স্বপনকুমার ঠাকুর

ভর
আকাশমণি।বয়স আর কত হবে! এই সবে ষোলোয় পা দিয়েছে।এই বয়সের মেয়ে মানেই একমুঠো বিদ্যুত। রূপ আর যৌবনের জ্বলন্ত অগ্নিশিখা ।কিন্তু কোথায় কী! ছোটবেলায় পোলিও রোগে আক্রান্ত হয়ে শুধু ডানপা'টাই খোঁড়া হয়নি।এক্কেবারে এলেবেলে খ্যাপাটে করে দিয়েছে। মুখদিয়ে লালাঝরে। কথা বলে যেন চেঁছা পানের মতো। চ্যাতরা ব্যতরা। সে কথার অর্থ বুঝতে হিমসিম খায় নিকট জন।বাকীদের কাছে অর্থহীন একতাল ধ্বনিপুঞ্জ।কোন কিছুতেই হুঁশ নেই।ভুয়ো ফলের মতো ফ্যালনা।লোকে দেখে আর হাসে। দুশ্চিন্তার কালো কালো মেঘ জমা হয় বাপ-মায়ের মনের আকাশে।বিয়েতো পরের ব্যাপার। জীবনটা কাটবে কি করে! এইসব সাত পাঁচ ভেবে মাধা মোড়ল ও তার পরিবারের জীবন থেকে সুখ স্বস্তি কবে উধাও হয়ে গেছে।

এদিকে আকাশমনির আর পাঁচটা মেয়ের যা হয় মানে মাসিক হয়েছে ঠিকসময়।কিন্তু মেয়ের কি সেসবে গা-গেরাজ্জি আছে!মাকেই সব ব্যবস্থা করে দিতে হয়। আরও একটা ভয় --যেভাবে পাটোয়ারিদের লরির ডেরাইভর (ড্রাইভার) আকাশমনির বুকের উত্তাল দুটি মাংসপিণ্ডের উপর কুদিষ্টিটা সেঁদিয়ে দেয় তাতেই অজানা ক্ষতির আশঙ্খায় অস্থির। এমনিতে তাদের মোটা ভাত মোটা কাপড়ের অভাব নেই। মুখুজ্জ্যেদের জমি জমা দেখে।একমাত্র ছেলে কেরালায় রাজমিস্ত্রির যোগাড়ের কাজ করে। বছরে দুবার বাড়ি আসে। বলে আকাশমনীর বিয়ে দাও। যত টাকা লাগবে আমি দেবো। চিন্তা করবা না একদম।

এমনি এমনি চিন্তা কেউ করে? বাগ পেলেই বাঁধভাঙা জলের মতো হু হু করে চলে আসে দুশ্চিন্তা। রেতে ঘুম আসে না। কত ডাক্তার কোবরেজ দেখানো হলো। ঠাকুরতলায় গিয়ে গিয়ে পায়ের সুতো ছিঁড়েছে। গুচ্ছেন স্বপ্ন প্রদত্ত ওষুধ গিলেয়েছে।যতসব ঘোড়ার ডিম।পাশের বাড়ির কচি ছাগলছানাটাকে নিয়েই যা পড়ে থাকে।আদর করে।খাওয়ায় ।ওর সঙ্গে বিড় বিড় করে কথা বলে।সোহাগ করে।পাড়ার বিপীন মাস্টার একদিন ডেকে বললে--শোন খুড়ো।ক দিন ধরেই তোমাকে বলবো বলবো করে আর বলা হয়নি।মেয়েকে কটা ছাগলছানা কিনে দাও।আমার মনে হয় রোগ ভালো না হোক মেয়েটা ভালো থাকবে।

কথাটা মনে ধরলো মোড়লের।এমনিতে এজমালি সংসারে ছাগল পুষতো। ভারী ন্যাওটার জাত । আর মায়ার সামিগ্রী।কিন্তু বিক্রী করতে হয় যে! আর তখনি খুব কষ্ট।যাকগে বিক্রী ফিক্রী না হয় বাদই দেব। মেয়ে যদি ছাগল নিয়েই ভালো থাকে তাহলে এর চেয়ে আর কি ভালো হতে পারে।আকাশমণির জন্য দুটো ছাগলছানা চলে এলো।তারপ থেকে সত্ত্যি আর ফিরে তাকাতে হয়নি।ছাগল নিয়েই মশগুল।আলাদা করে ঘর করে দিয়েছে।এখন চার পাঁচটা বাচ্ছা। ছাগলের জন্য ঘাস কাটা। ভাতের মাড় খাওনো। কোন কিছু বাদ থাকে না।অধিকাংশই পাঁঠি ছাগল।একটি পাঁঠার বাচ্ছা আছে।নাম মোড়ো।গত বছর খুবই অসুখ করেছিল।বাঁচার কথা নয়।ডাক্তার দেখিয়েও কাজ হয়নি।শেষে মা বটঠাকরুনের কাছে ধুনোসেবা মানত করে।মায়ের পাটাধোয়ানি জল খাইয়ে মোড়ো বেঁচে যায়।এখন ছাগীদের কাছে গিয়ে ফ্যাবা মারে।মোড়ল বলেছে এই গরমটা যাক। তারপর খাসি করে দেবে।

মুখুজ্জ্যে বাড়ির মা বটঠাকরুন কালী। যেমন জাগ্রত তেমনি এতটুকু ত্রুটি হবার যো নেই। মুখ রগুরে ফেলে দেবে।সকলেই ভয়ে অস্থীর।দুগগাপুজোর পর নিদির্ষ্ট দিনে দেবীর গায়ে মাটি পড়া,রং করা ইত্যাদি ব্যাপারতো আছেই সেই সঙ্গে মায়ের ঘট আসবে কারণবাড়িতে।আর লাগবে নিখুঁতো কালোপাঁঠা ।কতজন যে মানত করে তার ঠিক ঠিকানা নেই।কারু রোগ ব্যাধিতো কারু ছেলেপুলে হচ্ছেনা ।কেউবা চাকরি পাচ্ছেনা। সবেতেই মুসকিল আসান মা বটঠাকরুন।আকাশমণিও মোড়োর জন্য মানত করে।কিন্তু মা বললে খবরদার এ কথা যেন কেউ না জানে।জানলে লোক হাসাহাসি করবে।তারচেয়ে বরং নিজের জন্য মানত করেছে এই কথাটাই মা চাউর করে দেয়।এমনিতেই মুখুজ্যেবাবুদের জমি জমা দেখাশুনো করে আকাশের বাপ।অনেক দায়-দায়িত্ব তাকে সামলাতে হয় পুজোয়।

পুজোর রাতে হুলুস্থূলু কাণ্ড। বটঠাকরুনের পাঁঠার ছেড়ানি মানে পাতলা পায়খানা শুরু হয়েছে। দাঁতে একটা ঘাস কাটছে না। সেই যে গোয়ালের গড়ায় সাটপাট হয়ে পড়ে আছে ওঠার নাম গন্ধটি নেই। প্রথমে ভেবেছিল ও রকম দু একবার হয়। মায়ের কৃপায় সেরে যাবে।কিন্তু এখন অবস্থা আয়ত্বের বাইরে।পুরুত ঠাকুর বার কয়েক পরীক্ষা করে বললেন---অবস্থা ভালো ঠেকছে না মুখুজ্জ্যেমশাই। এতো খুঁতো পাঁঠা।এ -- পাঁঠার কোপ হলে বটঠাকরুনের কোপে পড়তে হবে।

মুখুজ্জ্যের চকচকে টাক দিয়ে ঘাম গড়াতে শুরু করে।খোঁজ খোজ পাঁঠা খোঁজ। কিন্তু কোথায় পাঁঠা? মিলছেনা। মুখুজ্জ্যে রাগ দেখিয়ে বলছেন চাদ্দিকে এতো পাঁঠা আর একটা পাঁঠা পাচ্ছিস না? একজন বললে-- কোমরে কেস্তে গুঁজে মাঠময় ছুটে বেড়ালে হবে? কেন মোড়লের বড়িতেই নিখুঁতো পাঁঠা আছে। বেশ নাদুস নুদুস!

-দ্যাখো কাণ্ড! মেধো তোর বাড়িতে পাঁঠা থাকতে চোদ্দভুবন ঘোরাচ্ছিস? নিয়ে আয় তাড়াতাড়ি!

-না মানে মেয়েটা ওই ছাগলগুলো নিয়েইতো থাকে।আমি বলছিলাম কী---

-কিছুই বলতে হবে না।কাল আমি দুটো পাঁঠা কিনে দেবো। যা মায়ের পুজোর বসার সময় হয়ে এলো।

উপস্থিত পারিষদবর্গ মাধবের হ্যাঁ না কিন্তু আচ্ছা মানে ইয়ে--- এই সব শব্দকে জব্দ করে পাঁঠা আনতে চলে গেল। কর্তা গিন্নি দুজনেই হায় হায় করতে লাগলো।আর বোধহয় মেয়েকে বাঁচানো যাবেনাগো। কিন্তু কে কার কথা শোনে!তবে ভাগ্য ভালো বলতে হবে মোড়লের। মেয়ের আচরণে তেমন কিছু দেখা গেল না। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো।আকাশমণি কাউকে কিছু বললে না।শুধু দুচোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো লবণাক্ত ধারা। ।বাবা মা বোঝালে --কাঁদিস না মা বটঠাকরুন যখন নিতে চেয়েছে তখন কাঁদিস না। দেখিস তোর ভালো হবে। কালই পাঁচুন্দির হাট থেকে মোড়োর মতোই জোরা পাঁঠা এনে দেবো।বলতে বলতে মোড়োলের গলা ধরে গেল।

বঠঠাকরুনের পুজো শেষ হলো। এবার বলিদানের পালা।মোড়োকে পুকুর থেকে চান করিয়ে আনা হয়েছে। গলায় পড়িয়ে দেওয়া হয়েছে গাঁদাফুলের মালা।পুরুত ঠাকুর কোষাকুষি আর মায়ের পায়ের সিঁদুর নিয়ে এসে পাঁঠার কপালে লাগিয়ে দিয়ে মন্তর বলে।সকলেই সন্ত্রস্ত।উঠানে খানিকটা মাটি খুঁড়ে তসলাই পোতা হয়েছে। আকাশমণি মায়ের কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। মা বলছে সহ্য করতে পারবিনা মা বাড়ি যা।পরে চোট শেষ হলে আসবি।কিন্তু আকাশ কোন কথা শোনেনি।

তসলাইয়ে মুড়টাকে ভরে দিয়েছে পাঁঠার।এবার পিছন থেকে দুটো দশাসই মরদ হাঁটু গেড়ে চারটে পা ধরে লাগিয়েছে টান।একটা মরণ আর্তনাদ বেড়িয়ে এলো।ঢুলিদার উন্মাদের মতো বলিদানের বাজনা বাজাচ্ছে। কামার প্রস্তুত। সমবেত ধ্বনি ওঠে ----জয় মা----

আরে রে...।ধর ধর...!!

সমস্ত দৃশ্যটি এই মুহূর্তে যেন স্থির ছবি। আকাশমণি তীরের বেগে একেবারে যূপকাষ্ঠের কাছে ছিটকে পড়ে। মুখ রগরাতে থাকে। তার মুখ গাল ঠোঁট কেটে রক্তে কাদায় মাখামাখি। মুখদিয়ে বেরিয়ে আসছে একটা বিকৃত আওয়াজ।গাঁজলা।একটা কান্নার ঘূর্ণি।সবমিলিয়ে অবাঞ্ছিত ঘটনা। কে যেন বলে উঠলো ভর হয়েছে। ভর হয়েছে। আকাশমণির উপর বটঠাকরুনের ভর হয়েছে। উপস্থিত দর্শক তখন কৌতূহলী হয়ে ওঠে।পুরুতঠাকুর মন্দির থেকে দ্রুত পদে নেমে এসে বলে---- সরো সরো দেখি। তাইতো সত্যি কথা । এতো মায়ের ভর। ঠাকুর মশাই গলবস্ত্র হয়ে জেরা করতে লাগলো।

মা মা কি হয়েছে ? কিসে খুঁত হলো মা মা মাগো।কিন্তু আকাশমণি কী বলছে বোঝা যাচ্ছে না।শুধু মুখ রগড়াচ্ছে। খামছে ধরছে মাটি।অনেকক্ষণ ধরে ঠাকুরমশাই আকাশমণির কথাগুলো শোনার পর বললে...মোড়লের মেয়েকে বটঠাকরুনই ধরেছে।মা আর পাঁঠা বলি চায় না।একবার খুঁতো হলে কি আর পুজো হয়? পষ্ট জানিয়ে দিল মা।

উপস্থিত দর্শকরা বললো-- জয় মা বটঠাকরুনের জয় ।খুঁতো পাঁঠা মা নেয় না। শেষে পুরুতমশাই বললে---এবার আপনি যা বলবেন মুখোজ্জ্যে মশাই।

--পাগল না মাথা খারাপ!মা নিজে যদি বলি না চান তাহলে হবে না।আপনারা কি বলেন। মুখুজ্জ্যে মশাই সকলের কাছে জানতে চাইলেন।

সকলেই বলল মা আর বলি চায় না।আকাশমণিকে তখন দেবীর চানজল খাইয়ে দিলে।অনেকটা সে এখন সুস্থ । তাকে এবার বাড়ি নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হলো। যূপকাষ্ঠ উপড়ে তোলা হলো। এদিকে মালার ফুলগুলি পাঁঠা তখন দিব্যি আরাম করে খাচ্ছে।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

সুচিন্তিত মতামত দিন

নবীনতর পূর্বতন