x

প্রকাশিত

অর্জন আর বর্জনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ সিদ্ধান্তের নিরিখে দোলাচলে।সেখানে প্রতিবাদও ভঙ্গুর।আর যথার্থ প্রতিবাদের থেকে উঠে আসে টায়ার পোড়ার গন্ধ।আঘাত প্রত্যাঘাতের মাঝখানে জন্মদাগও মুছে যায়।সংশোধনাগার থেকে ঠিকানার দূরত্ব ভাবেনি কেউ।ভাবেনি হাজার চুরাশির মা’র প্রয়াণ কোন কঠিন বাস্তবকে পর্যায়ক্রমিক প্রহসনে রূপান্তরিত করেছে।একটা চরিত্র কত বছর বেঁচে থাকে ?কলম যাকে চরিত্রের স্বীকৃতি দেয় তেমন পোস্টমর্টমের পড়ও আরও কয়েকযুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে কলমই। অভয়ারণ্যেও ঘেরাটোপ! সেই আপ্তবাক্য -

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

ভাববার সময় এসেছে। প্রতিবাদটা কোথা থেকে আসে—বোধ ?মস্তিষ্ক ?মুঠো? না বাহুবল?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

বিদিশা সরকার

মঙ্গলবার, এপ্রিল ০৩, ২০১৮

ইন্দিরা মুখার্জ্জী

sobdermichil | এপ্রিল ০৩, ২০১৮ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
উইকএন্ড
ধা ঘরওয়ালির দুষ্টুমিষ্টি ফচকেমি.. দু-চার মিনিট । ততক্ষণে আপিসের বাইরে মামণি টি-ষ্টলের মামণি এসে চায়ের গেলাসে ঠকাস করে চা রেখে চলে গিয়েছে টেবিলে । কিছুটা চেঁচানো" বিস্কুট কৈ রে মামণি?" 

এই কত্তে কত্তে সাড়ে এগারোটা । এবার ফাইলের স্তূপ থেকে সীতা উদ্ধারের মত করে টেনে হিঁচড়ে একখান চোতা কাগজ বের করে তাতে নিজের নামটা স‌ই করা হল । সেই মহাযজ্ঞে আরো একটি ঘন্টা কাবার । 

এবার মামণির মা এসে বলে " স্যার, আজ কি খাবেন? রুটি-ডিমের কারি, পরোটা-আলুর দম না এগ-চাউচাউ?" 

মামণির মায়ের ঝটিতি আগমন ও প্রস্থানে কিছুটা শান্তি ও আপিসে আসার তৃপ্তি । বেঁড়ে খাবার বানায় বৌটা । বাড়িতে তো "এটা খেওনা, ওটা খেওনা".. কত্ত শুল্ক চাপানো! আর আপিসে নো কোলেস্টেরলের কচকচানি ! মামণির মায়ের হাতের গুণে সব অসুখবিসুখ উধাও । সেখানে শুধু সুখ আর সুখ ! 

ঠিক একটা বাজতে না বাজতেই মামণির মায়ের হাতে ধোঁয়া ওঠা নিত্য নতুন ডিশ! বাড়িতে তো গিন্নীর সিরিয়ালের দাপটে রান্নার মেয়েছেলেটা সাত সকালে হুড়মুড় করে রুটিটাও ক্যাসারোলে ভরে রেখে চলে যায় । আহা! মামণির মায়ের হাতের ফুলকো ফুলকো রুটিটাও কি দারুণ লাগে তখন খিদের মুখে । 

এবার মুখটুক পুঁচে টুচে মগজের গোড়ায় আনফিল্টার্ড ধোঁয়া দিতে একটু পাপসের বাইরে পা । একটু আড্ডা, আধটু ধোঁয়া ছাড়া । রাজনীতির কূটকচালি থেকে শেয়ারমার্কেট । জয়েন্ট এন্ট্রান্সের ফল থেকে বিশেষ বিশেষ খবরগুলো নিয়ে মৌখিক জাগলিং চেয়ারের গদিতে ফিরে আসতে আসতে তিনটে । আবার চায়ে চুমুক, সাথে মামণির হাসিমুখ । বুদ্ধি খুলে গেলে একটু কারোর পেছনে কাঠি করা নয়ত টেবিলে মাথা রেখে ছোট্ট ন্যাপ । হার্ট ভালো থাকে এতে । বয়স তো আর কম হলনা বড়বাবুর ! চারটে বাজলেই ব্যাস্! 

এবারে আর কে পায়! পাপসের বাইরে পা । পাঁচটায় মেট্রোতে পা দিতে পারলে শান্তি । আর ছটায় বাড়ি ফিরেই আবার চা । গিন্নীর তদারকিতে ভরপুর অখাদ্য, স্বাস্থ্যকর পানীয়। এবার কালো-চা। এক টুসকি বীটনুন আর দু ফোঁটা লেবুর রস দেওয়া কেফিন। এন্টি অক্সিডেন্ট, ফ্ল্যাবোনয়েড সব আছে এই চায়ের মধ্যে । গিন্নীর বচন, খনার চেয়েও দামী । সারাদিন ধরে কাগজ আর টিভি সার্ফ করে সঞ্চিত জ্ঞানকণা ! 

হার্ড লাইফ বলে একে! এই কত্তে কত্তে আরো চারটে বছর পার করে দিতে পারলে ব্যাস! রিটায়ারমেন্টের পর বাড়ি বসে বসে পা নাচানো আর মাস গেলে পেনশন । সমস্যা একটাই কারণে অকারণে গৃহযুদ্ধ । 

বড়বাবুর সব ভালো । বেশ থাকেন দশটা-পাঁচটা আর বাড়ি নিয়ে কিন্তু আপিসে কেউ ছুটি চাইলে দক্ষযজ্ঞ বাধিয়ে দেন । আড়ালে অবিশ্যি এ নিয়ে অধস্তনেরা সর্বদাই মন্তব্য করেন "যত্ত হম্বিতম্বি আমাদের ওপর! নিজের বেলায় আঁটিশুঁটি আমাদের বেলায় দাঁতকপাটি" বড়বাবু সেকথা দিব্যি জানেন কিন্তু নিজের ডিসিশান, স্টাইল স্টেটমেন্ট থেকে সরতে অনড় তিনি। আফটার অল তিনি বড়বাবু। মুড়ি আর মিছরির কি এক দর হয় কোনোদিনো? লুচি আর রুটির মধ্যে বিস্তর ফারাক। নিজেও বড় একটা ছুটিটুটি নেন না কারণ তিনি আপিসের সকলের সামনে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতে চান । বছরের পর বছর তাঁর এলটিসি জমে যায় । তিনি এনক্যাশ করে নেন স্যালারিতে । এই নিয়ে গিন্নীর একরাশ ক্ষোভ জমা আছে বুকে । 

হঠাত একদিন অকালবৈশাখীর মত ভ্রমণ ভাবনা এসে পড়ল বড়বাবুর মনের মাঝে। 

টেবিলের সামনে বসে ফাইল ওল্টাতে ওল্টাতে ভাবেন একদিন বেশ ঝুরঝুরে বৃষ্টি পড়বে, ফুরফুরে ভেজা হাওয়া ব‌ইবে, আপিস কামাই করে বৌকে সঙ্গে নিয়ে ভিক্টোরিয়া যাবেন । কিন্তু বৌ তো সে সময় টিভির সিরিয়াল ছেড়ে কোত্থাও নড়বে না । বাবুর আর আপিস যেতে ভালো লাগেনা । রোজ রোজ এই আপিসের লোকগুলোর এক মুখ দেখতে হয়। অগণিত ফাইল স‌ই করতে হয়। বোরিং মিটিং ডাকতে হয়। ভাল্লাগেনা বড়বাবুর। 




গিন্নীকে বললেই চেঁচিয়ে বলে ওঠে " আঃ মলো যা! আপিস না গেলে হবে কি করে শুনি! মাস গেলে টাকা পাচ্চো, আর বাড়ি বসে বসে তো শুধু ফরমাশ করে আমার কাল ঘাম ছোটাবে । বলি তোমাদের আপিসে ট্যুর হয়না ? বন্ধুদের বরেরা প্রায়‌ই ট্যুরে চলে যায় । ক'টা দিন একটু হাড়ে বাতাস লাগত আমার । যত বয়স বাড়ছে মিনসে যেন তত আয়েসি হয়ে যাচ্ছে। যাও যাও, ম্যালা ফ্যাচ ফ্যাচ না করে আপিস চলে যাও দিকিনি" 

সেদিন বাড়ি ফিরে গিন্নীর মুড বুঝে ভ্রমণ প্রসঙ্গটা পেড়েই ফেললেন সজোরে। 

-কি? বেড়াতে? আবার তোমার সাথে? বলি হল কি লোকটার? গিন্নী বললেন। 

- আহা! রাগ করচো কেন গিন্নী, তোমাকে নিয়ে বেড়াতে যাবো বলচি তাতেও আমার দোষ! 

-ঐ সব কলকাতার কাছে ফাচে বেড়াতে গেলে হয় না কি । বেড়াতে গেলে স্যুটকেস গুছিয়ে, জলের বোতল, চায়ের থার্মোস, হটপট, ট্রলিব্যাগ নিয়ে যাব বলে দিলাম । অন্ততপক্ষে দিন দশেকের ছুটিতে । তার কম নয় । আমারো দুদিন রেস্ট হবে , তোমারো হবে । গিন্নী বললেন ।

-তাই বলে দশদিন? বড়বাবু বললেন বিস্মিত হয়ে। 

-সেই কবে বিয়ের পর একবার শান্তিনিকেতন নিয়ে গেছিলে। জম্মের বুড়ি কম্মো! ব্যাস! ঐ শুরু আর ঐ শেষ ! আহা! কেমন সেই খোয়াই পারে বসেছিলাম। লালমাটির সোঁদা গন্ধ বাতাস চারিদিকে ম ম করছিল । দূর থেকে একটা বাউল সন্ন্যাসী আমাদের দেখে কাছে গান শোনাল....সত্য পথে কেউ নয় রাজী, সবি দেখি তা না না না । আমরা পয়সা দিলাম । তখন তুমি কত দিলদরিয়া ছিলে । আমাকে কতকিছু কিনে দিয়েছিলে । বাটিকের ব্লাউজপিস, ডোকরার প্যাঁচা, মাটির বাতিদান ...মনে আছে তোমার? 

-মনে আবার নেই! তখন আমার রোজগার পাতি কম ছিল । তোমাকে একটা ভালো হোটেলেও রাখতে পারিনি গিন্নী । আমরা সরকারী সস্তার লজে উঠেছিলাম । 

-কিন্তু খুব আনন্দ হয়েছিল জানো? একে বিয়ের পরপরেই আমরা দুটিতে মিলে গেছি তায় আবার ট্রেনে করে । 

-তুমি কেমন ভোরবেলা সাত তাড়াতাড়ি উঠে লুচি-আলুর দম বানিয়ে আমাকে সারপ্রাইজ দিয়েছিলে! এখন তো আর লুচি খেতেই দাওনা ছাই! 

-আর সাথে জলভরা সন্দেশ, ভুলে গেলে? 

-তখন বয়স কম ছিল। তোমার আমার দুজনার যৌবনেরি ঝড় উঠেছিল আকাশ পাতালে। পাথর খেলেও হজম হয়ে যেত। 

-নাহ্‌! এবারে দুদিনের জন্য কোথাও একটা যেতেই হবে। 

সাতপাঁচ ভেবে বাবু ফোন ঘোরালেন ট্যুরিজমের আপিসে । যাব বললেই কি আর হোটেলে বুকিং মেলে না কি ট্রেনের টিকিট মেলে? 

ট্যুরিজম অফিসের মেয়েটি নরম সুরেলা গলায় জানালো কাছেপিঠের অজস্র জায়গার খোঁজ । বাঙালীর প্রিয় দীপুদা বা দীঘা-পুরী-দার্জিলিংও বাদ গেলনা সেই মেয়ের উত্তরে। মন উঠলনা বাবুর। একরাশ হেসে মেয়েটি ফোনের ওপ্রান্ত থেকে জানালো রিশপ-লাভা-লোলেগাঁওয়ের কথা। বাবুর আবার অত ঠান্ডা চলবেনাকো। আবারো খিলখিল হাসিতে ফেটে পড়ে সেই মেয়ে জানালো ডুয়ার্স-সিকিম-ভুটান। বাবু এবার বললেন, না বাবা, বড্ড দূর হয়ে যাবে। অত ছুটি নিতে পারবনা। 

অবশেষে বড়বাবু মুকুটমণিপুর বাছলেন । খবরের কাগজে ছবি দেখেছিলেন বটে! সরকারী হোটেল আছে। বেসরকারী লজও আছে। গতমাসে ঐখানেই যাবে বলে ছুটি চেয়েছিল আপিসের রায়বাবু । না জানি কি সুন্দর জায়গা । রায়বাবুকে ছুটি মঞ্জুর করেননি বাবু । সপ্তাহের মাঝামাঝি কেউ বেড়াতে যায়, বলুন ? এমন করলে বলি আপিসটা চলবে কি করে ! 

এবার তাঁর নিজের যাবার পালা । এদিকে ট্র্যাভেল এজেন্ট মেয়েটি হল রায়বাবুর শালী । সে খবরটি আপিসেই পেয়েছেন বড়বাবু । তার মানে খবরটাও ঠিক সময়ে রায়বাবুর কাছে পৌঁছে গেছে । মনে মনে প্রমাদ গণলেন বাবু। পরক্ষণেই ভাবলেন, আমি হেড। আমি যা করব তা কি অন্যেরা করতে পারে? 

এইবার শীতের অন্তিম লগ্নে, বসন্তের সমাগমে নাতিশীতোষ্ণ এক সপ্তাহান্তে বড়বাবু তাঁর গিন্নীটিকে নিয়ে মুকুটমণিপুর পৌঁছলেন। 

বাঁকুড়া, পুরুলিয়া জেলার সংলগ্ন পাহাড়ে তখন লাল পলাশের শোভা। আগুণ জ্বলছে যেন পাহাড়ের গায়। গিন্নীকে দেখিয়ে বললেন, পলাশের ইংরেজী নাম কি জানো? গিন্নী ঠোঁট ওল্টালেন। 

বড়বাবু দর্পের সাথে বললেন, ফ্লেম অফ ফরেস্ট। দেখছনা কেমন রাঙিয়েছে পাহাড়কে। 

-দ্যাখো দ্যাখো বাতাসে কেমন সজনেফুলের ঘ্রাণ! দোল এসে গেল! গিন্নী বললেন

-হ্যাঁ, বেশ লাগছে বলো অনেকদিন পর ধরাবাঁধা নিয়ম থেকে বেরিয়ে একটু বেড়াতে এসে। বড়বাবু বললেন। কোকিলের ডাকটাও শহরে বসে আর শোনার সময় পাইনা। শুধু আপিস আর আপিস, কাজ আর কাজ। 

-কি বিশাল ড্যাম গো! এতবড় জলাধার আগে দেখিনি কখনো। গিন্নী বললেন। 

-আর কি পরিচ্ছন্ন জায়গাটা বলো? তাহলে কেমন জায়গায় তোমায় আজ নিয়ে এসেছি বলো? কর্তা গর্বের সাথে বললেন। 

-সত্যি গো! দারুণ জায়গা মুকুটমণিপুর। 

-শোনো এই দুদিনের জন্য খাওয়াদাওয়াতে আর ট্যাক্স বসিওনা যেন প্লিজ। এটা খেওনা, ওটা খেওনা কোরোনা । এ দুদিন নো রেস্ট্রিকশান। আবার ফিরে গিয়েই তো তোমার কড়া শাসন শুরু হয়ে যাবে। 

-কর্তার গিন্নীটি ব্লাশ করতে করতে বল্লেন, ঠিক আছো, যাও ছেড়ে দিলাম। 

-হোটেলে যা পাওয়া যায় সব অর্ডার দেব আমরা। চাইনিজ, তন্দুরী, কন্টিনেন্টাল .....আর শোনো বাঙালী খানা নৈব নৈব চ! এদ্দূর ট্রেনে করে এসে ঐ ভাত-ডাল-মাছের ঝোল খাবনা, বলে দিচ্চি। 

-সেই ভালো, সেই ভালো। একটু মুখ বদল হবে বরং। গিন্নী আনন্দে বলে উঠলেন। 

নির্জন, সুদৃশ্য ড্যামের ধারে লাজে রাঙা গিন্নীটিকে নিয়ে বড়বাবু যেই ক্যামেরাটিতে ফার্স্ট ক্লিক করতে যাবেন তখুনি হা হা করে দন্তরুচি কৌমুদী বিকশিত করে রায়বাবুর সেখানে আবির্ভাব হল । 

-স্যার আপনি? 

বড়বাবু আধা হাসি, আধা রাগে বললেন আপনি? 

-কেন স্যার উইকএন্ডে বেড়াতে যেতে তো আর মানা নেই । এই আপনিও যেমন এয়েচেন, আমরাও এয়েচি দুজনে । 

বড়বাবুর তখন কাপড়েচোপড়ে অবস্থা । 

-চলুন রায়বাবু, আজ দুপুরের খাওয়াটা তাহলে আমাদের সাথেই হয়ে যাক । 

-হ্যাঁ, স্যার চলুন, আজ কব্জি ডুবিয়েই খাব আপনাদের সাথে। 

-দিন, দিন, মুরগী-মাটন যা খাবেন অর্ডার দিন। আপনার শালীর দৌলতে উইকেন্ড জমে দৈ এক্কেবারে! 


indira.mukerjee@gmail.com


Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.