x

আসন্ন সঙ্কলন

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ২৮, ২০১৭

রুমকি রায় দত্ত

sobdermichil | ডিসেম্বর ২৮, ২০১৭ |
রুমকি রায় দত্ত
চৌকরিঃ

গাড়ি ছুটে চলেছে চৌকরির পথে। উত্তরাখন্ডের পিথোরাগড় জেলায় অবস্থিত চৌকরি, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এক টুকরো স্বর্গ বলেই শুনেছি। আমরা যে পথে এসেছিলাম ফিরছি ঠিক সেই পথেই। প্রায় দুপুর বারোটা নাগাদ আমাদের গাড়ি এসে পৌঁছালো থলে, একটা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম। বড় হোটেল বা রেস্টুরেন্ট বলতে তেমন কিছু চোখে পড়লো না। একটা ধাবার সামনে দাঁড়ালো আমাদের গাড়ি। পাহাড়ে ঘোরার অভিজ্ঞতা এর আগেও বেশ অনেকবার হয়েছে। দুটো জিনিস খুব মাথায় নিয়ে চলতে হয়, জল আর চাল। শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য প্রচুর পরিমানে জল খেতে হয়, অবশ্যই বিশুদ্ধ বোতল জল, অথবা জীবাণু মুক্ত করার ওষুধ মেশানো জল। পাহাড়ে বাসমতী চালের যে ভাত পাওয়া যায়,সেটাকে ঠিক ভাত বলা চলে কিনা জানিনা, হাফসিদ্ধ বলা যায়। দেখলাম ধাবায় গরম গরম হাত রুটি তৈরি হচ্ছে। দুপুরের খাবারটা রুটি দিয়ে সেরে বাইরে এসে দাঁড়িয়ে আছি, দেখলাম দলবেঁধে পাহাড়ি মেয়ের সারি মাথায় কাঁচা তেজপাতার বোঝা নিয়ে হেঁটে আসছে। এই অঞ্চলের আর্থসামাজিক কাঠামো কিছুটা তেজপাতা চাষের উপর নির্ভরশীল, আর এই কাজে মহিলারা বিশেষ ভাবে যুক্ত। পাহাড়ি মহিলারা সংসারের সাথে বাইরের কাজেও বেশ পারদর্শী। পাহাড়ি মানুষের সংগ্রামী জীবন, টুকরো ছবি দেখে বা ক্ষণিকের অতিথি হয়ে বোঝা সম্ভব নয়, শুধু অনুমান করা সম্ভব মাত্র। আর অতিথি কবেই বা ঘরের মানুষ হতে পেরেছে? তবু মনে হলো ক’টাদিন যদি এদের সাথে এদের ঘরের লোক হয়ে থাকতে পারতাম! না, সেদিন ক্ষণিকের জন্য আর উঁকি দিইনি ওদের ফুটো চালের সংসারে, তেজপাতার বোঝা মাথায় নিয়ে হেঁটে আসা মেয়েদের কালো পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার চিত্রটুকু শুধু স্মৃতির খাতায় তুলে রাখলাম। 

আবার ছুটে চলা সামনের পথে। পাশে পাশে ছুটে চলেছে সেই রামগঙ্গা নদী। রামগঙ্গা নদীর উপর গড়ে ওঠা সেতু পেরিয়ে প্রায় হাফ্‌ মাইল চলার পর থেমে গেল আমাদের গাড়ি রাস্তার ধারে। খুব কাছেই বয়ে চলেছে নদীটি। রাস্তা থেকে বেশ একটু ঢালু মাটি তারপর বিস্তীর্ণ নুড়ি ভরা নদীতট। বাহারি রঙের নুড়ি-পাথর চারিদিকে ছড়িয়ে আছে। সব পাথরই যেন কিছু বলতে চায় তাদের রূপ আকৃতি কারুকার্য দেখিয়ে। বলতে চায় নদীর সাথে তাদের ভালোবাসার গল্প, বলতে চায় তাদের সৃষ্টির গল্প। এমন বিচিত্র পাথর কুড়িয়ে না আনলে স্মৃতিপটে আঁকা ছবিগুলো সম্পূর্ণতা পাবে না। তট ছেড়ে তাকালাম নদীর দিকে। চকচকে স্বচ্ছ জলের তল দেখা যাচ্ছে। পাথরের গায়ে বাঁধা পেয়ে এঁকে বেঁকে চলা নদীর সোহাগী কুলুকুলু শব্দ যেন বলতে চায়ছে নদীর গল্প,হয়তো বলছেও কিন্তু সেই গল্প বুঝতে না পারা প্রমাণ করে, আমরা প্রকৃতির থেকে ক্রমশ কত দূরে চলে যাচ্ছি। নদীর গায়ে হাত ছোঁয়ালাম, কনকনে ঠান্ডা। ফেব্রুয়ারী মাসের ১৯ তারিখ কিন্তু বেশ গরম। দুপুরে গায়ে সোয়াটার রাখা যাচ্ছে না। জুতোর ভিতর মোজা পড়া পা বেশ গরম হয়ে উঠেছে। একটা বড় পাথরের উপর বসে জুতো খুলে ঠান্ডা জলে পা ডোবাতেই শরীর জুড়ে নেমে এলো শীতলতা। বসে বসে দেখতে লাগলাম, নদী তটের এক প্রান্তে আমরা ক্ষণিকের অতিথি, আরেক প্রান্তে নদীর কোল ঘেঁষে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়। স্বচ্ছ জলের তলায় দেখা যাচ্ছে ছোটো ছোটো নুড়ি-পাথরের চলন। জলের ধাক্কায় গড়িয়ে চলেছে নদীর প্রবাহ পথের দিকে।



আবার শুরু পথচলা। পথের বাঁকে গাছের ফাঁকে মাঝে মাঝে চোখে পড়ছে সাদা বরফ শৃঙ্গের অগ্রভাগের আবছা অবয়ব, ‘ পঞ্চচুল্লি’। দুপুর আর বিকেলের সন্ধিক্ষণ তখন, এসে পৌঁছালাম চৌকরি। কে.এম.ভি.এন এর হোটেলের ঠিক গায়ে লাগা একটি হোটেলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো। প্রকৃতির এমনই জাদু,দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসেও ক্লান্তি নেই কোনো। হোটেলের ঘরে ব্যাগপত্র রেখে বেরিয়ে পড়লাম হাঁটতে। চৌকরিতে ঘুরে দেখার বিশেষ কিছু নেই, তবে পড়ন্ত বিকালে এমন নির্জন পাহাড়ি পথে হাঁটতে এক অনন্য তৃপ্তি হয়। হোটেলের গেট ছাড়িয়ে ডানদিকে হাঁটতে শুরু করলাম। সরু রাস্তা এঁকে বেঁকে এগিয়ে গিয়েছে সামনে, পথের বামপাশে স্থানীয় মানুষের দু’একটা বাড়ি চোখে পড়লো। প্রতিটি বাড়ির ছাদ রাস্তার লেভেলে। অদ্ভুত লাগছে দেখতে। জলের ট্যাঙ্ককে রাস্তা থেকে যেন ছুঁয়ে ফেলা যাবে। হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে পড়লাম এমনই একটা বাড়িতে। পরিচয় হলো বাসিন্দাদের সাথে। সবাই ভাড়াটে। কেউ এসেছে ছেলের পড়াশোনার জন্য,কেউ বা চাকরির স্থল থেকে কাছে থাকবে বলে। আমি বললাম, ‘কত সুন্দর একটা জায়গায় আপনারা থাকেন!’ তাদের মধ্যে একজন হেসে বললো—

“ইয়ে জাগা আপকো আচ্ছা লাগা? হামে বিলকুল ভি পসন্দ নেহি। কিয়া হ্যায় ইস জাগাপে? কুছভি নেহি’।

আমি বললাম, ‘কি যে বলেন, এত সুন্দর প্রকৃতি, নির্জনতা, এসব দেখবো বলেই তো কত অর্থ ব্যয় করে আমরা এখানে এসেছি, আর আপনি বলছেন ভালো না!’ 

সে হাসলো। আমরা হোটেলের পথে ফিরতে লাগলাম। আমাদের হোটেলের ব্যালকনি থেকেই দেখা যাচ্ছে পঞ্চচুল্লি শৃঙ্গ। রাতে ঘড়িতে এ্যালার্ম দিয়ে শুলাম। ব্যালকনি থেকেই দেখা যাবে প্রভাতরবির প্রথম কিরণে কেমন স্নান করছে পঞ্চচুল্লি। সূর্যোদয়ের বেশ কিছু আগেই বেশ করে চাদর মুড়ি দিয়ে দাঁড়ালাম ব্যালকনিতে,এক তীব্র প্রতীক্ষা নিয়ে। ধীরে ধীরে পাঁপড়ির মতো খুলে যেতে লাগলো অন্ধকারের আস্তরণ। একটা নীল স্বপময় বর্ণ ছড়িয়ে পড়তে লাগলো আকাশের বুকে। ধীরে ধীরে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো পঞ্চচুল্লি চূড়া। সোনালী আলোক বন্যায় ভাসতে লাগলো পাঁচটি পাহাড় চূড়া। পৌরাণিক মতে এই পর্বতগোষ্ঠীর নাম হলো ‘পান্ডব’। কথিত আছে পান্ডবরা যখন স্বর্গের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে,তখন এখানেই শেষ বারের মত খাবার রান্না করে।

সূর্য যত প্রকাশিত হতে লাগলো পাহাড় চূড়াগুলো তত মিশে যেতে লাগলো মেঘের সাদা বর্ণের সাথে। আমরা প্রস্তুত হতে লাগলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্য কৌশানি যাওয়ার উদ্দেশ্যে। চৌকরি থেকে কৌশানির দূরত্ব প্রায় ৬০ কিমি। পাহাড়ে ৬০ কি.মি পথ মানেই প্রায় ঘন্টা পাঁচেকের রাস্তা। সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম আমরা। প্রায় আড়াই ঘন্টার রাস্তা পেরিয়ে এসে পৌঁছালাম বেরীনাগ বলে একটি ছোট্ট বাজারে। এই দীর্ঘ ভ্রমণে এই প্রথম একটা বাজার পেলাম,যেখান থেকে কিছু কেনাকাটা করা সম্ভব। বেরীনাগের বাজার ঘুরে কিছু জিনিস নিয়ে আবার চলা শুরু। প্রায় ১৫ কি.মি রাস্তা পেরিয়ে এসেছি। বুঝতে পারছি আমারা পাহাড় ছেড়ে বেশ খানিকটা সমতলের দিকেই এগিয়ে চলেছি। রাস্তার পাশে বিস্তীর্ণ সবুজ জমি। উপর থেকে দেখলে মনে হবে হলুদ আর সবুজ রঙে সাজানো মানচিত্র। গাড়ি এসে পৌঁছালো ‘বাগেশ্বর’। বেশ একটা ঘিঞ্জি ছোটো শহর। দেওয়ানজি একটা ফাঁকা জায়গা দেখে গাড়ি দাঁড় করিয়ে বললেন কিছুটা পায়ে হেঁটে এগিয়ে গেলেই পাবো ‘বাগনাথ’ মন্দির। আমরা কিছুটা এগোতেই খুঁজে পেলাম মন্দিরে যাওয়ার রাস্তাটা। বাগনাথ আসলে বাগেশ্বরে অবস্থিত একটি প্রসিদ্ধ শিবমন্দির। ১৪৫০ সালে কুমায়ুনের রাজা ‘ লক্ষ্মীচাঁদ’ সরযূ আর গোমতী নদীর মিলিত প্রবাহের সংযোগ স্থলে এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন।

দেখলাম মন্দিরের পাশদিয়ে বয়ে যাচ্ছে ক্ষীণকায়া গোমতী নদী, জল প্রায় নেই বললেই চলে। দেখলাম শুকনো চড়ায় একটা চিতার আগুন নিভে এসেছে প্রায়। এক সাধু বললেন, ‘শ্মশান হ্যায়’। ওনার কাছেই শুনলাম, শিবরাত্রির দিন পুরো মন্দির পর্যন্ত জল উঠে আসে। নিজেদের পায়ের দিকে তাকালাম, মানে আমার যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে তখন প্রায় হাঁটুর উপর পর্যন্ত জল থাকে। মন্দিরের সামনে চারিপাশে বাঁধা আছে ছোটো বড় অসংখ্য ঘন্টা।এখানে ঘন্টা বেঁধে মানত করা হয়। ভিতরে একটা বিশাল আকারের শিবলিঙ্গ, ঘরের ভিতরটা বেশ অন্ধকার। ভক্তদের জ্বালিয়ে যাওয়া কিছু মোমবাতি এদিক ওদিক ছড়িয়ে আছে।

আমরা কৌশানির প্রায় কাছাকাছিই আছি। ধীর পায়ে বেরিয়ে এলাম মন্দির থেকে। গাড়ি ছুটে চললো কৌশানির পথে।

ক্রমশ...।। পূর্বের পর্বটি পড়ুন 




Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.