Header Ads

Breaking News
recent

রুমকি রায় দত্ত

রুমকি রায় দত্ত
৩শে ফেব্রুয়ারী সকাল। ঘুম ভাঙলো একরাশ মন খারাপ নিয়ে। মনখারাপ, নৈনিতালকে বিদায় জানাতে হবে বলে। আমাদের রুমে বাইরের আলো প্রবেশের তেমন কোনো অবকাশ ছিলনা, তবু জানালার উপরের সামান্য কাচের ফাঁক দিয়ে গতদিন দেখেছিলাম আলোর প্রবেশ। ঘুম ভাঙতেই হাতঘড়িতে তাকিয়ে দেখলাম সাড়ে ছ’টা বাজে। মানে বাইরে সূর্য উঠে গিয়েছে। কিন্তু আলোর দেখা নেই কেন? গরম লেপের ওম ছেড়ে বাইরে বেরোতে ইচ্ছাও করছে না তখন। শুয়ে শুয়েই হোটেলের রিসেপশনে ফোন করা হোলো চায়ের জন্য। লেপের
উষ্ণতা ভাঙার সাথে সাথে যাতে চায়ের উষ্ণতায় শরীর তাতিয়ে নাওয়া যায়। মিনিট দশেকের মধ্যে দরজায় টোকা। চা চলে এসেছে। মিঃ উঠে দরজা খুলতেই গরম গরম চা দেখে উঠে বসলাম। চায়ের পাক হাতে সামনের ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখলাম ঘন কালো কুয়াশা আর মেঘ মাখামাখি করে শুয়ে আছে রাস্তার ওপারে নৈনি লেকের গায়ে। বৃষ্টি নামলো বলে। চোখের সামনেই দেখতে পেলাম ক্রমশ ঘন কালো মেঘ ঢেকে ফেলছে হাত কয়েক দূরের বাড়ি ঘর গাছপালা। কি যে অপূর্ব সৌন্দর্য সেই প্রকৃতির! ঝিরঝির করে ঝরতে ঝরতে তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগলো বৃষ্টি। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে চোখের সামনের সৌন্দর্য যেমন মন ভালো করে তুলছে সঙ্গে একটা আশঙ্কাও। হ্রদের শহরে তখন হ্রদগুলোই দেখা হয়নি। আমাদের প্রোগ্রাম অনুসারে সকালে আমাদের ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা একেবারে জিনিস নিয়েই বেরিয়ে পড়বো। সারাদিন ঘুরে লালকুয়া থেকেই ফেরার ট্রেন আমাদের। কিন্তু প্রকৃতির এই হঠাৎ পরিবর্তনেই আমাদের প্রায় মাথায় হাত। এখানে কাঠের জিনিস বেশ ভালোই পাওয়া যায়। এমন বৃষ্টি হলে বাজারেই বা যাবো কেমন করে! কিন্তু মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লেও আমাদের বেরোতেই হবে। এই ক’দিন একসাথে কাটিয়ে দাওয়ানজি ও কেমন যেন কাছে মানুষ হয়ে উঠেছিলেন আমাদের। ন’টার দিকে দেওয়ানজি গাড়ি নিয়ে এলেন। সঙ্গে নিজের হাতে বানানো পুরি-তরকারি, আমাদের ব্রেকফাস্ট। আমরা মালপত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। হোটেল থেকে কিছুটা এগিয়েই একটা কাঠের জিনিসের দোকান সবে মাত্র খুলছে। কোনো মতে দোকানে ঢুকে ঝটফট কিনে ফেললাম কিছু জিনিস। গাড়ি এবার এগিয়ে চললো হ্রদ শহরের খুব পরিচিত হ্রদ “ সাততালের” পথে।

সাততালঃ
মেহারগাঁও উপত্যকয়ায় অবস্থিত এই হ্রদটির বিস্তার প্রায় ১৩৭০মি. আর গভীরতা প্রায় ২০ফুট। এখানকার অধিবাসীরা বিশ্বাস করেন যে, সাতটি তালের সমন্বয়ে গঠিত এই হ্রদটির সাথে মহাভারতের যোগ আছে। গাড়ি হ্রদের পাশে এসে যখন দাঁড়ালো বৃষ্টি তখন অনেকটা হালকা। আমরা প্রায় ছুটতে ছুটতে হ্রদের উপরে গড়ে ওঠা ছোট্ট সেতু দিয়ে ওপারের পৌঁছে বসলাম একটা সেডের নীচে। হালকা বৃষ্টির টিপটিপ ফোঁটা স্থির সবুজ হ্রদের বুকে গোল গোল আলোড়ন ছড়াচ্ছে। কিছুদূরে একটা বড় গাছে ঝুঁকে পড়েছে হ্রদের বুকে। তার একটা ডালপাতা ছুঁয়ে আছে নদীর বুক। বোটিং এর ব্যবস্থা আছে,কিন্তু উপায় তো নেই। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে শুধু দূর থেকেই দেখতে হবে এই অপরূপ সৌন্দর্যকে। কিছু সময় কাটিয়ে আমরা আবার এগিয়ে চললাম সামনের দিকে।

ভিমতালঃ 
সাততাল থেকে ভিমতাল যাওয়ার পথে শুরু হলো আবার বৃষ্টি। তীব্র বৃষ্টির দাপটে চারিদিক সাদা তখন। ভিমতালের পাশের রাস্তা দিয়ে ছুটে চলেছি আমরা। আমাদের ডানপাশে ভিমতাল বৃষ্টি বুকে শুয়ে আছে। গাড়ির কাচ সামান্য নামিয়ে ক্যামেরায় ফটো তুলে নিলাম। বুঝতেই পারছিলাম বাইরে বেরিয়ে হ্রদের কাছে যাওয়ার সুযোগ হয়তো হবে না। আমাদের আশঙ্কা সত্যি হলো। সেখান থেকেই দেখলাম হ্রদের কিনারে বাঁধা আছে বোট। দূরে মাঝ হ্রদে একটা দ্বীপের মাঝে একটা মিউজিয়াম। দেখা হবে না আমাদের। কিছুক্ষণ দূর থেকেই তাকিয়ে রইলাম ভিমতালের দিকে। ‘তাল’ কথাটির অর্থ হলো লেক। কিন্তু ভিমতাল নামকরণের পিছনে একটা পৌরানিক গল্প প্রচলিত আছে। মহাভারতের পঞ্চপাণ্ডব যখন নিজের রাজ্য ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন, তখন প্রচন্ড তৃষ্ণার সময় কোথাও জল না পেয়ে ভিম তার গদা দিয়ে এই স্থানে প্রহার করে। ভিমের গদার প্রহারে সেখানে একটি গর্ত তৈরি হয়।সেই স্থানের ভিতরে জলের উৎস ছিল, ফলে গর্তটি ধীরে ধীরে জলে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।এইখানেই পান্ডবরা নির্মান করেন ভিমেশ্বর মন্দির।

নৌকচিয়াঃ
তাল শহরে আমাদের শেষ গন্তব্য হলো নৌকচিয়া তাল। এই নৈনিতাল শহরে অবস্থিত সমস্ত হ্রদের মধ্যে সবথেকে গভীর হলো এই হ্রদ। এর আকৃতি নয়টি কোণা হওয়ায় এই হ্রদটির নাম নৌকচিয়া তাল। এই হ্রদ নিয়েও একটা পৌরানিক কথা শোনা যায়। এই হ্রদের দেবতা নাকি স্বয়ং ব্রহ্মা। যে বা যারা এই হ্রদের নয়টি কোণা এক সাথে দেখতে পাবে তার নাকি নির্বাণ প্রাপ্তি হবে। হ্রদের নীচের একটি প্রসবন থেকে এই হ্রদের উৎস। নাহ, পুরো দিনে বৃষ্টি আমাদের পিছু ছাড়লো না। তাই শেষ দিনের নৈনিতাল আমাদের কাছে শুধুমাত্র ধরা থাকলো ক্যামেরায়। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতে চললো। আমরা ফেরার পথে অনেকদূর এগিয়ে এসেছি। হঠাৎ সিপলা নদীর ধারে এসে গাড়ি দাঁড় করালেন দেওয়ানজি। একটা খুব সুন্দর সাদা মন্দির। ‘কাঁচি ধাম মন্দির’। নেমে ভিতরে গেলাম। নীরবতায় কান পেতে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যায়। হাতে সময় আর বেশি নেই। তাই দ্রুত গাড়িতে ফিরে আসা। আবার চলা। এবার থামা একেবারে লালকুয়া স্টেশনে। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক। সময় বলছে বিদায়ের সময় হলো। আমরা যে যার আসনে গিয়ে বসলাম ট্রেনে। ট্রেন ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে এগোতে লাগলো। মনটা তখন বড্ড কেমন করছে যেন। দেওয়ানজি দাঁড়িয়ে ছিলেন। ক্রমশ সরে সরে যেতে লাগলেন। খুব অনুভব হলো ঠিক সেই মুহূর্তেই, এক আকাশ, নিঃশ্বাসের বায়ুটাও এক আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে থাকা মানুষ আসলে এভাবেই জুড়ে আছি, এক সুতোহীন আত্মীয়তার টানে।



কোন মন্তব্য নেই:

সুচিন্তিত মতামত দিন

Blogger দ্বারা পরিচালিত.