x

প্রকাশিত | ৯৪ তম মিছিল

কান টানলেই যেমন মাথা আসে, তেমন ভাষার প্রসঙ্গ এলেই মানুষের মুখের ভাষার দৈনন্দিন ব্যবহারের কথাও মনে পড়ে যায়, বিশেষত আজকের দিনে। ভাষা দিবস মানেই শুধু মাতৃভাষা নিয়ে আবেগবিহ্বল হয়ে থাকার দিন বুঝি আজ আর নেই!

কেননা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাঁরা মাথায় বসে আছেন, বিশেষত যাঁরা রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতাভােগী এবং লােভী, তাঁদের মুখের ভাষা এবং তার প্রয়ােগ আজ ঠিক কতটা শিক্ষণীয় এবং গ্রহণীয় সেটা শুধু ভাবার নয়, রীতিমতো শঙ্কার এবং সঙ্কটের।

সবই কি তবে মহৎ ভাবনা, অনুপ্রেরণার জোয়ার? নাকি রাজনৈতিক কারবারিরা 'সুভাষিত' শ্রবণাতীত বয়ানে নিজেদের অক্ষমতার মদমত্ত প্রকাশ করছেন? সাধারণ ছাপােষা মানুষ বিস্ফারিত চিত্তে এই ভাষাসন্ত্রাস,এই ভাষাধর্ষণ দেখতে শুনতে ক্লান্ত। এর থেকে উত্তরণের উপায় এখনও অবধি কোনাে ভাষা দিবস দেখাতে পারেনি। এবারের ভাষা দিবসের কাছেও কি সেই উপায় আছে? নাকি এই খেলা হবে, চলবে ... মেধাহীন গাধাদের দৌলতে?

চলুন মিছিলে 🔴

বুধবার, ফেব্রুয়ারী ২১, ২০১৮

শাশ্বতী সরকার

sobdermichil | ফেব্রুয়ারী ২১, ২০১৮ | | মিছিলে স্বাগত
আত্মকথন
২০০৭ সালে প্রখ্যাত কবি, গীতিকার, সুরকার ও গায়ক বিপুল চক্রবর্তীর সাথে আমার কিছু কথোপকথন তুলে দিলাম এখানে। আমার ভূমিকা মূলতঃ প্রশ্নকারীর। তখনও কবিতা লেখা শুরু করিনি, একটা দ্বিধা কাজ করত, হাস্যকর লাগবে না তো? মনে বহু প্রশ্ন ছিল ধৈর্য ধরে যার উত্তর দিয়েছিলেন কবি। অপক্ক প্রশ্ন বলে এড়িয়ে যাননি বা অবহেলা করেননি যেজন্য জড়তা কাটিয়ে আমিও সোজাসুজি প্রশ্নগুলো রাখতে পেরেছিলাম তাঁর কাছে এবং লেখা শুরু করে দিতে সাহস পেয়েছিলাম।এই প্রেরণাটুকু যে কতখানি দরকার হয় তা আমি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলাম। আগে সুযোগ হলে অনেক আগে থেকেই শুরু করতে পারতাম বলেও খুব আফশোস হয়। পরবর্তী জীবনে কবির এই শিক্ষাটুকুই অনুসরণ করে আমার সন্তানদের আঁকা, লেখা ও বাংলা সাহিত্য পড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে সফল হয়েছিলাম কারণ ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করলে মাতৃভাষার প্রতি একটা অনাগ্রহ তৈরি হয় অথচ যুগের প্রয়োজনে তালে তাল দিতেই হয় নাহলে কাজের জগতেও অসুবিধেয় পড়বে, একটা হীনমন্যতাও তৈরি হবে। ফলে তারা না পারে মাতৃভাষাকে সুন্দর করে রপ্ত করতে, না পারে ইংরেজি ভাষাতেও ঋদ্ধ হতে। জগাখিচুড়ি ভাষায় এক অর্ধশিক্ষিত বাঙালি হয়ে জীবন যাপন করে যার ভাষায় কোন সৌন্দর্য ও রুচির ছাপ থাকে না। আশাকরি যাঁরা কবিতা লিখতে সবে শুরু করেছেন বা যাঁরা পাঠক, উভয়েই কবির কথায় সমৃদ্ধ হবেন।

আমি - আপনার ওই কথাটা খুব ভাল লেগেছিল,“ব্যাকরণ ভাঙার নামই কবিতা” – কিন্তু সত্যিই কি কোনও নিয়ম নেই?

কবি- ব্যাকরণ ভেঙেই কবিতার পথ চলা, এ কথা বলে আমি যা বলতে চেয়েছি তা হল, পুরনো প্রথা যা নতুনকে ধারণ করতে অক্ষম,তাকে ভেঙে তার গর্ভ থেকেই নতুন রূপ নতুন চাল-চলন গড়ে তোলাই কবিতা শিল্পের প্রবহমান কাজ। একজন প্রস্তর যুগের মানুষ আর একজন আজকের মানুষ অনেক ভাঙনের মধ্য দিয়েই ভিন্ন, আবার এক ও তো বটে – রূপান্তরিত এক।এ ভাবেই এগিয়ে চলা, একে ব্যাকরণ ভাঙা, আবার একই সঙ্গে ব্যাকরণকে রক্ষা করাও বলা যায়।

বিপুল চক্রবর্তী
লেখার সময় কিন্তু এ সব ভাবতেই নেই। নানান অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিজেকে আবিষ্কার করার মধ্য দিয়ে লিখে যাও... ভাষা পা ফেলে ফেলে সময়ের সঙ্গে এগিয়ে যেতে চায়,সময়কে পেরিয়েও যেতে চায়। রবীন্দ্রনাথের ভাষা যেমন এগিয়ে দিয়েছে আমাদের অনেকটা সময়।সময়ও এগিয়ে দেয় বহু ক্ষেত্রে আমাদের ভাষাকে।দৃষ্টান্ত রাখছি না।সময়ের দিকে চাইলেই তা দেখতে পাওয়া যাবে। আজকের এই দিনটি,যার সঙ্গে মিশে আছে কোনো কিশোরীর কেরোসিন পোড়া মুখ (তার প্রেমিক পুড়িয়েছে, প্রেমিক না পুরুষ–প্রভূ), এরই পাশে সেঞ্চুরি হাঁকানো কোনো ক্রিকেটারের নির্বোধ মুখ, তাও মিশে আছে। ইরাক কিম্বা নন্দীগ্রামের রক্ত নদীর জলে মিশতে মিশতে তোমার ভিতরে মিশে যাচ্ছে। আজ চড়ুই শালিখ প্রায় দেখা যাচ্ছে না। ধূলোয় মোড়া একটি শিউলি গাছে তবু এখনো একটি দুটি প্রজাপতি উড়ে বেড়ায়। এরকম আরো আরো। কত মুখ,কত কথা। এই দিনে দাঁড়িয়ে তুমি পালি ভাষা খুঁজবে তোমার প্রেম,বেদনা,রাগ প্রকাশ করতে নাকি অন্য কোনো ভাষা যা আজ বা আজকেও পেরিয়ে আগামীর।

পালি বা সংস্কৃত ভাষাকে পুরনো বলে আমি কিন্তু উপহাস করিনি।এইসব গৌরবময় সময় মনে রেখেই বলি,আজকের ভিন্ন সময়ের জন্য চাই ভিন্ন ভাষা,চেতনা।এমনকি অদূর অতীতের রবীন্দ্রভাষাও আজকের এই সময়কে পুরোপুরি প্রকাশ করতে অক্ষম।তাই নতুন ভাষা চাই।নতুনকে পেতে অবশ্য অতীতকে জানতে হয়, আজ-কে জানতে হয় আর আগামীকে অনুমানে অনুভবে জানতে হয়।এই বোধ যে যতটা পরিধিতে ধরতে পারবেন তার পক্ষে ততটাই সুবিধে হবে তার সময়কে,তার আগামীকে আবিষ্কার করা ও তাকে ভাষায় ব্যক্ত করার কাজে।শিল্পের সেই প্রবহমান কাজ।

আমি - নিশ্চয়ই, ভাষার অগ্রগতি বিনা তো সেই ভাষা মৃত হয়ে পড়বে, আর পারিপার্শ্বিক ও জীবনযাত্রার বদল তো ভাষাকেও অবশ্যম্ভাবীরূপে বদলাবে। তবে কিছু অরুচিকর ভাষা বিজ্ঞাপনের বা অন্যান্য সাধারণ ভাষার মধ্যে মিশে যাচ্ছে। ইয়ং জেনারেশন সবার সামনেই অবলীলায় সেইসব ভাষায় কথা বলে যায় কারণ কিছু সংস্কৃতি জগতের মানুষ তাদের কথায়,লেখায় সেগুলোকে স্বীকৃতি দিয়েছেন।আমার মনে হয় এখানে তাদের একটা দায় আছে। আবর্জনাকে নিশ্চয়ই গ্রহণ করব না? রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রেও যে নানারকম পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে—খুবই ভাল,কিন্তু রবীন্দ্র-অনুরাগীরাই তাঁদের সূক্ষ্ম বোধ দিয়ে বুঝে নেবেন কোন্‌টা গ্রহণীয় আর কোন্‌টা ছুঁড়ে ফেলতে হবে।

রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রসঙ্গে ওই কথাগুলো কেন মনে হয় একটু খুলে বলি—রবীন্দ্র-স্বত্ব উঠে যাওয়ায় প্রথমটা ভয়-ই হয়েছিল।কিন্তু আশার কথা মানুষ এখনো পর্যন্ত বর্জনীয়কে বর্জন-ই করেছেন।আবার বাঁধা গতে ঐ দাঁত চেপে প্রাণহীন গাওয়াও ভাল লাগে না।তবুও বলব কিছু কিছু জায়গায় মনে হয় বেশি হাত না দেওয়াই ভাল। রবীন্দ্রসঙ্গীত স্বয়ংসম্পূর্ণ।গল্প উপন্যাস বাদ দিলে বেশীরভাগ গান এবং কবিতাই চির আধুনিক এবং কালজয়ী।এটা অবশ্য সম্পূর্ণই আমার মত।আপনি কি বলেন?

কবি -অনেক কথা তুমি-ই বলে দিয়েছো। আমি শুধু এটুকু সংযোজন করতে চাই – রবীন্দ্রনাথ নিজে বহু নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে বাউল, কীর্তন, শাস্ত্রীয়সঙ্গীত এমনকি ওয়েস্টার্ন মিউজিক-এর প্রভাবে অসাধারণ সব গান করে গেছেন,তার আর নিরীক্ষার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।যুগ অনুসারে presentation-এ কিছু change আসতে পারে,তাও শিক্ষিত যত্নে।কেতা বা পান্ডিত্য দেখাতে যা যা হয়,আমি তার সঙ্গে নেই। পান্ডিত্য আর শিল্প এক নয়।

আমি - একদম আমার মনের কথাটি সুন্দর সাজিয়ে বলে দিয়েছেন।তবে এই নিয়ে চিন্তাভাবনা অবশ্যই স্বাগত কারণ একটা সময় পর্যন্ত রবীন্দ্রসঙ্গীত একটা বিশেষ শ্রেণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আধুনিক(বেশীরভাগ)কবিতাতে জটিল উপমা ও দুরূহ শব্দচয়ন করে কবিতাকে কিছুটা দুর্বোধ্য করে তোলার একটা প্রবণতা দেখি।এতে তাৎক্ষণিক ভাললাগা হয়ত আছে বা কবিতাটি হয়তো তারিফ পাওয়ার যোগ্য হয় কিন্তু মনের মধ্যে রেশ থেকে যায় না।এই অতি আধুনিক কবিতাগুলি সম্পর্কে আপনার মত খুব জানতে ইচ্ছে করে।

কবি - এই জটিল সময়, যাকে ধরতে বহু কবিই আন্তরিকভাবে জটিল হয়ে পড়েন,তাঁদের সাধুবাদ জানিয়েও আমি চেষ্টা করি জটিলকে সহজ করে বুঝতে এবং বলতে, সরলীকরণ নয় কিন্তু। অহেতুক যারা কেতা দেখাতে জটিলতাকে ডেকে আনেন,তারা এই আলোচনার বিষয় নন।তারা কিছুদিনের জন্য ভ্রম সৃষ্টি করেন ঠিক-ই,শেষমেশ টিঁকতে পারেন না।তারা সময়কে,সময় পেরিয়ে নতুন সময়কে আবিষ্কার করতে পারেন না, কেতায় আটকে পড়েন।

আমি - যথার্থ  বলেছেন। ‘ঈশ্বর’ সম্বন্ধে আপনার ধারণা কি?

কবি - ছেলেবেলায় বাড়ীর উঠোনে বাগান করতাম।মাটি তৈরি করা, বীজ ছড়ানো, বীজ থেকে চারা,চারা থেকে ধীরে ধীরে কাঙ্ক্ষিত কুঁড়ি ফুটে ফুলের দিকে যাওয়া আর অবশেষে ফুলের ফুটে ওঠা।কী গভীর বিশ্বাস নিয়ে অপেক্ষায় থাকতাম।একটা দুটো চারা কি নষ্ট হত না! সেই ব্যথা নিয়ে তবু বিশ্বাস ফুলের ফুটে ওঠায়।

একবার,ঝড়ে বাসা ভেঙে, গাছ থেকে পড়ে যাওয়া একটা পাখির ছানাকে বাঁচাতে সে কী যুদ্ধ আমার। ছোট ছেলে আমি, বড় হলেই বা কী, পাখি তো নই, তবু মনে হয়েছে আমি পাখিরও কেউ।হার মানতে চাইনি।হারি নি, আমি হারি নি।আমি জানি, এই যে আমার বিপুল আমার দশদিকে,এর সবকিছুর সঙ্গে আমি যুক্ত।তাই আনন্দ, তাই তো ব্যথা পাওয়া....

আনন্দ এই যে, একটি শালিখের হঠাৎ ওড়াতেও আমি খুঁজে পাই মহাবিশ্বের ছন্দ ও স্পন্দন।ব্যথা পাওয়া এই কারণে যে, আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সত্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রকৃত সত্যের প্রতি বিশ্বাসী করে তুলতে আজো চারপাশের মানুষকে বলতে হয়, বাতাসকে অনুভব করতে পারছ না, ওই দেখো বাতাস গাছের পাতা নাড়াচ্ছে, ওই দেখ তোমার হৃৎপিন্ডের ওঠানামা – আকাশকে চেনাতে দেখাতে হয় মেঘের চলাচল.... এই লুকিয়ে থাকা প্রকৃত সত্যই আমার ঈশ্বর।





Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.