x

প্রকাশিত বর্ষপূর্তি সঙ্কলন

দেখতে-দেখতে ১০ বছর! শব্দের মিছিলের বর্ষপূর্তি সংকলন প্রকাশের সময় এ খুব অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু অজস্র লেখক, পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থনে আমরা অনায়াসেই পেরিয়ে এসেছি এই দশটি বছর, উপস্থিত হয়েছি এই ৯৫ তম সংকলনে।

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

সাত্যকি দত্ত

sobdermichil | নভেম্বর ২৮, ২০১৭ |
প্রতিদিন তব গাথা
মাদের বাড়িতে ছোটবেলা থেকেই বিনোদদাকে দেখছি সারাদিন মালীর কাজ করে রাত হলেই গেটের কাছে লাঠি হাতে বসে থাকতে । এমনকি বৃষ্টির রাত গুলোতেও বিনোদদা সেই ভাবেই গেটের কাছে বসে থাকে । বাড়ির সবাই কত করে ধমক দেয়  , " বিনোদ এখনকার দিনে আর চোর ডাকাতের ভয় নেই । তুমি রাতে করে ঘুমিও । " বিনোদ দা হেসে বলে , " কি করি , নেশা হয়ে গেছে যে , রাত হলেই ওই গেটের কাছটা আমাকে ডাকে । না গিয়ে পারি না !  "

সেবার বিনোদ দা গ্রাম থেকে ফিরল বৌ নিয়ে , তখন কত আর বয়স হবে মেয়েটার , এই কুড়ি একুশ । আমাদের দিকের কুড়ি একুশের মেয়েরা বিছানা তোলা তো দূরের কথা , দাঁত টাও ঠিক করে ব্রাশ করতে শেখে না । কিন্তু বিনোদ দার বৌ সেই বয়সে এসে কি না কি করত - এই আচার গুলো রোদ থেকে তুলে আনছে , এই বিশাল বিশাল লেপ একা মাথায় তুলে রোদে দিচ্ছে , কিংবা গেট অবধি রাস্তাটা ঝাড়ু নিয়ে পরিষ্কার করতে গেল , আবার স্নান করে এসে রান্না ঘরে শাকসবজিও কাটতে বসে গেল । যদিও এই একটাও কাজ তার করার কথা নয় , এরজন্য আলাদা লোক ছিল তবুও মেয়েটা সব কিছুর উপর অধিকার চায় ।  

প্রথম দিনের কথা , পিসি জিজ্ঞেস করল - কী নাম তোমার ? বিনোদ দার বৌ প্রণাম করতে করতে বলল - সোনিয়া । আমারা সবাই অবাক হয়ে বললাম - কে রাখল এমন নাম? বিনোদ দার বৌ এইখানে লজ্জার নীল হয়ে গেল, দেখলাম তার নরম মুখের উপর সেই ছাপ পড়েছে । আপনারাও হয়ত ভাবছেন , " আহা কি বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলতে শিখেছে , আবার মালীর বৌয়ের নাম দেয় সোনিয়া । " সে আপনরা যা ভাবছেন ভাবুন , কিন্তু এখন আর গ্রামের লোকের নাম মাছি , ব্যাঙ ইত্যাদি হয় না । এক কালে হত , কারণ সেকালে ছেলেপিলে ঝাঁক ঝাঁক জন্মাত , মাছি ব্যাঙ যেমন গাদা গাদা জন্মায় , সেইরকম । ভাবতো , আলু পটল যা হোক একটা নাম রাখলে আর ছেলে পিলে জন্মাবে না । গ্রামে এখন সে দিন অপগত । 

মাঝখানে কেটে গেছে পনেরোটা বছর । ইদানীং আর বিনোদ দার বউকে দেখতে পাই না , শুনতে পাই তার শরীর বড় খারাপ , চলাফেরা করা মানা। এখন যখন রাতের বেলা বিনোদ দা গেটের কাছে বসে , বাবা দেখতে পেয়েই ঘর থেকেই চিৎকার করে - বিনোদ ঘরে যা । বিনোদ দা চুপচাপ রাধাচূড়া গাছটার তলায় তার সেই অনেক পরিচিত ঘরে ফিরে আসে । আমি ব্যালকনি থেকে দেখি , সে ঘরে আলো জ্বলেই থাকে তারপর থেকে । রাত আরও গভীর হয় , একটা সময় চোখ পড়তেই দেখা যায় সে আলো কখন নিভে গেছে আর বিনোদ দা আবার সেই গেটের পাশে চুপ করে বসে আছে , ওর হাতে হলুদ লালের রাধাচূড়া । 

আজ সকালে দেখলাম ফুলের বাগানে এক ঝাঁক প্রজাপতি তুমুল খেলা করে বেড়াচ্ছে , তাদের রঙের তীব্র কোলাহলে চারিদিক যেন মেদুরতায় ভুগছে । আমি না গিয়ে পারলাম না । ঘুরতে ঘুরতে কখন যেন চাঁপা গাছটার তলায় চলে এসেছি , তখনও সূর্যের আলো আলাপের লজ্জা কাটিয়ে ওঠেনি , সাদা সাদা ফুলের ঘ্রানে ওর তলার বাতাস ভারী হয়ে আছে । হটাত দেখলাম , কুয়ো পাড়ে বিনোদ দা বসে বসে বাসন ধুচ্ছে আর বিনোদ দার বৌ একটা ছোট কদম গাছে কোনো রকমে হেলান দিয়ে আছে । শুনলাম বিনোদ দার বৌ বিনোদ দা কে বলছে - " কেন জেদ করছ , দুটো মাত্র বাসন , আমি ঠিকই ধুয়ে নিতে পারব , আমাকে দাও । তুমি নোংরা বাসন ধুয়ে দিচ্ছ ভাবতেও ঘেন্না করছে ।  " বিনোদ দা বলল - " ঘেন্না লাগার কিছু নেই , বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর ; অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক নর । থালা বাসন ধোয়া তো এমন কিছু মহান সৃষ্টি নয় , এটা একটা সাধারণ সৃষ্টি । বিশ্বে যা কিছু সাধারণ সৃষ্টি তাতে নারীর অধিরকার থেকে পুরুষের অধিকার বেশি । নারীর অধিকার চিরকল্যাণকর সৃষ্টিতে । " বিনোদ দার কথা আমাকে শিউড়ে দিল , বিনোদ দা কিছু পড়াশুনা করেছে বলে জানি , কিন্তু ঠিক কত দূর পড়েছে ও ? বিনোদ দা কি রবীন্দ্রনাথ নজরুল পড়ে ? পড়ে সে ভাব আত্মস্থ করার চেষ্টা করে ? কিন্তু আজ যেন বিনোদ দার এই সামান্য অনুভবের কথা গুলো নজরুলের থেকেও সম্পূর্ণ বলে মনে হলো । 

স্পষ্ট দেখলাম বিনোদ দার বৌয়ের চোখ ভিজে উঠল , কেন যে ভিজে উঠল সে হয়ত নিজেও জানে না । আমি জানি , এখন সে চোখের জল লুকানোর জন্য ঘুরে দাঁড়াবে । আর দাঁড়ালাম না , তরল সবুজ ভেজা ঘাসের উপর দিয়ে বাড়ি ফিরে আসলাম , আমার পাঞ্জাবিতে তখনও চাঁপা ফুলের গন্ধ ।

Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.