x

আসন্ন সঙ্কলন

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৮, ২০১৭

নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত

sobdermichil | নভেম্বর ২৮, ২০১৭ |
নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত
বহুকাল অতীত হইল ,পুত্র পূজা অবকাশে গৃহে আসে নাই। যখন সে জানাইল যে এইবার শারদ আনন্দ যাপন করিতে কলিকাতায় আসিবে আমোদিনীর হৃদয় আলোকিত হইল, বাতাসে পারিজাতের সুবাস প্রবাহিত হইল। মার্কিনদেশ চলিয়া যাবার পর হইতে শরৎকালে পুত্র কখনো আসে নাই। দীর্ঘ অবকাশ সে শরতে পাইত না। প্রায় অষ্টাদশ বর্ষ অতীত হইয়াছে তাহার মার্কিন দেশে। সদ্যযুবা সে যখন গিয়াছিল তখন আন্তরজালের এতো সর্বব্যাপী বিস্তার হয়নাই। আন্তর্জাতিক ফোনের রাশভারী যোগাযোগ ব্যাবস্থা রহিয়াছিল।প্রায় সপ্তবর্ষ অপেক্ষা করিয়া আছেন তাহাতে স্পর্শ করিয়া দেখিবেন বলিয়া। তাহার পূর্বে জাকার্তা আর দুবাই আসিলে দেখা করিয়া গিয়াছে। বিবাহ করিয়াছে এক জাপানি কন্যা কে। বধূ লইয়া একবার একপক্ষ কাল আসিয়াছিল। ভাষার ব্যাবধানে জাপানি কন্যা বধূ হইয়া ওঠেনি। তাঁহার সহিত আমোদিনী সম্মানীয় অতিথির ন্যায় আচরণ করিয়াছেন। তাহাদের একখানি পুত্র হইয়াছে। তাহাকে দেখিতে ওই দেশে গিয়াছিলেন আমোদিনী। সেও আজ দ্বাদশ বর্ষীয়। তবে রণজয় একাকী আসিতেছে। উহাদের নানান ব্যাস্ততা রহিয়াছে। 

‘রণজয়’ নামটি আমোদিনীর পছন্দ হয় নাই। স্বামীর সহিত এই লইয়া দীর্ঘ মতান্তর হইয়াছিল। আমোদিনীর স্বামী অজয় বাবু হাসিতে হাসিতে বলিয়াছিলেন, “ যুদ্ধবাজ কেন হবে। দেখবে জীবনের সব প্রলোভনের থেকে যুদ্ধ করে সাচ্চা মানুষ হবে।” শিশুকাল হইতে রণজয় নিজ অধ্যয়নের দিকে মনযোগী রহিয়াছে। তাহাকে কোন দায়িত্ব প্রদান করিলে সে তাহা সে পালন করিত। বাধ্য আর নিয়মনিষ্ঠ বলিয়া তাহাকে সকলে ভালোবাসিত।আমোদিনীর অস্ফুট গর্ব হইত তাহাকে লইয়া। পুত্র বিদেশে চলিয়া গেলে মফস্বলের গৃহটি ত্যাগ করিয়া কলিকাতার শহরতলীর আবাসনে আসিলেন দুইজন।প্রতিবেশী দের সহিত এক খানি সম্ভ্রম যুক্ত সম্বন্ধ রচিত হইল। পুত্রের গর্বে আর তাহার আগমনের দিন গুনিয়া গুনিয়া আমোদিনীর জীবন অতিবাহিত হইতেছিল। কিন্তু স্বামীর কর্কটরোগ হইল। পুত্র প্রচুর অর্থব্যয় করিল। কেবল পিতার মৃত্যু হইলে মায়ের পাশে আসিতে পারিল না।মৃত পিতার মুখাগ্নি করিল পিসতুতো অগ্রজ। প্রায় মাসাধিক কাল পরে আসিইয়াছিল। মা আর পুত্র তিন চারিদিন একযোগে অনেক শোক যাপন করিয়া ছিল। পুত্র মাকে বলিল তাহার সহিত মার্কিন দেশবাসী হইতে। আমোদিনী তাঁহার স্বামীর অফুরান স্মৃতি সমুদ্র হইতে চলিয়া যান নাই। রহিয়া গিয়াছেন দুইকামরার ফ্ল্যাট টিতে। 

পুত্র আসিবে। ঘর গুছাইতে শুরু করিয়াছেন। নবীন বস্ত্র কিছু ক্রয় করিতে বড় সাধ। রাধা আর আমোদিনী নিকটস্থ শপিং মলে যাইলেন। পুত্রের জন্য শার্ট পছন্দ করিলেন। রাধা যারপনাই তৎপরতাই আমোদিনীকে লইয়া অতি সাবধানে জনবহুল বিপত্তি সামলাইলেছে। রাধা আমোদিনীর সর্বক্ষণের সঙ্গিনী। রাধা আয়া হইয়া আসিয়াছিল। কিন্তু আমোদিনীর স্বামীর মৃত্যুর পরে সর্বক্ষণের জন্য তাহাকে রাখিয়া দিয়াছেন। রাধার পিতৃ পরিচয় নাই। তাঁহার মা তাহাকে খুব প্রতিকুলতার সহিত মানুষ করিয়াছে। কিন্তু রাধা বড় নির্লোভ আর বাধ্য বলিয়া আমোদিনী তাহাকে রাখিয়াছেন। সে দেখিতে সুশ্রী নহে। কিন্তু আনন্দময়ী বলিয়া সহজেই সকলের প্রিয় হইয়া পড়ে। মায়ের সহিত শিশুকালের পতিতা পল্লীর ভয়ানক অভিজ্ঞতা গুলি তাহার মনের মধ্যে কোন মলিনতা তৈরি করে নাই। সে পরম আনন্দে আমোদিনীর পুত্র আসিবার বায়নাক্কা সামলাইতেছে। রাধা আর আমোদিনীর সারাদিন এক বিরাট উৎসব আনন্দের তৈয়ারি চলিতেছে। তাহাদের সাধারন স্রোতহীন জীবন বড় ব্যাস্ততা আসিয়াছে। 

রণজয় তিনখানি সুটকেস লইয়া ভোররাতে আসিয়া পৌঁছাইল। তাহার চেহারা ঝকঝকে আর ব্যায়ামবীর সুলভ। বহুকাল অপেক্ষার পড়ে কেহ আসিলে একটা অদ্ভুত আশ্চর্য বোধ কাজ করে। যেটা দূরত্ব কে লঙ্ঘন করিয়া হৃদয় স্পর্শ করে না। আমোদিনী যাহা আয়োজন করিয়া ছিলেন তাহা রণজয়ের সমীপে আনিতে সে জানাইল সে কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ করে না। প্রোটিন ডায়েট চলিতেছে। সে পূর্বের ন্যায় খাদ্যাভ্যাস ত্যাগ করিয়াছে। তাহার কথন ভঙ্গিমা বহুল পরিবর্তিত। তাহার কথন ভঙ্গিমা কিছুটা ওই দেশীয় দের ন্যায় হইয়া গিয়াছিল । পূর্বে আমোদিনী উপভোগ করিয়াছেন। কিন্তু এই সাত বৎসরে এই আমূল পরিবর্তন তাহাকে বিষাদ আনিয়া দিল। পুত্রের বিশ্রামের প্রয়োজন। আমোদিনী একটু বেশিমাত্রায় একাকীত্ব বোধ করিলেন। 

বিজয়া হইয়া গেল। রণজয়ের সহিত আমোদিনী তাহার শিশুকালের সাদা কালো ছবি লইয়া বসিয়া ছিলেন। অতীতচারী হইয়া উভয়ে উভয় কে কিছুটা স্পর্শ করিলেন। পুত্র জানাইল তাহার পুত্রের নানান কার্যকলাপ। রাধা এতোদিনের সন্ধ্যাকালীন সিরিয়াল টি না দেখিতে পাইয়া কিঞ্চিৎ তৃষিত হইয়া রহিল। মাতা আর পুত্র তাহাদের আপন জগতে ডুবিয়া রহিল। ষষ্টি এবং সপ্তমী রাধার দাদাবাবু দ্বিপ্রহরে বাহির হইয়া সিরিয়াল শেষ হইলে ফিরিয়াছেন। ইহার কারনে কোন সমস্যা হয় নাই। কিন্তু আজ সে দেখিতে পাইল না। হঠাৎ দাদাবাবু জানাইল, “ রাধা কাল তোমাকে একটু বেশী রান্না করতে হবে। আমার পাঁচ ছ্‌ জন বন্ধু আসতে পারে” । এই প্রথম রাধা কে দাদাবাবু কিছু বলিল। রাধা তাহার মাথা হেলাইল। 

আমোদিনী রণজয়ের নবীন বন্ধুদের কাহাকেও জানেন না। সকলেই ধনী। ইহাদের কথা আগে শুনেন নাই। তাহাদের সহিত আমোদিনীর দায়সারা আলাপ করাইয়া দিয়া আপন শয়ন কক্ষে লইয়া গেল রণজয়। রাধা কে আদেশ করিল কতক গুলি গ্লাস আনয়নের। আমোদিনী অবাক হইয়া গেলেন। বুঝিলেন তাঁহার গৃহে আজ মদ্যপানের একটি আয়োজন হইয়াছে। তাঁহার অভ্যাস নাই এ জাতীয় আমোদের। তাঁর সন্মুখে পুত্র কোনদিন এ ধরণের আনন্দের কথা কহে নাই। 

বুঝিলেন তাঁহার মৃত্যু হইলে কিছুমাত্র ক্ষতি হইত না কাহারো। আবার ভাবিলেন আপন স্ত্রীপুত্র সাথে নাই কি করিবে রণজয়। তাহার হয়তো একাকীত্ব লাঘব করিবার ইহাই উপাই- সকল মাতার অন্তরে একজন ধৃতরাষ্ট্র বাস করিয়া থাকে। 

রাধা বুঝিল আজ যাহা ঘটিতেছে তাহা আমোদিনীর মন মতো নহে। তাহার রন্ধন শেষ হইয়া গিয়াছে। বেলা হইয়াছে সে আমোদিনী কে দ্বিপ্রাহরিক ভোজন করিবার অনুরোধ করিল। তিনি জানাইলেন অতিথিরা না খাদ্য গ্রহণ করিলে তিনি কিরূপে খাইয়ালন। চিরকালীন বঙ্গজননী প্রকৃতি। আমোদিনীর পাশে বসিয়া রাধা পরবর্তী আদেশের অপেক্ষা করিতে লাগিল। রণজয়ের ঘর হইতে অসংলগ্ন কথার স্রোত বহিয়া আসিতেছে। রণজয়ের বারংবার একই কথা বলিয়া যাওয়া দেখিয়া আমোদিনী বুঝিলেন সে সম্পূর্ণ নেশাগ্রস্ত। তাঁর ভালো লাগিতেছেনা। ইহার পর কিছু সংলাপে রাধা চমকাইয়া যাইল। তাহার শিশুকাল হইতে শোনা সেই শব্দটি, “ লাগাই” । আর আমোদিনী শুনিতে পাইলেন মার্কিনী ইংরাজিতে তাহার পুত্র তাহার এই বন্ধুদিগের সংলাপ। এই শরতে পরিকল্পনা মাফিক দেশে আসিয়াছে, দামী দেশী গণিকাদের ভোগ করিবার জন্যে। পূজার কতাদিন তাহারা অভিজাত গণিকালয়ে দেদার মজা লুটিয়াছে। তাহাদের ডলারে উপার্জনের ইহার চাইতে সার্থক রুপায়ন আর কি হইতে পারে। পুত্র কয়েকদিন অতিপ্রয়োজনীয় দ্বিপ্রাহরিক কর্মে যাইতেছিল তাহার মর্ম আজ আমোদিনী বুঝিতে পারিলেন।

রাতে রাধার নিদ্রা আসিতেছে না। সে রান্না ঘরের সন্মুখে শয্যা গ্রহণ করিয়া থাকে। আজ অবধি আমোদিনীর আশ্রয়ে তাহার রাতে নিদ্রা যাইবার পূর্বে ভয় করে নাই। আজ নিদ্রা আসিতেছে না। অন্ধকারে চোখ মুদিয়া রাখিতে রাখিতে ক্লান্ত শরীর অল্প তন্দ্রা আসিয়াছে। হঠাৎ খসখস শব্দে সে শিশুকালের ন্যায় চমকাইয়া উঠিল। ছায়ামূর্তি তাহার মশারীর পাশে। “বালিশ নিয়ে আয়। আমার কাছে শুবি আজ থেকে”, নিদ্রাহীন আমোদিনী কহিল। 


1 টি মন্তব্য:

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.