x

প্রকাশিত বর্ষপূর্তি সঙ্কলন

দেখতে-দেখতে ১০ বছর! শব্দের মিছিলের বর্ষপূর্তি সংকলন প্রকাশের সময় এ খুব অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু অজস্র লেখক, পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থনে আমরা অনায়াসেই পেরিয়ে এসেছি এই দশটি বছর, উপস্থিত হয়েছি এই ৯৫ তম সংকলনে।

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

রবীন বসু

sobdermichil | নভেম্বর ২৮, ২০১৭ |
জীবন দান
জোরে ব্রেক কশার শব্দে সচকিত হল পরমা । অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে বড়রাস্তার মোড়ে একটা ট্যাক্সির জন্য । একটার মধ্যে এয়ারপোর্টে রিপোর্ট করতে হবে, দুটো পাঁচে কলকাতা-ভুবনেশ্বর ফ্লাইট । বস মিঃ দত্ত আগেই পৌঁছে গেছেন । অনেক টাকার একটা নতুন অর্ডারের ব্যাপারে পার্টিকে প্রেজেনটেশন দিতে হবে । স্যার ওকেই সিলেক্ট করেছে সঙ্গে যাবার জন্য । 

কিন্তু এই দুপুর বারোটায় কলকাতায় ট্যাক্সি পাওয়া আর লটারি পাওয়া একই ব্যাপার । এরই মধ্যে ওই বিকট শব্দ করে একটা টাটাসুমো দাঁড়িয়ে পড়ল । সবাই গেল গেল করে দৌড়ে এল, এক বয়স্ক ভদ্রলোক রাস্তা পেরোচ্ছিলেন টাটাসুমো তাঁকে ধাক্কা দিয়েছে । পরমা দৌড়ে গেল গাড়িটার সামনে । ভদ্রলোক পড়ে আছেন, মাথা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে । সবাই দেখছে কিন্তু কি করবে কেউ বুঝে উঠতে পারছে না । কিছু লোক গাড়িটার ড্রাইভারকে নামিয়ে মারধোর করতে লাগল । ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ বলে উঠল, অ্যাক্সিডেন্ট কেস পুলিশে খবর দিতে হবে । 

পরমা দেখল ভদ্রলোক বেশি রক্তক্ষরণে কেমন নেতিয়ে পড়ছেন । এভাবে আর কিছুক্ষণ পড়ে থাকলে খারাপ একটা কিছু হয়ে যাবে । তাই আর দেরি করে না, রাস্তায় বসে পড়ে ভদ্রলোকের মাথাটা কোলে তু্লে নিয়ে ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে ওঁনার মুখে একটু জল দেয় । তারপর নিজের ওড়না দিয়ে ভদ্রলোকের জখম মাথা বেঁধে নেয় । 

— প্লিজ, আপনারা আমাকে সাহায্য করুন, এখুনি কোন নার্সিং হোমে নিয়ে যেতে হবে ওঁনাকে । পরমার গলায় আকুলতা আর উদ্বেগ ঝরে পড়ে । 

ভিড়ের মধ্যে থেকে এক অটোওলা এগিয়ে এল । 

— না দিদি, নার্সিংহোম না, পুলিশ কেস, তাই এনাকে সরকারী হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে । পরে থানাকে জানাতে হবে । গাড়িটার নম্বর নিয়ে নিয়েছি, এখন চলুন আমার অটোতে কাছাকাছি একটা সরকারী হাসপাতাল আছে । 

হাসপাতালের পথে যেতে যেতে আহত ভদ্রলোকের রক্তমাখা সজ্ঞাহীন মুখের দিকে তাকিয়ে পরমার নিজের বাবার কথা মনে পড়ল । বছর তিনেক আগে হঠাৎ বিনা নোটিশে চলে গেলেন । পরমা তখন কলেজে থার্ড ইয়ারে । সবে অনার্সের ক্লাস করে লাইব্রেরীতে গিয়ে বসেছে, এমন সময় মায়ের ফোন । বাবার অফিসে কাজের মধ্যে ম্যাসিভ অ্যাটাক হয়েছে । অফিস কলীগরা ওঁনাকে নিয়ে হসপিটাল গেছে । পরমা যেন তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে আসে । 

বাড়ি ফিরে মাকে নিয়ে যখন হসপিটাল গেল পরমা, ততক্ষণে বাবকে আই সি ইউ-তে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে । কাঁচঘেরা ঘরের বাইরে থেকে ওরা বাবাকে দেখল । চোখদুটো বন্ধ । মুখটা কেমন ফ্যাকাসে । ডাক্তারবাবুরা বললেন, আজ রাত না গেলে কিছুই বলা যাবে না । মাকে নিয়ে পরমা হসপিটালেই ছিল । ভোর রাতের দিকে দ্বিতীয়বার অ্যাটাক হল । সে ধাক্কা বাবা আর সামলাতে পারলেন না । তাদের অসহায় করে বিদায় নিলেন । 

হাসপাতালে নিজের রিলেটিভ পরিচয় দিয়ে ফর্ম ফিলআপ করল পরমা । ডাক্তারবাবুরা ভয় নেই বলে পেশেন্টকে আই সি ইউতে ঢুকিয়ে নিল । 

অটোওলা ছেলেটির খুব উপস্থিত বুদ্ধি । একটা ব্যাঙ্কের পাশবই তার হাতে দিয়ে বলল, দিদি, ওঁনার পকেটে ছিল, বোধহয় ব্যাঙ্কে এসেছিলেন পেনশন তুলতে । এখানে ওঁনার বাড়ির ফোন নম্বর আছে, খবর দিন । কাউকে আসতে বলুন । একটু পরে তো পুলিশ আসবে খোঁজ- খবর করবে । 

ভদ্রলোকের বাড়িতে ফোন করতে গিয়ে পরমা দেখে, অফিস বস মিঃ দত্তের মিসড কল গোটা চারেক । এতক্ষণে তার খেয়াল হয়, কোথায় তার যাবার কথা । প্লেন ছাড়তে আর মাত্র পঁচিশ মিনিট । স্যারকে ফোন করে । 

—হ্যালো, স্যার—

—কি ব্যাপার পরমা, তুমি এখন কোথায়? তোমার কি কোন দায়িত্বজ্ঞান নেই? তুমি এলে না কেন?

—আসলে স্যার, আমি এখন একটা সরকারী হসপিটালে আছি । 

—হসপিটালে কেন? কি হয়েছে তোমার? বস জানতে চান । 

—পথদুর্ঘটনায় গুরুতর আহত এক বয়স্ক ভদ্রলোককে নিয়ে…

পরমার কথা শেষ হবার আগেই ও-প্রান্ত থেকে ঝাঁঝালো কণ্ঠস্বর ভেসে এল, তুমি জনসেবা করছ? অত টাকার অর্ডার— জানো, তোমার এই কর্তব্যে গাফিলতির জন্য আমরা তোমাকে চাকরি থেকে স্যাক করতে পারি?

— তা তো পারেন স্যার । কিন্তু কি জানেন, আমার কাছে নিজের চাকরির থেকে এই মুহূর্তে ওই মুমূর্ষু মানুষটাকে বাঁচানো বেশি প্রয়োজন । আমার বাবাকে আমি বাঁচাতে পারিনি, কিন্তু এই ভদ্রলোকের জীবন আমি বাঁচাবই । চাকরি গেলে আবার পাবো স্যার, কিন্তু এখন এঁনার জীবনদান আমার কাছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ । 

ফোন কেটে দিয়ে পরমা এবার জোরে একটা শ্বাস নেয়। তাকে দুটো ফোন করতে হবে। একটা ওই ভদ্রলোকের বাড়িতে আর অন্যটি মাকে ।

Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.