x

আসন্ন সঙ্কলন

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

বুধবার, জানুয়ারী ৩১, ২০১৮

অভিজিৎ পাল

sobdermichil | জানুয়ারী ৩১, ২০১৮ |
আমার দেশের বাড়ি : একটি দেশ, দুটি বাড়ি, অনেক মানুষ
মাদের বাড়িতে একজন কাজের দিদি ছিলেন। সবার মুখে তাঁর নাম ছিল কালী। শুধু নাম নয় তাঁর গায়ের রঙও মা কালীর মতো। কড়া কালো অথচ মুখটি মাতৃত্বে মাখা‌। সঙ্গে মিষ্টি হাসি আর মিষ্টি স্বভাব একদম ফ্রি। গায়ের এই রঙ থেকেই মেয়েবেলায় তাঁর ঐ নাম হয়েছিল কিনা সেটি আমরা জানি না। তাঁর এই নামটি ছাড়া অন্য কোনো নাম ছিল কিনা এখনও আমাদের বাড়ির কেউ জানে না। অমুকের মা, তমুকের মা বলেও তাঁকে কখনও ডাকা হয়নি। আমি তাঁর পদবী পর্যন্ত জানি না! জানার প্রয়োজন হয়নি। তখন বাড়িতে বাড়িতে কাজের দাদা ও দিদিদের নাম, ঠিকানা, ভোটার কার্ডের জেরক্স রাখার প্রবণতা ছিল না। যাই হোক, খুব মিষ্টি ব্যবহার ছিল তাঁর। আমাদের ছোট পরিবার এই কালীদিদিকে ঘরেরই একজন করে নিয়েছিল। বিশেষ করে আমার ঠাকুরমা। সবাইকে কাছে টানার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন পাড়ায় আদর্শ। 

সেই সময়ের কলকাতায় বিভিন্ন নাগরিক পরিবারে যাঁরা অর্থাভাবে গ্রামগঞ্জ থেকে এসে আমাদের মতো অজস্র পরিবারকে অর্থের বিনিময়ে সামাল দিতে আসতেন বিশ শতকের শেষ দিকেও ‘তুই'বাচক শব্দেই তাঁদের আটকে দেওয়ার চেষ্টা ছিল। ঠাকুরমার কারণে সেই অসৎ চেতনা আমাদের মনে ঠাঁই পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। মা বা পিসিরা কেউ তাঁকে তুমি ছাড়া বলতেন না। কালীদিদি তাঁদের কাছে সমাদর পেত যথার্থ। তাঁকে মজা করে শুধু ‘কালী’ বলে ডাকলে ঠাকুরমা ও মায়ের চড় পর্যন্ত জুটে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল আমাদের গালে। ঘরের কাজের ভুল ভ্রান্তিতে ঠাকুরমা তাঁর আদরের কালীকে বকাবকি করলেও সবসময় যত্ন করতেন। কখনও রাতের বাসী খাবার তাঁকে ভুল করেও খেতে দেওয়া হতো না। খুব যত্ন নিতেন। আমরা যে সব থালা বাসন ব্যবহার করতাম তিনিও সেই একই বাসনে খেতেন। আমাদের কোনোদিন সংকোচ হয়নি। সংকোচ করার মতো পরিবেশ আমাদের বাড়িতে ছিল না। 

এখন দশ-বিশটি পরিবারে যাতায়াত তৈরি হওয়ার পর দেখছি কাজের সাহায্যকারী মানুষদের জন্য অনেক বাড়িতে পৃথক বাসন থাকে। সেটি যেন অচ্যুতের বাসন। ছুঁয়ে ফেললে যেন অঘটন ঘটে যাবে! এটি যখন দেখতে পাই, তখন খুব খারাপ লাগে। আমি অনেক বড় হয়ে জেনেছিলাম কালীদিদি আমাদের পরিবারতন্ত্রের নিয়মে আত্মীয় নন। ঠাকুরমার থেকে শিখেছিলাম আত্মীয় কথাটি মনের ওপর নির্ভর করে। রক্তের সম্পর্ক থাকলেই সবাই আত্মীয় হয় না, রক্তের সম্পর্কের বাইরেও অনেকে আত্মীয় হন। শ্রীমতি কালী দেবীও আমাদের তেমনই এক আত্মীয় হয়ে উঠেছিলেন। আমাদের প্রয়োজন মতো শাসনও করেছেন। তাতেও তাঁর কাজ নিয়ে টানাটানি হয়নি। আমার পাঁচ-ছয় বছর পর্যন্ত তিনি আমাদের পরিবারের সঙ্গে ছিলেন। ১৯৯৫-৯৬-এর পরে আমাদের পরিবারের একটি বড় মাপের অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে আসে। তাতে পারিবারিক আয় এক ধাক্কাতে অনেকটা কমায় তিনি তাঁর এতদিনের কাজটি হারান। আমাদের তখন ক্ষমতা ছিল না একজন কাজের সহায়ক রাখবার। কিন্তু দেখেছিলাম তিনি ছিলেন নিরুপায় ও আমাদের সমব্যথী। তাঁকে কাজ ছাড়াতে আমাদের যেমন খারাপ লেগেছিল, তাঁরও সমান কষ্ট হয়েছিল আমাদের পরিবার ছেড়ে যেতে। শুনেছি কিছুদিন তিনি বিনা বেতনে কাজ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বিনা পারিশ্রমিকে একজন গরীব মানুষের শ্রম গ্রহণ করে আমাদের পরিবার ঋণী হতে চায়নি। তাঁরও তো একটি সংসার আছে দেশ-গাঁয়ে। তাই পরেও যখন তিনি কোন কাজের সূত্রে কলকাতায় এসেছেন আমাদের ঘরে একবার হলেও দেখা করে গেছেন। যোগাযোগ রাখতে চেয়েছিলেন। ঠাকুরমাকে তিনি মা বলে ডাকতেন। আমার মাকে বৌদি, বাবাকে দাদা। আমাকে আদর করে বাবা ছাড়া অন্য কিছু ডাকতেন বলে মনে পড়ে না। ঠাকুরমার শেষ বয়সেও তিনি একাধিকবার দেখতে এসেছিলেন। তারপর অনেক বছর যাতায়াত নেই। ফোন নম্বর ইমেল ঠিকানা কিছুই তো তখন সাধারণ মানুষের থাকত না। 



এই প্রায় এক বছর আগে তিনি আবার যাদবপুরে কাজ পাওয়ার পর একবার এসে দেখা করে গিয়েছেন। কি মিষ্টি স্বভাব! মানুষ বছরের পর বছর একসাথে থাকে কেমন করে! আমার শৈশবের দিনগুলি কেটেছে তাঁর কোলেও। সেই কথা অনেকবার বললেন। এখন তাঁর অনেক বয়স হয়েছে। ঘন কালো চুলগুলো কুয়াশার মতো রঙ ধরেছে। সেদিন আমার শৈশবের এলাকায় অভিযানের নামে আমার বোকা বোকা খেলা ও জেদের গল্প বলে আমার কান পর্যন্ত লজ্জায় লাল করিয়ে নিয়েছিলেন। হাসির কথা। শৈশবের নিষ্পাপ দুষ্টুমির কথা। আরও কত কি! এই কালীদিদির কাছেই খুব সম্ভবত ছেলেবেলায় প্রথম শুনেছিলাম দেশের বাড়ির কথা। তিনি নিয়মিত বছরে একবার করে প্রায় এক মাসের জন্য তাঁর দেশের বাড়ি যেতেন। মনে পড়ে প্রথম প্রথম আমি জানতাম দেশের বাড়ি একটি বেড়াতে যাওয়ার জায়গা। ছেলেবেলায় যেমন দীঘা থেকে দেওঘর অনেক জায়গায় ঘুরতে গিয়েছিলাম আমরা সবাই মিলে। তাই কালীদিদির সঙ্গে তাঁর দেশের বাড়ি যেতেও নাকি বায়না করতাম। বেচারি বিপদে পড়ে যেতেন। মুখে না বলতেও পারতেন না, আবার হ্যাঁ বলতেও পারতেন না। ছোটবেলায় আমার অনেক অন্যায় আবদার তিনি অচিরে অনেক যত্নে মেনে নিলেও এই আবদারটি তাঁর মেনে নেওয়ার সুযোগ থাকলেও কোনো উপায় ছিল না। তিনি যখন দেশে যেতেন তখন আমার স্কুল চলত পুরোদমে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কেউ কথা রাখেনি’র চরিত্রদের মতো তিনি প্রবোধ দিতেন যখন বড় হয়ে যাবো তখন তো আর হাফ প্যান্ট পরে রোজ রোজ স্কুলে যেতে হবে না, সেই সময় আমাকে দেশের বাড়ি নিয়ে যাবেন তিনি। তখন অনেকদিন থাকা হবে। আবার সঙ্গে করে মা, বাবা আর ঠাকুরমাকেও তিনি নাকি নিয়ে যাবেন। সবাই মিলে খুব মজা হবে। আমার স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে যাওয়ার আগেই আষাঢ়ের এক রাতে আদরের ঠাকুরমা আকাশে মিশিয়ে গেলেন। আকাশে একটি তারা চকচক করছিল সেই রাতে। কালীদিদির দেশের বাড়ি আমাদের যাওয়া আর হলো না। সেই বয়সে আমার দেশের ধারণাটি হয়তো বইয়ের মানচিত্রে সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু দেশের বাড়ির ধারণাটি রূপকথার গল্পের মতো মনের মধ্যে সবুজ রঙের রেশমের কাপড়ে রূপার ছুঁচে সোনার সুতোর আলপনা এঁকে তুলেছিল। 

এর অনেক পরে ঠাকুরমার কাছে জেনেছিলাম আমাদের পরিবারেরও একটি সত্যি দেশের বাড়ি ছিল। আমার ঠাকুরদা ফুড কর্পোরেশন বিভাগে কাজ করতেন। থাকতেন খাস কলকাতায়। আদি যাদবপুর তিনি দেখেছিলেন। তখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, চারিদিকে অনেক ডোবা আর পুকুর, জঙ্গলাকীর্ণ জমি, বিখ্যাত সুলেখা কালির কোম্পানি, কৃষ্ণা গ্লাস ফ্যাক্টরি, অন্নপূর্ণা, ডাবর কোম্পানি এই তো ছিল শুধু। তখন না ছিল সুকান্ত সেতু, না ছিল বাইপাস, না ছিল সুবোধ মল্লিক রোডের এত বড় পাকা রাস্তা। বাঘাযতীন স্টেশনও নাকি তখন হয়নি! তবু এই যাদবপুর আমাদের দেশের বাড়ি ছিল না। ঠাকুরমার ‘দ্যাশের বারি’ ছিল খাস বাংলাদেশে। ঢাকার বিক্রমপুরে। সেখানে বুড়িগঙ্গা ছিল, মা ৺ঢাকেশ্বরী মন্দির ছিল। না আমাদের আদিগন্ত বিস্তৃত নারকেল আর সুপারীর বাগান ছিল না। কিছু ধানের জমি ছিল, কিন্তু তা বিশ-চল্লিশ বিঘে না। পুকুরে ইলিশ চাষের গপ্পোও ছিল না। বাড়িয়ে বলে যে মানুষগুলো নিজেদের কয়েক প্রজন্মের ক্ষতে প্রলেপ দিয়ে শান্তি পান, তাদের আমি দোষী ভাবি না। সব থেকেও যাদের কাঙাল হতে হয়েছিল, তাদের কষ্ট একটি হাতঘড়ি হারালে যারা চিরুনি তল্লাশি করে তারা বুঝবে না, এটাই স্বাভাবিক। অত বেশি বেশি ওসব কিছু না থাকলেও আমাদের একটি একান্নবর্তী পরিবার ছিল। সবাই একসঙ্গে ছিলেন। নিজেদের যথেষ্ট পুঁজি ছিল। কিছু তৈজসপত্র ছিল। ছিল একসঙ্গে থাকার আনন্দ। ব্রত পূজা পার্বণ উৎসব। অখণ্ড ভারতের দেশের নেতাদের কুবুদ্ধির জন্য গোটা দেশের ভাগাভাগি হয়ে গেল। তাও ধর্মের নামে। ধর্মের ভিত্তিতে! যে দেশ ভাগ করা যায় ধর্মের নামে, সেই দেশ একদিন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হবে এমন আশা আর আমি করতে পারি না। 

আমাদের মধ্যে যারা দেশভাগের আগে থেকেই এদিকে ছিলেন তাঁরা মোটামুটি নিরাপদেই ছিলেন। এদিক থেকে মূলত মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষেরা ওদেশে গিয়েছিল। কিন্তু আমাদের বৃহৎ পরিবারের মধ্যে যারা বাংলাদেশে ছিলেন তাঁরা ধর্মীয় অত্যাচারের ভয়ে নিজেদের প্রাণটুকু সম্বল করে দেবতার মূর্তি বাক্সে নিয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে চলে এলেন এই বঙ্গে। আশা ছিল আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। আবার নিজেদের ভিটেয় ফেরা যাবে একদিন। আমাদের পূর্বপুরুষদের জমিদারি ছিল না, কিন্তু যেটুকু ছিল সেটিতে আমাদের অভাবহীন জীবন অনায়াসে কেটে যেত। যাঁদের পিঠে কাঁটাতারের দাগ পড়েছিল, তাঁদের শুকনো কাঁটাতারের দাগ দেখে স্বভাষীয় এই বঙ্গের মানুষ হাসিঠাট্টা করতে পারেন, কিন্তু ঐ শুকনো দাগের নিচে যে বহু প্রজন্মের বুকের ক্ষত রয়েছে তা তারা কোনোদিনও বুঝতে পারবেন না। তাদের সেই চেতনার শুদ্ধিকরণ হওয়া সম্ভব নয়। তাদের পূর্বপুরুষদের ওমন ট্র্যাজেডির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়নি। জীবনসংগ্রাম শুধু জীবনই শেখাতে পারে। ঠাকুরমার মুখে এতকিছু সত্ত্বেও মুসলিম বিদ্বেষের কথা শুনিনি। তিনি বরং সেই সব মুসলিমদের কথা বলতেন যারা দেশের ভাগাভাগির সময় ঝুঁকি নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের নারীদের গোপন পথে এদিকে আসতে সাহায্য করেছিলেন। যারা আমাদের সম্পদ লুণ্ঠন করেছিলেন তারাও ধর্মে ইসলামী, যারা সাহায্য করেছিলেন তাঁরাও। দাঙ্গার ইতিহাস ছিল ভয়ংকর। জোর করে ধর্মান্তরিত করা ও অমত দিলে ধর্ষণ ছিল স্বাভাবিক নিয়ম। রাষ্ট্র সেদিন ঐ অমানুষের শাস্তি দিতে অক্ষম হয়েছিল। তবু ঠাকুরমার কাছে মানুষ দুভাগে ভাগ হয়েছিল ভালো ও খারাপ। কোনো ধর্মই খারাপ নয়। সব ধর্মেই ভালো ও খারাপ লোক থাকে। কিছু মানুষের খারাপটুকু দেখেই একটি প্রাচীন ধর্মকে খারাপ বলাটা আমাদের ভারতের উপমহাদেশের ধর্ম-সংস্কৃতির অঙ্গ নয়। এই অখণ্ড দেশেই ছিল আমাদের দেশের বাড়ি। নিজেকে ভারতীয় ছাড়া আর কিছু বলার দরকার ছিলো না। পাকিস্তানের অশোভন জীবন তৈরি হতে শুরু করেছিল পূর্ব পাকিস্তানে। সেখানেই তো আটকে গেল আমাদের দেশের বাড়ি। সেই দেশের বাড়িতে ঠাকুরমার আর কোনদিন যাওয়া হয়নি। দরকারও হয়নি। চেনা কেউ তো আর কেউ ওখানে বেঁচে ছিল না। যাঁরা ছিলেন তাঁরাও তো দাঙ্গার শিকার হয়েছিলেন। 



আমাদের বসত বাড়িটিও দখল করে নিয়েছিল অন্যেরা, উঠোনের তুলসী গাছটিও ধীরে ধীরে জলের অভাব অনুভব করতে শুরু করেছিল। তবে তাঁর ইচ্ছে ছিল নিজের বাপেরবাড়ি ও শ্বশুরবাড়ির ভিটের মাটি আবার একবার ছোঁয়ার। শুধু ভিটের মাটি। আর কিছু নয়। ঠাকুরমার বাপের বাড়ির ভাইদের মধ্যে একজন ঘর তুলেছিলেন অশোকনগরে, আর দু'জন এই যাদবপুরেই। শুনেছি তাঁর এক ননদ বাংলাদেশে ছিলেন। আমাদের জন্মের পর একবার তিনি এই দেশে এসেছিলেন, কিন্তু আমার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়নি। তখন আমি বাড়ির বাইরে পড়তে গিয়েছিলাম হোস্টেলে। ঠাকুরদার ভাইদের মধ্যে কেউ বাঘাযতীনে, কেউ দক্ষিণেশ্বরে, কেউ মুকুন্দপুরে, কেউ যাদবপুরে বাসা তৈরি করতে শুরু করলো। সবাই পৃথক পৃথক। একান্নবর্তী পরিবারের ভাবটা ভেঙে গেল। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ঠাকুরমার দেশের বাড়িও ধীরে ধীরে কল্পনা হয়ে যেতে শুরু করেছিল। ঠাকুরমার কাছে ভারতই হয়ে উঠেছিল তাঁর দেশ। তাঁর নিজের দেশ। আগেও তো তাই ছিল। অখণ্ড ভারতের বুকে যে মানুষটি শ্বাস নিয়েছিলেন তিনি ভারতকে না ভালোবেসে পারবেন? পূর্ব পাকিস্তান তাঁর হারানো ভূমি ছাড়া আর কিছু ছিল না। দেশভাগের আগে ওদেশে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষেরা পাশাপাশি ছিল। পারস্পরিক সৌজন্য বজায় ছিল। শাসক ইংরেজ ও জাতীয় কংগ্রেসের বালখিল্যতা আজ এই অবস্থায় এত মানুষকে এনে দিয়েছে ঠাকুরমার কাছে এই বার্তাটি ছিল স্পষ্ট। আজও পশ্চিমবঙ্গে ও বাংলাদেশে যে ধর্মীয় বিদ্বেষ বারবার জেগে ওঠে তার জন্য দেশভাগ অনেকটাই দায়ি। অথচ সেই সময়েও আমার ঠাকুরমা যথেষ্ট মুক্তমনা ছিলেন, তাঁর বাস্তব বুদ্ধি ছিল অনেক। মনে আছে ছেলেবেলায় কাগজের তৈরি ভারতের জাতীয় পতাকা দিয়ে তিনি খেলা পছন্দ করতেন না। পাছে খেলার শেষে পতাকাটি নষ্ট হয়। পতাকায় মিশে ছিল তাঁর দেশের মূর্তি। ভারতের পবিত্র পতাকা। স্বাধীনতা দিবসে পতাকা দেখে তিনি দুহাত এক করে প্রণাম করতেন। সেই ঠাকুরমার দেশের বাড়ি জলের বুদ্বুদের মতো বাতাসে মিলিয়ে গেল। সঙ্গে মিলিয়ে গেল আমার বড় পিসি, মেজো পিসি, ছোট পিসির দেশের বাড়ির ছবিও। আমার বাবা সেই দেশের বাড়ি দেখেননি, তিনি পরে জন্মেছিলেন। ঠাকুরদার অকাল মৃত্যুর পর তাঁর পাকা চাকরিটা জেঠু পেলেও তিনি ঠাকুরমা বা তার বোনেদের দায়িত্ব না নিয়ে নিজের স্ত্রী পুত্রাদি নিয়ে পৃথক হয়ে যান। তিনি সারা জীবনে চাকরির একটি পয়সাও ঠাকুরমাকে কোনোদিন দেননি। এই নিয়ে ঠাকুরমার কোনো আক্ষেপও ছিল না। 

আমার বাবা তখন শিশু। বিধবা ঠাকুরমা সেদিনের মেয়েদের মতো ভেঙে পড়ে অসহায়ভাবে কারো দরজায় কড়া না নেড়ে নিজেকে ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী করে তুলেছিলেন। একাই বাকি চার ছেলেমেয়েকে মানুষ করেছিলেন। তিনি সেকেলে মানুষ হয়েও বাইরে বেরিয়ে কারখানায় কাজ করতেন, বাড়িতে প্লাস্টিকের খেলনা রঙ করতেন, সেলাইয়ের কাজ করতেন। আরো অনেক কিছু। তাঁর স্বামীর কোনো পুঁজির তিনি পাননি। সেগুলি যে ও যারা লুঠ করেছিল, অসহায় সাহসী বিধবাকে যারা ঠকিয়েছিল তাদের শাস্তি দেওয়ার মতো কেউ ছিল না। প্রতিবাদ করতে পারেনি কেউ। কিন্তু ঐ বিধবার ঈশ্বর ছিলেন। ঐ শৃগালের দল ঈশ্বরের হাত থেকে পরবর্তী সময়ে নিস্তার পায়নি। কর্মফল ভয়ংকরভাবে ভোগ করতে হয়েছে তাদের, কেউ কেউ এখনও সেই শাস্তি ভোগ করে চলেছেন। দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আমার ঠাকুরমা এতকিছুর পরও দেবতার কাছে অভিযোগ রাখেননি। শুনেছি তাঁর শ্বশুর শাশুড়ির আরাধ্য অষ্টধাতুর দেবতা যখন তাঁর থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তখন তিনি কেঁদেছিলেন। সেটি তিনি মেনে নিতে পারেননি। তিনি জানতেন সময়ের থেকে পালিয়ে বাঁচা মানে জীবন নয়। এই দৃঢ়তা থেকে কঠোর পরিশ্রম করে চার ছেলেমেয়েকে মানুষ করেছিলেন। কারো সাহায্য চাননি। একদিনের জন্য ভেঙে পড়েননি। তিনি জেঠুর প্রতি কোনোদিনই কোনো অভিযোগ রাখেননি। বরং তার স্ত্রী ও সন্তানদের গ্রহণ করেছিলেন। নিজের দেওয়ের প্রতারণায় স্বামীর কষ্টার্জিত বাড়িটি হাতছাড়া হওয়ার পরও সহ্য করেছিলেন। আইনের সাহায্য নেওয়ার কোনো সুযোগ তাঁর কাছে ছিল না। নাবালক ছেলেমেয়েদের মানুষ করার তাগিদে ছোট একটি বাড়িতে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন কিন্তু ভেঙে যাননি। অথচ নিজের সন্তানদের সেই সব আত্মীয় স্বরূপ অর্থলোভী ও সম্পদলোভীদের ঘৃণার চোখে দেখতে শেখাননি তিনি। সত্যিই ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে পেরেছিলেন। হ্যাঁ, মানুষের মতো মানুষ। সঙ্গে ছিল বাইশ-পঁচিশটি ম্যাও। মানে বিড়াল। আমার বাবাকে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে তবেই তিনি থেমেছিলেন। বাইরের কাজে যাওয়া বন্ধ করেছিলেন। আমাদের ততদিনে একটি পাকা বাড়ি হয়েছে। তিন পিসির ভালো ঘরে বিয়ে হয়েছে। তাদের সন্তানাদি হয়েছে। বাবা ঠাকুরমাকে বিশ্রামের কথা বললেও তিনি শুনতেন না। একাহাতে রান্নাঘর সামলে নিতেন। আমার মাকে মেয়ের মতো দেখতেন। আমার মায়ের অনেক ছোটবেলায় মা মারা যান। আমার মা বিয়ের পর এই বাড়িতে এসে একজন মা পেয়েছিলেন। সেই জন্য মায়ের বাপের বাড়ি থেকে পণ বা আসবাবপত্র কিছুই নেওয়া হয়নি। আসবাবপত্র নেওয়ার মধ্যে যে গোপন একটা পণ নেওয়ার মানসিকতা থাকে সেটি বাবাও বুঝেছিলেন নিজের মায়ের আদর্শ থেকে। এত কাজের পরেও কিন্তু দেবতার সেবাতে তাঁর কোনোদিনও ত্রুটি ছিল না। দ্বারে ভিখারী এলে অনেক যত্ন করে তিনি ভিক্ষা দিতেন। কাঠের বারকোশে ভরে উঁচু করে চাল, আনাজ, সঙ্গে টাকাও থাকতো। সেই দৃশ্য আমিও ছেলেবেলায় দেখেছি। পরবর্তী সময়ে এই মহিয়সী বৃদ্ধার সাহায্যের জন্যই আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন কালীদিদি। 

বাবার মতো আমারও কোনো দেশের বাড়ি ছিল না। যেমন দেশের বাড়ি ঠাকুরমা ছিল, পিসিদের ছিল, কালীদিদির ছিল। মায়ের বাপেরবাড়িকেই মায়ের দেশের বাড়ি ভাবতাম। শুধু বাবা ও আমার যেন কোনো দেশের বাড়ি ছিল না। এ যেন এক ভয়ানক অবিচার। একটু বড় হতেই ভূগোল পড়তে শিখে বুঝেছিলাম দেশ আমাদের একটাই। ভারত। বাংলাদেশ যে একদা আমাদের ভারতের অংশ ছিল, তাও ঠিকভাবে জানতাম না। এক থাকলে আলাদা করে দেওয়া যায়, এটিও তো বুঝতাম না। দেশের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল অনেক দেশের বাড়ি। সেটি খুঁজে পাওয়া একটি হীরেমানিক পাওয়ার মতো ব্যাপার। মানে অ্যাডভেঞ্চার। আমি ছেলেবেলায় একটি সত্যি দেশের বাড়ি খুঁজতাম। প্রাইমারি স্কুলে আমার খুব কাছের বন্ধু ছিল আকাশ ও অরিজিৎ। ওরা দুজনে পিসতুতো মামাতো ভাই। ওরা পুজোর সময় ওদের দেশের বাড়ি যেত। সেখানে নাকি অনেক বড় মাঠ, অনেক বড় বড় গাছ, পুকুরে বড় বড় মাছ, জলের উপর হাঁস। সেখানে নাকি মাঠে অনেক অনেক গরু ঘুরে বেড়ায়। সবাই মিলে খেলে, গাছে ওঠে, ফল নিজে হাতে পেরে খায়! আমি অবাক হয়ে শুনতাম, এসে ঠাকুরমার কাছে সেই সব গল্প বলতাম। তাঁর চশমা পরা চোখেও ঐ সব কথায় নাকি অদৃশ্য ময়লা এসে পড়তো। অস্বস্তিকর জল কাপড়ের পাড় দিয়ে মুছে নিলেই তাঁর চোখ আবার ঠিক হয়ে যেত কোনো এক অজানা উপায়ে। এখন বুঝি কোন স্মৃতির ক্ষত রয়েছিল তাঁর বুকের ভেতর। বড় হয়ে বুঝতে পেরেছি দেশ আর রাষ্ট্রের মধ্যেকার তফাতটা। আমরা তো সবাই মিলে আগে এক দেশে ছিলাম, মাঝখানে কোথা থেকে কি রাষ্ট্র ভাগাভাগি হয়ে গেল! দেশটা যেন রাজনৈতিক নেতাদের বাপের সম্পত্তি! যেমন খুশি ভাগ করা যায়! আমাদের দেশের ওপর আমাদের যেন কোনো দাবিই নেই! ইচ্ছে অনিচ্ছে নেই! অরিজিৎ আর আকাশদের কাছে দেশের বাড়ির কথা শুনে শুনে আমার একটা দেশের বাড়ির শখ হয়েছিল। প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পার হওয়ার পর আমিও একটি দেশের বাড়ি পেয়েছিলাম। একটি বিপর্যয়ের পর আমাদের পারিবারিক অর্থনৈতিক অবস্থা খুব ভালো না হওয়ায় জন্য আমি পারি দিয়েছিলাম সরিষা রামকৃষ্ণ মিশনে। ২০০২-০৩ সালে সেখানের মাসিক খরচ ছিল মাত্র ৭০০-৮০০ টাকা। বাবা চেয়েছিলেন আমার ওপর পরিবারের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের প্রকোপ যেন না পড়ে। বুকে পাথর চেপে তিনি ও মা আমাকে হোস্টেলে পাঠিয়েছিলেন। ঠাকুরমারও খুব একটা মত ছিল না। কিন্তু জীবনের অভিঘাতে পোড় খাওয়া এই মানুষটি ব্যক্তিগত আবেগের চেয়ে বাস্তবকে মেনে নিতে চেয়েছিলেন। বাধ্য হয়ে আমার মতামতের বাইরে গিয়ে আমি আবাসিক আশ্রমিক জীবন শুরু করি। সরিষা রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমে থাকাকালে যাদবপুরই হয়ে উঠেছিল আমার নতুন দেশের বাড়ি। সবার দেশের বাড়ি ছিল গ্রামে, আমার দেশের বাড়ি তৈরি হলো কলকাতা শহরে! তাও নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো। কালীদিদির মতো বছরে কয়েকবার মাত্র আমিও দেশের বাড়ি ফেরার মজা পেতাম। প্রথম প্রথম মিশনে থাকাকালে বাড়ি আসার খুব তাগিদ ছিল। সবাইকে ছেড়ে থাকতে কষ্ট হতো। অতিরিক্ত ছুটি নেওয়াতেও ছিল অসুবিধা। ধীরে ধীরে সরিষা রামকৃষ্ণ মিশন হয়ে উঠেছিল আমার বাড়ি। সবাই মিলে মা সারদার এক বড় পরিবার! কোনোক্রমে একটি বছর কাটানোর পর আমি আশ্রমিক জীবনের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করতে পেরেছিলাম। বুঝতে শিখেছিলাম এখানে জীবন গড়তে আসা, এটি কোনো অজানা দোষের শাস্তি না। রামকৃষ্ণ মিশন অনেক বড় একটি ধারণা। শ্রীরামকৃষ্ণ ও শ্রীমা সারদার পবিত্র স্রোত বয়ে চলেছে এখানে। স্কুলের জামায় যখন রামকৃষ্ণ মিশনের ব্যাচটি লাগিয়ে নিতে শিখেছি, তখনও কি জানতাম এর ভার আমাদের জীবনে সারাজীবন বহমান থাকবে? এখানের ভাবধারা অনেক উঁচু। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তা বোঝা যায়। তখন তো নিয়মগুলি কষ্টকর মনে হতো। তাই যাদবপুর ফিরতে পারলে পেতাম একটু আরাম। আরামগুলো খুব বাজে এখন বুঝি। নিয়মে বাঁধা জীবন এখনও কাঙ্ক্ষিত রয়ে গেছে। সরিষায় আমাদের খুব নিয়মমাফিক জীবন ছিল। ভোরে সূর্যোদয়ের একটু আগে ঘণ্টা বেজে উঠলে ঘুম থেকে উঠে আমরা ফ্রেশ হয়ে মন্দিরে গিয়ে বেদ ও উপনিষদের মন্ত্র পাঠ করতাম। বড় মন্দিরে শ্রীরামকৃষ্ণের সামনে বসে গান গাইতাম। প্রার্থনা শেষে ঘরে ফিরেই যেতে হতো মাঠে। খেলতে হতো, পি. টি. করতে হতো। কেউ কেউ পালা করে মন্দিরের দায়িত্ব পেতো। আমিও পেয়েছি দীর্ঘ আট বছর। ঠাকুরের কিছু কিছু দায়িত্ব নিতে ভালো লাগতো। তারপর সকালের টিফিন সেরে আমরা নিজেদের ঘরদোর সাফ করে সাতটার আগেই পড়তে চলে যেতাম। নটার দিকে ছুটি হলে ঘরে ফিরে স্নানাদি সেরে স্কুলের জন্য তৈরি হয়ে খেতে যেতাম। খাওয়ার পর সোজা স্কুল। বিকেলে ফিরে এসেই টিফিন আর তারপর খেলা। খেলাশেষে আবার সন্ধ্যারতির সময় প্রার্থনা হতো। খণ্ডন-ভব-বন্ধন। তারপর আবার সন্ধ্যাবেলা পড়তে যেতে হতো। পড়াশেষে রাতের খাবার খেয়ে আমরা চ্যান্টিং-এ যেতাম। সেখানে জীবন গঠনের নানা বই পাঠ হতো, ব্যাখ্যা করা হতো। আমাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা মহারাজ শুনতেন। উপদেশ দিতেন, সমস্যার সমাধান করে দিতেন। 

এরপর আমরা একটু হৈচৈ করে অবশেষে ঘুমিয়ে পড়তাম। রবিবার দুপুরে বাড়ি থেকে কেউ না কেউ দেখা করতে আসতো। ঠাকুরমাও যেতেন মাঝে মাঝে। এই তো মোটা দাগের রুটিন। কোথায় নড়চড় হওয়ার একটুও উপায় ছিল না। এসব কথা আগে কিছু কিছু বিস্তারিত লিখেছি। কেউ কেউ তা পড়েছেন। আমরা বুঝেছিলাম সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনের জন্য নিয়মিত রুটিন মাফিক চলাটা একটি ভালো অভ্যাস। একটি ভালো অভ্যাস তৈরি করতে সময় লাগে বড় জোর এক সপ্তাহ, আর সেই অভ্যাস ভাঙতে সময় লাগে এক মিনিট! আর এই দুই দিকের পছন্দ পুরোপুরি নিজের। অনেক অভ্যাসের পর একটা বছর কেটে গেল। বড় হলাম। ক্লাস সিক্সে পড়ি। একটু সিনিয়র দাদা হলাম। মিশনকে ও মিশনের জীবনকে ধীরে ধীরে ভালোবেসে ফেললাম। কিছু কাল পরে আমার ঠাকুরমাও মারা যান। বাড়িতে ঐ মানুষটির কাছেই আমার বাল্যকাল মজুত ছিল। সেই পুঁজি হারিয়ে যাওয়ার পর বাড়ির প্রতি হঠাৎ মোহ কমে গিয়েছিল। বাড়িময় তাঁর স্মৃতি। অনেক কষ্ট হতো। পালিয়ে বাঁচতে চাইতাম সেই স্মৃতি থেকে। মিশনে মন্দিরে কাজের সূত্রে আমার সবটুকু দিয়ে সেই বছর শ্রীরামকৃষ্ণ ও শ্রীমাকে ভালোবেসেছিলাম। একটি অজানা অকৃত্রিম মানসিক আশ্রয় পেয়েছিলাম সেই নির্ভরতার মধ্যে। সেই অনুভূতি আর দুটি অলৌকিক ঘটনা আমি চিরকাল গোপন রেখে দেবো। এই নির্ভরতা নিজে হাতে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিলেন বেলুড় মঠের তৎকালীন সহ-সঙ্ঘাধ্যক্ষ স্বামী আত্মস্থানন্দজি। আমার গুরুদেব। আমি আবার একটি বড় আশ্রয় পেয়েছিলাম। কেমন করে যেন সরিষা রামকৃষ্ণ মিশনই ধীরে ধীরে আমার দেশের বাড়ি হয়ে উঠতে শুরু করেছিল। আমি ওর সত্তায় মিশে যেতে শুরু করেছিলাম। আমার নিজের বাড়িতে যাতায়াত ছিল, কিন্তু কোথায় যেন মিশনে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি ছিল মনে মনে। অনেকগুলি বছর কেটে যখন ওখানে থেকে মাধ্যমিক দিলাম তারপর তখন মিশন ছেড়ে আসাটা আমার কাছে যেন বাধ্যতামূলক হয়ে গেল! আমার মনে হয়েছিল আমাকে যেন সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করে ছিন্নমূল করে দিতে চাইছে। আমি মিশনের আবহে থাকতে চাই আর আমার পরিবারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চাই একইসঙ্গে। মাধ্যমিকের পর মিশনে থাকার কোনো নিয়ম নেই। আমি তবু একদিন বেশি ছিলাম। উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তির খুব ইচ্ছে ছিল কিন্তু বাড়ি থেকে এবার আর মিশনে রাখতে নারাজ। অনেক কিছুর পরও বাড়ি থেকে একা পালিয়ে একা মিশনে গিয়ে পৌঁছেছিলাম। তখন নিমাই মহারাজ (স্বামী শক্তিপ্রদানন্দ) আমাদের স্কুলের হেড মাস্টার। তাঁর সহায়তায় স্কুলেই উচ্চ মাধ্যমিকের ফর্ম পূরণ করি বাড়িতে ফিরে আসি। মহারাজ দায়িত্ব নিয়েছেন দেখে বাড়ির লোকেরাও বিশেষ অমত করেননি। তাঁদের চিন্তা ছিল উচ্চ মাধ্যমিকের জন্য আবাসিক হোস্টেল নেই, বাইরে ঐ বয়সে মেসে থাকতে পারবো কি না। আমি নিজেও জানতাম এই সমস্যার কথা। কিন্তু তখন আমার সরিষা রামকৃষ্ণ মিশনে যুক্ত থাকার ইচ্ছের কাছে বাকি সব বাদ দেওয়ার মতো ক্ষমতা তৈরি করা হয়েছিল! এবং একা হাতেই! অবশেষে মেসে থাকার ব্যবস্থা হয়ে গেল। নিমাই মহারাজ ও সুভাষ মহারাজ (স্বামী সুজ্ঞানানন্দ) নিয়মিত খোঁজ নিতেন। তাঁদের দুজনের হাতে আমার দায়িত্ব তুলে দিয়ে বাড়ির লোকজন বেশ নিশ্চিন্ত হলো। আমার দেশের বাড়ি হয়ে উঠলো সরিষা। আমি প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিতে পেরেছিলাম। তারপর ছুটিতে মাঝে মাঝে কলকাতা এলেও আপার মাত্রাটা ক্রমশ কমেছিল। কত দ্রুত সেই দুটি বছর কেটে গেল! আমার উচ্চ মাধ্যমিক দেওয়া হয়ে গেল। আবার চলে এলাম সরিষা ছেড়ে যাদবপুরের মাটিতে। আমার পরিণত দেশের বাড়িটা দেশের বাড়িই রয়ে গেল। সরিষা আশ্রমই সেই দেশের বাড়ি। কলকাতার একটি নামি কলেজে ভর্তি হওয়ার পরও মাসান্তে নিয়মিত একদিন সরিষা আশ্রমে যাতায়াত বজায় ছিল। কোনো মাসেই বাদ যেত না। এক সময় সুভাষ মহারাজের বদলি হয়ে গেল আঁটপুর আশ্রমে আর নিমাই মহারাজের বদলি হলো চেন্নাই মঠে। আমার দুজন আপনার জন যেন সরিষা ছেড়ে গেলেন। ততদিনে স্বামী রাজীবানন্দ, স্বামী তত্ত্বসারানন্দ, স্বামী ভক্তিব্রতানন্দ, স্বামী অনুকম্পানন্দও ধীরে ধীরে একেক জায়গায় বদলি হয়ে গেছেন। 

এমন অনেক মহারাজ ছিলেন যাদের সন্ন্যাসী-ব্রহ্মচারী নামটুকু আমাদের অজ্ঞাত ছিল। আমরা তাঁদের শুধুমাত্র নির্মাল্য মহারাজ, সৌরভ মহারাজ, মোহন মহারাজ (একই নামের ২জন ছিলেন), দেবাশিস মহারাজ, কমল মহারাজ বলে চিনতাম। এখন শুধু কমল মহারাজ ও অপূর্ব মহারাজ (স্বামী দিব্যস্বরূপানন্দ) আছেন। আমাদের সোনার স্মৃতির বাড়িগুলো রয়েছে, সেই শ্রীরামকৃষ্ণের মন্দিরও রয়েছে, শুধু সন্ন্যাসী-ব্রহ্মচারীরা বদলি হয়ে গেছেন। এঁদের ঘিরেই তো আমাদের যাবতীয় স্মৃতি। এঁদের ঘিরেই তো আমাদের দেশের বাড়ি সরিষা আশ্রম। পুরোনো দিনের মাস্টার মশাইদের অনেকেই অবসর নিয়েছেন, কারো কারো সঙ্গে ফেসবুক যোগাযোগ হয় অবশ্য। ফোনেও কথা হয়। আশ্রমিক পুরোনো কর্মীদের সঙ্গে গেলে দেখা হয়। তাঁরা চিনতে পারেন। অনেক গল্প করেন আগেকার দিনের। হয়তো সরিষা সেই একই রয়ে গেছে আমরাই বদলে গিয়েছি। আমারও এই দেশের বাড়িটা ধীরে ধীরে স্মৃতিময় কল্পলোক হয়ে যাবে। খুব ইচ্ছে করে সরিষার মাটি একটি কৌটায় করে ঘরে যত্নে তুলে রাখার। আমার দেশের বাড়ির মাটি মাথায় ঠেকাতে খুব ইচ্ছে করলে একবার স্পর্শ করে নেওয়া যাবে। আগামীবার সরিষা গিয়ে একটু মাটি নিয়ে আসবো। ঐ মাটিতে আমার বাল্য ও কৈশোরে স্বাদ মিশে আছে। ওটি আর হারাতে চাই না এই জীবনে। স্মৃতিভূমি থেকে সামান্য একটু মাটি নিলে কেউ হয়তো বকবে না। সাগরের থেকে একবিন্দু জল নিলে কার ক্ষতি হবে! যদি শেষ বয়সে ঠাকুরমার মতো সশরীরে উপস্থিত হয়ে দেশের বাড়ির মাটি মাথায় ঠেকাতে না পারি তবে অন্তত কৌটায় রাখা মাটি স্পর্শ করে সেই সাধ মিটিয়ে নেওয়া যাবে। কোনো রকমের খেদ থাকবে না বৃদ্ধ বুকের ভেতর। 




Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.