x

আসন্ন সঙ্কলন

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ২৮, ২০১৭

পিনাকি

sobdermichil | ডিসেম্বর ২৮, ২০১৭ |
ডানা পোড়া একটি  প্রজাপতির  গল্প
-যাতি ,  তুমি যখন গভীর অরণ্যে , চার নখের  হিংস্র জন্তু  শিকার করতে যাও , তখন সাবধান থাকো ?
-হ্যাঁ , গুরুদেব । কান সজাগ থাকলেও , আমার বাকি চারখানা ইন্দ্রিয় সজাগ থাকতেই  হবে । কখনও আবার  আরেকটা অতিরিক্ত ইন্দ্রিয়ের  প্রয়োজন হয় ! 
-তারপরে ...
-বনের ভূমিতে যে শুকনো পাতা  থাকে, সেই পাতায় পশুর পায়ের শব্দ ভাসতে থাকে নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনতে হয়। ওরা যতটা বিপদজনক , ততটাই হিংস্র ।
-ইন্দ্র অনুগামীরা , বনের হিংস্র পশুদের থেকেও আরও ভয়ানক , হিংস্র আর ধূর্ত । নিজেদের কার্য সিদ্ধির জন্য , যে কোন পথ অনুসরণ করতে পারে । দেবতাদের কাছে, জেতাটাই নীতি । ক্ষমতা ধরে রাখাটাই প্রভুর ধর্ম । নিজের নীতি ও ধর্মকে টিকিয়ে রাখবার জন্য যে পরিকল্পনা , তাকেই বলে রাজনীতি । 

শুক্রাচার্যের  কথা  শুনে , রাজা যযাতি হাসল । তিনি  মনে – মনে বলল -  এই সত্তর  বছর বয়সী   পুরোহিত , নিজের অভিজ্ঞতার  কথা  বলছে । 

তার মাথায় কোন  কেশের  উপস্থিতি নেই ।  নিজের বয়স কে  নিয়ন্ত্রণে  রাখবার জন্যই  মাথার আর গুম্ফের  মুণ্ডন  করিয়েছে । এই ধারণা   রাজা যযাতির  রয়েছে । গুরু শুক্রাচার্যের পড়নে  কালো  পোশাক ।  দুই  চোখ ভরা  চাপা আগুন , ছাই চাপা ,   যে  কোন  সময়ে লেলিহান   জিহ্বা  দাপিয়ে উঠবে !  যযাতি  বলল 
-আপনার  রাজনীতিতে   আগ্রহ  নেই  , নাকি দেবতাদের  রাজনীতির   ধরণ  পছন্দ  নয় ?
- রাজা , একটা  কথা জেনে রেখো , রাজনীতির  নির্দিষ্ট  কোন  ধরণ  হয়না  ।  সে জলের মতনই  অবয়বহীন । তাই বলে তাকে আবার  পরিণামহীন   ভাববার  ভুল  করাটা  মূর্খের   কাজ !  এত টুকু  জেনে  রেখো  , তুমি যেমন  ঘুঁটি   সাজাবে , তেমনই ফিরে আসবে ।  দেবতাদের  আমি  বিশ্বাস  করিনি , আর শেষ  জীবন  অব্দি  করব না ।  এই বিশ্বাসহীন  রাজনীতিটা  ওদিক   থেকেই এসেছে । রাক্ষসরা   বশ্য জাতি নয় । দেবতারা   প্রয়োজনে  বশ্যতার  অভিনয়  করেও  ,  প্রভুকে  খুন করতে  পারে ।
-আপনি  এতটাই  ভীত ! মাপ করবেন   গুরুদেব , এটাই তো  যুদ্ধের  সহজাত   চরিত্র । যেমন  ভাবেই হোক  শত্রুকে  নিশ্চিহ্ন করতে হবে । জয়   নিশ্চিত  করাটাই  যোদ্ধার একমাত্র লক্ষ্য , তাই নয়  কি ?
- অবশ্যই । ক্ষত্রিয়  যখন  যুদ্ধ করে , সে বিপক্ষকে  পরাজিত  করবে বলেই  করে । পুরোহিত  যজ্ঞ  করেন  সফলতার অভিলাষ নিয়েই । সব কিছুই  নির্দিষ্ট  নিয়ম মেনে চলে । এখানে আগেও  যুদ্ধ  হত । দেবতারা  যুদ্ধের  যে নীতি  আমদানি করেছে , তা  কাপুরুষতা । শত্রুর  দুর্বলতা   খুঁজে  নেওয়াটা  বুদ্ধিমানের কাজ , তাইবলে   সেই দুর্বলতাকে  ব্যবহার  করে  যুদ্ধ  ক্ষেত্রে  নামবার আগেই , তাকে  পঙ্গু  করে  ফেলা , এটা  নিতান্তই   কাপুরুষতা । দেবতারা  যুদ্ধে জয়ী  হওয়ার  জন্য  -সম্পর্কের  ছলনা  , নারী  ,   আশ্রয়ের  অভিনয় --  এই সব কিছুকে অস্ত্র  হিসেবে ব্যবহার করে ।
যযাতি  ভূমিতে  বসেছিল , দুই পা মুড়ে । সামনে নরম  গদির  উপর পদ্মাসনে  শুক্রাচার্য । হাত জোড়  করে   যযাতি  বলল – আপনি , অনুগ্রহ  করে  আমাকে বলুন ।   ইন্দ্র  আর তার অনুচরেরা  আপনার   প্রতি কেমন  ব্যবহার  করেছে । 
কিছুক্ষণ  চোখ  বন্ধ  করে  রইল । দুজনেই   গোপন  কক্ষে    আলোচনায়  বিভোর ।    যযাতি  নিজের অবর্তমানে , সিংহাসনে  যোগ্য  উত্তরাধিকারী  নির্বাচন  করবে । সেই আলোচনায়   নানাবিধ  দিক উঠে  এসেছে , এমনই  এক সময়  যখন  যযাতি  জানতে চাইল , শুক্রাচার্য  নিজের মেয়ের সন্তানদের  মধ্যেই  একজনকে  কেন নির্বাচন  করছেন না ? উত্তরে , অসুর  গুরু জানালেন , যুদ্ধে  রক্তের  সম্পর্ক  বলে কিছু হয়না। কথা হচ্ছে , বিপক্ষ  শিবিরে কে আছে ।  
এখন  দিনের মধ্যভাগ ।  যযাতি  বলল  , 
-সেখানে  যদি   নিজের জন থাকে তাহলে ?  
- সে ও  শত্রু   হবে  । 
-আপন  জনকে শত্রু  বলব ! এমনটা  বলা যায় ! 
-আমি তোমায়  আজ এমনই গল্প  বলব ।  একটি  অংশের  সাথে  আমি যুক্ত । বাকি অংশ টির সাথে দেবযানী ।
-দেবযানী  ?
-   হ্যাঁ  , তোমার  সহধর্মিণী  , আমার একমাত্র কন্যা    ।
- কেমন  ভাবে , আপনার এই কাহিনীর  সাথে দেবযানী  যুক্ত  আছে ! 
-  খুব ভাল  করে    বুঝতে  পারলে ,  দেখবে , এই কাহিনীতে  দেবযানীই  আছে ।   তার অবস্থান  আজও  জানা নেই ! 
-অবস্থান !
- সে  যে নিজের সামাজিক অবস্থান  পরিবর্তন  করতে চেয়েছিল । পেরেছে কি না জানা নেই । তার  প্রেম শুধুই নিষ্পাপ  আত্মত্যাগ , না সেই ত্যাগে নিজের কোন  গভীর  পরিকল্পনা আছে ! মানুষকে  চিনতে পারাটা বেশ শক্ত , তার মনে যে ধরণের  ওঠা –পড়া  চলে , তার সাথে  সে নিজেও পা মিলিয়ে চলতে পারেনা । তাই পর্যবেক্ষণ  করতে  হয় । দেবযানী  আমার কাছে এমন প্রজাপতি  , যার  পুড়তে  থাকা ডানা  দেখেও , করুণায়  উদ্বেলিত  হয়নি  আমার হৃদয় । বরং  বিশ্বাস  ঘাতকতার  গন্ধে নাক চাপা দিয়েছি ! সে নিজেই  নিজেকে অন্য পুরুষের  কাছে  আত্মসমর্পণ করেছিল । 
-দেবযানীর  জীবনে   প্রেমিক  হিসেবে  আমার  অবস্থানের  আগেও কি অন্য পুরুষের  আনাগোনা  ছিল !
-এটা  প্রশ্ন  হলে উত্তর  দিতাম হ্যাঁ । তোমার  কণ্ঠলালিত উচ্চারণে , শঙ্কার ছায়া ! এত বিস্ময়ের  কোন  কারণ  আছে ? দেবযানী  তোমার জীবনে একাধিক  মহিলার  উপস্থিতি  মেনে নিতে  পারলে , তুমি পারবে না  কেন ?  প্রেম মানে দখল নয় ।  যারা ভাবে আমি যাকে ভালোবাসি  , তাকে শুধুই আমি ভালবাসব ; তারা সত্যি  কথা  স্বীকার  করতে  চায় না । 


-কী  কথা ? 
- পৃথিবীতে  কোন নতুন  কাজ ছাড়া , একাই এক মাত্র কাজের  মালিক  হওয়া যায় না। ভালোবাসা  পুরানো  এক অনুভূতি । এই অনুভূতিতে  সামিল হওয়াটা স্বাভাবিক ।  আমি বলতে চাইছি ,   তুমি যেমন  একাধিক  ভাবে ভালোবাসার  অনুভূতিতে  ভেসে গিয়েছ , এখনো  চলেছ ।  দেবযানীও  ভেসেছে , এটাই  স্বাভাবিক । 
-তাহলে  আপনি তার উপর   বিশ্বাস  হারিয়েছেন  কেন ?
- তার এই ভালোবাসা  , আমার আর দেবতাদের  মাঝে  চলে এসেছে । দেবযানী  এমন এক অস্ত্র  , দু’ পক্ষই  যাকে ব্যবহার করতে আগ্রহী ।
-মানে ? 

 ২

রাতের অন্ধকারে ,  মাটির  পথের উপর  দিয়ে   ছুটে  আসছে এক যুবক ।    আঠারো  বসন্ত  ছুঁয়েছে তার যৌবন । দুই পাশে গভীর  বন । গভীর  তাদের  পত্র পল্লবের শিরা –উপশিরায়  জড়িয়ে থাকা অন্ধকার  । বন্য  জন্তুদের  স্বাধীন  উল্লাস  ধ্বনি , পাতায় – পাতায় ধ্বনিত  হয়ে , আকাশ ভারী  করে তুলেছে ।  সে ছুটছে । দস্যুদের  আক্রমণের  চিহ্ন  , তার সারা শরীর  জুড়ে ।  মাথা ফেটে  রক্ত   ধারা নামছে , ঘেমে গিয়েছে শরীর।  সে কিছুটা  দূর  গিয়ে দাঁড়িয়ে  থাকল ।  বুকের ভিতর  হৃদস্পন্দন  বেড়ে  গিয়েছে । 
সে   দু’ পা মুড়ে  বসে পড়ল ।  এখন  শীতকাল ।  আর চলতে পারছেনা । চোখে  দৃষ্টি ঝাপসা  হয়ে উঠছে  !  সেই প্রায় নিমেলিত , আর কাঁপতে   থাকা  চোখ  দিয়ে  , দূরে   ঝাপসা  কুয়াশার ভিতর  আশ্রম  দেখতে পাচ্ছে । আরেকটু  কষ্ট  করে নিজের  দেহটাকে  টানতে  - টানতে  নিয়ে চলেছে । 

আশ্রমের  মুখে এসে , শরীরের  অবশিষ্ট  শক্তি  দিয়ে ডাকল, - কেউ আছেন ? আমার প্রাণ  রক্ষা করুন । আমি পথিক ।  অরণ্যে  একাকী  ভ্রমণে  এসেছিলাম । দস্যুর  আক্রমণে  সব কিছু লুঠ  হয়ে  গিয়েছে । আমাকে প্রাণে  বাঁচান …… 

যখন   চোখ  খুলল ।  যুবকটি  নিজেকে নরম  পরিষ্কার  গদির  উপর  আবিষ্কার  করল! তার মনে আছে , চোখ  বুজে যাওয়ার আগে , কুয়াশার  ভিতর আশ্রম   দেখতে পেয়েছিল । তারপর  কিছুই মনে নেই ।  সে চারপাশে দেখল ।  ডানদিকে  মাথার কাছে , গম্ভীর  মুখে দাঁড়িয়ে  আছে বৃদ্ধ  পুরোহিত । তার পাশে একজন  বৈদ্য । ছেলেটি  পায়ের  দিকে চোখ  পড়তেই  দেখল  এক সুন্দরী , ফর্সা  যুবতী ।  চোখে উদ্বিগ্নতা । 
-আমি  এখানে ।
মেয়েটি  বলল –  তোমাকে  আমিই এখানে নিয়ে এসেছি । আশ্রমের  মুখেই  অজ্ঞান হয়ে ছিলে । তোমার  পরিচয়  দাও ।
-আমার নিজের কথা নিজের কিছুই মনে নেই ।  আপনারা কারা ?
-আমি দেবযানী । দৈত্য  গুরু  শুক্রাচার্যের কন্যা । ইনি আমার পিতা ।

  শুক্রাচার্যের  দিকে তাকিয়ে ,  ছেলেটি  দুর্বল  হাত জড়ো  করে বলল – আপনি ! 
-হ্যাঁ  আমিই  শুক্রাচার্য  । এটা আমারই  আশ্রম । তোমার  চোট  বেশ গভীর । ক্ষতও  রয়েছে । আমার বৈদ্য  চিকিৎসা  চালাচ্ছে ।  আশা রাখছি  একমাসের  মধেই   অবস্থার  পরিবর্তন  হবে । তুমি  বিশ্রাম নাও । 


শুক্রাচার্য  দেবযানীকে নিয়ে   ঘরের  বাইরে  এল ।  দেবযানী  বলল 
-পিতা  , আপনার কী  মনে হচ্ছে ?
-ছেলেটি  উচ্চ বংশজাত সে বিষয়ে  সন্দেহ  নেই  ।  তাকে সুস্থ  জীবনে ফিরিয়ে আনতে হলে , আমাদের  আশ্রম  জীবনের  সাথে   স্বাভাবিক  হতে হবে । দেবযানী  আমি চাই , তুমি তার পরিচর্যা করো । মনে রাখবে ,  সে তোমার  চেয়ে বয়সে ছোট । তাকে  কখনই  নিরাপত্তাহীনতায়  ভুগতে দেবে না ।   সে যেন দ্রুত সুস্থ  হয়ে ওঠে।

দেবযানী  মাথা নাড়ল ।

সময়  হাওয়ার মতন  নিজের গতি  নিয়েই  এগিয়ে চলে ।    দেখতে – দেখতে একমাসে , ছেলেটি  নিজেই আশ্রমের  খুব আপন হয়ে ওঠে ।  শুক্রাচার্যের  মনে তার 
প্রতি  দুর্বলতা   অনেক সময়  প্রকাশ পেয়েছে । মন নিজে কবেই বা , নিয়ন্ত্রণে  থেকেছে !   এই  অচেনা ছেলেটিকে  খুব আপন বলে মনে হয় । অবশ্য  যেমন  রুপ তেমনই গুন ।  কণ্ঠে  যে সুর তার ,  দেহের প্রতিটি  খাঁজে   নৃত্যের  মুদ্রা  ; অপ্সরাদের  কাছ থেকেই  যেন  নাচ শিখেছে  ! যে আশ্রম   যুদ্ধের  পরিবেশে  থমথমে  ছিল , কোকিলের  কণ্ঠ থেকেও    যুদ্ধ ক্ষেত্রের  রণ  হুঙ্কার বেশি আরাম দিত, সেই কানে ছেলেটির  সুর ভাসে ! প্রতি সকালে আশ্রমের  মহিলা  মহল  তার কাছে গান আর নাচের তালিম নেয় । 
দেবযানী  তাকে বলে দিয়েছে ,  আশ্রমের  জন্য  যে সময়  তাতে যেমন ,  সে ভাগ বসাবেনা । তেমনই   দেবযানীকে যখন  শেখাবে , তখন সেই সময়টুকু   শুধু তারই । 

 শুক্রাচার্য  কয়েকদিনের জন্য একান্ত সাধনার  উদ্দেশ্যে  আশ্রম ত্যাগ করল ।  সে দেবযানীকে  নিজের কক্ষে  ডাকল । 
দেবযানী  ধীরে  ঘরে প্রবেশ করল ।  বলল 
-আপনি  ডেকেছেন  পিতা ?
- হ্যাঁ  আমি কয়েকদিনের  জন্য  , আশ্রমের বাইরে যাচ্ছি । আমার অবর্তমানে  এই আশ্রমের  দায়িত্ব   যেহেতু  তোমার  হাতে , তাই  কিছু উপদেশ  দিচ্ছি । 
- আপনি  বলুন পিতা  । 
-আমি চাইব   , আমার অবর্তমানে    এখানে তুমি এক যোগ্য  নেত্রী  হিসেবে  , দক্ষ প্রশাসক  হিসেবে নিজের কাজ  করবে ।   দেবতারা যেন  কোন  ভাবেই বিঘ্ন না ঘটাতে  পারে , অসুরদের মধ্যে  সংযমতার  অভাব রয়েছে ।  আমার এখানে  উপস্থিতি না থাকা টা  ক্ষতি  হতে পারে ।
- আমি চেষ্টা  করব  , আপনার  সম্মান  রাখাবার ।
 শুক্রাচার্য  ,  দু’হাত দিয়ে  দেবযানীর  মাথা বুলিয়ে বলল – আমার তোমার  উপর বিশ্বাস  আছে ।

শুক্রাচার্য  নিজে  অরণ্যের  এই গোপন গুহায়    ধ্যানে মগ্ন । সে প্রতি  বছর  এই স্থানে  আসে । তার আসবার পিছনে অবশ্য অন্য কারণ  রয়েছে ।   এক গোপন  ও  রহস্যময়  অনুসন্ধান । এই গবেষণার  কথা একমাত্র  তার মেয়ে   দেবযানী  জানে ।   দশ দিনের  জন্য   শুক্রাচার্য    আসেন , নিজের   বিশ্বস্থ  অনুচরদের  নিয়ে ,  গবেষণায়  মত্ত   থাকে ।  অসুরেরা  ভাবে , গুরুদেব  গভীর  ধ্যানে  মগ্ন । 
আজ চতুর্থ  দিন  হয়ে গিয়েছে ।  বাইরে মৃদুমন্দ  ঝিরি  ঝিরি  বৃষ্টি    ঝরছে । গুহার  ভিতর  থেকে , ভিজতে থাকা অরণ্যকে  খুব বাধ্য  বলে মনে হয় । কোন দুরন্ত  শিশুকে  , মা পরম স্নেহে   স্নান করিয়ে দিচ্ছে   ! দেবযানীর  কথা মনে পড়ে যায় । মেয়েটা  এখন   একা – একা  আশ্রমে ।   যদিও  বা  তাকে রক্ষা  করবার  মতন  , সাহায্য  করবার  মতন  অনেকেই  আছে।  পিতার  চিন্তার   দায়িত্ব  তবু থেকেই  যায়! যতই   নিজেকে চিন্তামুক্ত   রাখবে   ভেবেছিল ,  তার দায়িত্ব  তাকে  শান্তিতে থাকতে দেয়না । অসুর  জাতির  উন্নতি , দেবতাদের   বিরুদ্ধে  সংগ্রাম  আর মেয়েটির  চিন্তা । দেবযানীর   বিয়ের বয়স  হয়ে গিয়েছে । তাদের  সমাজে নির্দিষ্ট  সময় সীমার  অনুশাসন  নেই ,  মেয়েরা  স্বাধীন । বাবা হিসেবে  সে নিজে এখন চাইছে এক সৎ   বংশে মেয়েকে বিয়ে দিতে । এই কথার  সাথে , নব্য  বালকের  মুখটা  ভেসে উঠল !  ছেলেটির  কণ্ঠ  বড়ই  মধুর !  শুনলেই   সব  ক্ষোভ  , হতাশা ,  বিদ্রোহ  --  মুছে যায় । একথা এই পৃথিবীতে  কেই বা অস্বীকার  করবে যুদ্ধে  অস্ত্রের   চেয়েও  কণ্ঠের  সুর বেশি  ক্ষমতারাখে , শত্রুকে  বশে রাখতে !   ছেলেটি নিজের  সংগীত ,  নৃত্য  আর   মিষ্টি ব্যবহার দিয়ে  --  শুক্রাচার্যের  মতন  আপাতত  নিরস  মানুষকেও  রসিক  করে  তুলেছে ! আশ্রমের   দিন গুলোর  কথা খুব মনে পড়ল । সে ভাবছে  , ফিরে গিয়ে    আবার আগের মতন ছেলেটির  গান শুনবে  ।

বাইরে বৃষ্টি  থেমে গিয়েছে ।  গাছের  পাতার উপর  অপেক্ষমাণ জল ধারা , ভূমি  চুম্বনে পীড়িত !   শুক্রাচার্য  গোপন   গুহাকক্ষে  যাবে ।  সামনের  পথ ধরে  অরণ্যে  যেতে হবে । তারপর  , অরণ্যের মাঝে জলাশয়ের   তলায়  , সেই কক্ষ  । এখানেই তাঁর  গোপন   গবেষণাটি  অত্যন্ত   যত্নে লালিত হচ্ছে । এখানকার হদিশ  দেবতারাও  পায়নি । এত দিনের যুদ্ধে  দেবতারা পরাজয়ের  গ্লানিতে ডুবেছে , কেননা শুক্রাচার্যের  এই  অদ্ভুত  রসায়ন  বিজ্ঞানের  খোঁজ  তারা পায়নি ! 

শুক্রাচার্য হেঁটে  চলেছে । সদ্য  ভিজে  থাকা  অরণ্যচারী  বনস্পতির   পাতায়  পা ঘষে গেলেও , শব্দ হয়না । এই অভয় অরণ্য   সে নিজের হাতে প্রতিষ্ঠা  করেছে । দেবতারা বহুবার  দখল করতে চেয়েছিল ।  অসুরদের প্রতিরোধে  তারা ব্যর্থ । পরিবেশের   ভারসাম্য রক্ষা করবার জন্য  , পশু , পাখি , সরীসৃপ , পতঙ্গদের  সংরক্ষণ  করতে হবে  ।   এখানে পশু  - পাখি শিকার  নিষিদ্ধ । প্রতি মাসে  সে নিজে আসে  , গবেষণার  জন্য  ।  এই  গবেষনা এতটাই  রহস্যময় আর গোপন যে , রাজা বৃষপর্বা  , আর দেবযানী ছাড়া কেউ জানেনা ।    এই গোপন  গুহায় শুক্রাচার্যের  অবর্তমানে  তাঁর কয়েকজন  অনুচর পাহারা  দেয় ।  

জলাশয়ের  কাছে আসতেই , শুক্রাচার্য  চমকে উঠল !  আরে সামনে অর্ধমৃত  এক মানুষ ! এখনো  প্রাণ  অবশিষ্ট আছে হয়ত !  উপুড়   হয়ে , মাটিতে  মুখ গুঁজে শুয়ে আছে । এই দুর্ভেদ্য  অভয় অরণ্যে ,   জলাশয়ের  কাছে  , এমন অবস্থায়  কেন ? সে  দেহটির  পাশে এসে বসল , হাত দিয়ে মুখটি দেখতেই , শুক্রাচার্যের   গোটা  শরীরে  বিদ্যুৎ  খেলে গেল ! সামনে যে আছে , ঠিক  বিশ্বাস  হচ্ছে না ।  আশ্রমে থাকা  সেই যুবকটি ।

সে এমন অবস্থায়  কেন  ? এই অভয় অরন্যে  প্রবেশের   সঠিক  পথ আছে , কাছের মানুষ ছাড়া কেউ জানেনা  । এই  ছেলেটি  সেই পথ দিয়ে  , জলাশয়ের  নিকট  পৌঁছে   গিয়েছে ! এই  রহস্যের সমাধান চাই ।  তার  আগে গোপন  গুহা কক্ষে নিয়ে যেতে হবে । চিকিৎসা  করতে হবে । নতুবা বাঁচানো   যাবে না ।                                                    
                                                 


-তাঁর মানে তোমার  নাম  কচ , তুমি দেব গুরু  বৃহস্পতির  পুত্র ! 
-আপনি তিন দিন তিন রাত যে সেবা  দিয়েছেন । আদর দিয়েছেন । তারই  আশ্রয়ে  রক্ষা পেয়েছে  আমার এই তুচ্ছ প্রাণ । আমি আপনার দাস ।
-রাক্ষস জাতি আর তোমাদের  দেবতাদের মধ্যে এখানেই পার্থক্য । খুব সহজেই কর্তব্যের    হোম কে নিজের উদারতার বীরত্ব বলে প্রচার করতে থাকো । সেই    বীরত্বের   জোরেই  মানুষকে দাস বানিয়েছ ! কোন    মুমূর্ষ  রুগীকে  প্রাণে বাঁচানো আমার কর্তব্য । নিজের কাজ , দায়িত্ব সম্বন্ধে  আমি সজাগ । তাই এতটুকু  ভেবে 
দেখবে , তোমাকে বাঁচিয়েছি  মরণাপন্ন  রুগী   হিসেবে । হত্যা করব শত্রু  পক্ষের  গুপ্তচর হিসেবে ।  এখানে তোমাকে হত্যা করে গুম করে দেব , কেউ জানতেও পারবেনা ।
শুক্রাচার্যের  মুখ , সূর্যের  আগুনে  তেতে থাকা সকালের মতন ।  সেই তাপ কচের  হৃদয়ে  শঙ্কা  আর ভয়ের  উদ্বেগ   করছে  । মাত্র  উনিশটি  বসন্ত পেরিয়েছে । আগের দিনই , আঠারো  ছাড়িয়ে  উনিশে পা ।  সে জানেনা আগামি  মুহূর্ত  তার জন্য কিছু উপহার আনবে নাকি ? কেননা অসুরের  বিপক্ষ শিবিরের  গুপ্তচরকে  ছেড়ে দেয় না । তাদের কাছে প্রাণ  ভিক্ষা করেও  লাভ নেই । তাছাড়া  ,  সে যে গুপ্তচর  এই কথা  অনেক আগেই দেবযানী  জেনেছে ।   শুক্রাচার্যের  আশ্রম  ত্যাগের  পরেই , কচ পিছু নিয়েছিল ।  অভয় অরণ্যে  প্রবেশের  মুখেই  ,  প্রহরারত  অসুরদের    চোখে  পড়ে যায় । তারা কচকে মেরে ফেলেছে , এমন ভুল  বশতই  এই জলাশয়ের  কাছে ফেলে দিয়ে গিয়েছে । এখানে কুমির আছে ।  সে অতি যত্নে  মৃত  মানুষের   মাংস  খেত । সেই সময়ই শুক্রাচার্য  আসে ।  উদ্ধার  করে । 
কচ জানে কুমিরের  হাতে , অসুরের হাতে  প্রাণ  না গেলেও । শুক্রাচার্যের  কাছ থেকে বেঁচে  পালানোর  কোন  সম্ভাবনা নেই । 
-কী  ভাবছ ?
 গম্ভীর গলায়  , হুঁশ ফিরল ।  কচ বলল 
-আমি আপনাদের ক্ষতি করতে আসিনি ।
- আমার  গবেষণার  পদ্ধতি   চুরি  করবার কাজ টিকে  ক্ষতি বলা যায় না , তাই তো ?
- ঠিক , তা  বলতে চাইনি ।
- আচ্ছা কচ । তুমি   জানও আমার এই গবেষণা  কিসের জন্য ।
-অমরত্ব  দেওয়া  ওষুধ  । স্বর্গে  আমরা  এই নিয়ে  খুব  আতঙ্ক  গ্রস্থ । যুদ্ধে আপনার ওষুধ ,  মৃত   অসুরদের  পুনরায় জীবিত  করে ।
-হাঃ  হাঃ হাঃ ......

 শুক্রাচার্যের  প্রবল হাসির ধ্বনিতে , মনে হচ্ছে গুহাটাই  না ফেটে যায় !   থেমে বলল
-পুত্র ,  তোমরা  দেবতারা মূর্খ   । চিরটাকাল রাক্ষস জাতির জ্ঞান চুরি করে , তাদের দাস  বানিয়ে  রাখতে চাও ।   দেহ থেকে প্রাণ  চলে গেলে , পুনরায়  প্রাণ  প্রতিষ্ঠা  সম্ভব  নয় । আমার ওষুধ   প্রায় মরণাপন্ন  মানুষের   দেহে  এমন  উত্তেজনা  সৃষ্টি  করে , যাতে সে  বেঁচে  ফেরে । শুধু তাই নয়  এই ওষুধ  সেবনে দিন – রাত নেশাচ্ছন্ন  হয়ে সৈনিকরা যুদ্ধ করতে থাকবে ।  তারা ক্লান্ত হবে , ক্ষুধার্ত  হবে , তাও যুদ্ধ  করবে।  বলতে পারো , যুদ্ধে তাদের  সংগ্রহে  খাদ্য রশদ না থাকলেও , আমার ওষুধ  সেবনে  যোদ্ধারা  না থেমে যুদ্ধ করে যাবে ।  এই ওষুধ  পরবর্তী সময়ে হয়ত  পৃথিবীর  মানুষ ব্যবহার করবে ।  আপাতত   দেবতাদের  হাত  থেকে বাঁচাতে  হবে । তোমাকে  আমি এই সব বললাম  কেননা , আমি এখনই  হত্যা করব । আমি বিশ্বাস  ঘাতকটা সহ্য করতে পারিনা ।
- হে গুরুবর , আপনি আমাকে হত্যা করুন ।  অনুগ্রহ করে  বিশ্বাস  ঘাতক বলবেন না। 
-কেন বলব না ! আমার আশ্রমে আশ্রয়ে  থেকে আমাকে আর আমার মেয়েকে প্রতারণা  করেছ ।
- হে বিপ্র , আমি আপনাকে  নিজের পরিচয়  সম্পর্কে অন্ধকারে  রেখেছি , এই কথা ঠিক  । তবে  দেবযানী  সব জানে ।
-কী  জানে ?
- আমার পরিচয় ।
-মানে ? কচ নিঃসঙ্কোচ  হয়ে আমায় বলও । 
-আমি জানি  মৃত্যু , গুহার ভিতরেই অপেক্ষমাণ  । যদিও  আপনার হাত থেকে আমি রেহাই পাব না। আপনি ছেড়ে দিলেও  অসুররা  আমায় মেরে ফেলবে । তাই যে মারাই  যাবে ,  তার সত্যি  বলতে  আপত্তি কিসের ? আমার হুঁশ  আসবার   দিন দশেকের  মধ্যেই , এক নির্জন স্থানে  দেবযানী  আমাকে আর দেবতাদের  অনুচরদের দেখে ফেলে ! সে  একদিন প্রশ্ন করল । আমার পরিচয়  জানতে চাইল ।  আমি জানতাম , নিজেকে লুকিয়ে লাভ নেই ।  আমার  কাজে আমি সফল হব না। দেবযানীকে  বললাম ,সেই দিন রাত্রি বেলা নিজের লোকেদের  দ্বারাই আমি আক্রান্ত হয়েছি ।  আশ্রমে আশ্রয়ের  প্রধান কারণ  , আপনাদের   গোপন  ঔষধ  তৈরি  করবার পদ্ধতিটি   চুরি করা । দেবযানী  আমার কথা মন দিয়ে শুনল ।  তাঁর  চোখে  আমি  কোন আলাদা অভিব্যাক্তি  খুঁজে পেলাম না । সে শুধু আমাকে   এতটুকু আশ্বস্ত   করল আমার  নিরাপত্তার দায়িত্ব  নেবে ।   শুধু তাই নয়  , সে আমাকে অভয় অরণ্যের  পথ বলে দেবে ।  আমার কাজ হবে , আপনার পিছু নিয়ে গোপন  গুহা কক্ষের  ভিতরে   ঢুকে পড়া । ভাগ্যের  পরিহাস দেখুন ,  সব কিছু পরিকল্পনা মাফিক  এগিয়ে থাকলেও , আজ শেষ অব্দি পরাজয় হল ! 

শুক্রাচার্য মুণ্ডিত মাথায় হাত দিয়ে বসে রইল , চোখ বন্ধ করে । কচ দেখছে , বৃদ্ধের  দু’চোখ  বেয়ে জলধারা   নামছে । এমন   বুদ্ধিমান , বীর ব্রাক্ষ্মণকে খুব অসহায় মনে  হল । মুহূর্তে  সে যেন ভেঙে গিয়েছে ।  ইন্দ্রের  বজ্রাঘাত সহ্য  করলেও , নিজের মেয়ের এই বিশ্বাসঘাতকতা  মানতে পারছে না। 

-আপনি বিশ্বাস  করুন , দেবযানী  চেয়েছিল  দেবতা আর অসুরদের  মধ্যে বিরোধ  মিটুক ।  তাই হয়ত  , আমাকে   এই বিরোধের  উৎস কেন্দ্রে   পৌঁছিয়ে  দিয়েছে  ! 

ধীরে – ধীরে শুক্রাচার্য  মাথা তুলল , মৃদু  হেসে বলল 
-ভালো  উপায়   বলেছ ,    শান্তি  প্রস্তাবে  সম্মত   না হয়ে , নিজের হাতের অস্ত্র  শত্রুর  হাতে তুলে  দিয়ে বলব ,  যুদ্ধ   চাইনা । এটাকে  কাপুরুষতা বলে । আমি রাক্ষস জাতিকে সন্ধির  পথ দেখাতে পারি , আত্মসমর্পণের  নয় । 
-আপনি উত্তেজিত হয়ে পড়ছেন । আমি বলছি  , দেবতাদের থেকে আপনাদের  ভয় নেই ।
- ভয়  ! ! ওরা  অন্যের সম্পদ  দখল করবে । ওরা অন্যকে বশ করবে । ওদের  ও ঔপনিবেশিক    সাম্রাজ্যবাদ  মানসিকতার   বিরুদ্ধেই আমার লড়াই । আজীবন । আমি শেষ  জীবন  পর্যন্ত  লড়বই ।  আমার  চিতার  আগুনেও  দেব বিরোধীতা র উত্তাপ । এত  সহজে  আমি  হারতে রাজি নই । 

কচের ফর্সা মুখ আশঙ্কার  ঘামে ভিজে গিয়েছে । সে জানে এখান থেকে বেঁচে ফেরা সম্ভব নয় ।   তার দিকে তাকিয়ে শুক্রাচার্য  বলল 
-মৃত্যু  জীবনের  চেয়েও দামী  ।   এত সহজে  মুক্তি পাওয়া যাবেনা । আমার মেয়েকে আমার বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছ । এতে আমি তোমার  দশ দোষ দেখিনা । তুমি তোমার  পরিচয়  আশ্রয়দাতাকে   দিয়েছিলে । তুমি বিশ্বাস  ঘাতক  নও । আমার মেয়ে যাকে  আমি  সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস  করেছিলাম , সেই  বেইমানী  করেছে ! মৃত্যু  দণ্ড  তোমার প্রাপ্য  নয়  কচ ,  দেবযানীর  প্রাপ্য । 
- আপনি দেবযানীকে  হত্যা করবেন  না ।
- এটা ঠিক  আমি ওর উপর  রেগে আছি । এটাও  ঠিক  দেবযানী  বিশ্বাস  ঘাতক । আবার এটাও  ঠিক  আমার  অন্ধ স্নেহ  , আমাকে  চরম  পথ নিতে বাধা দিচ্ছে ! 
-আমি দেবযানীর  প্রতি চিন্তিত ।
-ভালোবাসো ?
- দেখুন  , ভালোবাসা  এক স্বতঃপ্রণোদিত  অনুভূতি । এটা   এমন আবেগ , যা না চাইলেও  সৃষ্টি  হতেই পারে । আমার মনে দেবযানীর  প্রতি তেমনই  অনুরাগ জন্মেছে। আপনার কাছে  আমার স্বীকার  করতে অসুবিধা নেই , আমরা আপনার অবর্তমানে  , ওঁর ঋতুকালীন  নিরাপদ দিন গুলোতে মিলিত হতাম ।  মেয়েদের  রজঃস্রোতের  গন্ধের  সাথে  , সেই প্রথম আমায়  পরিচয়  করায় । তাঁর ঠোঁটে  আমি  গরম জলে  ফুটন্ত  আপেলের  স্বাদ পেয়েছি ।  আমাকে নেশায় আচ্ছাদিত করেছিল ! আমার  পীঠে  দেবযানীর  নখের  আঁচড়  আছে ,  দেওয়ালে চিত্রিত  মানচিত্রের মতনই   শোভা পাচ্ছে  ! এত কিছু নিয়েও বলব , আমি দেবযানীকে  বিবাহ করতে সম্মত নই । আমাদের দেহ  মিলিত হয়েছিল ,  অনেক আনন্দ মুহূর্ত  একসাথে কাটিয়েছি । আমি তাকে এক কণাও   ভালবাসতে পারিনি ! এই অপরাধ আমার । 
-অপরাধ !
-পৃথিবীতে  ভালবাসতে  না পারাটা  অপরাধের । দেবযানীর  সাথে মিশতে – মিশতে  এতটুকু  বুঝে গিয়েছি , যুদ্ধ  মানুষের  মন থেকে কখনই  ভালোবাসার  অনুভূতিকে  মুছে দিতে পারেনা ।  আমরা কখনই  ভালবাসাকে ভুলতে পারব না , যা চেষ্টা করছি  , তা হচ্ছে    নিজের আবেগকে অস্বীকার  করা ।  
-তুমি তো দেবযানী কে ভালোবাসো  না ।   ওকে নিয়ে অত চিন্তিত কেন ?
-চিন্তা ভালোবাসার  অনেক গুলো উপসর্গের  মধ্যে একটি , তবে সেটাই  একমাত্র  নয়।  বিয়ে আমাদের মধ্যে সম্ভব  নয় , কোন  সামাজিক  সম্পর্কও  সম্ভব  নয় । 
- এর কারণ , দেবযানী  তোমার  থেকে বয়সে বড়  , তাই ? 
-আপনি ভালোভাবে জানেন ,  বয়সে বড়  মহিলাকে  পত্নী হিসেবে  গ্রহণ করবার  রীতি   এখনো  আর্য ভূমিতে  প্রচলিত নয় । আমি  দেবতাদের  বিরুদ্ধে  গিয়ে এমন কাজ করতে পারব না । আমার  সাহস নেই । দেবতারা  বিবাহ ব্যাপারটিকে  খুব  গুরুত্ব  দিয়ে দেখে । 
-একজন  বয়স্ক  মহিলার  সাথে সম্পর্কে  জড়াতে  পারো , তার  অনুভূতিকে ব্যবহার করে নিজেদের কার্য উদ্ধার  করতে পারো ।  তাকে  সমাজের বিপক্ষে গিয়ে  স্বীকৃতি  দেওয়ার সাহস নেই  ! এই তোমাদের বীরত্ব ? যুদ্ধ  ক্ষেত্রে  যে যুদ্ধ চলে , তা একদিন থেমে যাবেই । রণভূমিতে   রক্তের  দাগ শুকিয়ে যায় । সমাজে চিরটাকাল ধরে  , প্রচলিত   স্রোতের  বিপক্ষে লড়তে  গিয়েও ,রক্ত ঝরছে । সেই দাগ শুকাবেনা । তুমি  এতটাই  কাপুরুষ  ,   দীর্ঘ   সময়ের  যুদ্ধকে ভয় পাচ্ছ ।  কচ  , যে মেয়ে তোমাকে  ভালোবেসে  , নিজের এত বছরের  স্নেহ আর নিরাপত্তার   সম্পর্ককে  বাজি রাখল, তাকে এই সম্মান দিলে ! দেবতাদের  পক্ষেই  সম্ভব ।
-আপনি ঠিক  বলছেন ।  বিপ্র  আমার দিকটিও  ভাবুন । আমি  দেবযানীকে  ভালোবাসি, সে ভালোবাসা  স্বার্থহীন নয় ।  পৃথিবীতে  কোন  ভালোবাসাই  স্বার্থ  ছাড়া  হয়না । দেবযানী  আর আমার ভালোবাসার  মাঝখানে  যে স্বার্থ আছে , তা যুদ্ধের রণভূমিতেই  সীমাবদ্ধ । যদি  মানসিক  স্বার্থ  জড়িত  থাকত আমি  অবশ্যই  সমাজের বিরুদ্ধে গিয়ে লড়াই  করতাম । 
-তোমার প্রতি   ভালোবাসা  মানসিক  স্বার্থযুক্ত । এইরকম  অনুভূতিকেও  স্বার্থহীন  প্রেম বলে । তুমি এখনো নিজেকে দোষী  বলবে না ? 
-আমি দোষ করেছি গুরুদেব । আপনি ঠিক বলেছেন । আমরা কেউ ই কি  নিজেদের দোষ  অস্বীকার  করতে পারি ?
-মানে ? 
-আপনি দেবযানীকে পিতার নিরাপত্তা  দিয়েছেন ।  শিক্ষা দিয়েছেন । তার সাথে কখনোই  বন্ধুর মতন মেশেননি ।  নিজের ব্যক্তিগত   রেষারেষি আর যুদ্ধ কেন   দেবযানীর জীবনে কঠোর  অনুশাসনের   শৃঙ্খলে চাপিয়ে দিলেন ! সেই সময় যদি নিজের মেয়ের  মনের কথা জানতে চাইতেন । আপনার কাছে সে বলত । আমার মতন অচেনা এক  যুবকের  কাছে , শুধু  একাকীত্ব  ভুলবার জন্য  আসতে হত না। আপনি জানেন না , দেবযানীকে  নাচ – গান শেখাতে গিয়ে আমি বুঝেছি  , সে অসহায় । বড্ড  একা । তাহলে দৈত্য  গুরু শুক্রাচার্য , নিজের  দায়িত্ব  পালন করেন নি । তাই দেবযানীর  এই অবস্থার জন্য  , আমাকে এই  পর্যায়ে  পৌঁছানোর  জন্য  , নিজের  দোষটি  অস্বীকার  করবেন  না , আশা করি । আপনি জ্ঞানী  , বেদজ্ঞ , ন্যায়পরায়ণ ,  আর সহনশীল । আমি জানি আপনি সত্যিকে অস্বীকার  করেন না। 

দু’জনেই   চুপ করে থাকল ।  কচ  মাথা নিচু  করে আছে । শুক্রাচার্য  বলল 
-আমি আশা রাখছি  , তুমি দেবযানীর সামনে   নিজের অপারগতা  স্বীকার  করবে । আমি তোমায়  প্রাণ ভিক্ষা দিলাম । দেবতাদের  বলে দিও , অসুর  গুরু  শুক্রাচার্য  কোন  ভাবেই  দেবতাদের  বশ্যতা  মেনে নেবে না।



এখন  সন্ধ্যা । কিছুক্ষণ  আগেই দাসী  কক্ষে  আলোদানি   দিয়ে গিয়েছে । সেই আলোয় , কক্ষটি   সেজে উঠেছে !  যযাতি  নিজের শয়ন  কক্ষের  ভিতর , নরম গদির  উপর চিত  হয়ে শুয়ে, কপালে এক হাত রেখেছে , আরেক হাত চোখের  উপর  রেখে , শুক্রাচার্যের  কাছ থেকে শুনে নেওয়া  গল্প  গুলো ভাবছে । আজ সারাদিন সে শুক্রাচার্যের  কাছে ছিল। দেবযানীর প্রাক্তন প্রেমের  কথাও  সে জেনে গিয়েছে । এতক্ষণে বুঝতে অসুবিধা হল না , শুক্রাচার্য  নিজে থেকেই  শর্মিষ্ঠাকে যযাতির সংসারে পাঠিয়েছিল , দেবযানীকে  নজরে  রাখবার জন্য । এক সময়  নিজের মেয়েকে  গোপনে  হত্যাও  করতে চেয়েছিল ।  দেবযানী  বিপদজনক  , এই মুহূর্তে  অসুরদের জন্য । আমৃত্যু  পর্যন্ত  , দেবযানী  দোষী ।

কচ  বুঝতে পেরেছে  , শুক্রাচার্য   ছোটবেলা থেকেই দেবযানীকে  যথেষ্ট  স্নেহে লালিত করেছে , কন্যার  সাথে  যে বয়সে বন্ধুত্ব হয়ে উঠতে হয় , সে ছিল  রুক্ষ    কর্তব্যপরায়ণ  পিতা । দেবতাদের  বিরুদ্ধে  যুদ্ধ করতে গিয়ে  , তাঁর  জীবনের  অর্ধেক  অনুভূতি  নষ্ট  হয়ে গিয়েছে । এই সুযোগের  ব্যবহার  করে ফেলল  কচ ! দেবযানী  তাকে সব কিছু দিয়েই ভালোবেসে ছিল , অথচ সে হয়ত  দেবযানীকে পুরোপুরি  ভালবাসতে পারেনি! দেবতাদের  কাছেও  সে বিপদ জনক ।

যযাতি ভাবল , কিন্তু  আজকের  পরেও  কি   সে   দেবযানীকে আগের মতন বিশ্বাস  করতে পারবে ? সে নিজে একাধিক নারী  সঙ্গে  অভ্যস্থ  হলেও , দেবযানীর  একজন পুরুষের কাছে আত্মসমর্পণ  মেনে নিতে পারছে না ।পারবেও না ।

কচ , শুক্রাচার্য , যযাতি  -- নিজেদের  দায়ী  করল  না। তারা নিজেদের অক্ষমতাকে  স্বাভাবিক  ভাবেই   মেনে নিয়েছে , যুদ্ধরীতি  বা জীবন  রীতির  দোহাই  দিয়ে ।  শুধু দেবযানীই   ভারতীয়  সমাজে বিশ্বাসের যোগ্য  নয় । তার দোষ  অনেক ।

সে ভালবেসেছে , একাকীত্ব  থেকে মুক্তির পথ খুঁজেছে ,  নিজের  অবস্থানের  জন্য পরিণামের  চিন্তা না করে নির্ভরযোগ্য  যোদ্ধা  হয়েছে । 



Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.