x

প্রকাশিত বর্ষপূর্তি সঙ্কলন

দেখতে-দেখতে ১০ বছর! শব্দের মিছিলের বর্ষপূর্তি সংকলন প্রকাশের সময় এ খুব অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু অজস্র লেখক, পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থনে আমরা অনায়াসেই পেরিয়ে এসেছি এই দশটি বছর, উপস্থিত হয়েছি এই ৯৫ তম সংকলনে।

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

পিনাকি চক্রবর্তী

sobdermichil | অক্টোবর ২৬, ২০১৭ |
যযাতি কথা

সকালের রোদ রাজকক্ষের জানালা দিয়ে এসে , পিঠের উপর চাদরের মতন ছড়িয়ে রয়েছে । বিছানায় শুয়ে একা যযাতি । উপুর হয়ে মুখটা নরম গদিতে গোঁজা রয়েছে । দিনের মধ্যভাগে আসতে দু’ঘণ্টা বাকি রয়েছে । অন্যান্য দিন হলে এই সময় রাজ দরবারে ব্যস্ত থাকত । ভিড় জমতে শুরু করত । রাজা যযাতির অবকাশের ফুরসৎ পর্যন্ত থাকত না । আজ তেমনটা হয়নি । আজ রাজদরবার বন্ধ । খুব জরুরি অবস্থার জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে ; সেখানেই অমাত্যদের সাহায্য পাওয়া যাবে । বেশ কয়েকদিন ধরে একটা চিন্তা রাজাকে তাড়া করে চলেছে । রাজা চিত হল । কপালের উপর হাত দিয়ে চিন্তায় ডুবে গেল !

এই চিন্তা যোগ্য উত্তরসুরি বেছে নেওয়ার । তার দু’পক্ষের পত্নীর মোট সন্তান পাঁচ জন , এদের ভিতর থেকে একজনকে ভবিষ্যতে যযাতির রাজত্ব এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হবে । এই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনটা করবে দৈত্য গুরু শুক্রাচার্য । 

যযাতির কাছে দেবযানী যা, শর্মিষ্ঠাও তাই। দেবযানীর দুটো ছেলে যদু ও তুর্বসু। শর্মিষ্ঠা তিন ছেলে আছে ; দ্রুহ্যু , অনু , পুরু । রাজা এদের ভিতরেই একজনের হাতে সাম্রাজ্যের ভার তুলে দেবে। যযাতি কিছুতেই বুঝতে পারছে না – কাকে এমন দায়িত্ব দেওয়া যায়! রাজকুমারদের মধ্যে একজনকে যুবরাজ হিসেবে অভিষেক করা হবে। একমাস ধরে রাজধানীতে সেই উপলক্ষ্যে ধুমধাম করে উৎসব চলবে । 

আজ ছুটি নিয়েছে রাজপাট থেকে , যযাতি সারাদিন ভাববে । বাবা হিসেবে যদিও তার এখনই এই চিন্তা হওয়াটা স্বাভাবিক নয় , কেননা তার নিজের বয়েস এমন কিছু নয় ; এখনতো সবে যৌবন উপভোগ করা শুরু হল।এখনো সে চাইছে দীর্ঘ সময় ধরে আনন্দ ফুর্তি করতে । রানীদের সাথে সঙ্গমে মথিত সহস্র রাত কাটাতে। তার মধ্যবয়স ছুঁতে এখনো তিন বছর বাকি। দুই রানী তার থেকে প্রায় দশ বছরের ছোট । দেবযানীকে দেখলে অবশ্য কেউ সে কথা বলবেনা । শর্মিষ্ঠার কথা আলাদা । সে নিজেকে এখনো সুন্দর রেখেছে । অবশ্য মায়ের দিক থেকে দ্রাবিড়িয় কাঠামো , বয়স তার বোঝাই যায়না ।

যযাতিকে দেবযানী যখন বিয়ে করেছিল , তারও অনেক আগে থেকেই শর্মিষ্ঠার সাথে দেবযানীর সম্পর্ক খারাপ ছিল । এর জন্য দায়ি যে পক্ষই থাকুক না কেন , দেবযানী নিজেই সম্পর্ক ভাল করতে চায়নি । পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন বিয়ের পর দেবযানীর সাথে শর্মিষ্ঠা দাসী হিসেবে রাজধানীতে চলে আসে । 

শর্মিষ্ঠা যযাতির মহলে থেকে , সেবা করবার কষ্ট নাও নিতে পারত । সেই সময় একান্ত অনুরাগিণী হয়ে , রাজা যযাতির একান্ত অনুগতা দাসীর মতনই সেবা করে যাচ্ছিল । 

রাজমহলে শর্মিষ্ঠার থাকা , দেবযানীর পরিচর্যা করা – সমস্তটাই শর্মিষ্ঠা আর দেবযানীর ইচ্ছাতেই হয়েছে । শুক্রাচার্য প্রথমে রাজি হতে চায়নি । দেবযানীর সৌন্দর্য আর মানুষের প্রতি আন্তরিক ব্যবহার - যে কোন ক্ষত্রিয়কে তার দিকে চুম্বকের মতনই আকর্ষিত করবে । রাজার মন চুরি করতে কতক্ষণ !

দেবযানী খুবই একগুঁয়ে। শর্মিষ্ঠাকে দাসী করে নিজের সাথে নিয়ে যাবেই। শুক্রাচার্য একপ্রকার বাধ্য হয়েই মেয়ের একগুঁয়েমিকে প্রশ্রয় দিল! 

এমন অবস্থা চলছিল , দেবযানী গর্ভবতী হওয়ার আগে অব্দি । দেবযানী চেয়েছিল , শর্মিষ্ঠাকে নিয়ে বাপের বাড়ি যেতে , যাতে শর্মিষ্ঠাকে দাসীর মতনই খাটানো যায় । শর্মিষ্ঠা বলল – এমনটা হয়না, কেননা বিয়ের পর মেয়েরা স্বামীর অধীন হয় । দেবযানীর মনিব হচ্ছে যযাতি । তারমানে যযাতি দেবযানী আর শর্মিষ্ঠা দু’জনেরই মালিক । শর্মিষ্ঠা বলে , সে নিজের দাসী ধর্মের অবজ্ঞা করবেনা । কেননা যযাতির এই সময় একান্ত অনুগত পরিচর্যা করবার মানুষ চাই । 

যদি দেবযানী তাকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেয় , তবে শর্মিষ্ঠার আর ধর্মত্যাগের পাপ থাকেনা । দেবযানী রাজি হল না । শর্মিষ্ঠা রাজমহলে রাজা যযাতির সেবার জন্য থেকে গেল ।

যযাতির মনে অনেক আগে থেকেই শর্মিষ্ঠার প্রতি দুর্বলতা জন্মেছিল । সে তাই চুপ থেকে গেল! দেবযানী যখন গর্ভবতী হয়ে বাপের বাড়ি , তখন শর্মিষ্ঠা অন্যান্য দাসীদের সাথে রাজা যযাতির একান্ত অনুগত হয়ে , সেবা করছিল রাজমহলে থেকে । 

মেয়ে জামাই যযাতিকে সাবধান করেছিল শুক্রাচার্য । যযাতি যেন শর্মিষ্ঠা থেকে দূরত্ব বজায় রাখে । সে যেনও শর্মিষ্ঠাকে শয্যায় আহ্বান না করে । যযাতি নিজেও প্রথম দিকে দূরত্ব রাখত। অথচ এত সাবধানতা নিয়েও যযাতি শেষ পর্যন্ত ধরা দিয়ে দিল ! 

শর্মিষ্ঠা প্রথম থেকেই যযাতির প্রতি দুর্বল ছিল । অনার্য যুবতি যখন নিজের কামকলা দিয়ে যযাতির মন দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে, তখনই রাজা নিজেকে ধরে রাখতে পারল না । সেই মূহুর্ত , এখনো যযাতির চোখের সামনে ভাসছে! শরীরের রোমকূপ গুলো রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল । যে সকল পুরুষের পত্নী গর্ভবতী থাকে এবং বাপের বাড়ি যায় , তাদের স্বামীরা পত্নী অনুপস্থিতির মুহূর্তে এক ঔদাসিন্য মনোভাবের আক্রান্ত হয়ে পড়ে । এমন ভাবেই এক সন্ধ্যায় নিজের ঘরে বসে –বসে যযাতি দেবযানীর কথা ভাবছিল । তখনি তখনই শর্মিষ্ঠা ঢুকল । মেয়েটার বক্ষ বন্ধনী ওড়না দিয়ে বস্ত্রের আড়ালে ঢাকা ছিল না । মাথার ঘন গহীন চুল রঙিন ফুলে সাজানো ছিল । চোখে দুটোয় ছিল - বৃষ্টির আগে গর্জন করা মেঘের বিদ্যুত ঝলকানি ! 

যযাতি বলল – তুমি এখন এখানে !

শর্মিষ্ঠা মাথা নিচু করে । খুব ধীর কণ্ঠে বলল – দাসী বলে কি দেবযানীর অবর্তমানে আসতেও পারিনা ? আমি এতটা অপরাধী !

-না । আমি তা বলিনি , তবে আমাদের বিয়ের সময় তোমাদের গুরুই সেই নিষেধ করেছিলেন ।

- কোন বাবাই চায়না , তার মেয়ের সতীন হোক । মেয়ের স্বামী অন্য নারীরে আসক্ত , তা কোন পিতাই মেনে নেবেন না। তাই এই নিষেধ একজন গুরুর নয় । একজন সংস্কারপন্থী দুর্বল পিতার। আপনি তার কথা শুনে আমাকে দূরে সরিয়ে রাখবেন ?

যযাতি মেয়েটির চোখের দিকে তাকিয়ে রইল । মনে –মনে বলল – এই মেয়েটি সব দিক থেকেই দেবযানী থেকে এগিয়ে । ঘরের কাজ গুছিয়ে করে । কখনো আমার সাথে উঁচু স্বরে কথা বলেনি । আমার খেয়াল রাখছে । দেবযানী আমাকে ভালোবাসে তবে সেই ভালোবাসায় আত্মসমর্পণ নেই । এক নারীর প্রতি এক পুরুষের অনুরাগ জন্মানোর জন্য এই কারণটাই কি যথেষ্ঠ নয় ? শর্মিষ্ঠাকে না ভালোবেসে থাকা যায়না । অথচ আমি তো শুক্রাচার্যকে কথা দিয়েছি ! তাঁর কন্যা বাদে শর্মিষ্ঠাকে শয্যায় ডাকব না। 

শর্মিষ্ঠা বলল – চুপ করে আছেন কেন ? আপনি না ক্ষত্রিয় , আপনিতো আমার বংশ পরিচয় সম্বন্ধে অভিজ্ঞ । সত্যি বলুনতো ...দেবযানী মা হওয়ার সুযোগ পেয়েছে । আমি এমন কী দোষ করলাম? রাজা আমিও ঋতুমতি । সন্তান ধারণে সক্ষম । তবুও কেন আমাকে দূরে সরিয়ে রাখছেন ?

-আমি সব বুঝি । দেবযানী আর তার বাবার বিপক্ষে যেতে পারব না। আমার রাজত্ব পরিচালনার জন্য শুক্রাচার্যের সমর্থন দরকার । এমনিতেই প্রায়শই অনার্যদের সাথে ঝামেলা থাকেই । আমি যদি এমন কিছু করি , তবে প্রজা বিদ্রোহ দেখা দিতে পারে ।

-আচ্ছা আমরা যদি রাজধানী থেকে দূরে কোথাও দেখা করি ? মিলিত হই ... 

শর্মিষ্ঠা হাত ধরল । যযাতি তাকিয়ে দেখছে – মেয়েটা নিজের চাহিদার কথা অকপটে বলে দিল! সত্যিই , অনার্য হলেও ক্ষত্রিয় । রাজার দুর্বল মন খুব অসহায় হয়ে পড়েছিল !

কক্ষের বাইরে দাসী এসে বলল – মহারাজ , মহারানী আপনার সাথে দেখা করতে চাইছেন ।

যযাতির স্মৃতি রোমন্থন থেকে নিজেকে নিষ্কৃতি দিল । উঠে বসল । দাসির উদ্দেশ্যে বলল – যাচ্ছি । 

আজ এই একটা দিনের মধ্যেই নিজের যোগ্য উত্তরসূরী খুঁজবার পথ যযাতিকে পেতে হবে । যযাতি বিছানা থেকে নেমে , গায়ে কাপড় জড়িয়েছে , এই ধরণের কাপড়কে উত্তরীয় বলে । সে ভাবছে – অশোক বনে শর্মিষ্ঠার সাথে যে একান্ত সময় কেটেছিল , তা সত্যিই বেশ উন্মাদনায় ভরা ছিল । অনেক স্মৃতি রয়েছে । মেয়েটা যযাতির বীর্য ধারণ করল গর্ভে । তারপরেও একান্তে লোক চক্ষুর আড়ালে অশোক বনেই থাকবার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল । বেশ চলছিল । একদিন বনে যযাতি দেবযানীকে নিয়ে ভ্রমণে যাচ্ছিল , তখনই শর্মিষ্ঠার সন্তানদের সাথে দেখা হয়ে যায় ! সেই সময় দেবযানীও তাদের দেখে কৌতূহল দেখালো । শর্মিষ্ঠার সন্তানদের যযাতি চিনতে অস্বীকার করেছিল । দেবযানীর সন্দেহ থেকে রেহাই পায়নি । বলাযায় সেখান থেকে দেবযানী আর শর্মিষ্ঠার সম্পর্ক আরও তলানিতে এসে ঠেকেছে ! তারপর যখন সত্য সামনে এলো , শর্মিষ্ঠা আর দেবযানীর মধ্যে সম্পর্কের আর কিছু অবশিষ্ট থাকল না। 

যযাতি মুখ ধুয়ে নিল । স্নান করে দেবযানীর অন্দরমহলে যাবে । এর মধ্যেই পথ খুঁজতে হবে । নতুবা শান্তি নেই । যে জনপদ গুলো তার অধীনে আছে , সেগুলোর একচ্ছত্র অধিপতিকে উদার , সংযমী , বুদ্ধিমান , সাহসী আর আত্মত্যগী আর অবশ্যই দৃঢ় হতে হবে । পাঁচ ছেলের মধ্যে এই সব গুন যার অতি প্রবল থাকবে সেই হবে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী । যদিও কূলের নিয়ম অনুযায়ী বড় ছেলে সিংহাসনে বসে । যযাতি এই নিয়মকে মান্যতা দেয় না। তার বিশ্বাস সিংহাসন শুধু মাত্র যোগ্য ব্যক্তির হতে পারে । 


দেবযানী আজ নিজেকে নতুন বউয়ের মতন সাজিয়েছে । দুটো সন্তান জন্ম দেওয়ার পর তার চেহারায় মেদ জমেছে । নিজেকে খুব একটা পরিপাটি করে রাখেনা , আজ সেজেছে কারণ রাজধানীতে অনেকেই আসবে । মহারানী বলে কথা ! যযাতির প্রধান পত্নী সেই । 

যযাতি অন্দরমহলে ঢুকেই , দেখল দেবযানী পরিচিতদের সাথে কথা বলছে । যযাতিকে দেখেই তারা বেরিয়ে গেল । 

-তোমাকে ডেকেছিলাম , সব ব্যবস্থা করে ফেলেছ ? 

দেবযানীর কথা শুনে যযাতি হাসল । – অনুষ্ঠানের নিয়ম , রীতি এগুলো নিয়ে আমি চিন্তিত নই। ব্যবস্থা হবে , কিন্তু দেবযানী পাঁচ পুত্রের মধ্যে যোগ্য কে ? যতক্ষণ না এই প্রশ্নের সমাধান হবে আমি তোমাদের উৎসবে সামিল হয়েও, উৎসবে থাকতে পারব না । 

-তুমি শর্মিষ্ঠাকে পত্নী হিসেবে মর্যাদা দিলেও , আমি ওই দাসীকে এই রাজমহলে স্বীকৃতি দেব না। ওর সন্তানরা বেজন্মা । 

-ছিঃ ।দেবযানী , তুমি না বিপ্র কন্যা । শুনেছি যিনি শ্ত্রু আর মিত্রকে সমান ভাবে ভালোবাসে , তিনিই ব্রাহ্মণ । তোমার ব্যবহার , কথা , আর বাক্য নির্বাচনের ধরণ বলছে , তুমি শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করে চলেছ । 

-আর আমার অবর্তমানে তুমি যে শর্মিষ্ঠার সাথে সম্পর্ক করলে ! দেখো ফূর্তি করেছো তাও ক্ষমা করে দিতাম । তাই বলে ওই দাসীকে তিনটে সন্তান দিলে ! ছিঃ ।

-দেখো , ও ক্ষত্রিয় কন্যা । বারংবার এই দাসী শব্দটা আমার শুনতে ভালো লাগছে না । 

-যা সত্যি আমি তাই বলেছি । তুমি ভুলে গিয়েছো , শর্মিষ্ঠা আমার দাসত্ব স্বীকার করেছিল । সে এখনও আমার অধীন। আমিই তার মনিব । 

-তাহলে তোমাকেও একটা কথা বলছি । মন দিয়ে শুনবে । আমি শর্মিষ্ঠাকে নিজের পত্নীর মর্যাদা দিয়েছি । আমার অন্যান্য শয্যাসঙ্গিনীদের সাথে ওকে এক করে ফেলবে না ! 

যযাতির গলার আওয়াজের পরিবর্তন হল ! এতক্ষণ সে দেবযানীর সাথে যেন আত্মপক্ষ রক্ষার জন্য লড়াই চালাচ্ছিল । এই প্রথম রাজা যযাতি নিজের মেজাজ দেখাল । 

দেবযানীকে থামিয়ে দিল । 

যযাতির ঘাড় অব্দি লম্বা কেশ গুচ্ছ । চওড়া বুক আর শিরদাঁড়া সোজা । তার চেহারায় কয়েকটি পরিবর্তন দেখা দিয়েছে । মাথার কেশ গুচ্ছে দুচারটে সাদা চুল উঁকি মেরেছে। আর থুতনির চামড়া খানিক কুঁচকে গিয়েছে ! চোখের নিচে কালো দাগ । 

যযাতির দিকে তাকিয়ে বলল – তোমাকে আমি বিশ্বাস করেছিলাম , ভেবেছিলাম তুমি শয্যাসঙ্গিনী রাখতেই পারো , তোমার জীবনে প্রধান আর একমাত্র স্ত্রী আমিই । আমার সন্তানই তোমার উত্তরাধিকারী হবে । সেই বিশ্বাসের ফল দিলে এমন ভাবে !

-আমি তোমায় কতবার বলেছি , শর্মিষ্ঠাকে ভালোবাসি আর তোমাকেও সম্মান করি । তুমি আমার আজও প্রধান স্ত্রীই আছো । তবে হ্যাঁ একমাত্র নয় । নিজের এই অন্যায় কাজের জন্য ক্ষমা চেয়েছি । দেখো , শর্মিষ্ঠাকে আমি খুব ভালোবাসি । এই ভালবাসা রাজা যযাতির নারী দেহের প্রতি কামনা নয় । প্রেমিক যযাতি শর্মিষ্ঠার প্রতি অবিচার করতে পারবেনা । পাছে তোমাদের মধ্যে আমাকে নিয়ে কোন ঝগড়া হয় , তাই আমি চাইনি মেয়েটা রাজমহলে থাকুক । আর শর্মিষ্ঠাও তোমাকে কষ্ট দিতে পারবেনা বলেই আশ্রমেই থাকবার কথা বলেছিল । তুমি তোমার সন্তানদের সাথে এই রাজমহলে থেকেছ । শর্মিষ্ঠার ছেলেদেরও সে আশ্রমেই বড় করেছে । ও এতদিন নিজের অধিকারে এই রাজমহলে থাকবার জন্য আমার কাছে দাবি করেনি । 

-তাহলে আচমকা পাঁচ ছেলে বলছ কেন ?

-আচমকা নয় প্রথম থেকেই বলে আসছি । আমার সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রে আমি পাঁচ ছেলের ক্ষেত্রেই সমান দৃষ্টি রাখব । তাছাড়া ভুলে যেও না তুমি ব্রাক্ষ্মণের কন্যা হয়ে যতটা উচ্চবংশীয় দাবী করছ , শর্মিষ্ঠাও ক্ষত্রিয় রমণী । মনে রাখব ওর পিতা বৃষপর্বা ।

-আর এও জানি ও যখন আমার সাথে এসেছিল , পিতা বলেছিলেন , শয্যায় না ডাকতে । আমি যখন গর্ভ যন্ত্রনায় ছটফট করছিলাম । তখন তুমি ওকে নিয়ে বিছানায় মত্ত ছিলে ! ছিঃ ...

ঘরের ভিতর এক ঘন নিস্তব্ধতা । বাইরে দিনের মধ্যভাগ অনেক আগেই পেরিয়ে গিয়েছে । দেবযানী চুপ করে রইল । তার সুন্দর সাজ নষ্ট হয়ে গিয়েছে । দু’ চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে নামছে । বুকের কাপড় অগোছালো , ফলত ওড়নার অন্তরালে বক্ষবন্ধনীটি দেখা যাচ্ছে । দেবযানী বলল – আমি সেই দিন যদি উপবনে ঘুরতে গিয়ে সুন্দর মতন দেখতে তিনজন বালককে না দেখতাম আর সেই কুরূপা দাসীকে জিজ্ঞেস না করতাম । আজও জানতে পারতাম না। 

যযাতি বলল – শর্মিষ্ঠা বলেছিল আমাদের এই সম্পর্ক ধর্মানুসারে ।

দেবযানী আরও জোরের সাথে বলল – চুপ করো , শর্মিষ্ঠার এত বড় সাহস আমাকে বলল সে তোমাকে আমারই মতন পতি হিসেবে গ্রহণ করেছে । তাই সন্তান নিয়েছে । এর জন্যই অসুর স্বভাব বলেই ... 

কক্ষের বাইরে প্রহরী এসে খবর দিল । দৈত্য গুরু শুক্রাচার্য এদিকেই আসছেন । দেবযানীর সাথে দেখা করবে । দেবযানী ডানহাতের পিঠটা চোখের নিচে গালের ভিজে যাওয়া জায়গা গুলোতে মুছে নিল । 

-জানতাম দেব আসবেন । আমার সমস্যার সমাধান তার কাছে আছে । 

যযাতির কথা শুনে দেবযানী হাসল । -পিতা আমাকে এখনো ভালোবাসেন আর আমি জানি আমাকে তিনি তোমার মতন ত্যাগ করবেন না। যেমন আমি আমার সন্তানদের করতে পারিনা । 


গুরু শুক্রাচার্য নিজের ঘরে বিশ্রাম করছিলেন । 

দুপুরের ভোজ আজ খুব তৃপ্তি ভরে খেয়েছেন । তাঁর একমাত্র আদরিনীর তত্ত্বাবধানে তৈরি খাবার , মেয়েকে পাশে পেয়ে পরম সন্তোষে খেয়েছেন । খাবার গ্রহণ করবার সাথে মনের একটা যোগাযোগ রয়েছে , এই যোগাযোগে বৃদ্ধের মুখে পরম তৃপ্তি ফুটে উঠল । 

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল । নরম গদি থেকে নেমে রাজকক্ষের জানালায় হাত রেখেছে । বাইরে প্রাঙ্গণে শিশুদের ছোটাছুটি তাকে আজও তাজা আর শৈশবে নিয়ে যায় । আকাশের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল , সূর্য ডুবতে ঘণ্টা খানেক বাকি আছে । 

-আসব 

শুক্রাচার্য ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল রাজা যযাতি দাঁড়িয়ে আছে ! 

-আরে এসো রাজন , আমার ঘরে আসতে এত সংকোচ কেন ? 

- আর্য সংকোচ । রীতি বলতে পারেন । আপনার শরীর কেমন আছে ? 

-এই বয়সে যতটা ভালো থাকা যায় , তার চেয়ে ভালো । তাছাড়া আমায় যে সুস্থ থাকতেই হবে। ইন্দ্র অনুগামীরা ক্রমাগত লড়াই চালাচ্ছে । এক সাম্রাজ্যবাদ মানসিকতা । আমি অসুরের পক্ষ নিয়ে লড়াই করব বলেছি । বৃহস্পতির কাছে কিছুতেই হারতে পারব না। 

-ক্ষত্রিয় জীবনে যুদ্ধ এক অনবদ্য অঙ্গ । আপনার এত ব্যস্ততার মধ্যেও আমাকে সময় দেওয়াও এই যুদ্ধেরই অঙ্গ ।আমি জানি । আর আপনার মতন একজন যোদ্ধাকে গুরু হিসেবে পেয়ে দৈত্য কূল বেশ লাভবান হয়েছে ।

-লাভ আর লোকসান , ব্যবসায়িক শব্দ । বড়ই আপেক্ষিক রাজা । তুমি যুদ্ধ হেরেও লাভবান হতে পারো , যদি শ্ত্রু শিবিরের পরাজয়ের রহস্য জেনে যাও । আবার জিতেও লাভ হবেনা, যদিনা সেই জয় এক দীর্ঘকালীন পরিকল্পনার অংশ না হয় ! 

-জানি ।

-তুমি এত সহজে এই তথ্য বুঝে গেলে । দৈত্যদের আমি আজও বোঝাতে সক্ষম হলাম না । বাদ দাও। 

এই সময় দাসী জল নিয়ে এল । শুক্রাচার্য কপালে হোমের কালো টিকা দিয়েছে । তার চেহারা আর্য দের মতনই , তবে নর্ডিক আর্য নয় । অপেক্ষাকৃত খাটো চেহারার আর চোখ দুটো বেশ চওড়া । আয়ত দৃষ্টিতে পাণ্ডিত্য আর বুদ্ধির ধার ঝলসে পড়ছে । 

-তুমি তোমার লোকাচার সম্পূর্ণ করে ফেলো । 

পা ধুয়ে দিল যযাতি । দাসী চলে গিয়েছে । গুরু শুক্রাচার্য নরম খাটের উপর বসল। বলল –তুমি তোমার রোগের কথা গোপন রেখেছ তো ? 

-এই রোগের কথা গোপন রাখা গেলেও , চিহ্ন কি লুকিয়ে রাখা যাবে ? 

-না পারলেও রাখতে হবে । নতুবা দুর্বল রাজা দেখলেই প্রজা বিদ্রোহ করবে । দুর্বল নেতাকে কেউ চায়না । তাছাড়া মনে রেখো তুমি যে বংশে , তার একটা সুনাম আছে । যদিও তোমার অসংযমী যৌন জীবন , তোমাকে রোগের দিকে ঠেলে দিয়েছে । আমি চিকিৎসা করব । কিন্তু আমার মনে হয় এই সময় তুমি কাজে লাগাও । তোমার পুত্রদের বয়স উনিশ । এটাই সবচেয়ে ভালো মুহূর্ত । 

-আচ্ছা আপনার পরিচিত বিশেষজ্ঞরা এই রোগ নিয়ে কি বলছেন ?

-বার্ধক্য খুব দ্রুত গ্রাস করবে । শরীর ভাঙতে থাকবে । তাইতো তোমায় পরামর্শ দিয়েছি । তুমি পরীক্ষা করেছ ?

-হে প্রভু , আমি উত্তর পেয়েছি । মন ভেঙে গিয়েছে । 

-এইক্ষণ যোগ্য উত্তরাধিকারী খোঁজার । তোমার মন ভাঙা গড়ায় কিছুই যাবে আসবে না । 

-আমার চোখে পুরুই সেরা । আমি চাইছি আপনি নিজে বিচার করুণ । পুরু আমার আত্মজ ।আমি চাই শক্তিশালী উত্তরসূরি ।পুরু সেরা কারণ ও আমার অনুগত । আমার রোগ , পাপ সবটাই বিনা শর্তে নেবে ! 

-রাজা , তোমার রোগ যদি কেউ জেনে বুঝে নিয়ে নেয় , সে কিন্তু বোকা হতে পারে কিম্বা লোভী ! তাই আবেগ তাড়িত হয়ে লাভ নেই । তুমি আমায় বলও , যখন নিজের সন্তানদের এই প্রস্তাব দিলে তোমার জরা তুমি দেবে আর তার বদলে সে তোমাকে যৌবন দেবে নাকি ? উত্তরে কি বলল ?মানে আমাকে সবটা খুলে বলবে ,চেপে রাখবে না । 

-তারা একেক জন একেক রকমের উত্তর দিল । কার প্রবৃত্তি কোন পথে চলেছে , বুঝতে পারলাম না । এই ব্যাপারটা যতটা সরল ভেবেছিলাম ততটা নয় । 

-আমি বুঝেছি । একটা কথা মনে রাখবে , শুধু সিংহাসনে বসালেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়না । ভবিষ্যতে তোমার অন্যান্য পুত্রের মনে সিংহাসন না পাওয়ার যে ক্ষোভ তা বিদ্রোহের আকার নিতে পারে ! সেই দিক থেকেও সাবধান থাকতে হবে । 

যযাতির কাঁধ ধরে শুক্রাচার্য বলল – আজ বিশ্রাম নাও । কাল খুব ভোরে আমরা এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করব । 

৪ 

এই সময়ে পাখিরা জেগে ওঠেনা । আকাশে শেষ রাতের ছায়া থাকে । সেই ছায়ার পিছনেই আলো অপেক্ষা করে রয়েছে । ঠিক সময়ে ভোর হবে । আর শেষ রাতের অন্তিম সীমায় দাঁড়িয়ে ,যে মুহূর্তে ভোরের আলো ঢুকবার জন্য পরিচিত আগন্তুকের মতন দরজার উল্টো দিকে অপেক্ষা করে থাকে , সেই সময়টুকুই ব্রক্ষ্ম মুহূর্ত । 

আগের রাতের কথা মতন রাজা যযাতি ব্রক্ষ্ম মুহূর্তে , গুরু শুক্রাচার্যের কাছে এসেছে । পাথরের তৈরি জানালায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে । পিছনে গুরুদেব পাথরের মেঝেতে বসে ধ্যানে মগ্ন রয়েছে ।

শুক্রাচার্যের ধ্যান ভাঙতেই , সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যযাতিকে ইশারায় ডাকল । রাজা এসে পা’ভাঁজ করে বসল । শুক্রাচার্য বলল

-সারারাত না ঘুমালে , চেহারায় তার ছাপ থাকে । এর ফলে এক প্রকার নিজের রোগকেই প্রশ্রয় দেওয়া হয় । এটা তোমার জন্য কাম্য নয় ।

-আপনার কথা মতন আমি আমার পাঁচ সন্তানকে গোপনে জিজ্ঞেস করেছিলাম । তারা বিশ্বাস করেছে যে আপনি আমায় জরা ভোগ করবার অভিশাপ দিয়েছেন । আমি তাদের বলেছি , আপনি এই শাপের হাত থেকে রক্ষার একটাই পথ দেখিয়েছেন । আমার পাঁচ সন্তানের মধ্যে কোন একজনকে নিজের ইচ্ছায় আমার জরা নিয়ে , নিজের যৌবন দিতে হবে । আমি অবশ্য আমার ইচ্ছা অনুযায়ী যৌবন ভোগ করে আবার তাকে তার যৌবন ফিরিয়ে দিতে পারব । তবে পুরো ব্যাপারটাই আমার ইচ্ছার উপর । 

-তারপর ? 

-তারা নিজেদের মতামত রাখল ।

-শুনছি ।

- আমি আমার বড় ছেলে দেবযানীর পুত্র যদুকে বললাম সে যেন তার যৌবন আমায় দেয় আর আমার রোগ তাকে নিতে হবে। উত্তরে বলল, এই সংসারে কেউই বৃদ্ধ আর দুর্বল ব্যক্তিকে পছন্দ করেনা। কেননা তাকে দেখতে আগের মতন থাকেনা । শরীরের মাংস ঝুলে যায় । তাই তাকে বাদ দিয়ে অন্য পুত্রের কাছে যেন যাই ।

শুক্রাচার্য হাসল । বলল – এই পুত্র ভোগটাকেই প্রথমে রেখেছে । তার উপর ভীতু । তাই তুমি একে সিংহাসনে বসিয়ে নিজের জনপদের পরিসীমা বৃদ্ধি করতে পারবে না । ওকে বলও নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে । যদি কখনও সক্ষম হয় , তখন দেখা যাবে । 

-এরপর গেলাম দেবযানীর ছোট পুত্রের কাছে , তুর্ব্বসু বলল বার্ধক্য এলে বুদ্ধি নষ্ট হয়ে যায় । পদে পদে প্রাণ নাশের আশঙ্কা থাকে , তাই সে কোন মতেই নিজের ক্ষতি করবেনা ।

-তারমানে রাজা ভাবো , এমন একজন নেতা যদি সিংহাসনে বসে তবে সে কখনই তোমার অধীনতা স্বীকার করবেনা । নিজের ইচ্ছামতন শাসন করবে । ফলত ভবিষ্যতে ব্রাক্ষ্মণ আর ক্ষত্রিয়ের মধ্যে যে বোঝাপড়ার ইতিহাস রয়েছে তাকেও অস্বীকার করবে ! তুমি তাকে এক রুগ্ন , অল্প বুদ্ধি , সমাজচ্যূত , দুর্বল , আর নিকৃষ্টতম জনপদের নেতা কর । কেননা তাকে সরাসরি রাজ্যচ্যুত করলে বিদ্রোহ করতে পারে । বরং এমন জনগোষ্ঠীর নেতা করে দিলে যারা আর্য আচরণ থেকে অনেক দূরে থাকে , ফলত তোমার বিরুদ্ধে কোন বিদ্রোহ হলেও , তা দাবিয়ে রাখতে পারবে । আর্য নেতাদের থেকে সহায়তা পাবে না । তারপর ... 

-আমি শর্মিষ্ঠার বড় ছেলে দ্রুহ্যোকে প্রস্তাব দিলাম । সে উত্তরে বলল , বুড়ো হলে মানুষ খুব দুর্বল হয়ে পড়ে । বৃদ্ধ মানুষ ঘোড়া , রথ , হাতির পিঠে চড়তে পারেনা । কথা বলতে গেলে হাঁপায় । মেয়েরাও এমন লোককে ত্যাগ করে । সে কোন মতেই নিজের ক্ষতি করে , আমার প্রস্তাব নেবে না ।

-মানে , তোমাকে অস্বীকার করল ! একে রাজ্য না দিলে সরাসরি তোমার বিরুদ্ধে আক্রমণ করতে পারে ! কেননা , রথ , ঘোড়া আর হাতিতে ওর বিশেষ আগ্রহ আছে । তুমি দ্রুহ্যোকে এমন স্থানের রাজা করে দাও , যা এই তিন বাহিনীর থেকে অনেকটা দূরে । বলতে পারো জল আর জল থাকে । ভেলা করে যাতায়াত করতে হয় । ফলত ভবিষ্যতে তোমার বিরুদ্ধে আক্রমণ করলেও যোগ্য সেনাবাহিনীর অভাবে ব্যর্থ হবে । তারপর ...

-অনুকে বলতেই সে তৎক্ষণাৎ বলল , দুর্বল ব্যক্তি যজ্ঞে অংশ নিতে পারেনা আর তার জীবন সদাচারে থাকে না । তাই সে এই সবের মধ্যে থাকবে না ।

-রাজা মনে রাখবেন অনু , দৈত্য রাজ বৃষপর্বার নাতি । ভবিষ্যতে ভাইদের নিয়ে আপনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতেই পারে । তাই ওকে সমাজের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ । শাপ গ্রস্থ করে দাও । 

রাজা যযাতি থামল । ঘাড় নিচু করে আছে । আবার ঘাড় তুলে বলল 

-পুরুকে আমি বললাম আমি পাপি ও কামুক । এটাই আমার আজকের অবস্থার জন্য দায়ি । তুমি কি আমার অনুগত হয়ে , আমার পাপ নেবে ? সে কোন কথা খরচ করল না । অত্যন্ত বিনীত ভাবে বলল সে প্রস্তুত ।

এই কথা শুনেই দৈত্য গুরু শুক্রাচার্যের মুখ হাসিতে ভরে গেল । সে উচ্চস্বরে হাসতে -হাসতে বলল – হ্যাঁ , অনুগত হতে হবে । এটাই সিংহাসনে বসবার একমাত্র শর্ত । যযাতি এটা ঠিক পুরু আমার প্রভুর নাতি । এটাও ঠিক ওর হাতে সিংহাসন চলে যাওয়া মানে আমার বংশধরের হাত থেকে ক্ষমতা অন্য বংশের হাতে চলে যাবে । কিন্তু তাও আমি পুরুর দিকে থাকব । ওকেই সমর্থন করব । রাজা এটা আর্য ভূমি এখানে সমীকরণ রক্তের উপর নির্ভর করে না । এখানে ক্ষমতা ধরে রাখা আর নিজের প্রয়োজনে তা ব্যবহার করাই একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত । সিংহাসন প্রাপ্তির প্রধান শর্ত আনুগত্য । তুমি যেমন ক্ষত্রিয় হয়ে ব্রাক্ষ্মণের প্রতি অনুগত । তেমনই তোমার উত্তরাধিকারিকেও অনুগত হতে হবে। আমি দেবযানীর পিতা হিসেবে নয় ইন্দ্রের বিপক্ষ শিবিরের নেতা হিসেবে এসেছি । তুমি পুরুকেই তোমার উত্তরাধিকারি কর । তাকে রাজ্যাভিষেকে আহ্বান করা হোক । 

-কিন্তু , আপনার মেয়ে যে আপনার থেকে অনেক আশা করে রেখেছে । আপনি তার আত্মজকেই সিংহাসনে বসাবেন !

-রাজা যযাতি , দেবযানী তার পিতার কাছে আশা করেছে । তাকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যেতেই হবে । তুমি দৈত্য গুরু শুক্রাচার্যের কাছে আশা করেছ । সে তোমায় ঠকাবেনা । এমনিতেও কন্যার প্রতি অন্ধ প্রেম আমার আদর্শের অনেক ক্ষতি করেছে অতীতে । ইন্দ্র অন্ধ সন্তান স্নেহের ভরপুর সুযোগ নিয়েছে । এই সবকিছুর কেন্দ্রে আছে দেবযানী । তুমি নিশ্চিন্তে থাকো এই নিয়ে দেবযানী তোমাকে আর বিরক্ত করবেনা । বিদ্রোহ করবেনা ।

-কেন গুরু শ্রেষ্ঠ ?

-পৃথিবীতে সব সুন্দর আর উজ্জ্বল অস্থিত্বের আড়ালেই রয়েছে এক অন্ধকার ইতিহাস । ধরে নাও তেমনই অন্ধকারের ইতিহাস আছে দেবযানীর ! এই ইতিহাস সে তোমাকে বলেনি । তোমার সাথে তার দেখা একটি বনের ভিতর , যেখানে তাকে জীবন্ত সমাধি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল । সেখান থেকে তুমি উদ্ধার করেছিলে । তারপর তোমাদের বিয়ে হয় । রাজা তোমার জানতে ইচ্ছা হচ্ছে না দেবযানী কেন সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল ? তার জীবনেওতো কোন রহস্য থাকতে পারে ? সেও কি প্রতারণার স্মৃতি নিয়ে ঘুরে বেরাচ্ছে ! তার সেই অভিজ্ঞতার সাথে আর্য ভূমির ক্ষমতা দখলের সমীকরণ লুকিয়ে আছে কি ? 

উত্তেজিত যযাতির নিঃশ্বাস ঘন হতে শুরু করেছে । চোখের পলক স্থির। এই প্রথম শুক্রাচার্য লক্ষ্য করল --- হেমন্ত কালে , রাজা ঘামছেন ! 

যযাতি বলল – প্রভু আমি জানতে চাই ।

শুক্রাচার্য আবার ধ্যানে ডুবে গিয়েছে । সে ভাবছিল , পুরু যদি কখনও আনুগত্য দেখাতে অস্বীকার করে , তবে তারও বিকল্প পথ রয়েছে । আসলে যযাতি চাইছে উত্তরাধিকারী , আর সে চাইছে অনুগত শাসক ! 


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.