ) , বছর কুড়ির ছেলেকে নিয়ে ; কলেজে ভর্তি হলেও, মন দিয়ে পড়তে চায় না । বাপের সাথে জমিতে কাজ করলেও নিজেকে চাষী বলতে চায়না । সে মুখে বলে ---- জমি বেঁচে শহরে গিয়ে সবজির দোকান খুলবে ; এখানে থেকে লাভ নেই । 

এই গ্রামে এখনো সারাদিন বিদ্যুৎ থাকেনা । মেঘের ঝলকের মতন দুর্মূল্য নাহলেও , বিদ্যুৎ সম্পূর্ণ ভাবেই আজও অধরা ! মহারাষ্ট্রে জলের সংকটের একটা কারণ , বৃষ্টির অভাব । কৃষকেরা ঋণ নেন , চাষ করবে বলে । এই চাষের সফলতা নির্ভর করছে , ফসল বাজারে বিক্রি করে যে টাকা ফিরবে , এই টাকাই ফিরিয়ে দিয়ে ঋণমুক্ত হতে হবে । এটাই কারণ কৃষকের ছেলে , বংশগত জীবিকা ত্যাগ করতে চাইছে । কৃষকের কাছে , চাষে ফলনের থেকেও ঋণ মুক্তির পন্থা ভয়ের কারণ হয়ে ওঠে । 

গণেশের চোখে রাতের অন্ধকারের মতনই গভীর চিন্তা ভাসছে ! এইবছর ঋণ শোধ দিতে পারবে তো ? দাওয়ায় চারপায়ির উপর শুয়ে , আকাশের দিকে চোখ রেখে , নিজের মনেই এইসব কথা ভাবছিলেন । বেশ কিছুটা দূরে ফাঁকা প্রান্তরের বুকে, পুরানো অশ্বত্থ গাছটা, রাতের অন্ধকার জড়িয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে । গাছের পাতা, শাখা গুলো অন্ধকারে ছায়া হয়ে ঝুলছে ! আকাশে চাঁদের আলো , সাদা হয়ে গাছের মাথায় পড়ছে , চারপাশটা সেই আলোয় ভেসে গিয়েছে, শুধু গাছের মাথায় জমাট অন্ধকার ! 

এই গাছটাকে নিয়ে অনেক রূপকথা আছে, গ্রামে অনেকের মুখে - মুখে সেই রূপকথা যেন সত্যি হয়ে উঠেছে ! যদিও গাছটা , গণেশের বাড়ির সীমানার বাইরে , এক নিরাপদ দূরত্বে , তাও এই মুহূর্তে ভয় করছে । 

ভয় অনেক সময় মানুষের নিঃসঙ্গতা আর দুর্বল মনের প্রতিফলন। গণেশ দিনের বেলায় যে গাছে মাথা ঠেকিয়ে ক্ষেতে যায় । এই রাতে গাছের মাথার দিকে তাকিয়ে, সাদা লোমে ঢেকে থাকা বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল ! 

চারপায়িতে শুয়ে গণেশ ভাবছিলেন, গ্রামের লোকেরা বলে ওই গাছে এক ব্রহ্মরাক্ষস বাস করেন । তিনি কৃপা না করলে, ক্ষেতে ফসল ফলবেনা । তাঁকে আনন্দ দেওয়ার জন্য পুজো দরকার । সন্তুষ্ট করবার জন্যই প্রতি অমাবস্যায় মুরগী উৎসর্গ করা হয় । 

ঘুম পাচ্ছে । 

গণেশের চোখ দুটো লেগে গেল । সারাদিনের ধকলে ঘুম নামছে । 

আচমকাই নিঃশ্বাসের হাওয়ায়, কেঁপে উঠলেন। চোখে ঘুম আছে। জড়ানো চোখেই তাকিয়ে দেখলেন, আগের থেকেও চারপাশ আরও অন্ধকার হয়ে গিয়েছে । রাত অনেক । ঘরে কেউ নেই । আরেকটু ঘুমিয়ে তারপর উঠবেন , গণেশ টানটান হয়ে শুয়েছেন , আর ঠিক সেই সময়ই চোখে পড়ল ! 

প্রথমটায় ভেবেছিল চোর । তাঁর মতন গরীব কৃষকের ঘরে কিসের জন্য চোর চুরি করতে আসবে । তাহলে কে ? গণেশ পায়ের কাছে এক পুরুষ ছায়া মূর্তিকে বসে থাকতে দেখলেন । দেহের উপরিভাগ নগ্ন । নিম্মাংশ লজ্জা ঢাকার মতনই কাপড় জড়িয়েছে ; মাথার জটা ধরা চুলের স্রোত ঘাড় পর্যন্ত নেমে এসেছে । 

গণেশ তাকিয়ে রইলেন । এই অদ্ভুত রকমের মানুষটা কে ? 

⇌ ২

-অত ভয় পাচ্ছিস কেন ? 

সামনের লোকটার ভারী কণ্ঠস্বর শুনে , গণেশ চমকে গেলেন ! গলা শুকিয়ে যাচ্ছে । বললেন - আপনি ?

লোকটি মাথা নামিয়ে বলল - এতক্ষণ যার কথা মনে - মনে ভাবছিলিস । প্রতিদিন , জমিতে যাওয়ার আগে আমার থানে মাথা ঠেকিয়ে যায় গ্রামের লোক । তুইও তাই করিস ... 

-মানে ?

-দূরের গাছটার দিকে তাকিয়ে দেখ । আমি ওখান থেকেই এসেছি ।

-বুঝলাম না ।

-এমনটাই হয় । মানুষ কানে যা শোনে , তা প্রথম দর্শনে মানতে চায়না । 

গণেশের মনের ভিতর অনেক প্রশ্ন , সে তাকিয়ে রয়েছে । 

লোকটি বলল - তোকে একটা গল্প বলছি , মন দিয়ে শুনবি । অনেক রাত হয়েছে । চারদিক বড় নিঃস্তব্ধ । এমন রাতে যদি কেউ কোন মানুষের ঘাড় মটকিয়ে দেয় , বলবার কেউ নেই ! বাঁচাতেও আসবেনা । কিরে ভয় লাগছে ?

গণেশ ঘামছে। টের পেলেন গলা আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছে । চিৎকার করবার মতন ক্ষমতা নেই ! 

লোকটি হাসতে –হাসতে বললেন - ভয় নেই , আমার গল্প মন দিয়ে শোন । দেখবি এটা শেষ হলেই তুই আবার কথা বলবার শক্তি ফিরে পাবি , আমি চাইছি আমার গল্পের প্রতি তোর মনঃসংযোগে ব্যাঘাত না হয় । অবশ্য গল্প চলাকালীন তুই প্রশ্ন করতেই পারবি । মন দিয়ে শুনবি ...

অবন্তী নগরের খুব কাছেই , জলে ভরা ক্ষিপ্রা নদী । নদীর ধারে বিস্তীর্ণ ক্ষেত ভূমির মালিক দেবশর্মা । এই এলাকা তারই । নদীর জলে , পলির আদরে যে চওড়া ভূমি লালিত হচ্ছে , সেখানে যদি ফসলে ভরে যায় , খুব আনন্দ হবে । পরিশ্রমী নয় । হ্যাঁ ক্ষমতা আর পাশবিক বলে , এই অঞ্চল নিজের দখলে রেখেছে । এমনটা করে , এই তল্লাট ফাঁকা হয়ে গিয়েছে ! দেবশর্মা একপ্রকার নদীর ধারের ফাঁকা জমি দেখে ই দিন কাটিয়ে দিচ্ছিল । 

সে বসন্ত কালের এক ভোরে । বহেড়া গাছের তলায় , পায়ের উপর পা তুলে , নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নিচ্ছিল দেবশর্মা । ঘুম ভেঙে যেতেই , দেখল - চণ্ডাল এইদিকেই আসছে । এমন সুযোগ পেয়ে যাবে বুঝতেও পারেনি ! দশ বছর জমি ফাঁকা পড়ে রয়েছে । মাথায় বুদ্ধি খেলছিল । যেমন ভাবেই হোক , এই চণ্ডালকে বশে আনতে হবে । 

এখন একটা বুদ্ধির দরকার যাতে চণ্ডাল তার কথা শুনে , কাজ করে । মনে – মনে ভাবছিল ... 

চণ্ডাল আচমকা ফর্সা টকটকে , লম্বা মানুষটিকে শুয়ে থাকতে দেখে , চমকেই গেল । 

দেবশর্মার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল । গলা কাঁপছে । চণ্ডাল বলল 

-আমায় মাপ করে দিন । 

কেউ নিজে থেকে যদি আত্মসমর্পণ করতে চায় , তাকে বন্দী করবার মজাই আলাদা । দেবশর্মা দেখল , চণ্ডালকে এমন ভাবে বন্দী করতে হবে , সে ঋণে জড়িয়ে থাকে । ঋণ সে শোধ করবার জন্য আমার কাছেই আসবে । দেবশর্মা উঠে দাঁড়িয়ে স্থির চোখে গম্ভীর গলায় বলল

– এই ভূমির মালিক আমি । আমার নাম দেবশর্মা । 

কথা শুনে , হাত জড়ো করে চণ্ডাল বলল – আপনাকে দেখেই বুঝতে পেরেছি , এই ভূমির মালিক আপনি । আমি ভুল করে এই সীমানায় আসিনি । আমার খুব দরকার, এই গাছের কা , পাতা , ফল আর নদীর পিছনে যে বনভূমি রয়েছে, সেখান থেকে কিছু পাখি শিকার করব । এই নদীতে রুপালী মাছের ভেসে যাওয়া দেখে টের পেয়েছি , হাঁসের ঘুরে বেড়ানো দেখে আন্দাজ করেছি , খুব সুন্দর জায়গা । খাদ্যের কোন অসুবিধা হবে না । আমার পরিবারের জন্য এইখানে আসতেই হয়েছে । আমার পরিবারের পেটে খাদ্য তুলে দিতে হবে । তাই এই উত্তম স্থানের খোঁজে এলাম । 

দেবশর্মা হাসল । 

-এই নদীর মালিক আমি । বনভূমি আমার সীমানার মধ্যেই পড়ে । তুমি বিনা অনুমতিতে এখানে এসেছ । শিকার করছ । 

-আমি চণ্ডাল । পশুদের ছাল - চামড়া নিয়ে কারবার করি । এটা ঠিকই অন্যের ভূমিতে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করে অপরাধ করেছি । তাইবলে আপনাদের বিরোধী নই । আমি আপনার বিষ্ণু মন্দিরে পুজা দিয়েছি । প্রতি একাদশীতে উপবাস করি । এটাই আমার স্বভাব । হে ব্রাক্ষ্মণ পুরুষ আমায় উদ্ধার করুন । 

এই প্রথম দেবশর্মার মুখে হাসি খেলেছে । মন ভালো হয়ে গেল । অনেক দিন বাদে কেউ তাকে আবিষ্কার করল ! শুধু আবিষ্কার কেন , সম্মান দিল বলা যায় ! 

সেই অনেক দিন আগের কথা । দাদু , মানে বাবার বাবা, সেই সময়কার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল । এই ঘটনা দেবশর্মা শুনেছে , নিজের পিতার মুখে । 

বহুদিন দিন বাদে পিতার মৃত্যুর পর , এক অন্তজ চণ্ডাল যখন তাকে ব্রাক্ষ্মণ বলে সম্বোধন করল , আচমকাই একপুরুষের জীবিকা , সম্মানের মুহূর্ত ভেসে উঠল - চোখের সামনে । এই সম্মান দেবশর্মাকে বেশ আনন্দ দিল , উত্তেজিত করল । 

দেবশর্মা বলল – চণ্ডাল তুমি যা বললে তা ঠিক । আমার এক পুরুষ ব্রাক্ষ্মণ ছিলেন । তাঁদের ব্রহ্মতেজে আমরা বিশেষ শক্তির অধিকারী । তাই আমি তোমার অতীত সম্পর্কে অবগত ।

কথাটা শুনে , চণ্ডাল বলল - প্রভু , আমার অতীত !

-সকলেরই অতীত রয়েছে , তোমারও আছে । তুমি শুনবে সেই কথা ?

-আপনি আমার জন্মের রহস্য জানেন ! বলুন ...

চণ্ডাল হাত জোর করে হাঁটু ভাঁজ করে বসে পড়ল । সামনে দাঁড়িয়ে দেবশর্মা । মুখে স্মিত হাসি । সূর্য মধ্যগগনে ; দেবশর্মার মধ্যবসন্তের মতনই তা তেজে ভরপুর । দেবশর্মা বলল – আমরা দূরের ওই ছায়া ঢাকা স্থানটি আলোচনার জন্য বেছে নিতে পারি । অসুবিধা না থাকলে , ওইদিকে গিয়ে বসতে পারি ।

চণ্ডাল ও দেবশর্মা গাছের ছায়া ঢাকা উত্তম পাথরের তৈরী ঠাণ্ডা বিষ্ণু মন্দিরের ভিতর বসল । দেবশর্মা র পায়ের কাছে , পাথরের চাতাল ; চণ্ডাল পা’ ভাঁজ করে বসেছে । 

চণ্ডাল বলল – প্রভু আপনি কিছু বলছিলেন । 

-হ্যাঁ , তুমি চণ্ডাল হয়ে কেন জন্মেছো জানও ? এই চণ্ডাল জন্মের পিছনের এক করুণ কাহিনী রয়েছে । 

-করুণ কাহিনী ! না প্রভু আমি জানিনা । আপনি বলুন আমি জন্মের ইতিহাস জানতে চাই ... 

দেবশর্মা চোখ বন্ধ করে , পা ঝুলিয়ে বসে , চণ্ডালের উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করল ..। 


⇌ ৩

অনেক দিন আগেকার কথা । এক সন্ন্যাসী একান্ত মনে ধ্যানে আচ্ছন্ন । তার অনেক অনুরাগী রয়েছে । ঈশ্বরের কথা সে , এমন সুন্দর ভাবে বলে , অনুরাগীরা বিভোর হয়ে থাকে । তাঁর এক শিষ্য ছিল । নাম তার চণ্ডু । মূলত গোশালার দেখাশুনো করত । সন্ন্যাসীর অদ্ভুত ক্ষমতায় , তাঁর ভক্তরা বিভোর হয়ে থাকত । চণ্ডু খুব কাছের শিষ্য । সন্ন্যাসীর অনেক খবরই সে জেনেছে । সন্ন্যাসীর নিজের একটি আশ্রম ছিল , ভক্তদের উপহারেই সেই আশ্রম চলত ।   

সন্ন্যাসী খুব সুন্দর কথা বলে মানুষকে সম্মোহিত করে ফেলতে পারেন। এই সম্মোহন বিদ্যা দীর্ঘ দিনের অনুশীলনের দ্বারাই আয়ত্তে এসেছে। একদিন গভীর রাত পর্যন্ত ধ্যানে ব্যস্ত ; চণ্ডু খুব ব্যস্ততায় প্রভুর সাথে দেখা করবে ; বিশ্রাম কক্ষের সামনে এসে অনুমতি চাইল ।

সন্ন্যাসী অনুমতি দিলেন । 

তখন মধ্যরাত । আকাশের অন্ধকার আশ্রমে মিশে গিয়েছে । সকলেই নিদ্রায় । এমন সময় উত্তম সময় , গোপন পরামর্শের জন্য । 

-আয় , মেঝেয় বস । 

সন্ন্যাসীর কথা শুনে , চণ্ডু ইতস্তত বোধ করছিল । আজ কিছু বলবে বলে এসেছে । এই কথা না বলে সে থাকতে পারছেনা । আবার গুরুদেবের সামনে বললে , তিনি রেগে যেতে পারেন । নিজের মনকে বুঝিয়ে নিচ্ছে । আজ তাকে বলতেই হবে । 

সন্ন্যাসী বললেন - কিছু বলবার থাকলে বলতে পারিস । 

চণ্ডু চুপ করে মাথা নামিয়ে বলল – আপনার ভক্তরা অনেক কিছুই দেয় । আপনি আমাকে অত অল্প দ্রব্য দেন কেন ?

সন্ন্যাসী হেসে বললেন - নিজের লোভকে সম্বরণ করা দরকার । তোর শিক্ষা সেই স্তরের মধ্যে দিয়েই চলেছে ...

চণ্ডু প্রণাম করে বেড়িয়ে এলো । 

মন খুব বিচিত্র । সন্ন্যাসীর ইঙ্গিত চণ্ডু বুঝতে পারল না , কিম্বা মানতে চাইল না । গোশালা থেকে গরু চুরি করে পালিয়ে গেল । 

এই পর্যন্ত বলে দেবশর্মা গল্প থামিয়ে দিল । চণ্ডাল বলল – প্রভু । চণ্ডুর কী হল ?

দেবশর্মা চোখ দুটোকে , দূরের দৃশ্যের দিকে রেখে বলল - এক সন্ন্যাসীর কথা না শুনে , চুরির জন্য তার বংশ মহাপাতক হল । চণ্ডুর দোষের শাস্তিই তোমরা ভোগ করছ । তোমার পূর্বপুরুষ চণ্ডু । 

চণ্ডাল মাথা নিচু করে রইল । ক্ষিপ্রা নদীর ঝুরঝুরে হাওয়া , তার শুকনো তেলাক্তহীন কেশ গুচ্ছকে উড়িয়ে দিচ্ছিল । সে হাওয়ায় পলির গন্ধ মেখে রয়েছে । এই মুহূর্তে মুখ দিয়ে শব্দ বেরোচ্ছে না । 

দেবশর্মা , চণ্ডালের শক্ত পেশীবহুল চওড়া কাঁধে ডানহাত রাখল । বলল - চণ্ডাল , এটা কর্মযুগ । তুমি নিজের পূর্বপুরুষের পাপের জন্য প্রায়াশ্চিত্ত করতে পারো । সেই সুযোগ আমি তোমায় দেব ।

চণ্ডালের স্থির হয়ে যাওয়া চোখ দুটো আশার আলোয় ঝলমল করে উঠল ! আচমকাই মেঘ বাহিত আকাশের বুকে , কেউ বিদ্যুতের তলোয়াড় চালিয়েছে , এখনই ঝর - ঝর করে নামবে , মোহময়ী বৃষ্টি ! রুক্ষ প্রান্তরে বৃষ্টির স্বাদের মতনই , চণ্ডালের পাপঙ্খলনের সুযোগ ! 

-বলুন দেব , ব্রাক্ষ্মণ পুরুষ ... সেই পথ আপনি আমায় দেখিয়ে দিন । 

দেবশর্মা পুনরায় চোখ বন্ধ করল । বলল - চণ্ডাল , তুমি নিজের ভক্তি দিয়ে নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারো ।

চণ্ডাল অবাক হয়ে বলল - কিছু মনে করবেন না দেব , ঠিক বুঝলাম না ! 

-তুমি পরিশ্রম করো । জমিতে চাষাবাদ করে ফসল উৎপাদন করো । এই যুগ চণ্ডালের মুক্তির যুগ । পরিশ্রম করে নিজের মুক্তির পথ প্রস্তুত করো । আমার জমিতে আমি তোমায় সেই সুযোগ দেব । তুমি দশ বছরের জন্য আমার জমিকে কর্ষণ করবে । তোমার শ্রম আছে , আমার সামর্থ্য । তুমি সমাজে প্রতিষ্ঠা তখনই পাবে , যখন এই সমাজের প্রচলিত অর্থ ব্যবস্থার অংশীদার হতে পারবে । অবন্তী নগরে যে আর্থিক পরিবর্তন ঘটছে , তাতে কৃষি ব্যবস্থার ভূমিকা রয়েছে । চণ্ডাল , তুমি যে জীবিকার সাথে যুক্ত তা মূলত যাযাবর অর্থনীতির অন্তর্গত । এই সময় নতুন সভ্যতা সৃষ্টির সময় । এই সময় স্থায়ী আর্থিক ব্যবস্থাকে বেছে নিতে হবে । গ্রামীণ সভ্যতায় কৃষিই তোমাকে মুক্তির পথ দেবে । আমার প্রস্তাব বিবেচনা করে জানিও । দশ বছর তোমাকে আমার জমি ব্যবহার করতে দেব । তোমার বয়স আমার থেকে কম । এখন তুমি ঠিক করবে , নিজের উত্তরপুরুষের জন্য কোন পথে হাঁটবে ? 

চণ্ডাল বলল - প্রভু , আমি মুক্তি চাই । 

⇌ ৪ 

ক্লান্ত দেহটাকে টানতে – টানতে নিয়ে যাচ্ছে চণ্ডাল । দেবশর্মা সেই দিকে তাকিয়ে ভাবছে - 

সেই সন্ন্যাসী , সেই রাতেই চণ্ডুকে খুন করেছিল ! এই রহস্য অবশ্য আজও , দেবশর্মাদের পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ । সন্ন্যাসীর বিলাস বহুল জীবন যাত্রার খোঁজ পেতেই , চণ্ডুর ভক্তির দেওয়াল ভেঙে যায় ! আর কাহিনী এখান থেকেই নতুন ভাবে মোড় নিয়েছিল । 

সন্ন্যাসীর কাছে চণ্ডু গিয়েছিল সেই রাতে , নিজের কথা বলতে । সে আর সন্ন্যাসীর আস্থায় নিজেকে মত্ত রাখতে পারছিল না । সে চাইছিল নতুন কৃষি অর্থনীতির জোয়ারে নিজেকে ভাসিয়ে দেবে । খাদ্য উৎপাদনের সাথে নিজেকে নিযুক্ত রাখবে । 

এই চিন্তা সমাজে ছড়িয়ে গেলে বিপদজনক হত । এই সমাজব্যবস্থায় ভক্তির সাথে একটা আর্থিক যোগাযোগ রয়েছে । কেননা যদি সকলেই গ্রামীণ শ্রমকে মর্যাদা দিতে শুরু করে , সন্ন্যাসীর ভাববাদের পক্ষে তা বিপদজনক হয়ে উঠত । চণ্ডু ক্রমশই নিজস্ব চিন্তার জন্য শ্রমজীবীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে পড়ছিল । সেই রাতে , অনুমতি নিতেই গিয়েছিল - নিজের মৌলিক মতবাদ প্রচারের জন্য । সন্ন্যাসী বুঝতে পারল , আর বেশী দিন নয় , চণ্ডু জনপ্রিয় হলে , ভক্তির মতবাদ ক্রমশই জনপ্রিয়তা হারাবে । তাই সেই রাতেই চণ্ডুকে খুন করা হয়েছিল । রাতারাতি দেহটাকে পুঁতে দেওয়া হয়েছিল , রাতের শেষ প্রহরে ক্ষিপ্রা নদীর গর্ভে ; এর খুব কাছেই সন্ন্যাসীর আশ্রম । পরের দিন চক্রান্ত করে চণ্ডুর নামে গোধন চুরির অপবাদ দেওয়া হয়েছিল । 

দেবশর্মা ভাবছে , এই যুগেও চণ্ডুর বংশধরদের আয়ত্তে রাখতে হবে । চণ্ডালকে তাই একটা পাপমোচনের পথ দেখিয়েছি । তাদের শ্রমই সম্পদ । এই সম্পদের ব্যবহারই , এই ভূমির ছবি পাল্টে দেবে । কৃষি অর্থনীতিকে দূঢ়তা দেবে । 

কয়েক পুরুষ আগের ঘটনা । দেবশর্মা , নিজের দাদুর মুখে শুনেছে । নিজেদের সাত পুরুষের ব্যবসা পৌরহিত্যের বিরুদ্ধে তাঁদের কোন এক পূর্বপুরুষ কথা বলেছিলেন । তিনি বুঝতে পারেন নতুন অর্থনীতিতে কৃষিব্যবস্থা এক আধুনিক পরিবর্তন । সে ভাবেন , যদি জমির সহায়তায় কৃষি শ্রমকে সঞ্চিত করা যায় , খুব সহজেই মুনাফা লুঠতে যাবে । এই কারণেই ব্রাক্ষ্মণত্ব ত্যাগ করবে বলে ঠিক করেন । 

দেবশর্মাদের বংশ এখান থেকেই নিজেদের , ঋণ প্রদানকারী হিসেবে দেখতে শুরু করলেন । 

আজ চণ্ডালকে মুক্তির ফাঁদে ফেলে , তার কৃষি শ্রমকে দখল করে নিল ! দেবশর্মা হাসছে , সে বুঝতে পেরেছে - পিতা পুত্রের বচসা আর পৈতে না হয়েও , রাজবাড়িতে যজ্ঞের আগুনে আহুতির অপরাধের গল্প বানানো হয়েছিল । সেই গল্পের ভিতরের আসল রহস্যটি ! 

দেবশর্মা হাসছে । সে বুঝে গিয়েছে , চণ্ডালদের শ্রমকে এমন ভাবেই নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে হবে । 


⇌৫ 

গল্পটা থেমে যেতেই , গণেশের খেয়াল হল , ভোর হতে হয়ত এখনো ঘণ্টা তিনেক বাকী আছে । সামনের কালো ছায়া মূর্তিটা অনর্গল যে সব ঘটনা গুলো বলছিল , নিজের চোখের সামনে ক্ষিপ্রা নদী , দেবশর্মা , অবন্তী নগর , কিম্বা সেই হতভাগ্য চণ্ডাল ! সে আজও হয়ত ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পায়নি । 

গণেশ বললেন - আচ্ছা দেবশর্মা সেই চণ্ডালের সাথে শেষ পর্যন্ত কী করল ? 

মূর্তি আচমকাই যেন উত্তেজিত হয়ে বলল - সব ঠিক চলছিল । দশ বছর পর , একদিন চণ্ডাল আচমকাই দেবশর্মার কাছে নিজের শ্রমের মূল্য দাবী করে বসল । 

-মানে ?

তখন সবেমাত্র সন্ধ্যা হয়েছে । দেবশর্মা নিজের হিসেবের ঘরে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন । ঠিক তখনই ভগ্নপ্রায় দেহে চণ্ডাল এসে ঢুকল । বলল 

-প্রভু , আমাকে আমার পাওনা দিয়ে দিন । 

দেবশর্মা কিছুটা অবাক হলেও , নিজেকে শান্ত রেখে বললেন - আরে , তুমি তো মুক্তি চাইছিলে । আমার জমির সেবা কর । বিষ্ণু মুক্তি দেবে । পাপঙ্খলন হচ্ছে । ভয় নেই । তুমি আর চণ্ডাল থাকবে না । তোমার বংশধরেরাও সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে ।

- প্রভু , সমস্ত পাওনা না পেলে , ফসলের ন্যর্য মূল্য না পেলে , আর চাষ করব না । আমার শ্রমের সম্মান চাই । কাজের সম্মানেই আমার মুক্তি । অন্য কিছুর দরকার নেই । 

-মানে ?

-মানে আমি আপনার কাছে চণ্ডাল হয়ে আসিনি , কর্ষক হয়ে এসেছি । ভূমির পিতা হয়ে এসেছি । আমার কর্মের মর্যাদা চাইছি । না পেলে , আপনার জমির দায়িত্ব আমার নয় । 

গণেশ নিঃশ্বাসটাকে চেপে রেখে বললেন – তারপর ... 

মূর্তি বলতে শুরু করল – চণ্ডালের ভিতর তার পূর্বপুরুষের আত্মা ভর করেছিল । দেবশর্মা টের পেয়েছিল , চণ্ডুর মতনই চণ্ডালও দেবশর্মার বিরোধীতা করবে । এখানেই থেমে থাকবেনা । হয়ত দেবশর্মার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে দিতে পারে ! দেবশর্মার শরীরে সন্ন্যাসীর রক্ত বইছে , তাই ...

-তাই কী ?

দেবশর্মা হাল্কা হাসি হেসে বললেন - ঠিকাছে । এই সময়ে কালকে আসবে । আমি সব পাওনা দিয়ে দেব ।

-তারপর সব হিসেব দিয়ে দিল ! 
মূর্তি ভারী গলায় বলল - এইবার চণ্ডালের লাশটাকে নর্মদা নদীর চরে পুঁতে দিল । 

গণেশ পা ভাঁজ করে , ঘন –ঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছে । - ইস ! এত নিষ্ঠুর !! 

-নিজের ক্ষমতা রাখতে হলে , চরম নিষ্ঠুরতাই দরকার । দেবশর্মারা বিদ্রোহীদের কখনও ক্ষমা করে না , আর করবেও না । 

মূর্তি কথা গুলো বলেই খুব আক্রোশে বলল - এরপর এক ভয়ঙ্কর অভিশাপ নেমে আসে , দেবশর্মার শেষ বংশধর আর তাঁর পরিবার - পৃথুদকে পালিয়ে যায় । কেননা , চণ্ডাল তখন আর জাতিতে চণ্ডাল নেই । তারা এখন একসাথে কৃষক । গ্রামীণ অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক । দেবশর্মার পরিবার শাপিত হয়ে , পৃথুদকাতেই অনাহারে প্রাণ দিয়েছিল । তাদের মুক্তি হলেও, দেবশর্মা নিজে পৃথিবীতেই থেকে গেল ! 

গণেশ বড় – বড় চোখ করে বলল – মানে ? 

মূর্তি বলল - ব্রহ্মরাক্ষসের কথা শুনেছিস ? অতৃপ্ত , কৃষকদের শোষণকারী , দেবশর্মা এখন ব্রক্ষ্মরাক্ষস !! 

গণেশ বললেন - আপনি এত খবর কেমন করে জানলেন ?

এই সময় মূর্তি তীব্র অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল । হাসি শুনে গণেশের দেহ ঠাণ্ডা হয়ে আসছে । এই হাসি যেন তাঁকে গিলে খাবে ! এখন যদি ভোর হয়ে যায় , খুব ভালো হয় । তার শরীরটা অবশ হয়ে যাচ্ছে । উল্টো দিকের মূর্তির দিকে তাকিয়ে , এক আশ্চর্য ঘটনা লক্ষ্য করলেন । হ্যাঁ মূর্তিটা যেন ক্রমশই দূরে চলে যাচ্ছে । হ্যাঁ ওইতো অশ্বথ্থ গাছটার উপর উঠে গেল ! মূর্তির মাথাটা জমির দিকে , পা দু’টো আকাশের দিকে ; কেউ যেন অদৃশ্য হাতে টেনে নিচ্ছে । গাছের মাথার দিকেই মূর্তিটা উঠে যাচ্ছে । একসময়ের পরেই আর দেখা গেল না ! 

ভয়ে , সারা শরীর ঘেমে গেল ! গণেশ টের পেলেন , আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বেহুঁশ হয়ে যাবেন । ধপ করে চারপায়ির উপর হাত ছড়িয়ে শুয়ে পড়লেন , যতক্ষণ পর্যন্ত হুঁশ ছিল মুখ দিয়ে বিরবির করে বললেন - ‘দশ বছরে অনেক ঋণ । হে প্রভু উদ্ধার করো ... হুজুর আমার আর ঋণের দরকার নেই , মুক্তি চাই , মুক্তি... ’

chakrabortypinaki50@gmail.com



Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.