x

আসন্ন সঙ্কলন

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

বুধবার, জানুয়ারী ৩১, ২০১৮

ঝর্ণা চ্যাটার্জী

sobdermichil | জানুয়ারী ৩১, ২০১৮ |
চেনা পথ---অচেনা মানুষ
পায়ে পায়ে পথ চলার অভ্যাস যাদের আছে, হঠাৎ করে বাইরের টানে একছুটে বাইরে বেড়িয়ে পড়তে পারেন যাঁরা তাঁদের কাছে তো বটেই, আমরা যারা সৌখিন ভ্রমণকারীর দল ( কখনও কেমনও সবদিক সামলে বাইরে বেরোই), কখনও কখনও তাদের ভাগ্যেও জুটে যায় আশ্চর্য ব্যতিক্রমী দু একটী মানুষ যাদের না দেখলে, না চিনলে মনে হয় কতকিছুই অজানা রয়ে গেল। তাদের আন্তরিকতা, উষ্ণ ভালবাসায় দ্রব হয় মন। আমার দেখা তেমনি একজন সিকিমের ‘পারখা’ গ্রামের মেয়ে গাকী।

কিছুদিন আগেই ঘুরে এসেছি সিকিম থেকে। আমার সঙ্গ নেওয়া নেহাতই বেড়ানোর তাগিদে। ছোট্ট তিন/চার জনের একটি দল। আমার সঙ্গীদের কাজের প্রয়োজনে যেতে হয়েছিল সিকিমের প্রত্যন্ত এক গ্রামে। হোটেল কর্তৃপক্ষ গাড়ি ইত্যাদির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। আমাদের তিনজনের দলটি ছাড়া সেদিন সঙ্গে ছিলেন আরো দুজন—একজন ড্রাইভার সঞ্জয় এবং আর একটি হাসিখুশি অল্পবয়সী লেপচা ছেলে, তাশি। কিন্তু তাশির কথা পরে একদিন বলা যাবে, আজ নয়। আজ পারখা গ্রামের সেই মেয়েটির কথা হোক!

গ্রামের নাম পারখা। নিকটবর্তী শহর অথবা গঞ্জ যাই বলি না কেন, তার নাম প্যাকিয়ং। নেহাত ফ্যালনা শহর নয়। ১৯৯৬ সালে এখানে ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর অর্কিড’ গড়ে তোলা হয়েছে। গ্যাংটক থেকে পারখার দুরত্ব ৩০ কিলোমিটার মত, যেতে সময় লেগেছিল প্রায় সাড়ে তিনঘন্টা। পারখা গ্রামে আমায় নামিয়ে দিয়ে আমার সঙ্গী দুজন চলে গেলেন নিজেদের কাজে। আমি গ্রাম দেখব, গ্রামের মেয়েদের সঙ্গে কথা বলব, ঘুরব...সময় কাটানো হবে, জানাও হবে কিছু। সঙ্গীরাও নিজের কাজ সেরে আবার আমায় ফেরার পথে তুলে নেবেন। আমার যাবার উদ্দেশ্য গ্রামের জীবনযাত্রার কিছুটা আভাস পাওয়া, গ্রামের মেয়েদের জীবন সম্বন্ধে একটা ধারণা করা। সঞ্জয় আমার সঙ্গীদের নিয়ে চলে গেলেন। তাশি নামের সেই লেপচা ছেলেটি আমায় সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন যাঁর কাছে, সেই মহিলার নামই গাকী।

গাকী একটি অল্পবয়সী বৌ। আমার ধারণা হয়েছিল মেয়েটি লেপচা। আমার মত অল্পদিনের পাহাড়ে বেড়াতে আসা ভ্রমণকারীর কাছে লেপচা, ভুটিয়া, নেপালী সব এক মনে হয়। পরে জানলাম মেয়েটি ভুটিয়া। ফর্সা ধবধবে গায়ের রং। কালো লম্বা স্কার্ট ও কালো টপ পরনে। খুব সাধারণ পোশাক কিন্তু ফর্সা গায়ের রঙে মানিয়েছে ভালো। মাথার চুল টানটান করে পিছনে ক্লিপ দিয়ে আঁটা। সিকিমে পাহাড়ি মেয়েদের সাজপোশাক দেখে কেমন যেন বিদেশিনী মনে হয়। যে মেয়েটি আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল, ভারি হাসিখুশি মেয়ে। আগেই দোতলা থেকে ঝুঁকে আমাদের অভিবাদন জানিয়েছিল, এবার হাত ধরে ঘরে নিয়ে এসে বসাল। বল---একটু বসো, আগে চা নিয়ে আসি...তারপর কথা।‘

আমরা সোফায় বসলাম। ঘরখানা ভারি সুন্দর করে সাজানো। সত্যি কথা বলতে কি,বাইরে থেকে বাড়িটার সম্বন্ধে যেমন ধারণা হয়েছিল, ভিতরে এসে সেই ধারণা বদলে গেল। বাইরেটা একেবারেই অন্যরকম, প্রায় ভাঙ্গাচোরা, রং নেই, এমন কি দেয়ালের কাঠের রঙ্গও প্রায় উঠে এসেছে। ভিতরটি খুব সুন্দর। গাকী চা নিয়ে এসে আমার সঙ্গে সোফায় বসল। তাশি তার চা নিয়ে বাইরে গেল। আমরা আলাপ শুরু করলাম।

জানলাম, সে দক্ষিণ সিকিমের মেয়ে। ওখানকার ইংরাজি স্কুলে বারো ক্লাস পর্যন্ত পড়েছে। তাই কি তাকে এত বেশি ঝকঝকে,স্মার্ট লাগছিল! হতে পারে। তার স্বামী এখানকার পঞ্চায়েত প্রধান, সারা গ্রামের লোক তাকে ভোট দিয়ে নির্বাচন করেছে, কি গর্ব তার! হবে নাই বা কেন? গ্রামের লোক তাকে ভালো মনে করেছে বলেই না নির্বাচন করেছে, গর্ব হবারই তো কথা। সারাদিন বাড়ির সব কাজ সে নিজেই করে, কাজের লোক তার নেই। কাজের লোক আবার কি? এখানে কারো কাজের লোক নেই, সে কাজের লোক জানে না। বছর পাঁচেক হল তার বিয়ে হয়েছে। না বিয়ে তাদের কেউ দেয়নি, নিজেরাই করেছে। বিয়ে আবার দেবে কি, বিয়ে তো সে নিজেই করেছে। হ্যাঁ, স্বামীও সে নিজেই নির্বাচন করেছে। তাছাড়া এখন তো এটাই চলছে। 

--চলছে মানে? 

মানে, এখানে তো এটাই রীতি, সকলেই নিজের স্বামী কিংবা স্ত্রীকে বেছে নেয়, নিজেরাই পছন্দ করে বিয়ে করে। 

তার মানে এখানে বাবা-মা আপত্তি করেন না, তাই তো?

--কেন করবেন? বাবা-মা তো আর বিয়ে করছেন না।‘ বলেই মুখ টিপে হাসি...করলেই শুনছে কে? বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবে, বিয়ে করবে। শেষে বাবা-মাকেই তো খুঁজে এনে বিয়ে দিতে হবে। তাই আপত্তি করে না কেউ। বাবা, কত ঝামেলা!’ 

অবাক হই। বাবা-মাকে খুঁজে আনতে হবে কেন? মুখের দিকে তাকাই। 

--আনতে হবে না? দিদি যেন কি! ‘গ্রামের লোকে বলবে না, ছেলে মেয়ে বিয়ে করতে চাইছে, ভালবাসা হল ওদের আর এমন মা-বাবা, বিয়ে না দিয়ে ছেলে-মেয়েকে ঘর থেকে বার হয়ে যেতে হল, ছিঃ। কি নিন্দের কথা, নয়?’ বলেই আমার মুখের দিকে তাকায়। বুঝলাম, আমাদের এখানে বাবা-মায়েদের এখনও কিছুদিন লাগবে এই ধারণায় পৌঁছতে। বললাম, তাহলে তোমাদের এখানে সব এইভাবেই বিয়ে হয়।



--না, আরো একরকমের বিয়ে আছে, তাকে বলে ’মাঙনি’। সেখানে মেয়ের বাড়ি থেকে টাকা- পয়সা, জিনিসপত্র সব চাওয়া হয়, ছেলের বাড়ি দিতে পারলে বিয়ে হয়, নইলে আবার অন্য মেয়ে দেখতে হয়।‘

আমাদের এখানে অন্য রকম নিয়ম শুনে সেকি হাসি তার! সে কি, মেয়ে সংসারে এসে খাটবে, সংসারের সব করবে, আর টাকা দেবে তারাই? একি উলটো নিয়ম তোমাদের! অমন শ্বশুরবাড়ি না যাওয়াই ভাল। হেসেই অস্থির গাকী। 

--আমাদের ওখানে এতদিন তো সেই নিয়মই ছিল, এখন পাল্টাচ্ছে। মানে, তোমাদের মত হচ্ছে’ বলে ওর দিকে তাকিয়ে আমি হাসি।

--পুজো কর নাকি, গাকী?’ আমি প্রশ্ন করি। ঘরের এক কোনে বুদ্ধ আর দলাই লামার ছবি। ধূপ জ্বলছে, মোমবাতি জ্বলছে। সেদিকে তাকিয়ে গাকী উত্তর দিল---আমি তো মন্ত্র জানি না। রোজ সকালে বুদ্ধের সামনে রাখা বাটিতে জল পাল্টাই আর ধূপ জ্বালি, মোমবাতি জ্বালি।‘ বুদ্ধের সামনে রাখা সাতটি বাটির কথা আমার জানা ছিল। ওগুলি বুদ্ধের চরণ কমল হিসেবে পুজিত হয়। সর্বত্রই দেখেছি বুদ্ধের সামনে রাখা থাকে এই বাটি। 

আমি জিজ্ঞেস করি গাকীকে তার ঘর সংসারের কথা, ছেলেমেয়ের কথা, স্বামীর কথা সে নিজেই বলেছে। ছেলেমেয়ের কথা উঠতেই সে চঞ্চল হয়ে উঠল। জানালার পর্দা সরিয়ে হাত দিয়ে একটি বাড়ি দেখাল, সেটি তার চার বছরের ছেলের স্কুল। খুব দুষ্টু সে, খুব চঞ্চল। হাসিতে মায়ের স্নেহ ঝরে পড়ল। ছুটে গিয়ে ঘরের একপাশে রাখা একটি কাঁচের আলমারির মাথায় রাখা কয়েকটি বই এনে দেখাল। তার ছেলের বই। একটি ছোট্ট শিশুর ছবিও এনে দেখাল। পাহড়ী বাচ্চাদের ছবি যেমন হয়। ফটোটি বুকের কাছে চেপে ধরে আদর জানাল। কোন লজ্জ্বা তার নেই। ছেলেকে সে খুব ভালবাসে যে! বললে—একটু একটূ ইংরেজি বলছে, জানো?’

বললাম-- কে পড়ায় তাকে, তুমি নাকি তোমার স্বামী? 

--না না, আমি পড়াই। স্বামীর কত কাজ, কত জায়গায় যেতে হয় গ্রামের জন্য। কাজ না করলে গ্রামের লোকেরা ভালবাসবে কেন? তারা কাজের জন্যই তো তাকে নির্বাচন করেছে, এখন যদি সে কাজ না করে, ওদের বিশ্বাস ভেঙ্গে যাবে না? আমি নিজেই পড়াই, আমার তো অনেক সময়...বলেই হেসে বললে—আসলে আমি ওকে একটুও ছেড়ে থাকতে পারি না’। হা হা করে হেসে উঠলাম। মেয়েটির সপ্রতিভতা আমার ভাল লাগছিল। এই সময় তাশি ঘরের ভিতর এল। আমাদের মধ্যে বাচ্চাটিকে নিয়ে কথা হচ্ছিল শুনে জানাল, ঐ বাচ্চাটি গাকীর নিজের বাচ্চা নয়, তাকে সে দত্তক নিয়েছে। আমি অবাক হলাম। মাত্র ক’বছর তো বিয়ে হয়েছে, দেখে তো অল্পবয়সী বলেই মনে হয়েছে। তাহলে...? 

এবার সে নিজেই জানাল। হ্যাঁ, তাশি যা বলছে, সত্যি। তারা বাচ্চাটিকে দত্তকই নিয়েছে বিয়ের দুবছর পরেই, সামনের ভুটিয়া বস্তি থেকে। আসলে বাচ্চাটির বাবা-মা খুব গরীব। বাচ্চাটি খেতে পেত না। তাই ওরা ওকে নিয়ে এসেছে। এখানে থেকে যদি মানুষ হয়, হোক না! ভগবান বুদ্ধ তো সব দেখেন, একটা ভাল কাজ করলে তিনি কি খুশী হবেন না? তাছাড়া, তার স্বামী একজন গ্রামের প্রধান, সে সকলকে বলে অনাথকে দেখো, তাদের কথা চিন্তা করো...তারও কি উচিৎ নয়, ভাল কাজ করা? লোকে তবে তো তাকে দেখে আরো গরীব বাচ্চাদের নিজের বাড়ি নিয়ে আসব, তাই না?’ বলে আমার মুখের দিকে সরল বিশ্বাসে তাকিয়ে রইল। আমার এত ভাল লাগছিল ওর কথা শুনতে, আমি অভিভূতের মত তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। আরো নানান কথা হল। তারা জামাকাপড় কোথায় কেনে, গ্রামের দোকানে নাকি শহরে যায়? যা ভাবছিলাম তাই। গ্রামে একটি দোকান আছে, যাআসে তাই কেনে। তবে ওর তো বাবার বাড়ি দূরে যেতে হয়, তখন সেখান থেকে কিনে নিয়ে আসে। এখানে গরীব লোকের খুব কষ্ট—সারা বছর ভাল করে খেতেও পায় না। তার স্বামী যে এই নিয়ে সরকারের কাছে খুব দৌড়াদৈড়ি করছে তাও জানাল। 

সময় হয়ে আসছিল। আমার সঙ্গীরা এবার এসে পড়বেন। আমি গাকীকে ধন্যবাদ আর ওর ছেলেকে ভালবাসা জানিয়ে তাশির সঙ্গে নিচে নেমে এলাম। ওখানে আমার সঙ্গীরা অপেক্ষা করবেন। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় গাকীকে জিজ্ঞেস করলাম—গাকী, তোমাদের ভাষায় তুমি তোমার নামের মানে জানো, কি মানে তোমার নামের?’

লজ্জ্বা আর হাসিতে মেশা মুখে সে উত্তর দিল—‘অলওয়েজ হ্যাপী’

আমি অবাক হয়ে গাকীর দিকে চাইলাম। হাসিখুশি মেয়েটির এর চেয়ে ভাল আর কি নাম হতে পারে! সারাটা পথ ফিরলাম গাকীর চিন্তা নিয়ে। 

সিকিমের প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়ে গাকীরা যা পারে, আমরা পারি না কেন?




Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.