x

আসন্ন সঙ্কলন

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ২৮, ২০১৭

পিয়ালী গাঙ্গুলী

sobdermichil | ডিসেম্বর ২৮, ২০১৭ |
অব্যক্ত যন্ত্রণা
মেহেলি ছোট থেকেই স্টেজ ফ্রী। স্কুল, কলেজে মঞ্চে কত অনুষ্ঠান করেছে। অভিনয় করেছে, আবৃত্তি করেছে, সঞ্চালনা করেছে। মাইক্রোফোনের সামনে চিরকালই সপ্রতিভ। কলেজে অধ্যাপনা করতে ঢোকার পরেও কত সেমিনার, কনফারেন্সে মাইক্রোফোনের সামনে বক্তব্য রেখেছে। তবু আজ যেন মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। এ সি অডিটোরিয়ামেও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। ' সেকশুয়াল এবিউজ অফ উইমেন এন্ড চিলড্রেন' এর ওপর একটা সেমিনারে বক্তব্য রাখতে এসেছে মেহেলি।

খুব আত্মবিশ্বাসী কন্ঠে কাগজ থেকে পড়তে শুরু করল মেহেলি। মিনিটখানেক পরে আর কাগজের দরকার পড়ল না। সারা জীবনে কাউকে বলতে না পারা অব্যক্ত যন্ত্রণাগুলো যেন ঠেলে বেরোতে শুরু করল। বাবার বন্ধুর ছেলে, জন্মে থেকে দাদা বলে, রাখী পরিয়ে অভ্যস্ত। সেই বোস কাকুদের ইছাপুরের বাড়িতে গেট টুগেদার। বুম্বাদার সাথে ছাদে গেছে ক্লাস টু তে পড়া মেহেলি। হঠাৎই কেমন অচেনা হয়ে গেল বুম্বাদা। ছাদের ঘরের ছিটকিনিটা বন্ধ করে আচমকা নিজের ঠোঁটগুলো দিয়ে চুষতে লাগল ছোট্ট মেহেলির নিষ্পাপ নরম ঠোঁটগুলো। আর হাতদুটো ততক্ষণে মেহেলির জামা আর প্যান্টির ভেতরে ঢুকে পাগলের মত কি যেন খুঁজছে। সেক্স সম্বন্ধে সামান্য ধারনাটুকুও ছিল না মেহেলির আর শরীরে তো নারীত্বের কিছুই হয়নি তখনও। ওই অপরিণত শরীরে হাত বুলিয়ে, চুষে, চেটে কি সুখ পেয়েছিল বুম্বাদা, মেহেলি জানে না। খুব ব্যথা লেগেছিল। যৌনতা না বুঝলেও এটুকু বুঝেছিল খুব খারাপ কিছু একটা হয়েছে তার সাথে। ভয়ে আর লজ্জায় কাউকে কিছু বলতে পারে নি। সেদিনের ঘটনার পরেও মেহেলিদের বাড়িতে এসে আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চেয়েছিল বুম্বা। এইবার কোনোরকমে ওই নোংরা থাবা থেকে নিজেকে বাঁচাতে পেরেছিল মেহেলি। কিন্তু ওই চোখ দুটোকে কোনোদিন ভুলতে পারে নি। প্রায় পঁচিশ বছর পরেও হটাৎ একদিন টিভির পর্দায় ওই মুখটা দেখে শিউড়ে উঠেছিল মেহেলি। তিনি এখন বিখ্যাত বিজনেস গ্রূপের এক নামকরা পাঁচতারা হোটেলের মস্ত বড় হনু। কে জানে আরও কত মেয়ে তার লালসার শিকার হয়েছে এতদিনে।

#

আইসক্রিমটা হাতে দিতে গিয়ে কাকুর হাতটা ইচ্ছাকৃতভাবে ছুঁয়ে গেল মেহেলির শরীর। পাশের বাড়ির কাকু। এই ঘটনা আজ প্রথম নয়। নাহ, ওর সন্দেহ অমূলক নয়। লোকটা সত্যি বিকৃত। আর কোনো পরিস্থিতিতেই এই দোকানে আর পা দেবে না ও। ছিঃ, ভাবলেই শরীর গুলিয়ে ওঠে। কাকুর ছেলে মেহেলির চেয়ে মাত্র একদিনের বড়। অর্থাৎ মেহেলি কাকুর মেয়ের বয়সী। এখানেই শেষ নয়। বহুবার নানা অছিলায় দুপুরবেলা নিজের অফিস ঘরে দেখা করতে বলেছিল মেহেলিকে। মেহেলির বন্ধু অয়ন বলেছিল "তুই যা একদিন দুপুরে। আমি বাইরে থাকব। তুই একবার হাঁক পাড়লেই ভেতরে ঢুকে উদুম ক্যাল্যাবো মালটাকে"। মেহেলি এরকম কিছুই করেনি। কারণ ততদিনে মেহেলি বড় হয়ে গেছে, বুঝে গেছে যে কাদা শুধু মেয়েদের গায়েই লাগে। অয়নের কাছে মার খেয়ে নিজের দোষ ঢাকতে কাকু ওর চরিত্র নিয়েই, বিশেষত অয়নকে জড়িয়ে নানারকম অশ্লীল গল্প ছড়াবে পাড়ায়। আর লোকে সেটাকেই ধ্রুব সত্য বলে মেনে নেবে।



আরেকজন ছিলেন। মেহেলির ড্রয়িং স্যার। মধ্যবয়সী। বাড়িতে এসে আঁকা শেখাতেন। শেখাতেন সত্যিই অসাধারণ। ওনার কাছে শিখে মেহেলির আঁকার স্টাইল অনেক ডেভেলপ করেছিল। বাইরের ঘরে বসে আঁকা শিখত মেহেলি। অবশ্যই কেউ পাহারা দিয়ে বসে থাকত না। চলে যাওয়ার সময় দরজা অবধি এগিয়ে দিতে গেলেই দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে স্যার নিজের ঠোঁট আর জিভ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তেন মেহেলির ঠোঁটের ওপর। ওনার আগ্রাসী ঠোঁট আর জিভের মধ্যে কোথায় যেন হারিয়ে যেত মেহেলির ঠোঁটদুটো। তীব্র ঘেন্নায় বমি পেয়ে যেত মেহেলির। কিন্তু সত্যি কথাটা কোনোদিন বাড়িতে বলতে পারে নি। বাঁচার একমাত্র পথ হিসেবে আঁকা শেখা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় মেহেলি। তাই নিয়ে কি কম কথা শুনতে হয়েছে? " কোনো কিছুতেই আগ্রহ নেই, ধৈর্য নেই, লোকের ছেলেমেয়েরা পড়াশুনো ছাড়াও কতকিছু শেখে..." ইত্যাদি।

#

বাড়ি ফেরার পর থেকেই শরীরটা কিরকম খারাপ লাগছে। ফ্রিজ থেকে কোলার বোতলটা বার করে ঢকঢক করে খানিকটা গলায় ঢালল। টনসিলটা ফুলবে, সে আর কি করা যাবে! কোলাটা খেয়ে একটু যেন আরাম হল। সোফায় বসে টিভিটা চালাল। নিউজ চ্যানেলগুলো এখনও কলকাতার দুই প্রাইভেট স্কুলে শিশুদের যৌন নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে চটকে যাচ্ছে। অসহ্য লাগে মেহেলির। সত্যি কি এতে কোনো লাভ হয়? কলকাতার এই ঘটনার পরেও তো রোজই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়ে চলেছে কোথাও না কোথাও। নির্ভয়াকাণ্ডে তো সারা দেশ তোলপাড় হয়ে গেছিল। তাতে কি ধর্ষণ কমেছে? বরং ধর্ষণ করে যোনীপথের ভিতর কোনো জিনিস ঢুকিয়ে শরীর ক্ষতবিক্ষত করে দেওয়ার হিড়িক পড়ে গেছে। মেহেলির মনে হয় মিডিয়ার প্রচারে বিকৃতকাম মানুষরা আরও নতুন নতুন আইডিয়া পায়। আর এইসব মোমবাতি মিছিল, হোয়াটস্যাপে ডি পি ওড়ানো ইত্যাদি সব নাটকীয়। এগুলো কোনো সমাধান নয়। জেল ও সমাধান নয়। বর্বরচিত শোনালেও পরপর কয়েকজন ধর্ষণকারীকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মত জনসমক্ষে ফাঁসিতে ঝোলানো বা পাথর ছুঁড়ে ছুঁড়ে মাথা থেঁতলে দেওয়া হলে যদি এইসব বিকৃত রুচীর মানুষদের মনে এতটুকু ভয় জন্মায়। তবে সবচেয়ে উপযুক্ত শাস্তি হল কাস্ট্রেশন। না কেমিক্যাল কাস্ট্রেশন নয়, একদম নির্মমভাবে। মেহেলির মনে পড়ে গেল কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে একবার এক আরবী ছবিতে এরকম এক দৃশ্য দেখেছিল।

রান্নাঘরে বাসন মাজছে সবিতা। চোখ মুখ থেকে কালশিটের দাগগুলো এখনও মেলায় নি। নিত্যকার ব্যাপার। ভোর চারটেয় উঠে সংসারের যাবতীয় কাজ করে লোকের বাড়ি বাড়ি কাজ করতে বেড়োয় সবিতা। সন্ধ্যেবেলা ফিরে আবার রাতের রান্না। তাতেও মারধর চলতে থাকে। সবিতার সবচেয়ে বড় অপরাধ পরপর দুবার কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছে ও। মেহেলির মাঝে মাঝে মনে হয় সবিতাকে বলে "পরেরবার তোর গায়ে হাত তুললে বসিয়ে দিবি বঁটির এক কোপ"। বলতে পারে না। সত্যি সবিতা এরকম কিছু করে বসলে মেহেলি কি নিতে পারবে তার দায়িত্ব? সবিতার অসহায়তা বা অপরাগতার কথা নয় তাও বোঝা যায়। যতই যাই হোক, মাথার ওপর একটা পুরুষের ছায়া আছে, নইলে তো একা থাকলে শিয়াল কুকুরে ছিঁড়ে খাবে। কিন্তু মেহেলির ছোটবেলার বান্ধবী কুহুর দিদির কি অসহায়তা ছিল?

নিজে ভালো চাকরি করত কুহেলির দিদি। অর্থনৈতিকভাবে সফল, স্বাবলম্বী। প্রথমে দিনের পর দিনের জামাইবাবুর অসভ্যতা মুখ বুজে সয়েছে কুহু। ভয়ে আর লজ্জায় কাউকে বলতে পারেনি। তারপর এক কালীপুজোর রাতে যখন সব মাত্রা অতিক্রম করে গেছিল, সেদিন প্রতিবাদ করে উঠেছিল কুহু। জানিয়েছিল দিদিকে। কিন্তু বোনের পাশে দাঁড়ানোর বদলে কুহুর দিদি নিজের স্বামীর পাশেই দাঁড়ায়।  নিজের কুকীর্তির কথা ঢাকতে আর কুহু যদি কারুর কাছে মুখ খোলে সেই ভয়ে আগেভাগেই কুহুর চরিত্র নিয়ে আত্মীয়স্বজনের কাছে নানান কুৎসা রটিয়ে বেড়ায়। সকলে প্রিয় জামাইয়ের কথাই বিশ্বাস করেছিল। কুহু হয়ে গেল 'বাজে মেয়ে' আর একটা লম্পট, বদমাইশ লোক সারাজীবন সকলের সামনে মাথা উঁচু করে ঘুরে বেড়াল। এরকমভাবে নিজের পরিবার, পরিজনের মধ্যেই তো মেয়েরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিবারের সম্মানের কথা ভেবে প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ করতে পারে না মেয়েরা। মেহেলির নিজের এক মেসোমশাইও তো মেহেলির ঠোঁটে চুমু খেত, নানারকম অস্বস্তিকর প্রশ্ন করত।

হটাৎ মেহেলির চোখ গেল ঘড়ির কাঁটায়। প্রায় সাড়ে নটা বাজে। রু তো এখনও ফিরল না অফিস থেকে। সেক্টর ফাইভ জায়গাটা তো এমনিতেই ফাঁকা হয়ে যায় সন্ধ্যের পরে। তারপর আজকাল ওলা, উবেরেও যা সব কান্ড হচ্ছে, মেয়ে বাড়ি ফেরা না পর্যন্ত চিন্তা তো হয়ই। ফোন করল রু কে "মা, আমার ফিরতে আরেকটু দেরী হবে। নতুন প্রজেক্ট এসেছে। তোমার সেমিনার কেমন হল? আর আমায় নিয়ে একদম চিন্তা করো না মা। জানো না তোমার মেয়ে ব্ল্যাক বেল্ট?  দু চারটেকে মেরে ফাটিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আমার আছে মা"....



Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.