x

আসন্ন সঙ্কলন

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

বুধবার, জানুয়ারী ৩১, ২০১৮

পিয়ালী গাঙ্গুলি

sobdermichil | জানুয়ারী ৩১, ২০১৮ |
আগুন পাখি
"এই শালা ছাড়, ছাড় বলছি। ফড়িং পেছন থেকে ছেলেটার ঘাড়ের কাছের কলারটা ধরে প্রাণপণে টেনে তোলার চেষ্টা করছে মেয়েটার শরীরের ওপর থেকে। ফড়িংয়ের আচমকা আক্রমণের তাল সামলে অন্য ছেলে দুটো ঝাঁপিয়ে পড়ল ফড়িংয়ের ওপর। ফড়িং তখন বাঘিনী। এলোপাথাড়ি লাথি, ঘুঁষিতে কাবু করে ফেলল ওই দুটোকে। তারপর অন্যটাকে কলার ধরে টেনে তুলে পেটে সজোরে এক লাথি মারল। ছেলেটা পেট ধরে যন্ত্রণায় লুটিয়ে পড়ল। কোনোমতে উঠে "তোকে দেখে নেব" শাষাতে শাষাতে পালিয়ে গেল। স্টেশনে ট্রেনটা ঢোকার আগেই ফড়িংয়ের চোখ পড়েছিল প্ল্যাটফর্মের পেছনে অন্ধকারে ঝোপটার দিকে। ট্রেনটা থামার অপেক্ষা করেনি ও। ট্রেন স্লো হতেই লাফিয়ে নেমে দৌড়ে গেছিল ঝোপের দিকে।

মেয়েটার তখনও চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ। মুখের কষ দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। সালোয়ার কামিজের সামনেটা ছিঁড়ে গেছে। তবে মোক্ষম ক্ষতিটা হওয়া থেকে বেঁচে গেছে ফরিঙের সঠিক সময়ে উপস্থিতিতে। নিজের ওড়নাটা খুলে ভালো করে মেয়েটার গায়ে জড়িয়ে দিল ফড়িং। "তোমার নাম কি? বাড়ি কোথায়? ভয় পেও না, ওরা আর আসবে না"। মেয়েটির নাম মৌমিতা। স্থানীয় স্কুলের দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়ে। ফড়িংদের বাড়ির উল্টোদিকে, মানে স্টেশনের ওপারে। বাবা একটা সাইকেল কারখানায় কাজ করেন। বাড়িতে আরো দুটো ছোট ভাই বোন আছে। "ছেলেগুলোকে চেনো?" " একটা ছেলেকে চিনি। আমি যেখানে টিউশন পড়তে যাই, ওখানে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি অনেকদিন"।

"তাহলে চলো আগে তোমার বাড়ি যাই, তারপর তোমার বাবা মাকে নিয়ে থানায় যাব। ওই ছেলেগুলোর নামে ডায়েরি করতে হবে তো। মৌমিতার বাড়িতে পৌঁছতে মেয়ের অবস্থা দেখে মৌমিতার মা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। শত চেষ্টা করেও মৌমিতার বাবাকে রাজি করানো গেল না থানায় যেতে। এই স্ক্যান্ডালটা উনি আর বাড়াতে চান না। থানায় গেলে লোক জানাজানি হবে, সমাজে মুখ দেখানো মুশকিল হবে। তাছাড়া থানা পুলিশ করেই বা কি হবে? কদিন পরেই তো ছাড়া পেয়ে যাবে, তখন যদি প্রতিহিংসায় আরও বড় ক্ষতি করে? পড়াশুনা যাই করুক, শেষমেষ বিয়ে তো দিতেই হবে। শুধু মৌমিতা নয়, ওর ভাই বোনগুলোর ওপরেও এর আঁচ এসে পড়বে। ফড়িং বোঝানোর চেষ্টা করে "কিন্তু কাকু, আমরা সবাই যদি ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাই, তাহলে এই পাষন্ডগুলোর সাহস আরও বেড়ে যাবে। আজ একটা মেয়ের ক্ষতি করেছে, কাল আরেকটা মেয়ের ক্ষতি করবে।" মৌমিতার বাবা অনড় "শোনো, তুমি আমার মেয়েকে বাঁচিয়েছো, তার জন্য আমরা তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু তোমায় অনুরোধ করছি তুমি আর আমাদের ব্যাপারে নাক গলিও না।"

এরপর আর কথা না বাড়িয়ে ফড়িং উঠে পড়ল। ফড়িংয়ের বাড়িতেও চিন্তা করছিল। ফড়িংয়ের বাবা রাজ্য সরকারি অফিসে গ্রূপ ডি কর্মী। মেয়ে ছোটবেলা থেকেই মেধাবী। সরকারি স্কুলে পড়েই, কোনো প্রাইভেট টিউশন বা স্পেশাল কোচিং ছাড়াই জয়েন্টে ভালো রেজাল্ট করে যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। ফাইনাল ইয়ার। এবার মিস রূপসা দত্তর খালি একটা চাকরি পাওয়ার অপেক্ষা। ও অবশ্য আরও পড়াশুনো করতে চায়। বিদেশে যাওয়ারও ইচ্ছা আছে। কিন্তু বন্ধুদের মত ওইসব জি আর ই ইত্যাদি পরীক্ষা দেওয়া মত আর্থিক সঙ্গতি ওদের নেই।

পরশু ফড়িংয়ের ৯ নম্বর সার্জারি। মায়ের শেষ যেটুকু গয়না পড়েছিল, সেটুকুও বেচে দেওয়া হয়েছে। তাতেও পুরো টাকার জোগাড় হয়নি। আস্তে আস্তে শোধ করে দেবে এরকমই কথা আছে হাসপাতালের সঙ্গে। অ্যসিড আক্রমণে ফড়িংয়ের মুখ প্রায় বিকৃত হয়ে গেছিল। তার সঙ্গে গলা, বুক আর পেটের কিছুটা অংশও। একটা চোখে দৃষ্টিশক্তি প্রায় নেই। গত একবছরে ৮ টা সার্জারি হয়ে গেছে। আরও কতগুলো রিকন্সট্রাক্টিভ সার্জারি লাগবে  কে জানে। ২০১৩ সালে পাশ হওয়া আইন অনুযায়ী প্রধান মন্ত্রীর 'ন্যাশনাল রিলিফ ফান্ডের' অন্তর্গত 'ভিক্টিম কম্পেনসেশন স্কিমের' আওতায় এসিড এট্যাক ভিক্টিমের ৩ লক্ষ টাকা পাওয়ার কথা, তাও ঘটনার পাঁচ দিনের মধ্যে। একবছর  হয়ে গেল, ফড়িংয়ের কপালে এক টাকাও জোটেনি। পুরো চিকিৎসাই চলছে বাবার টাকা আর ইউনিভার্সিটির বন্ধুবান্ধব, প্রফেসর আর কিছু সহৃদয় মানুষের সহযোগিতায়।



ইউনিভার্সিটিতে ফেস্ট চলছিল। তাই অন্যদিনের চেয়ে ফিরতে একটু দেরিই হয়েছিল ফড়িংয়ের। শীতকাল বলে এমনিতেই সন্ধ্যার পর রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়। রাস্তার একটা বাঁকে ওরা তৈরি হয়েই অপেক্ষা করছিল। কাছাকাছি আসতেই ছুঁড়ে দিল ফড়িংয়ের মুখ লক্ষ্য করে। সেইদিনের প্রতিশোধ। জ্বলে উঠল ফড়িংয়ের শরীর। আর্ত চিৎকারে কেঁপে উঠল চারিদিক। রাস্তায় পড়ে কতক্ষণ ছটফট করেছিল ঠিক নেই। শেষে এক রিক্সাওয়ালার চোখে পড়ে। এরেস্ট হয়েছিল বটে ছেলেগুলো। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কদিনের মধ্যেই তারা মুক্তি পেয়ে প্রকাশ্যে মাথা উঁচু করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভারতের দণ্ডবিধির সেকশন ৩২৬ অনুযায়ী কমপক্ষে ১০বছর সশ্রম কারাদন্ড হওয়ার কথা। কিন্তু ভারতবর্ষে রাজনৈতিক প্রভাব যে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী অস্ত্র। এই অস্ত্রের চোখ রাঙানিতে চিরকাল শত শত অপরাধ চাপা পড়ে এসেছে।

একটু সুস্থ হওয়ার পর থেকে ফড়িং আবার ইউনিভার্সিটি যাওয়া শুরু করেছে। নিয়মিত যেতে পারে না। কত অভিজ্ঞতাই না হয় রোজ। বেশিরভাগ সময়ই ওর মুখ দেখে শিউরে ওঠে সবাই। বাবা, মা থেকে আরম্ভ করে অনেকেই পরামর্শ দিয়েছিলেন মুখে একটা ওড়না জড়িয়ে রাখতে। ফড়িং রাজি হয়নি। "আমি তো কোনো অন্যায় করিনি, আমি কেন মুখ ঢাকতে যাব? বরঞ্চ আমার এই বিকৃত মুখই হবে সমাজের আয়না। লোকে দেখুক কত ভয়ানক আমাদের এই সমাজ। অনুভব করার চেষ্টা করুক আমার বা আমার মত মেয়েদের কি নারকীয় যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে"। রাস্তা ঘাটে, এমনকি ক্যাম্পাসেও নানারকম কটূক্তি শুনতে হয়েছে। ছেলেগুলো ওকেই কেন টার্গেট করল, ওদের মধ্যে কারুর সাথে ফড়িংয়ের কোনো প্রেমের সম্পর্ক ছিল কিনা, সেদিন ফড়িং অত রাত করে ফিরছিল কেন, ওর গায়ে কি পোশাক ছিল ইত্যাদি। তবে ইউনিভার্সিটির বন্ধুরা আর প্রেফসররা খুবই সাহায্য আর সহযোগিতা করেছেন।

টি সি এসের চাকরিটা পাওয়ায় জীবনটা অনেকটা সহজ হয়েছে ফড়িংয়ের। চিকিৎসার খরচ নিয়ে এখন আর ওকে ভাবতে হয়না। চাকরির সুবাদেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে। মিডিয়ার সহযোগিতায় চাপে পড়ে পুলিশ আবার নতুন করে কেসটা ওপেন করেছে। নিয়মিত থানা, কোর্ট সর্বত্র ফড়িং একাই ছোটাছুটি করে। এই সূত্রে ওর মত আরও অনেকের সাথে আলাপ হয়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা বা অর্থনৈতিক অবস্থার নিরিখে অনেকেরই অবস্থা ওর চেয়েও খারাপ। নিজের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অন্যদেরও যথাসম্ভব সাহায্য করার চেষ্টা করে, যার যেরকম সাহায্যর প্রয়োজন। সর্বোপরি ফড়িং সারাক্ষণ এদের সকলের মনোবল বৃদ্ধি করার চেষ্টা করে। এই দীর্ঘ আর কঠিন লড়াইয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হল মনোবল আর আত্মবিশ্বাস।

আজ খুব আনন্দের দিন। দীর্ঘ পাঁচ বছরের যুদ্ধের পর ফড়িংয়ের দোষীরা আজ সাজা পেয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ ও হাইকোর্টের রায়কেই বহাল রেখেছে। সকাল থেকেই আজ মিডিয়ার ভিড় এই ছোট্ট অফিস ঘরটাতে। 'দা ফিনিক্স ফাউন্ডেশন' নামের একটা সংস্থা গড়ে তুলেছে ফড়িং। ওর মত মেয়েদের সাহায্যের জন্য। সবরকম সাহায্য আর সহযোগিতা করার চেষ্টা করে। অনেক ক্ষেত্রে বোঝা ভেবে পরিবারও বহিস্কার করে এইসব মেয়েদের। তাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থাও করে এই সংস্থা। না, সম্পূর্ণ একা নয় ফড়িং। বেশ কিছু ভালো মানুষকে পাশে পেয়েছে ও। বাইটের জন্য ফড়িংয়ের মুখের সামনে বুম ধরেছে এক টি ভি চ্যানেল "ম্যাডাম, কেমন লাগছে এই জয়? অন্যান্য এসিড এট্যাক ভিক্টিমদের উদ্দেশ্যে আপনি কি বলবেন?" মাঝপথে সাংবাদিককে থামিয়ে দিয়ে খুব স্থির কিন্তু দৃঢ় গলায় ফড়িং বলল "আমরা ভিক্টিম নই, আমরা সারভাইভার। আমরা লড়াই করতে জানি, লড়াই করেই বাঁচব। অনুকম্পার প্রয়োজন নেই আমাদের"। ফড়িং তো ও শুধু নামেই, আসলে তো ও আগুনের পাখি।




Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.