x

আসন্ন সঙ্কলন

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ২৮, ২০১৭

বনবীথি_পাত্র

sobdermichil | ডিসেম্বর ২৮, ২০১৭ |
তুষের আগুন
হুন্ হুনা.......হুন্ হুনা.......

কাটা ধান গাছের মেঠো পথের আল ধরে পালকি চলেছে । পশ্চিম দিগন্তে দিবাকর ঢলছে ।

সেই রঙে লাল ঝালরের আড়ালে লজ্জারাঙা কিশোরী কনে ।

পাশে পাশে হেঁটে চলেছে সদ্যযুবক বর । এ গাঁয়ে এখনো পালকির চল্ থেকেই গেছে ।

দূর থেকে এই দৃশ্য দেখছে গাঁয়েরই এক পূর্ণযুবতী , চন্দ্রলতা । সেওতো বছর আটেক আগে এমনি পালকিতেই চলেছিল । ভাবতে ভাবতে মাথাটা কেমন যেন ঘুরতে থাকে !

সেদিনও কোপাই নদীর তীর দিয়ে এমনি করেই পালকি চলছিল , তখন ভরা অঘ্রাণ মাস । দুধারে ক্ষেত ভরা পাকা ধান কাটা চলছে । পালকির পরদাটুকু ফাঁক করে বাইরে তাকায় চন্দ্রলতা । ইস্ কি লজ্জা , একেবারে চোখাচোখি ঘনশ্যামের সাথে । শুভদৃষ্টির পর এই প্রথমবার দুজনের চোখাচোখি । বরবেশে পালকির পাশে পাশে হেঁটে হেঁটে চলেছে নতুন বর । তবে যে ছোটবেলায় পড়েছিল , বিয়ের পর বৌ পালকিতে যায় আর বর যায় ঘোড়ায় চেপে । ধুস্ বইএর লেখা সব সত্যি হয় নাকি !!!! নিজের ভাবনাতে নিজেই হেসে ফেলে চন্দ্রলতা । ঘনশ্যামকে ঠিক রাজপুত্তুরের মতো দেখতে নয় , রঙটা ময়লা তবে পেটানো শক্তিশালী চেহারা । কাল সবে বিয়ে হয়েছে আর এরমধ্যেই যেন মানুষটাকে ভালোবেসে ফেলেছে । লজ্জা আর ভয় বুকে নিয়ে শ্বশুরের ভিটেতে পা রেখেছিল চন্দ্রলতা । সতেরো বছরের চেনা পরিবেশ ছেড়ে নিজের সংসারে । মা বারবার বলে দিয়েছিল ওটাই তার নিজের সংসার । শ্বশুর-শাশুড়ি ই এখন থেকে তার বাপমা আর ঘনশ্যাম তার আপন মানুষ , জনম-মরণের সাথী । তবু মায়ের জন্য বুকটা হা-হুতাশ করতো থেকে থেকে , মনটা ছুটে ছুটে যেতে চাইত কোপাই নদীর চরে । শ্বশুরমশাই মানুষটি বড্ড রাশভারী , পয়সার গুমোরটা একটু বেশি । গরীবের মেয়ে বলে একটু যেন ট্যারা চোখেই দেখেন ওকে । ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে যেন উদ্ধার করেছেন চন্দ্রকলাকে । শাশুড়ী মানুষটা এমনি ভালোই তবে ছেলে-বৌমার বেশি ভাব দেখলেই যেন মেজাজ খিঁচড়ে ওঠে তার , এই বুঝি তাঁর ছেলে পর হয়ে গেল । ঘনশ্যামের রোমশ বুকে মাথা রাখলে অবশ্য সব মনখারাপ ভুলে যেত চন্দ্রলতা । অল্প লেখাপড়া জানা গাঁয়ের মেয়ে , সংসারের কাজকর্ম-রাঁধাবাড়া শিখে নিতে বেশি সময় নেয়নি । পাড়া প্রতিবেশীতেও বলতো , লক্ষ্মীমন্ত বৌ ।

বছর ঘুরতেই শাশুড়ির মুখভার , এতদিনেও কোন খুশির খবর না পাওয়ার জন্য । বয়স হচ্ছে এখন কোথায় নাতি-নাতনির সাথে খেলাধূলো করবেন , ওনার পোড়া কপালে নাকি সে সুখটুকুও নেই ।

শ্বশুরমশাই বংশধর চান ।

সন্তান তো ঘনশ্যাম ও চায় , চন্দ্রলতাও তো চায় মা হতে.....কিন্তু সন্তান আসছে কৈ !!!!

শুরু হলো ঠাকুর-দেবতা-তাবিজ-কবচ , কিছুতেই তো কিছু হচ্ছে না !!!! পাড়া-প্রতিবেশী-আত্মীয়স্বজনের মুখে চাপা ফিসফাস , ঘনশ্যামের বৌটা একটা বাঁজা মেয়েমানুষ । যৌবন ফেটে পড়ছে অথচ তিনবছরে একটা সন্তান দিতে পারলো না ঘনশ্যামকে । এমন মেয়েমানুষের মুখদর্শন ও নাকি পাপ ।

মনে মনে কষ্ট পেলেও কিছু করার ছিলনা চন্দ্রলতার । মা বলেছে , মেয়ে হয়ে যখন জম্মেচে অনেক কিচু সহ্য করতে হবে । টিভিতে একটা সিনেমাতে চন্দ্রলতা দেখেছিল , ডাক্তার দেখিয়ে কত বছর পর একটা বৌয়ের বাচ্চা হয়েছে । তাই একদিন রাতে চুপিচুপি ঘনশ্যামকে বলছিল , দুজনে মিলে গিয়ে একবার শহরের বড়ো ডাক্তার দেখানোর কথা । ঘনশ্যাম প্রথমে রাজি না হলেও শেষ অবধি রাজি হয়েছিল । কিন্তু ডাক্তার দেখানোর কথা ঘনশ্যাম তার মাকে বলতেই যেন অশান্তির ঝড় উঠলো বাড়িতে । "ঘরের বৌ কিনা লজ্জাশরম ভুলে যাবে শহরের ডাক্তারের কাছে !! পেটে বাচ্চা আসতে সোয়ামীকে লাগে , ডাক্তারকে লাগে না । আমার অমন সুপুরুষ ছেলে ঘরে থাকতে বৌ যাবে শহুরে ডাক্তারের কাছে !!!!" বৌয়ের আঁচলধরা বলে ঘনশ্যামকে কম কথা শুনতে হয়নি । ঘনশ্যাম নাকি ম্যাদামারা পুরুষ মানুষ , চন্দ্রলতার রূপে মজে বোধবুদ্ধি লোপ পেয়েছে । নাহলে এমন বাঁজা মেয়েমানুষকে বিদায় করে নতুন বৌ আনতো ঘরে ।

সময় কেটেছে আপন গতিতে , সবার প্রিয় লক্ষ্মীমন্ত বৌ ততদিনে বাঁজা মেয়েমানুষ ।

দু-তিনটে গাঁ পেরিয়ে ময়ূরাক্ষীর তীরে নাকি এক সাধুবাবা এসেছেন , তিনি নাকি অসাধ্য সাধন করতে পারেন , মরা গাছেও ফুল ফোটাতে পারেন । 

ঠাকুর-দেবতা-ফকির-সাধু সবেতেই ভক্তি চটে গিয়েছিল চন্দ্রলতার । তবু শ্বশুর-শাশুড়ি এমনকি ঘনশ্যামেরও ইচ্ছা একবার সেই সাধুর কাছে চন্দ্রলতাকে নিয়ে যাওয়ার । কদিন থেকে চন্দ্রলতার শরীরটা ভালো নেই , মাথাটাও কেমন যেন ঘোরঘোর লাগছে । অনেকটা পথ হেঁটে যেতে হবে সাধুবাবার কাছে । তবু যেতে আপত্তি করেনি , তার মতো মেয়েমানুষের মুখে কি আর প্রতিবাদ মানায় !!!! 



গ্রামের মেঠো পথ , মানুষজন কম , যাতায়াতের তেমন কোন যানবাহন নেই । তবে দুটো একটা ভ্যানরিক্সা আছে হয়তো । কিছুটা পথ হেঁটেই সেদিন বারবার হাঁপিয়ে যাচ্ছিল চন্দ্রলতা । ঘনশ্যাম ওর হাতটা শক্ত করে ধরেছিল , ভ্যানরিক্সাও করতে চেয়েছিল । রাজি হয়নি চন্দ্রলতা । শাশুড়ীর কানে খবরটা গেলে পাড়া মাথায় করবে চেঁচিয়ে , চোদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করে দেবে চন্দ্রলতার । ঘনশ্যামের জন্য বড্ড মায়া হয় ওর , মানুষটা চন্দ্রকেও ভালোবাসে আবার মায়ের কথার প্রতিবাদ ও করতে পারে না । 

আজো মনে পড়ে সাধুবাবার কাছে মানুষের লম্বা লাইন । সবাই বোধহয় এসেছে মরা গাছে ফুল ফোটাতে । চন্দ্রলতাকে দেখে সাধুবাবা বলেছিল , মেয়ে হয়ে জন্মেছিস আর মা হবি না তাও কি হয় !!!! আগামী অমাবস্যায় আসবি একটা লালশাড়ি আর তিনটে তামার পয়সা নিয়ে । তারপর দেখি তোর মা হওয়া কে আটকায় !!!!

সাধুবাবার কথায় চন্দ্রলতা আর ঘনশ্যামের মনে খুশির ছোঁয়া । 

হেমন্তের বেলা পড়ে আসে তাড়াতাড়ি । সূর্য ডুবছে ময়ূরাক্ষীর কোলে , এখনি আঁধার নামবে । বড্ড দেরী হয়ে গেল সাধুবাবার কাছে । একটু জোরেই বাড়ির দিকে পা চালায় দুজনে । তাড়াতাড়ি হবে বলে বনবাংলোর রাস্তাটা দিয়ে আসছিল দুজনে । মাঠভরা পাকা ধান থেকে একটা মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছিল নাকে । ঠিক তখনি........

চন্দ্রলতা বা ঘনশ্যাম কিছু বুঝে ওঠার আগেই , হিংস্র জন্তুর মতো ওরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল চন্দ্রলতার শরীরটার ওপর । ঘনশ্যামকে পিটুলি গাছটাতে বেঁধে ওর চোখের সামনে তিন-তিনটে মানুষ ছিঁড়েখুড়ে খেয়েছিল চন্দ্রলতাকে । ঘনশ্যাম আপ্রাণ চিৎকার করছিল কিন্তু ঐ ফাঁকা জায়গায় কে শুনবে সে চিৎকার !!!! তবু কেমন করে জানি বনবাংলোর মানুষগুলো শুনতে পেয়েছিল । কিন্তু তেনারা যখন এসে পৌঁছায় সব শেষ । পশুগুলো সব লুঠ করে হারিয়ে গেছে আঁধারে । বনবাংলোর চৌকিদারের টর্চের আলোয় সবার চোখে পড়েছিল রক্তাক্ত চন্দ্রলতার নগ্ন দেহটা । বনবাংলোর গাড়ি করেই ওকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল স্বাস্থ্যকেন্দ্রে । চন্দ্রলতার শরীরের অবস্থা ভালো বোঝেননি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তারবাবু । সাথে সাথেই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন শহরের হাসপাতালে । আর কিছু মনে নেই চন্দ্রলতার , জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল ।

জ্ঞান ফিরেছিল যখন তখন সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা , হাতে ছুঁচ ফোটানো স্যালাইন চলছে । গতরাতের কথা মনে পড়তেই লজ্জা-ঘেন্না আর আতঙ্কে দুচোখ বন্ধ করে ফেলেছিল চন্দ্রলতা । বাপ-মা খবর পেয়ে ছুটে এসেছে হাসপাতালে । এ কি সব্বোনাশ হয়ে গেলো তাদের আদরের দুলালীর !!!!!

এতো যন্ত্রণাতেও ডাক্তারবাবু একটা খুশির খবর দিয়েছেন , চন্দ্রলতার শরীরে তার সন্তান বড়ো হচ্ছে তিলতিল করে । অমন অবস্থায় শরীরের ওপর এমন ঝড় বয়ে গেছে চন্দ্রলতার , বাচ্চা না হওয়া অবধি খুব সাবধানে থাকতে হবে ওকে ।

চন্দ্রলতার দুটো চোখ বারবার ঘনশ্যামকে খুঁজছিল । ভয় হচ্ছিল সেরাতে মানুষটার কিছু ক্ষতি করেনি তো জানোয়ারগুলো !!!!!!

শেষ অবধি মায়ের মুখে জানতে পেরেছিল , শ্বশুরমশাই বলে দিয়েছেন নষ্ট মেয়েমানুষকে আর ঘরে তুলবেন না তিনি । শাশুড়ী ছেলেকে দিব্যি দিয়েছেন , ঐ বৌয়ের সাথে সম্পর্ক রাখলে মা-বাপের মরা মুখ দেখবে ঘনশ্যাম । চন্দ্রলতার পোয়াতি হওয়ার খবরটা ওর শ্বশুরবাড়িতে দিতে চেয়েছিল মা-বাপ । চন্দ্রলতা রাজি হয়নি । যে সংসারে তার মতো নষ্ট মেয়ের জায়গা নেই ওর সন্তানও যাবে না সেখানে ।

বাপ-মায়ের সাথে হাসপাতাল থেকে ফিরে এসেছিল নিজের বাড়িতে ।

চন্দ্রলতার মেয়েকে দেখতে হয়েছে ঘনশ্যামের মতো । যতবার মেয়েকে দেখে মানুষটার প্রতি ঘেন্নায় মন ভরে যায় চন্দ্রলতার । সে রাতের ঘটনাতে তো চন্দ্রলতার কোন দোষ ছিলনা , যা ঘটেছির তার চোখের সামনেই । তবু মানুষটা তাকেই ত্যাগ দিল !!!! কাপুরুষ কোথাকার । সেই রাতের জানোয়ারগুলোর থেকেও বেশি ঘেন্না হয় ঘনশ্যামকে । রাগে দুটো চোখ যেন দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে , মাথাটা ঘোর ঘোর....

কি রে মেয়েটাকে আজ ইস্কুলে ভর্তি করতে নিয়ে যাবি তা নয় তুই এখানে দাঁড়িয়ে কি করছিস্ ?

মায়ের ডাকে যেন চমকে ওঠে চন্দ্রলতা । 

মা তখনো বলেই চলেছে , দিদিমণি আগের দিন কিন্তু বারবার বলেছে ইস্কুলে ভর্তি হতে বাপের সই লাগবে । যদি ইস্কুলে ভত্তি না নেয় !!!! বাপ থাকতেও মেয়েটা মুখ্খু হয়ে থাকবে !!!!

মায়ের মুখের দিকে একবার কটকট করে তাকায় চন্দ্রলতা , ওর জন্মের আগেই ওর বাপ মরে গেছে । 

আর না দাঁড়িয়ে হাঁটা দেয় বাড়ির দিকে ।

মেঠো পথ ধরে পালকি ততক্ষণে অনেক দূরে । শুধু ক্ষীণসুরে ভেসে আসছে হুন্ হুনা.......হুন্ হুনা.......

#

মা ওমা তুমি এখনো রান্নাঘরে !!!! তৈরি হওনি এখনো !!!! দেখো তো দশটা বাজতেই চললো....

মেয়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই চন্দ্রলতা ভাতের থালা হাতে হাজির । 

এই নে আগে দুটো খেয়ে নে তো , সারাটা দিন তো নাহলে পেটে কিচ্ছুটি পড়বে না ।

মা একটা দিন তো , বাইরেই কিছু খেয়ে নিতাম । তুমি চটপট তৈরি হয়ে নাও , আর দেরি কোরো না প্লিজ....

আমার এইসব একদম ভালো লাগছে না খুকু । এতোবছর পরে এসবের কি দরকার বলতে পারিস্ ? তুই মানুষ হয়েছিস , ভগবান তোকে সুস্থ রাখুন আমার আর কিছু চাওয়ার নেই জীবনে ।

তোমার না থাকুক , আমার আছে । আমার মায়ের মানসম্মানের দাম আমার কাছে সবথেকে বেশি । সেই ছোট থেকে তোমাকে শুধু সবার থেকে মুখ লুকিয়েই থাকতে দেখেছি । আসল কথাটা কখনো আমাকে জানতেও দাওনি । তোমার নিজের জন্য না যাও , আমার জন্য আজ তোমাকে যেতেই হবে মা ।

মেয়ের বাপের পরিচয় কখনো মেয়েকে জানতে দেয়নি চন্দ্রলতা । সে ছোট থেকেই জেনে এসেছে তার জন্মের আগেই তার বাপ মরে গেছে । কিন্তু বড়ো হওয়ার পর কানাঘুঁষো তো তার কানে আসতোই , সে নাকি অত্যাচারের ফসল - তার নাকি বাপের ঠিক নেই । মেয়ে ঘরে এসে কান্নাকাটি করতো , মা-দিদিমাতে কত বুঝিয়ে শান্ত করতো মেয়েকে । সব কথাগুলো যেন পর পর ছবির মতো মনে পড়ছে চন্দ্রলতার । 

মেয়েটা লেখাপড়ার মাথাটা পেয়েছিল বাপ-ঠাকুর্দার মতো । অভাবের সংসারে থেকে কলেজ পাশ দিয়েছে । শহরে গিয়ে কিসব কম্পুটার শিখেছে । শেষ অবধি একটা চাকরীও পেয়েছে খুকু । বড়োসড়ো চাকরী নয় , তবে চন্দ্রলতাদের মতো অভাবী সংসারে ঐ ঢের । যেদিন খুকুর চাকরীর খবরটা পেয়েছিল চন্দ্রলতা , জীবনে প্রথমবার বোধহয় অত আনন্দ হয়েছিল ।

কিন্তু কখনো চায়নি এমন জটিলতা আসুক খুকুর জীবনে । নিজের অতীত ওদের মা-মেয়ের জীবনটাকে আবার এমন অগোছালো করতে সামনে আসার কি দরকার ছিল !!!!! 

খুকু যেখানে চাকরী করে সেখানে নাকি অমন পরীক্ষে-নিরিক্ষে হামেসাই হয়ে থাকে । তাই বলে এই ঘটনাও ওখানেই আসতে হলো !!!!! নাকি এটাই বিধাতার ইচ্ছে !!!! তিনি তো সবার আড়ালে নিজের খেলা খেলেন , তাঁর খেলা বোঝার সাধ্যি কার !!!! তা নাহলে খুকুর মুখে কেন তার বাপের আদলই থাকবে । আর সে ছেলেকেও তো শুনছি নাকি দেখতে হয়েছে শ্যামল ঠাকুরপো মতো । এ বিধাতার খেলা ছাড়া আর কি বা হতে পারে !!!!

চলো মা এবার আমাদের নামতে হবে ।



খুকুর কথায় হুঁশ ফেরে চন্দ্রলতার । আগে কোনদিন শহরে আসেনি , জীবনে এই প্রথমবার শহরে আসছে মেয়ের হাত ধরে । খুকু গল্প করে শহরে নাকি মেলা গাড়িঘোড়া - মেলা মানুষজন , হুসহুস করে প্লেন ছোটে আকাশ দিয়ে , মাটির তলা দিয়ে নাকি রেলগাড়ি চলে । কেমন যেন ভয়ভয় করতে থাকে চন্দ্রলতার , শক্ত করে খুকুর হাতটা চেপে ধরে ।

স্টেশনে গিজগিজে মানুষের ভিড় । ভারি আশ্চর্য লাগে চন্দ্রলতার । তেইশ বছর ধরে তিনটে গাঁ দূরে থাকা বাপকে লুকিয়ে রাখলো মেয়ের থেকে , এই এতো মানুষের ভিড় থেকে সেই বাপের সন্ধান পেয়ে গেল খুকু !!!!

স্টেশন থেকে বেরিয়ে আবার বাসে চাপতে হয়েছে ।

খুকু বোধহয় বুঝতে পারছে চন্দ্রলতার বুকের ধুকপুকুনিটা ।

তুমি শুধু শুধু ভয় পাচ্ছো মা । তুমি এমন মুখ করে আছো যেন কোর্ট-থানা-পুলিশ করতে যাচ্ছো । আজ তোমার এতবছরের মিথ্যে অপবাদের গ্লানি থেকে মুক্তির দিন । জানো তো ডাঃ গাঙ্গুলি খুব ভালো মানুষ , উনি না থাকলে এতোকিছু আমি একা কোনমতেই করতে পারতাম না । তবু একটু সাহস দিতেই মায়ের হাতটা নিজের মুঠোয় ধরে খুকু ।

বিশাল একটা ঘর , চারদিকে কাচ দিয়ে ঘেরা আর ভারী ভারী পর্দা , ঠান্ডা মেশিন চলছে বলে হিমহিম ঠান্ডা চারদিকে । কাপড়ের আঁচলটা গায়ে টেনে নেয় চন্দ্রলতা । সারসার দিয়ে কতো গদিআঁটা চেয়ার , সামনে কাচের টেবিলে বইখাতা ছড়ানো ছিটানো । দু-তিনজন মানুষ বসে আছেন । কি ভীষণ চুপচাপ চারদিক । খুকু এইখানে কাজ করে !!!! কথাটা ভাবতেই চন্দ্রলতার বেশ গর্ব হয় খুকুর জন্য । চন্দ্রলতাকে বসিয়ে ভেতরে গেছে খুকু । বুকের মধ্যিখানটা নাকি পেটটা নাকি গলার কাছটা , সব জায়গাতেই যেন কেমন একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি হচ্ছে । মনে হচ্ছে কিছুটা বমি হলে বোধহয় শান্তি হতো । 

ঘনশ্যাম আবার যে বিয়ে করেছ খবরটা চন্দ্রলতা অনেকদিন আগেই পেয়েছিল । এবার নাকি লেখাপড়া জানা বড়োলোকের মেয়েকে বৌ করেছিল । শেষ অবধি এতোবছর পর সেই বৌয়ের চরিত্র নিয়েও এমন টানাটানি উঠলো যে এতো পরীক্ষে-নিরিক্ষে করাতে হলো !!!! আর এক রাতের দুর্ঘটনাতে চন্দ্রলতা নষ্ট মেয়েমানুষ হয়ে গিয়েছিল সেদিন !!!!

শ্যামল ঠাকুরপোর চরিত্রটা মোটেও ভালো ঠেকতো না চন্দ্রলতার । দু-চারবার তার সাথেও ঘনিষ্ঠ হতে চেয়েছিল , বুদ্ধি করে এড়িয়ে গিয়েছিল চন্দ্রলতা । শাশুড়ির আদরের ভাইপো বলে শাশুড়িকে কিছু বলতে পারেনি কিন্তু ঘনশ্যামকে বলেছিল কথাটা ।

ওনারা ভেতরে আছেন , তুমি ভেতরে চলো মা ।

চমকে ওঠে চন্দ্রলতা , এতোবছর পর আবার মানুষগুলোর মুখোমুখি হতে হবে ? একটা ভয় , জমাট বাঁধা অস্বস্তি আর অসহ্য ঘৃণা যেন চন্দ্রলতার সারা মন জুড়ে । 

আমার না গেলেই কি নয় রে খুকু ?

কিচ্ছু হবে না , আমি তো তোমার সাথে আছি মা । আমার ওপর একটু ভরসা রাখো । তুমি এই পর্দার আড়াল থেকে পুরোটা দেখো এখন , আমি যখন ডাকব ভেতরে যাবে ।

ঘনশ্যামের চুলে পাক ধরেছে । শ্বশুরমশাই তো বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন , দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে তেজ আর নেই । শ্যামল ঠাকুরপোর ও সেই ডাকাবুকো চেহারা আর নেই । আর ঐ বছর কুড়ির ছেলেটাই কি তবে ঘনশ্যামের এপক্ষের ছেলে ? চন্দ্রলতার বিয়ের সময় শ্যামল ঠাকুরপোকে দেখতে যেমন ছিল , ঠিক তেমনটাই লাগছে দেখতে । এ যে শ্যামল ঠাকুরপোর ছেলে সে তো রাতের আঁধারে দেখেও বোঝা যাবে , এরজন্য আবার এতো ডাক্তারী পরীক্ষার কি আছে !!!! মুহুর্তে চন্দ্রলতার চোখ যেন যাচাই করে নেয় ঘনশ্যাম আর খুকুর মুখটাকে । একরকম কাঁচকাঁচ রং-লম্বা নাক আর ছোট ছোট চোখগুলো ।

খুকু বলেছিল বটে কি ডিএনএ না কি যেন পরীক্ষে হয়েছে । ডাক্তারি রিপোর্টে ঘনশ্যামের সাথে ওর ছেলের জিনের মিল পায়নি । উল্টে ছেলের জিন মিলেছে শ্যামল ঠাকুরপোর সাথে । শ্বশুরমশাই সেখানেই তম্বিহম্বি শুরু করে দিয়েছেন , ঘনশ্যাম মুখে একরাশ বিরক্তি আর ঘৃণা । শ্যামল ঠাকুরপো তখনো সাফাই গাইছে । সবথেকে অসহায় লাগছে ছেলেটাকে । ওর কাঁচুমাচু মুখখানা দেখে কষ্ট লাগছে চন্দ্রলতার । আহা রে , ও বেচারার কি দোষ !!!!

ডাক্তারবাবু কি সব বলছে ইংরাজীতে আর খুকু পাশে কম্পুটারে কি সব করছে ।

এখানে উত্তেজিত হয়ে চিৎকার চেঁচামিচি করবেন না । ডাক্তারবাবুর কথায় চুপ করে সবাই ।

আপনাদের কটা কথা বলবো চুপ করে শুনুন প্লিজ ।

আজ থেকে তেইশ বছর আগে এক অন্ধকার গ্রামের পথে এক মহিলা ধর্ষিতা হন । আপনারা নিশ্চই মানেন , যে ধর্ষিতা হয় তার কোনো অপরাধ থাকে না । সেটা তার জীবনের একটা দুর্ঘটনা ছাড়া কিছুই না । অথচ কি আশ্চর্য দেখুন এই মেয়েটির মা ধর্ষিতা হয়েছিলেন বলে , ওর বাবা ওর মাকে ত্যাগ করেছিল ।

দেখুন তো একে আপনারা চেনেন কিনা । এর মুখটা কি একটুও চেনাচেনা লাগছে আপনাদের ?

এতক্ষণ ডাক্তারবাবুর কথার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছিল না কেউ । এতক্ষণ নিজেদের টেনশনে বোধহয় কেউ খেয়াল করেনি খুকুকে । কিন্তু খুকুকে দেখেই যেন চমকে ওঠে ঘনশ্যাম আর ওর বাবা । 

আপনারা চমকে উঠলেন তো !!!!

প্রথমদিন ঘনশ্যামবাবুকে দেখে ও ও ঠিক এভাবেই চমকে উঠেছিল । আমাকে বলেছিল ওর মায়ের জীবন কাহিনী । আর ওর কৌতুহলের নিরসন করতেই আমি ঘনশ্যামবাবু আর ওর ডিএনএ টেস্টটাও করেছি । আর এই দেখুন , কি অদ্ভুত ভাবে মিলে গেছে দুজনের রিপোর্ট ।

রিপোর্টটা হাতে নিয়ে চমকে ওঠে ঘনশ্যাম ।

যাও তোমার মাকে ভেতরে নিয়ে এসো , আশা করি ওনারা চিনতে পারবে ।

চন্দ্রলতাকে দেখে হতবাক ঘনশ্যাম আর শ্বশুরমশাই দুজনেই । 

এতোবছর পর এই পরিস্থিতিতে কারোরই যেন কোনো কথা বলার ক্ষমতা নেই । কি অসহায় ভাবে চন্দ্রলতার দিকে তাকিয়ে ঘনশ্যাম । 

আমার ভুল হয়েছে , ঘরে ফিরে চলো বৌমা । নীরবতা ভেঙে প্রথম কথাটা শ্বশুরমশায়ই বললেন । এই মানুষটাই একদিন নষ্ট মেয়েমানুষ 'চন্দ্রলতা'কে ঘরে তুলতে অস্বীকার করেছিল ।

খুকুর হাতটা চেপে ধরেন উনি , ক্ষমা করে দে দিদিভাই । তোর নিজের বাড়িতে চল্ এবার । ও কুলাঙ্গারের ছেলে জাহান্নামে যাক , সে নচ্ছাড় মেয়েমানুষকেও আজ বাড়ি থেকে লাথি মেরে বের করে দেবো । আমার যা কিছু সব তো তোর দিদিভাই । তুই যে আমার ঘনার মেয়ে ....

আরো কিছু বলতেন হয়তো উনি , তার আগেই হাত ছাড়িয়ে নেয় খুকু । 

আমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার তো কিছু নেই , অন্যায় তো করেছেন আমার মায়ের সাথে । ক্ষমা চাইতে হলে তার কাছে চান । অবশ্য ক্ষমা করবেন কি না সেটা মায়ের ইচ্ছা ।

আর সম্পত্তির লোভে আমি আমার পিতৃপরিচয় খুঁজে বের করিনি । আমি আমার মায়ের পরিচয়ে বড়ো হয়েছি আর মায়ের পরিচয়েই বেঁচে থাকব । আমি শুধু মাকে দেওয়া মিথ্যা অপবাদটুকু মুছতে চেয়েছিলাম ।

আমার মা গঙ্গার মতো পবিত্র , নোংরা স্পর্শে আমার মা নষ্ট হয়না ।

অমন সুন্দর করে কথা বলছে তার সেই ছোট্ট খুকু !!!! খুকু কবে এতো বড়ো হয়ে গেছে যেন জানতেও পারেনি চন্দ্রলতা ।

চলো মা এবার আমাদের ফিরতে হবে । 

মেয়ের হাত ধরে বেরিয়ে আসছে চন্দ্রলতা । উফ্ কি শান্তি সারা বুকটাতে । এত বছর মিথ্যা অপবাদটা বইতে বইতে সত্যি যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল চন্দ্রলতা ।

চন্দ্র.......

বহুবছর পর পিছন থেকে ডাকটা শুনে থমকে দাঁড়ায় । 

কিছু কি বলতে চায় মানুষটা ?

তেইশ বছর আগে সেদিন তো কিচ্ছু বলেনি !!!! সবটুকু তো তার চোখের সামনে ঘটেছিল , তবু তো সে কাছে টেনে নিতে পারেনি চন্দ্রলতাকে !!!! ক্ষণিকের আবেগটা তিত্কুটে ঘৃণায় পরিণত হয়ে যায় ।

খুকু একটু দূরে দাঁড়িয়ে । হয়তো ভাবছে কিছু কথা হয়তো এখনো বাকি আছে ঐ দুটো মানুষের । ঘনশ্যামের সাথে সব কথা সেই তেইশ বছর আগেই শেষ হয়ে গেছে চন্দ্রলতার ।

চন্দ্রলতা এগিয়ে গিয়ে মেয়ের হাতটা ধরে , কি রে লাস্ট ট্রেনটাও ফেল করবি নাকি !!!!!!


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.