x

প্রকাশিত

​মহাকাল আর করোনাকাল পালতোলা নৌকায় চলেছে এনডেমিক থেকে এপিডেমিক হয়ে প্যানডেমিক বন্দরে। ওদিকে একাডেমিক জেটিতে অপেক্ষমান হাজার পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ।​ ​দীর্ঘ সাতমাসের এ যাপন চিত্র মা দুর্গার চালচিত্রে স্থান পাবে কিনা জানি না ! তবে ভুক্তভোগী মাত্রই জানে-

​'চ'য়ে - চালা উড়ে গেছে আমফানে / চ'য়ে - কতদিন হাঁড়ি চড়েনি উনুনে / চ'য়ে - লক্ষ্মী হলো চঞ্চলা / চ'য়ে - ধর্ষিতা চাঁদমনির দেহ,রাতারাতি পুড়িয়ে ফেলা।

​হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা মানুষটি লালমার্কার দিয়ে গোল গোল দাগ দেয় ক্যালেন্ডারের পাতায়, চোদ্দদিন যেন চোদ্দ বছর। হুটার বাজিয়ে শুনশান রাস্তায় ছুটে যায় পুলিশেরগাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স আর শববাহী অমর্ত্য রথ...। গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে অনেকটা জল, 'পতিত পাবনী গঙ্গে' হয়েছেন অচ্ছুৎ!

এ কোন সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি আমরা?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

সমীরণ চক্রবর্তী

বুধবার, ফেব্রুয়ারী ২১, ২০১৮

পিন্টু ঘোষ

sobdermichil | ফেব্রুয়ারী ২১, ২০১৮ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
পুনর্জন্ম
খোলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরের প্রকৃতিটাকে একদৃষ্টিতে দেখছিল মেঘলা। চোখের পাতা যেন পড়ে না। বিকেল ফুড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে প্রকৃতির বুকে। এই গোধূলি লগ্নে সব পাখিরা বাসায় ফিরছে ; পাখা মেলে বের হচ্ছে নিশাচরের দল।

এসব দেখতে দেখতে তার মনের মধ্যে একটা অতৃপ্ত আকাঙ্খা জেগে উঠল। বুকের ভিতরটা কেমন যেন করে উঠল, কানে হঠাৎ ভেসে এল সেই চেনা কন্ঠস্বর---মায়ের ডাক। ঘরের চারদেওয়াল থেকে যেন শুধু প্রতিধ্বনিত হতে লাগল সেই পরিচিত কন্ঠস্বর---' বাড়ি আয় মেঘলা, সন্ধ্যে হয়েছে ....।' হঠাৎই সে যেন দশবছর পূর্বে ফিরে গেল।

সদ্য উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছে সে। রেজাল্ট যে খুব ভালো হয়েছে তা নয়। কিন্তু এই বাজারে এই রেজাল্টটা দেখিয়ে কিছু একটা কাজ জুটতে পারে। বাড়িতে অভাব। তাই তাকে বাধ্য হয়ে পড়াশুনায় ইতি টানতে হল। শুধু একটা চাকরির আশায় সে বিভিন্ন জায়গায় ছুটছিল। এখানে পরীক্ষা তো ওখানে ইন্টারভিউ। কিন্তু কোথাও কিছু পাচ্ছিলো না।

একদিন হঠাৎ এক বিজ্ঞাপন তার চোখে পড়ল। ' কুড়ি বছরের কম বয়সী তরুণীরা চাকরির জন্য যোগাযোগ করুন '---এই বিজ্ঞাপন দেখে সে উৎসাহিত হয়ে যোগাযোগ করেছিল। তারপর সব শেষ। সব স্বপ্ন ভেঙে গিয়েছিল, বাবা-মা'র সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আত্মীয় স্বজন বলতে আর কেউ ছিল না। চাকরি দেওয়ার নাম করে দুষ্কৃতীরা তাকে অপহরণ করল।

এই দশটি বছর সে কাটিয়েছে একটা ঘরের মধ্যে বন্দি থেকে। দুনিয়া বলতে শুধু একটা জানালা দিয়ে দেখা এক টুকরো খোলা আকাশ। এই দশবছরে তাকে প্রতিদিন ধর্ষিতা হতে হয়েছে, চরম নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।

দুষ্কৃতীদের অত্যাচারে-ই শুধু থেমে থাকেনি। ওরা বাইরে থেকে লোক আনতে শুরু করে মেঘলার ঘরে। শুরু হল দেহব্যবসা। উন্মাদ নরখাদকেরা তাদের পৈশাচিক কাজ করার পরে জলন্ত সিগারেট নেভাতে লাগল তার শরীরে। প্রতিদিন সিগারেটের প্রতিটি স্পর্শ তার শরীরে টসটসে আঙুড়ের মতো ফোস্কা তুলতে লাগল।

একদিন তার ঘরে এক নতুন প্রবীণ প্রবেশ করল। বাইরে থেকে দরজা বন্ধ। মেঘলার মনে আবার সেই পৈশাচিক আতঙ্ক জেগে উঠল। মনে হল প্রতিদিন এই অত্যাচার সহ্যের চেয়ে নিজেকে শেষ করে দেওয়া বোধহয় সবচেয়ে ভাল।

কিন্তু না; এবারের প্রবীণ কিন্তু সেরকম কিছু করল না। সে খাটের উপর উঠে বসল। মেঘলার দিকে একভাবে চেয়ে বসে থাকল। তার মনে হল সে যেন কিছু ফিরে পেয়েছে। মনে হল সে মেঘলাকে অনেক আগে থেকে চেনে, আবার নতুন করে দেখা পেয়েছে। 

সারারাত শুধু মেঘলার হাতদুটি ধরে চোখের পানে চেয়ে বসে থাকল। হঠাৎ প্রবীণ জিজ্ঞেস করল ---' তুমি কে? ....বাড়ি কোথায়? ....এখানে এলে কিভাবে? ' প্রশ্ন শুনে মেঘলার চোখ ছলছল করে উঠল। সে তার সবকিছু খুলে বলল। তার মনে হল এই মানুষটি অন্যরকম। কেমন দয়ালু , নিরীহ প্রকৃতির। তাই সাহস করে সে প্রবীণ জিজ্ঞেস করল ------

'এই জায়গাটা কোথায়? '

'রামনগর '

'সেটা কোথায়? '

'দীঘার কাছাকাছি একটা গ্রাম। প্রায় আট কিলোমিটার দূরে দীঘা। '--- প্রবীণ উত্তর দিল। সারারাত শুধু কথা চলতে থাকল। রাত ফুড়ালে প্রবীণটি চলে গেল।




দিন যায়, সন্ধ্যা নামে ; মেঘলার ঘরে আরো অনেক নতুন পিশাচের আগমন ঘটে। তেমনই সেই প্রবীণটিও মাঝে মাঝে আসতে শুরু করে মেঘলার কাছে। ক্রমে ক্রমে তারা দুজন দুজনকে ভালোবেসে ফেলে।

একদিন হঠাৎ সেই প্রবীণ বলল ---' মেঘলা, তোমার বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে না? '

'করে '

'যাবে? '

'যেতে চাইলেই আর উপায় কোথায় '---বলে প্রবীণের বুকে মাথা রাখে মেঘলা। প্রবীণ প্রতিশ্রুতি দেয়, তাকে যেমন করেই হোক্ বাড়িতে পৌঁছে দেবে। প্রবীণের আশ্বাসে মেঘলা প্রাণে শক্তি ফিরে পায়।

সে আবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। বাড়ি ফেরার আশায় সে দিন গোনে।

হঠাৎ মেঘলার ঘোর কাটে। একটা হাত যেন তার কাঁধ স্পর্শ করেছে। চমকে ওঠে সে। পিছনে ফিরে তাকায়। প্রবীণকে দেখে খুশি হয় মেঘলা।

'আজ রাত তোমার নরক যন্ত্রণার শেষ রাত, আমি ভোরে তোমায় নিয়ে এখান থেকে পালাব। '--- প্রবীণের কথা শুনে মেঘলার চোখে জল আসে। মা'র কথা মনে পড়ে তার। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই পল্লীগ্রাম। যেখানে সে দশবছর আগে খেলত, স্কুল যেতো। বাড়ি ফিরতে দেরি হলে তার মা তাকে ডাকতো বাড়ি ফেরার জন্য। আজ তার বাবা-মা'র খবর সে জানে না, সে শুধু জানে এই প্রবীণটিকে। এই প্রবীণই তাকে তার বাড়ি পৌঁছে দেবে। আবার তাকে নতুন করে জীবন দেবে, এটাই তার বিশ্বাস।

কৌতুহলবশত এবার সে প্রবীণকে জিজ্ঞাস করে ---' আচ্ছা, বাড়ি ফেরার পর তোমার সাথে কি আমার আর দেখা হবে? '

' হবে '

' কিভাবে? '

' আমি তোমাকে বিয়ে করব মেঘলা। '

শুনে তার কান লজ্জায় রাঙা হয়। মাথা নত করে সে। প্রবীণ তাকে কবি জয় গোস্বামীর "পাগলী, তোমার সঙ্গে ..." কবিতাটি আবৃতি করে শোনায়।

কবিতা শুনতে শুনতে ঘুম আসে মেঘলার। হঠাৎ প্রবীণের ডাকে তার ঘুম ভাঙে। রাত ফুড়িয়ে ভোর হতে চলেছে।এবার তাদের বেরোতে হবে। যেমন করে হোক, যে ভাবে হোক তাদের বের হতে হবে। বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগানো আছে। তাহলে বেরোবে কোন দিকে, ভাবতে থাকে প্রবীণ। হঠাৎ তার চোখ পড়ে জানালার দিকে। জানালার কাঠে ঘুণ ধরেছে। হয়তো গোটাকতক সজোরে আঘাত করলে ভেঙে যেতে পারে জানালাটা। কিন্তু কি দিয়ে আঘাত করবে ! 'একটা শক্ত কিছু, একটা ভারি কিছু থাকলে....'---মুখের কথা না ফুড়াতেয় মেঘলা তাকে একটা শাল কাঠের ডান্ডা দেয়। ওটা দরজায় খিলের কাজে ব্যবহৃত হতো।

একটা আঘাত, দুটো, আরও গোটাকতক আঘাত করার পর জানালা ভেঙে যায়। তারা বের হয়। এই ভোরে ট্রেন ধরতে হবে তাদের। একটুও দেড়ি করা চলবে না, দেড়ি করলেই বিপদ। হয় ট্রেন ছাড়বে, নয়তো এই দুষ্কৃতিরা তাদের ধরে ফেলবে। তারা প্রাণপনে ছুটতে শুরু করে স্টেশনের দিকে, ট্রেন ধরার আশায়।



Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.