x

আসন্ন সঙ্কলন

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

বুধবার, জানুয়ারী ৩১, ২০১৮

পিনাকি

sobdermichil | জানুয়ারী ৩১, ২০১৮ |
কলঙ্কিত নায়ক
-১

ক অপরাহ্ণে , গঙ্গার তীরে বসে আছে জটাধারী সাধু । দীর্ঘ চেহারা , বনে অনেক সময় ধরে বসবাস করার জন্য , ত্বক শুষ্ক হয়ে গিয়েছে । বুক অব্দি লম্বা দাড়ি । গায়ের রং কালো । তার চোখ দু’ টো রোষায়িত রক্তিম !

সামনে বাহিত স্রোতস্বিনী । কিছুক্ষণ আগেই সূর্য ডুবে গিয়েছে । সেই স্থান এখনো খানিক রঙিন । আকাশে মাখানো খামখেয়ালী আলোর কোলাজ । আর মাত্র কিছু সময় , তারপরেই পৃথিবীতে রাত নেমে আসবে । 

জটাধারী সাধু , এক পণ্ডিত বিজ্ঞ । ইতিমধ্যেই আর্যাবর্তে পরিচিত । তাঁর নিজস্ব দশ হাজার শিষ্যবাহিনী আছে । এই সময়ে এমন ক্ষমতাশালী মানুষ যে কোন ব্যাক্তিকে ঈর্ষায় ফেলবে । আজ এই ক্ষণে , এত কিছু পেয়েও , মন অশান্ত । কেন ? 

সব কিছুর শুরুতে থাকে শুরুর গল্প । আমরা গঙ্গা নদীর তীরে অপরাহ্ণে , এই গল্পের শেষ পর্বে দণ্ডায়মান । আমাদের দুটি পর্বে ফিরতে হবে । 

সেই দিন , দিনের আলো গাছেদের বেড়াজাল টপকে , আশ্রমের মাটিতে এসে ছড়িয়েছে । নৈমিষারণ্যে এক উৎসব চলছিল । এটি জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র । সভ্যতার পূর্ব মুহূর্ত থেকেই এখানেই গবেষণা চলছে , জ্ঞান , বিজ্ঞান , সাহিত্য চর্চার । নানা স্থান থেকে উপাসকেরা এখানে থেকে নিজেদের সাধন পদ্ধতি নিয়ে মেতে থেকেছে । 

এখন মধ্যাহ্ন হতে আরো চার প্রহর বাকী । আশ্রমের মধ্যেই ঋষিরা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত । আচমকা খোলা আকাশে যেমন ঝড় এসে তছনছ করে দেয় , তেমন ভাবেই মধ্য বয়স্ক দীর্ঘাকায় ঋষি , তাঁর দশ হাজার শিষ্যকে নিয়ে ঢুকল ।

তাঁকে দেখেই , আশ্রমের ঋষিরা নিজেদের সাধন কর্ম থামিয়ে দাঁড়িয়ে স্বাগত জানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে । একজন বয়স্ক ঋষি হাত জোর করে বলল – আসুন প্রভু । এই অরণ্য আজ আপনার দয়ায় কৃতজ্ঞ । অনুগ্রহ করে আসন গ্রহণ করুণ । আপনি মহামুনি পরাশরের উত্তরাধিকারী ব্যাসদেব । আপনার পাণ্ডিত্য সূর্যের তেজের মতনই অচ্যুত । এলেন যখন , আমাদের জ্ঞানে সিক্ত করে দিয়ে যান ।

ব্যাসদেব বলল – আপনি ব্যস্ত হবেন না । আমি আর আমার শিষ্যরা ভ্রমণে বেরিয়েছি । ভাবলাম একবার এই গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এসে দেখি । বৈদিক সংস্কৃতি আপনারা যেমন ভাবে লালিত করছেন , তা প্রশংসনীয় ।আমি একবার দেখতে এলাম , নিজের চোখে । 

-আপনি এসেছেন আমাদের ভরসা বেড়েছে । আমরা আপনার কীর্তি সর্বদা স্মরণ করে চলেছি । বেদ আমাদের কাছে প্রাণ বায়ু । 

নিজের প্রশস্থি বাক্য শুনে , বেদব্যাস হাসল ।

এমন সময় , তাঁর দৃষ্টি গিয়েছে , আশ্রমের বাঁ – দিকে , ঘেরা ছোট্ট প্রাঙ্গণে । সে দেখতে পেল , অষ্টাশি জন সাধু সারা গায়ে ভস্ম মেখে ধ্যানে নিমগ্ন । বেদব্যাস আশ্রমে এসেছে , সেই দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই ! 

বেদব্যাস উঠে হেঁটে গেল ।

সামনে বসে থাকা সাধুদের উদ্দেশ্যে বলল - আপনারা কোন দেবতার সাধনে মগ্ন ?

সকলেই নির্বিকার চিত্তে ধ্যানে মগ্ন । 

সে বেদজ্ঞ বেদব্যাস । তাঁকে গুরুত্ব না দেওয়া র অর্থ , বেদ অস্বীকার করা ! দুঃসাহস । 

ক্রোধাম্বিত মুখ দেখে , বৃদ্ধ সাধু এসে বলল – প্রভু , ওদের নেতা শিব । আজ তিনদিন হল , এক কঠোর সাধনায় মগ্ন । 

-শিব ! সে আবার কে ?

-বলতে পারেন , ইতিমধ্যেই উপজাতিদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে । দক্ষিণাপথে, শিবের মহিমা প্রচারিত । ব্যাধ , ম্লেচ্ছ , অবৈদিক জনজাতি , এমন কি রাক্ষসদের মধ্যেও তার বেশ সুনাম । ভক্তের সংখ্যা , অনুরাগীর সংখ্যা ইতি মধ্যেই প্রচুর । 

- আপনি এখানে সাধনা করতে দিলেন কেন ?

-ওদের সাধন পদ্ধতি বেশ অভিনব , বাস্তব সম্মত এবং বৈজ্ঞানিক ভিত্তি মূলক । আমরা এই পদ্ধতিটি নিয়ে বর্তমানে গবেষণা করছি । 

-আপনি জানেন না , একমাত্র বিষ্ণু গোষ্ঠীর সাধকরাই সেরা মার্গের সন্ধ্যান দেন । তাদের পদ্ধতি বিশুদ্ধ বৈদিক পদ্ধতি ।

-প্রভু , শিব দক্ষিনাপথ জয় করে উত্তরাপথে বিজয় যাত্রা শুরু করেছে । আপনি এখনই তাকে পরাস্ত করুন । 

-সে কোথায় আছে ?

-কাশীতে । সেখানে এমন এক সভ্যতার জন্ম দিয়েছে । সংস্কৃতির সৃষ্টি করেছে , যেখানে বৈদিক সংস্কার মানা হয় না । অবৈদিক জন জাতির মানুষরাও , সমাজের মূল স্রোতে সমাদৃত । 

ব্যাসদেব ভাবছিল , দশ হাজারের শিষ্যবাহিনীকে নিয়ে শিবের রাজত্ব আক্রমণ করা উচিত হবে না । আগে খুব নিকটে কয়েক জন , কাশী যাবে । নিকটেই কোন নির্জন স্থানে , অরণ্যে ধীরে – ধীরে বাহিনী জড়ো করবে । সুযোগ বুঝে আক্রমণ । সে আগে কখনো এই বর্বর বিদ্রোহীকে দেখেনি । 

শিব নিজেও হয়ত জানেনা , তাঁর মুখোমুখি হতে চলেছে , বেদব্যাস ! 

বেদব্যাস মনে –মনে বলল – যেমন ভাবেই হোক , বেদ বিরুদ্ধ সংস্কারকে কখনই আর্যাবর্তে স্থায়ী হতে দেব না । 


মণিকর্ণিকার ঘাটে ব্যাসদেব দাঁড়িয়ে আছে । এত সকালে মৃদুমন্দ শীতল বাতাসে , নিম্মাঙ্গের গেরুয়া বসন উড়ে চলেছে । উর্দ্ধাঙ্গ অনাবৃত । সে অবশ্য শিষ্যবাহিনীকে এক সাথে , কাশীতে আসবার অনুমতি দেয় নি । খুব জনা তিনেক বাদে , বাকীদের ফিরিয়ে দিয়েছে । তারা কাশীর নিকটেই , গঙ্গার পাড়ে ছোট্ট অরণ্য ভূমিতে আত্ম গোপন করে আছে । 



এই মুহূর্তে ব্যাস , এক প্রিয় শিষ্যকে ডাকল । বলল – আমরা , আপাতত কাশীতেই আত্ম গোপন করব ।

শিষ্য হাত জোর করে বলল – প্রভু , অতর্কিতে আক্রমণ করলে , ওরা নিজেদের রক্ষা করতে পারবে না । এই স্থানে , আমাদের মতাদর্শ প্রচারে সুবিধা হবে ।

-তুমি যতক্ষণ না শত্রুর ক্ষমতা বুঝতে পারছ । তার দুর্বলতা জানতে পারবে না । আর দুর্বলতা , না জানলে আক্রমণ করবে কেমন করে ? 

-ওরা আমাদের থেকে অনেক পিছিয়ে । 

-তুমি জানলে , কী ভাবে ? দেখো । আমাদের আগে , গোটা নগর ঘুরতে হবে ভিক্ষার জন্য । এতে আমরা বুঝতে পারব এখানকার মানুষের ব্যবহার । মানসিক দৃঢ়তা । কোন জনগোষ্ঠীকে দখল করতে হলে , দরকার তাদের মানসিক আর মানবিক শক্তির মূল্যায়ন । 

-তা হলে আমরা এখন এখানে কয়েক দিন থাকব ?

-আপাতত , বিশ্রাম নিতে হবে । মধ্যাহ্নে একটু ঘুরে বেড়াবো । কাল সকাল থেকে নগর পর্যবেক্ষণ শুরু হবে ।

শিশ্য মাথা নামিয়ে বলল – ঠিকাছে ।

নগরী নিজের ছন্দে প্রবাহিত । গঙ্গার মতনই সে গতি কখনো তীব্র , আবার শ্লথ , কিন্তু কখনই থেমে যায়নি । এখনাকার নাগরিকেরা কোন দেবতায় বিশ্বাস করে না। তাদের আচার , অনুষ্ঠান , সংস্কার নিজেদের মতনই । ব্যাসদেব এত দিন বিশ্বাস করত এই সমাজ আর সভ্যতাকে বাঁধতে হলে , এক নির্দিষ্ট নিয়ম দরকার । এই প্রথম দেখল , এখানকার লোকেদের নিয়ম নেই , নিষ্ঠা আছে । অধ্যায়ন নেই , অধ্যাবশায় আছে । তারা গৃহস্থি , অথচ নির্মোহী । প্রতি মুহূর্তে উৎসব চলছে । 


আজ পথে বেরিয়ে , ব্যাস আর তার শিষ্যন নগরের বাঁ – দিকে , সংকীর্ণ পথ দিয়ে এগিয়ে চলেছে । সামনেই , ছোট্ট কুটীর দেখতে পেল ! 

বাসস্থান ছোট , এক অদ্ভুত ভাবে তা তৈরী হয়েছে । বোঝাই যাচ্ছে , এখনাকার মানুষদের বাস্তু বিজ্ঞান , বৈদিক সভ্যতার থেকে আলাদা । সামান্য এক ব্যাধ শ্রেণীর মানুষের বাসস্থান প্রয়োগে উত্তম ভাবে সামগ্রীর প্রয়োগ করা হয়েছে । দেখতে – দেখতে গুরু আর শিষ্য দু’ জনেই হারিয়ে গেল ।

তাদের গৃহের বাইরে দেখে , ব্যাধ এগিয়ে এসেছে । বলল 

-হে , বিপ্র , অনুগ্রহ করে আসন গ্রহণ করুন । 

ব্যাস বুঝতে পারেনি , এখানে তাকে এমন ভাবে সম্ভাষণ করা হবে । মনে – মনে বলল –এরা সহবত জানে , জংলী , ম্লেচ্ছ , বর্বর জাতি । তবে গুণীর কদর করতে জানে । 

-তুমি এখানেই থাকো ?

-হ্যাঁ প্রভু । আমরা এখানেই থাকি । শম্ভু আমাদের থাকবার জায়গা করে দিয়েছে । ও আমাদের প্রাণকর্তা । 

-তুমি শম্ভুকে দেবতা মনে করো ?

-না প্রভু । আমাদের মধ্যে কেউ দেবতা নই । কেউ অসুর নয় । আমরা মানুষ । আমাদের এখানে বর্ণ ভেদ নেই । 

-মানে ? শূদ্র হয়েও , পুজোতে অংশ নাও ! 

-প্রভু । আমরা আমাদের প্রাণ কর্তার জন্য যে উৎসব করি । তাতে নিয়ম নেই । সংস্কার নেই। যাদের বৈদিক সমাজ ত্যাগ করেছে , তারাই শম্ভুর আশ্রয়ে । উনি আমাদের নেতা। 

-তুমি কখনো দেখেছো ?

-হ্যাঁ , সে এখানেই আছে । নিন...

বেদব্যাস দেখল -- শাল পাতার উপর , পশু মাংস । 

-প্রভু আমরা ব্যাধ । আজ সকালে , যা শিকার হয়েছে , সেখান থেকেই সেবা নিন । 

ব্যাস রোষায়িত চোখে বলল – ছিঃ নির্দোষ প্রাণী বধ করতে তোদের হাত কাঁপেনা ? এই প্রাণীর মৃতদেহ আমাকে খেতে দিয়েছিস ! নিজেদের মতন , ম্লেচ্ছ ভাবলি । এর জন্যই বেদ থেকে তোরা নির্বাসিত ...

ব্যাধ পা মুড়ে বসল – প্রভু , ফেলে যাবেন না । আমরা , ম্লেচ্ছ । এটা আমাদের খাদ্যাভ্যাস । আপনি এখানে এক্ষুনি বসুন , আমি ফলের ব্যবস্থা করছি... 

ব্যাস কিছু না শুনে বলল – আমাকে অপমান করবার ফল , কাশীবাসী বুঝবে । 

বেদব্যাস আগে হেঁটে চলেছে । শিষ্য , পিছনে । সারাদিন আজ তাদের ভিক্ষার ঝুলি শূন্য । ডুবন্ত সূর্যের শেষ আলোটুকু তাদের বুকে মেখেছে । ছায়া – ছায়া আলোয় , দুই ছায়া মূর্তি গঙ্গার তীরে মণিকর্ণিকা ঘাটের পাশে দাঁড়িয়ে আছে । 

ব্যাস দেখল , এক নারী তাদের পিছনে অপেক্ষারত মুখ ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে । শিষ্য বলল – আজ আমরা এমন অভুক্তই থাকব ? 

-এই নগরে আর একটা দিন নয় । এখন রাস্তায় অন্ধকার নামবে , তাই কোন আস্তানায় কাটিয়ে , কাল ভোরে গঙ্গার উল্টো দিকের অরণ্যে চলে যাব । ওদের খবর পাঠিও । 

নারী এতক্ষণ তাদের পর্যবেক্ষণ করছিল । বলল – বিপ্ররা যদি কিছু মনে না করেন । আমার সাথে আসতে পারেন । 

মধ্য বয়সী নারীকে দেখে ব্যাস বলল – আপনার পরিচয় ?

-আমি এই নগরের উত্তর দিকে থাকি । আমার স্বামী নগরপতি । আসুন । 



রাত গভীর । অতিথিদের রাতের খাবার দেওয়া হয়ে গিয়েছে। এখন শয়নের ব্যবস্থা করছে । দাসীরা শয্যা প্রস্তুত করে কক্ষ ত্যাগ করল । 

ব্যাস বলল – মা , আপনি আজ আমাদের প্রাণ রক্ষা করলেন । এই রাতে , ঠাণ্ডার কষ্ট সহ্য করলেও , ক্ষুধার জ্বালায় বেশ কষ্ট হত । 

মাথা নামিয়ে নারী বলল – আপনারা , দু’ দিন ধরে অভুক্ত । এই নগরী কখনো , কোন মানুষকেই খালি হাতে ফিরিয়ে দেয়নি । আপনারা , দু’ দিন ভিক্ষা পেলেন না ! আমি বুঝতে পাচ্ছি না । 

ব্যাসদেবের মুখে , ঠাণ্ডা রাতের নিথরতা । এই দুই দিন , সে অনেক অপমানিত হয়েছে । শেষ পর্যন্ত আত্ম পরিচয় দিয়েও , ভিক্ষা পাননি ! যে জ্ঞানীর শুধু মাত্র পায়ের ধুলোর জন্য , ক্ষত্রিয়রাই শুধু নয় , আশ্রমের ঋষিরা পর্যন্ত উদগ্রীব হয়ে থাকে । কাশীর অতি সাধারণ জনগণ তাঁকে বহিষ্কার করল !

ব্যাস বলল – ভিক্ষা প্রার্থীর শুধুই প্রার্থনার উপর অধিকার থাকে । যদি কেউ ফিরিয়ে দেয় , আমি দায়ী নই । কাশীর নাগরিকরা ব্যাভিচার দ্বারা আক্রান্ত ।তাদের প্রতি অভিসম্পাত রইল । 

নারী উঠোনে বসেছে । কিছুটা দূরে ব্যাস আর তাঁর শিষ্য বসে আছে । নারী বলল

-হে মহাজ্ঞানী , বেদ ভাগ করেছেন । সংহিতা , পুরাণ কথক । আপনার কাছে আমার কিছু প্রশ্ন ছিল।

ব্যাস বলল – বলো মা ।

-ধর্মচারণ কেমন করে সম্পাদন হয় ?

-মেপে কথা বলা , সবার মতামত কে মানবিক ভাবে গুরুত্ব দেওয়া , সকলের জন্য ভালো চিন্তা করা । আর হ্যাঁ অবশ্যই ভাবনা চিন্তা করে কাজ করা ।

-প্রভু , ব্যাধ অভুক্ত অতিথি কে খাবার পরিবেশন করেছিল । নিজের ভাগের টা দিয়ে । এমন ভাবে সরল ধর্মাচারণ , আপনার কছে তিরস্কৃত হল ! ক্ষমা করবেন , আপনার মতন বেদজ্ঞের কাছে আশা করা যায় না । 

ব্যাস নিজের যুক্তি বলল – আমি যে সংস্কারকে বিশ্বাস করেছি , সেখানে এই ধরণের খাদ্যাভ্যাস সমর্থিত নয় । 

-প্রভু , মানুষ পরিস্থিতি , পরিবেশ আর প্রাকৃতিক ভৌগোলিক প্রয়োজন দ্বারা নিজের খাদ্যাভ্যাস , জীবন চর্চা গড়ে তোলে । আমি বা আপনি আমরা কেউই আমাদের জীবন চর্চা অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে পারিনা । 

ব্যাস চুপ করে থাকল । যে সময় বয়ে চলেছে , রাত দিনের রূপান্তরের দিকে ধাবমান । আজ এই এখানে , নারীর প্রতিবাদ , প্রতিহত করবার সামর্থ নেই ! 

--হে মুনিবর , আপনি এই নগরীতে এসে সর্বত্র শুধুই বিদ্বেষ ছড়িয়েছেন । তাই ফিরছেন হতাশা নিয়ে । মাপ করবেন , শিব তত্ত্ব মানুষকে নিজের মতন করে মিশতে শেখায় । আর এই শিক্ষা নেহাত ভক্তিবাদের উপর নির্ভর নয় । বাস্তবিক প্রয়োগ এই অন্তর্লীন সত্য । আমি , আপনি আমরা কেউই এই উপলব্ধির উর্দ্ধে নই । আজ যে জ্ঞান আপনার কাছে সেরা অস্ত্র বলে মনে হচ্ছে , পরিবেশ ভেদে তার তীব্রতা কমতেই পারে । এমনকি সে বিজ্ঞান অনুপযোগীও হতে পারে । আপনি বিচার না করে , এই নগরীকে অভিসম্পাত করলেন ! 

কোন সাধারণ নারী নয় । এই মহিলার পরিচয় জানতেই হবে 



-আপনি কে মা ?

-বলতে পারেন , শম্ভুর উপাসক এক সন্ন্যাসিনী । 

-তোমার দেবতা বুঝি মহাদেব ?

-আপনারা দেবতা বলেন । আমরা নেতা বলি । সে ব্যাক্তিগত দেবত্বে বিশ্বাসী নয় । মানুষ নিজেই নিজেকে উন্নত করবে । তার জন্য , পক্রিয়া আছে । কেউ দয়া করে , আত্ম উন্নয়নের পথ বলে দেয় না। নিজেকেই খুঁজতে হয় , আমরা তাই বিশ্বাস করি । এটা আমাদের ব্যক্তিগত । অন্যের বিশ্বাসকেও সম্মান করি । অনেক রাত হয়েছে , কাল ভোরেই রওনা দেবেন । এখন আপনাদের আর কষ্ট দেব না । 


গঙ্গার তীরে দুই পায়ের হাঁটুর উপর থুতনি রেখে ব্যাস বসে আছে । পিছনে ডুবে গিয়েছে সূর্য । আলো বলে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই । এই ছায়া , ব্যাসের বিষণ্ণ মুখকে ভিজিয়ে দিয়েছে । নিজের কীর্তির দুর্বলতা , এই স্থানে এসে আচমকাই সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে । এখানে এসেছিল , শিবকে শাস্তি দেবে বলে । নিজের সৃষ্টিকে ছড়িয়ে দেবে বলে । ব্যাস নিজে বিষ্ণু গোষ্ঠীর সমর্থক । বেদ সংস্কৃতি ব্যাভিচারীদের হাতে আক্রান্ত হলে , বিষ্ণু নিজে দায়িত্ব নিয়ে উদ্ধার করেছিল । বিষ্ণুর প্রচারক ব্যাস আচমকাই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে ! কাশীতে এক অদ্ভুত সংস্কৃতির প্রসার চলছে । এখানে , নগর সভ্যতা ছুঁয়েছে । এই সভ্যতা সংকুচিত নয় , বরং নতুন কিছুকে গ্রহণ করতে তারা সদা ব্যস্ত । 

অনেক কিছুই শিখেছে ব্যাস । সে ভাবছিল , যা উপলব্ধ , তাকে বিশ্লেষণ করতেই উপলব্ধি প্রাপ্ত হয় । এই উপলব্ধি একত্রে সাহিত্যের রূপ দিতে হবে । 

-গুরুদেব চলুন ফিরে যাই । খবর এসেছে । কাশীর উল্টো দিকে পরিত্যক্ত জঙ্গলে , আমাদের বাহিনী জড়ো হয়েছে । ইতিমধ্যে পাঁচ হাজার আছে । বাকীরাও আসবে । আমরা সরাসরি আক্রমণ করব । 

-তাতে লাভ ? আক্রমণ করে অঞ্চল দখল করা যায় । সভ্যতা নয় । নতুন করে ভাবতে হবে । ওদের সংস্কৃতির দুর্বল দিক খুঁজে পেতে হবে , তারপর আমাদের সভ্যতা গ্রাস করতে পারবে । তাই এখন ওদের ফিরে যেতে বলবে । আমায় নতুন করে ভাবতে হবে । তোমরা নানা স্থানে পর্যবেক্ষণে ছড়িয়ে যাও ।

-প্রভু , আমরা তাহলে আপনার সাথেই থাকি ।

-না । আমি একা যাব । তোমরা আস্তানায় ফিরে যাও । যারা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হয়েছে , তাদের ফিরিয়ে নাও । আমি কয়েক দিন এই নগরীকে পর্যবেক্ষণ করছি । এই নগরীর বিপরীতে নির্জন স্থানে , আত্ম বিশ্লেষণ করব । তারপর...

-প্রভু আপনি এরপর কোথায় যাবেন , অনুগ্রহ করে জানতে পারলে কিছুটা হলেও চিন্তামুক্ত হতাম । 

- অরণ্য ভ্রমণ করব । আবার নতুন করে কিছু শুরু করতে হবে । 

-আমাদের প্রতি আদেশ দিন... 

-শল্যাবত তুমি আমার অবর্তমানে , বাহিনীকে নেতৃত্ব দেবে । আমি একান্তে আত্ম পর্যালোচনায় নিমগ্ন থাকব । ঠিক সময়ে ফিরব । আমাকে নিয়ে চিন্তা করবে না । 

-প্রভু আপনি একা ! এমন ভাবে আপনাকে একা ছাড়তে মন চাইছে না । 

ব্যাস পদ্মাসনে বসল । রাতের কালো ছায়া , গঙ্গার খোলা বুকে ওড়না দিয়েছে । কেউ জানেনা , ব্যাসের ধ্যান ভাঙতে কতক্ষণ !

শল্যাবত কিছু বলবার সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারল না। প্রণাম করে পিছনের পথ ধরল । গুরু আদেশ পালন করতে হবে... 



Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.