x

প্রকাশিত বর্ষপূর্তি সঙ্কলন

দেখতে-দেখতে ১০ বছর! শব্দের মিছিলের বর্ষপূর্তি সংকলন প্রকাশের সময় এ খুব অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু অজস্র লেখক, পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থনে আমরা অনায়াসেই পেরিয়ে এসেছি এই দশটি বছর, উপস্থিত হয়েছি এই ৯৫ তম সংকলনে।

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৭

তাপসকিরণ রায়

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৭ | | মিছিলে স্বাগত
ত্যাগ না, পরিত্যাগ
গ্রাম মাঝুলির কথা বলছি। মধ্যপ্রদেশের জেলা মান্ডলার কথা বলছি। 

নতুন গজিয়ে উঠছিল এক নেতা, নাম তার ভানু। ছোট বেলা থেকে ও কথাবার্তা বেশ গুছিয়ে বলতে পারতো। গ্রামের মাতব্বরের দল তাকে উৎসাহ দিতো, ভানু রে তুই কথা বেচতে পারবি--আমরা যেমন একটু একটু করে নিজেদের আখির গুছাতে পেরেছি ঠিক তেমনি বক্তিতে দিতে দিতে তুইও একদিন বড় নেতা হয়ে উঠতে পারবি। এই যে দেখ তেলিরাম দাদাকে, আশপাশের তিন গ্রামে তার কি গণ্যিমান্যি! তোরও একদিন হইবো--তুই নেতা হইতে পারবি--দেশে কথা বেচে বেচে নেতা বনছে এমনটার অভাব নাই রে ! 

ভানু তখন উৎসাহ ভরে বক্তৃতা শুরু করে দেয়, বন্ধুগন দেশ মানে মাতা, এই দেশ নাই তো তুমি নাই, এই দেশের জন্যে তুমি কি করছ ? নিজের বুকে হাত রাইখ্যা কও তো নিজের খাওয়া পরার বাইরে একবার কি দেশ মার পানে চাইয়া দেখছো ? তার অপমান, তার দুর্দশা…

ভাষণ মহড়ায় তেলিরাম মাতব্বর খুব খুশি হয়ে যায়, সে ভানুর পিঠ চাপড়ে বলে ওঠে, সাবাস, তুই আধা নেতা বইনে গেছিস রে ! ঠিক এমনি এক দিনে গ্রামে এসে হাজির হয় বিপক্ষ দলের নেতা মনু বাবু ও তার দলবল। মনুর লোকেরা গ্রামের কাউকে চেনে না। চেনা জানার বিশেষ দরকার পড়ে না, ওদের কাছে এতো সময় কৈ ? ওরা দেশের সেবা করতে করতে আর অবসর সময় খুঁজে পেল কৈ ? তবে ওরা গ্রামের মাতব্বর শ্রেণীর তেলিরামের মত লোককে হাতে রাখে। ওরা জানে গ্রামের মাতব্বর শ্রেণীর লোকরাই গ্রামের মন্ত্রীমন্ডল। ওদের বাগাতে পারলেই গ্রামের সব লোকদের হাতে করে নেওয়া যায়। 

--এই যে তেলিরাম বাবু, কেমন আছো ? নেতা মনু বলে ওঠে। 

তেলিরাম গদগদ হয়ে ওঠে, আপনাদের দয়ায় ভালো চলে যাচ্ছে, সের ! 

--সব তো বুঝলাম, এখন দেশের জন্যে তো কিছু করতে হয় ! 

তেলিরাম হাত জোর করে বলে ওঠে, হুকুম, সের !

মনুর দলের এক হাফ নেতা বলে উঠলো, দেশের খবর কিছু রাখো তো ?

--সব শুনি--টিভি তো একটা আছে সের !

--তোমার গ্রাম তো এখনো ঘুমাচ্ছে দেখি !

--সবাই ভালই আছে বাবু, এমনিতে দু এক ঘর দিন আনা দিন খাওয়া আছে বটে--

একজন খুচরো নেতা বলে ওঠে--লেকচার বন্ধ করো তুমি, এবার কিষান আন্দোলনে যোগ দাও--

--এ তো সময়ের ব্যাপার, সের--

এবার মনু বলে ওঠে--তিন দিন সময় দিলাম, সদর শহরে তোমাদের গ্রামের লোক পাঠাও, কিষানের সঙ্গে এরাও যোগ দিক--সুখে ঘুমিয়ে থাকলে চলবে না তেলিরাম বাবু !

হাত জোরে তেলিরাম, এ তো আমার একার কাজ নয় বাবু, সময় লাগবো--আর সবাই আমাগ কথা শুনবো কেন ? কথাগুলি হাত জুড়ে বলল বটে কিন্তু তার মুখে কেমন যেন কপট হাসির রেখা ছড়িয়ে পড়ল। তারও তো তিন গ্রামের মাতব্বর বনতে কম কাঠ খড় পুড়াতে হয়নি। ট্রিক্স পলিটিক্স কম চালাতে হয়নি--তেলিরাম দেখেছে গ্রাম বলো, আর শহর বল, জিলা কিংবা দেশ, সব জাগার ইতিকথা এক--পলিটিক্স সর্বত্র চলছে। এমন কি সে দেখেছে, পরিবার চালাইতে গেলেও সেই গিয়া পলিটিক্সই ভরসা। পলিটিক্স মানে হল গিয়া এক প্রকার ভন্ডামি। এই দেশের অনেকটাই এই পলিটিক্স, মানে ভণ্ডামিতে চলছে। হ্যাঁ, দুই একজন অপেক্ষাকৃত সাদামাটা লোক বাস্তবিক দেশ সেবায় আছে বটে কিন্তু আখির তারা টিকতে পারে না, এ ব্যাপারে বোকা সাদাসিধা লাল বাহাদুরের কথা তার মনে পড়ে গেল।

--এই নাও, দশ হাজার রাখো, মনু বাবু হাত বাড়িয়ে একশ টাকার এক বান্ডিল তেলিরামের দিকে এগিয়ে ধরে বলে, অনেকদিন চুপচাপ বসে আছো এবার লেগে যাও দেশের কাজে। 

না না, সের টাকা লাগবো না--তা ছাড়া এই টাকায় কি হইবো ? মানুষের ঘুম ভাঙাইতে, সুখের ঘুম ছাড়াইতে সময় লাগে বাবু !

মনু বলে ওঠে, তুমি যে ঝানু মাল সে আমি জানি--সে আরও একশ টাকার একটা বান্ডিল তুলারামের হাতে ধরিয়ে দেয়, তার পিঠে একটা হালকা চাপড় মেরে বলে, আরও অনেক পাবে, আমাকে তো তুমি চেনো ?

তেলিরাম জানে বেশী দাম কষাকষি এখানে চলে না—এর থেকেই নিজের আলাদা অংশ তুলে রাখতে হয়। আজই গ্রামের মন্ত্রীমন্ডল ডাকতে হবে—না আজ না--এখনই--

গ্রামের মন্ত্রীসভায় তেলিরাম উত্তেজনার রসদ যুগিয়ে চলে। ভানুকে ডেকে সে বলে, ভানু দেশের কি অবস্থা তুমি আমাগ একবার শুনাও তো ?

ভানুকে নিয়ম করে টিভি দেখতে হয়। মন্ত্রীর, নেতার বক্তৃতা মন দিয়ে শুনতে হয়। দেশের জ্বলন্ত খবর তার রাখতে হয়। তবেই তো সে তার বলার কথা জুগার করতে পারে ! ভানু শুরু করে--আমার ভক্তি ভাজনেরা, আজ আমরা দেশ উদ্ধারে একত্রিত হয়েছি। দেশের এখন খুব খারাপ অবস্থা চলছে, দেশের অন্নদাতাদের ওপরেই দেশ টিকে থাকে, আমরা তা জানি, সেই দেশের কৃষক আজ না খাইতে পাইয়া মরতাছে--

এর মধ্যে এক নিম্ন শ্রেণীর নেতা মাঝ পথে বলে ওঠে, কৈ এমনটা শুনি নাই তো ! আমরা তো ভাল আছি ! তেলিরাম তাকে প্রায় ধমক দিয়ে থামিয়ে দেয়, তুমি কি খবর রাখো ? আমাগ গ্রামের সুখীরামের খবর তুমি রাখো ? এই ভানু, তুই শুরু কর--

--হ্যাঁ, যা কইতে ছিলাম, সুধীগণ….

এই তিন গ্রামে ভানুর ভাষণ বেশ কাজে লেগেছে। সুখী কিষাণদের ঘুম ভাঙছে। দেশের দিকে তাগ মন জাগতাছে--আর কিষানদল মানে হল গিয়ে তাদের নিজের দল। কৃষকের দুঃখ কৃষকই তো বুঝবে। কেবল নিজের খেত খামার দেখলেই তো চলে না--তার ওপর যে বড় একটা জাগা আছে, তাকে বলে দেশ, তাকে বলে মা, দেশ মাতার কথা কে ভাববে ? আমরা যদি শুধু নিজের কথাই ভাবি তবে আমরা কেমন মানুষ ? মানুষের নাম মানব বলা হয় কখন ? ভানুর নতুন নতুন ভাষণের পর একদিন মনু বাবুর সঙ্গে স্থানীয় বিধায়ক আসলো, সঙ্গে বেশ কিছু জনতা, ক্ষুদে নেতা, কৃষক নেতা, কৃষক আত্মদাহ সমিতির মন্ত্রক দল। সে এলাহি ব্যাপার বলতে হবে। এমন কি নিউজ কভার করতে রিপোর্টাররাও এসে হাজির হল। সে বলতে গেলে বিরাট এক সভা অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো। 

ঘুমন্ত গ্রাম জেগে উঠলো। এখানেও উত্তেজনার মহল তৈরি হয়ে গেলো। বিভিন্ন মতামতে মতাকার হয়ে গেলো। দেশ নিয়ে বিবাদ, মাতব্বরদের স্বার্থপরতা নিয়ে সন্দিহান, সব কিছু জড়িয়ে এক ক্ষুদ্র ভারতের অশান্ত ঘূর্ণন চিত্র যেন এ গ্রামেও প্রতিফলিত হতে লাগলো। তেলিরাম দোকান ছেড়ে সারাদিন তিন গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ গ্রাম, পাশের গ্রাম, শুধু এক গ্রাম নিয়ে বসে থাকলে তো তার চলে না --ধীরে ধীরে ক্ষমতা বাড়াবার প্রচেষ্টা করতে কার না ইচ্ছে জাগে ? আর্থিক সহায়তা তেলিরামের হাতে এসে পৌঁছে গেছে। সে জানে এ ধরনের কাজে টাকা পয়সার অভাব হয় না--লাগলে দেবে গৌরী সেন ! ভূতে যোগানো টাকা আর কি ! এ সব কাজে সব হয়ে যায়, রাধাও নাচে, কুইন্টাল কুইন্টাল তেলও পোড়ে। 

এদিকের গ্রাম থেকে কৃষকদল সদর শহরে পৌঁছে গেছে--ওরা যোগ দিয়েছে কৃষক আন্দোলনের মুখ্য প্রতিবাদী ধারায়। ভানু নিজের ছবি টিভিতে দেখেছে। সে আজকাল দৈনন্দিন কথাগুলি ভাষণের চালে বলে যাচ্ছে। গ্রামে তার নামডাক হয়েছে তার গায়ের পোশাক বদলেছে। মনু বাবু তাকে কথা দিয়েছে, তাকে দলে ভর্তি করবে বলে। তার মত সেবক নাকি তাদের দলে প্রয়োজন আছে।

--জয় জোয়ান, জয় কিষাণ !

--অন্ন হল মানুষের জীবন, অন্ন নাই তো মানুষ নামক প্রাণী নাই--সমস্ত কিছু বন্ধ--আজের এই কিষাণ, গরীব কিষাণ, আজের কিষান না খেতে পাওয়া মরা কিষান ! নিজের খেতের অন্ন সে তুলে দেল দেশের দ্বারে…

সদর শহর মান্ডলা। জেলার প্রধান আন্দোলন কেন্দ্র। ইতিমধ্যে ময়না লাল আত্মদাহ করেছে। এবার সুখীরামের পালা। না খেতে পেয়ে পরিবার পালন করতে না পেরে সে নাকি আজ আত্মহনন করতে বদ্ধপরিকর। বিরোধী দলের আঁতাঁতরা এখানে পালা বদল করে রাতদিন পড়ে আছে। তারা কিষাণদের বাঁচাতে তাদের পরম সহায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান সরকার অপারক। কৃষকের দিকে তাদের দৃষ্টি নেই। কৃষক বাঁচুক-মরুক তাতে নাকি তাদের কিছু আসে যায় না। 

ঝড় উঠেছে--ভাষণে, কর্মকর্তাদের বিতর্কে, কিষাণের প্রতিবাদী কণ্ঠে। দু-তিন গ্রাম মিলিয়ে আলাদা আলাদা নেতা, সবাই আন্দোলন জোরদার করতে ব্যস্ত। কৃষক শ্রেণীর অনেকেই আজ তাদের ভেতর দুঃখগুলি যেন খুলে খুলে দেখতে পারছে। অভুক্ত কৃষকের যন্ত্রণা ভুক্ত কৃষকেরা কিছুটা টের পায়। আবার অনেকখানি ভাবনায় ভুক্ত ওদের মন, অভুক্ত কৃষকের অন্তরকে ঘায়েল করে। এখানে আছে অনেক অকৃষক শ্রেণীর লোক, খুচরো নেতা, আধ নেতা, ভাড়া খাটা গুণ্ডা, আর কিছু ভব ঘুরে জনতা, সবাই বলতে গেলে তেলিরামের মত ভাড়া খাটছে বা ভাড়া খাটাচ্ছে। ওপরওয়ালা মানুষগুলির কাছে কিন্তু নাচাবার সূত্র ধরা আছে। তারা সবাই মিলে ভাল মানুষের কানে মন্ত্র দিয়ে তাকে মন্দ মানুষ করতে পারে কিংবা ধমকি দিয়ে তার পরিবার ও জীবনের ওপর ভীষণ চাপ সৃষ্টি করে ভাল মানুষকে মন্দ মানুষ বানাতে তাদের বেশী সময় লাগে না।

হঠাৎ প্রতিবাদীর এক অংশ থেকে হৈ চৈ জটলা হতে দেখা গেলো। এক কিষান নাকি আত্মহত্যা করতে উদ্যত হয়েছে। তার হাতে কীটনাশক দাবার শিশি, লোকটা উন্মাদের মত গোল গোল ঘুরে ঘুরে কিছু বলে যাচ্ছিল। ওকে বাঁচাবার জন্যে কেউ তৎপর হয়ে উঠছিল না। এক আধজন এগিয়ে গেলে তাকেও পরোক্ষ ভাবে বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছিলো। লোকটা মাঝে মাঝে শান্ত হয়ে কিছু বলতে চাচ্ছিল। হবে তা তার একান্ত নিজের কথা, গূঢ় কিছু কথা। লোকটা কিছু বলতে গেলেই কিছু লোক ছুটে ছুটে গিয়ে তার মুখ চেপে তাকে থামিয়ে দিচ্ছিল। কি সে গুপ্ত কথা, না বলা কথা, আত্মকথা ! আমরা হয়ত তা কোন দিনই জানতে পারবো না। চারদিকে উত্তেজিত ভিড়। রিপোর্টারের ভিডিও ও ছবির ফ্ল্যাশ চমকে যাচ্ছে লোকটাকে ঘিরে। নেতার দল উত্তেজিত, কিষান উদ্বেলিত, তেলিরামের দল করুণ চাহনির নিচে গুপ্ত হাসির রেখা ধরে আছে। ঠিক তার পাশটিতে জয় জোয়ান, জয় কিষাণ শ্লোগানে আকাশ বাতাস মুখরিত হচ্ছিল। পুলিশ দল নীরব দর্শক, তারা যেন কিছুই বুঝতে পারছে না। ওদের সামনে যেন কোন বিয়োগান্ত নাটকের শেষ দৃশ্য ঘটে চলেছে। ওদের কমরের বন্দুক পিস্তলগুলি তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।

--দেশ মাতা কি--জয় !

--এই মাটির আসল রূপ সবুজ, কিষান ভাই সবুজ, ধ্বংসের বিপ্লবের বিরুদ্ধে আমাদের এ লড়াই। ওই দেখো তোমাদের সামনে এক কৃষক ভাই, স্বেচ্ছায় নিজের বলিদান দিচ্ছে। কেউ তাকে বাঁচাতে পারবে না, সে মরণ পণ করেছে যে সে মরবেই ! 

লোকটা তার হাতের বিষের শিশি তার মাথার ওপরে তুলে ধরে চীৎকার করে কিছু বলে চলেছে---তার কথার কিছুই বোঝা যাচ্ছে না, সে বাঁচাও বাঁচাও বা আমি মরবো, কি বলছে আমরা জানি না। হ্যাঁ, এবার সে তার হাতের বিষের শিশি খুলে নিচ্ছে। তাকে দেখলে এক বদ্ধ উন্মাদ বলেই মনে হচ্ছে। তার বৌ বারবার লোকটার কাছে ছুটে যাবার চেষ্টা করছিলো। কিন্তু তাকে স্বামীর কাছে যেতে দেওয়া হচ্ছিলো না। বৌটা দু হাত তুলে ব্যর্থ আকাশ ফাটা চীৎকার করতে করতে শেষে ভিড়ের পাশে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

আঃ আঃ আঃ লোকটা এবার আকাশের দিকে তাকিয়ে কাঁদছে। বিড়বিড় করে সে কিছু বলে চলেছে। পুলিশ ও কর্মকর্তাদের ঘেরার মাঝে যেন এক নাটক অনুষ্ঠিত হয়ে চলছিল। ওই যে লোকটা ঢগ ঢগ করে তার হাতের শিশি থেকে বিষ গিলে নিচ্ছে। চারদিকে ভীষণ শোরগোল চলছে। কিছু লোক ছুটেছিল লোকটাকে বাধা দেবে বলে, কিছু লোক তাদের বাধা দিচ্ছে যাতে নির্বিঘ্নে নাটকের শেষ দৃশ্য ঘটিত হতে পারে। 

ওই লোকটা মাটিতে ঢলে পড়লো। ও চীৎকার করছে। বিষের তীব্র যন্ত্রণায় হবে ও ভীষণ ছটফট করছে। জনতার ভিড়ের মাঝে, খোলা আকাশের নীচে এক বাস্তব নাটকের অন্ত মুহূর্ত শেষ হতে চলেছে। হাজার হাজার জনতা তার দর্শক, খোলা আকাশ তার নীরব দর্শক। 

লোকটার দেহ স্থির হয়ে গেলো। আর কিছু সময় দরকার। লোকটার শেষ দম যাবার পর নাটকের পর্দা পড়বে। আর তারপর দর্শকবৃন্দ ছুটে যাবে বাস্তবের আওতায়। কিছুক্ষণ পরে কর্মকর্তারা সবাই ছুটে গেলো লোকটার দিকে। হ্যাঁ, সব ঠিকঠাক, লোকটা নিশ্চয় শেষ বায়ু ত্যাগ করেছে। এবার ওকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হবে, আর তারপর শ্মশানঘাটে। 

পরের দিন সকালের আখবারে ফুটে উঠলো সেই লোকটার মানে সুখী রামের আত্মহত্যার ছবি। কাগজে বড় বড় হরফে লেখা হল, গ্রামের কিষান সুখী রামের আত্মহত্যা। বেশ কিছু দিন ধরে তার দিন আনা দিন খাওয়া পর্যায়ে চলছিল, সরকার তার আবেদন নিবেদনের দিকে ধ্যান দেয়নি। গ্রামের লোকেরা কিছু দিন সাহায্য করেছে বটে অবশেষে সুখীরাম তার পরিবারের অনাহার ও করুন দৈন্য অবস্থা দেখতে না পেরে কৃষক আন্দোলনে যোগ দেয়। তারপর ফলিডল জাতীয় তীব্র কীট নাশক বিষ খেয়ে সে আত্মহত্যা করে। সে সর্ব সমক্ষে নিজের দৈন্য কাহিনী বর্ণন করে, হাজার হাজার জনতার মাঝখানে থেকে সে দেশের জন্যে নিজের প্রাণ বলিদান দেয়। চেষ্টা সত্ত্বেও তাকে কেউ বাঁচাতে পারেনি। শেষে লেখা, জয় জোয়ান, জয় কিষান ! কৃষকদের আন্দোলন সফল হোক, এমন কামনা করে পত্রিকা তাদের বক্তব্য শেষ করে। সচিত্র ভিডিওতেও সুখীরামের আত্মহত্যার টুকরো টুকরো ঘটনাকে দেখানো হয়। টিভিতে নেতা, আধানেতা, খুচরো নেত, সাধারণ জনতা, কিষান আত্মদাহ সমিতির কর্মকর্তা আর মুখ্য নায়ক, গ্রামের সেই সুখীরামকে দেখানো হয়। তেলিরাম ও ভানুর এসব মন্দ লাগে না। তবে ভানু ভাবছিল, জনতার একপাশে হলেও তার ছবিটা আরও একটু স্পষ্ট হওয়া উচিত ছিল কিংবা কাগজওয়ালাদের বড় বড় নেতাদের সঙ্গে তার নামটা অন্তত একবার হলেও দেওয়া উচিত ছিল। তেলিরাম নিজের শরীরের ভেতর এক গরম উৎস অনুভব করছিলো। সফলতার বড় এক সোপান যে সে পার করে এলো ! এক প্যাক খোকা তার অপেক্ষায় যে বসে আছে।

এদিকে পরবর্তী টার্গেটের জন্যে নেতারা চিন্তিত, কিষান আত্মহত্যা বন্ধ হয়ে গেলে কিষান আত্মহনন সমিতির কি হবে ?--সদস্যরা এমত ভাবনায় পড়তেই পারে।

তিন গ্রামের মধ্যে সুখীরামের বলতে গেলে অবস্থা অসুখীর ছিল। দিন আনা, দিন খাওয়া লোক ছিল সে। পরিবারের আর পাঁচজন লোকের পেট চালানো সত্যি তার পক্ষে খুব কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবু, তবু তার দিন গুজার হয়ে যাচ্ছিল। তারই মাঝে একদিন হঠাৎই গ্রামের শাসন তন্ত্রের লোকেরা তার ঘরে এসে উপস্থিত হয়ে ছিল। কি ব্যাপার ? সুখীরাম অবাক হয়েছিল। কিছু না হোক সবাইকে সে শ্রদ্ধা ভরে জল খাওয়ালো। তেলিরাম সেদিন সুখীকে আলাদা ভাবে ডেকে নিয়ে বলেছিল, আমরা মানে আমি তোমার সঙ্গে আছি, আমরা থাকতে তোমারে না খাইয়া মরতে দিমু না। তবে--

সুখীরাম অবাক হয়ে তেলিরামের দিকে তাকিয়ে ছিল। তেলিরাম ভানুকে কাছে ডাক দিলো। বলল, তুমি সব কিছু বোঝাও তোমার সুখীরাম চাচারে ! ভানু অনেক বোঝাল সুখীরাম চাচারে। কি গো চাচা তোমার নামের দেখি কোন সত্যতাই নাই গো ?...তবে হ্যাঁ ভগবান মাঝে মাঝে সুযোগ দেয়--নাম সার্থক করতে। তুমি যাও কিষানের সাথে যোগ দাও, সরকার রে তোমার না খাইতে পাওয়ার কথা চীৎকার কইরা কও। এদিকে আমরা তো আছি--তোমারে কথা দিলাম, তোমার পরিবারের কিছু অসুবিধা হইবো না। আমরা ওগো দেখুম। দেখো, দেশ মায়ের সেবা করলে দেশ মাও তোমায় সুখী করবে--তোমার নাম সার্থক হবে…

অগত্যা সুখীরাম রাজি হয়েছিল। সে তার স্ত্রী অবলাকে, জলদি আমি ফিরুম, বলে কিষান আন্দোলনে যোগ দিতে সদরে চলে গেলো। স্ত্রী অবলা আর ছেলে মেয়েদের কান্নাকাটির মাঝ দিয়ে সুখী ঘর থেকে বেরিয়ে বৃহৎ আন্দোলনের মাঝে ঝাঁপ দিলো। তেলিরাম ও তার গ্রামের মন্ত্রীমন্ডলের প্ররোচনা অবশেষে সার্থক রূপ নিয়েছিল। অনেকগুলি টাকা পেয়ে তারা সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। বিনিময়ে অনেক পটিয়ে পাটিয়ে তারা সুখীরামকে পাঠাতে পেরেছিল। তলে তলে সব কিছু ঠিক ছিল। সুখীরামের আত্মদাহ আগেভাগেই পরিকল্পিত ছিল। তিন দিনেও যখন সুখীরাম গররাজি, শত বোঝানো, লালচ দেওয়া, সব কিছু যখন ব্যর্থ হল অগত্যা বাধ্য করানো হল সুখীরামকে। হঠাৎই একদিন তার পিঠে পিস্তলের নল ঠেকল। সে শুনতে পেলো চাপা গর্জন, হারামজাদা, দেশমায়ের জন্যে তুই তোর সামান্য প্রাণ দিতে পারিস না--তবে পিস্তলের গুলি খেয়েই মর। নির্জনতার সুযোগে সেদিন এমনি ঘটে গেলো। অগত্যা পরিবার বাঁচাতে সুখিরাম আত্মহত্যা করতে রাজি হল। তবে একটা শর্ত ছিল তার, সে আগুনে পুড়ে অনেক সময় নিয়ে জালা যন্ত্রণা ভুগে মরতে পারবে না, তার চে বিষ খেয়ে মরা তার কাছে অপেক্ষাকৃত সহজতর বলে মনে হয়েছিল। 

আত্মহননের দিনটিতে গ্রাম থেকে ডেকে আনা হল সুখীর স্ত্রী, অবলাকে। কিন্তু স্ত্রীকে সুখীরামের সঙ্গে বেশী সময় দেখা সাক্ষাৎ করতে দেওয়া হল না। তাকে জানানো হল যে তোমার স্বামী কিছুতেই আমাদের কথা মানছে না--সে দেশ মাতার জন্যে দেশের সমস্ত কিষান ভাইয়ের স্বার্থে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে বদ্ধপরিকর।

ওদিকে শেষ দৃশ্য শুরু হয়ে গিয়েছিলো। অবলা উন্মাদের মত স্বামীর কাছে ছুটে যেতে চাইতো, কিন্তু এখানকার আমলাতন্ত্র তাকে বাধা দিয়ে যাচ্ছিল। তারপর একটা সময় এলো সুখীরাম মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। তখন অবলা তার চোখে অন্ধকার দেখছিল। তার চোখের সামনে যেন ছায়া ছবির মত দৃশ্যগুলি পার হয়ে যাচ্ছিলো। ও তাকিয়ে দেখছিল। সবাই তার স্বামীর দিকে ছুটে যাচ্ছে। তার স্বামী মাটিতে লুটিয়ে ছটফট করতে করতে নিশ্চল হয়ে গেলো। আর তারপর লোকে লোকারণ্য। স্বামীকে ঘিরে সহস্র মানুষ--কেউ চীৎকার করছে হৈ হল্লার মাঝে কেউ শ্লোগান দিয়ে উঠলো, জয় জোয়ান, জয় কিষান !

কিষান আন্দোলন, অমর রহে ! তারপর অবলার আর কিছু মনে নেই। তার না খেতে পাওয়া শরীর কথা বলার শক্তি হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ছিল। যখন তার জ্ঞান ফিরে এলো, একটা গাড়ি তড়িঘড়ি করে তাকে কোথায় যেন নিয়ে এলো, অবলা.সেখানে দেখল, বিরাট এক মাঠের মাঝখানে প্রজ্বলিত আগুনের মাঝখানে কিছু জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে। ততক্ষণে সমস্ত নাড়াবাজী, চীৎকার, হৈহল্লার অবসান ঘটে গেছে। সুখীরামের দেহ থেকে দলা দলা মাংসপিণ্ড গোলে গোলে মাটিতে মিশে যাচ্ছে। পাশটাতেই তেলিরাম, ভানু, সানুদের দল দাঁড়িয়েছিল। ভানু অবলার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে মৃদু স্বরে বলে উঠলো, চাচী তুমি খুব পুণ্যবান, মানে পুণ্যবতী, দেখো তোমার স্বামী স্বর্গের দিকে রওনা দিয়েছে। দেশের জন্যে দশের জন্যে সে নিজেকে স্বেচ্ছায় শহীদ বানিয়েছে। তুমি যেন দুঃখ করো না, চাচী !


তাপসকিরণ রায়। পিতার নাম : স্বর্গীয় শৈলেশ চন্দ্র রায়।  মাতাঃ শ্রীমতী বেলা রায়। জন্মস্থান : ঢাকা, বাংলা দেশ। জন্ম তারিখ : ১৫ই এপ্রিল, ১৯৫০
স্বর্গীয় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রকাশনায় কৃত্তিবাস প্রকাশনী থেকে লেখকের প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : চৈত্রের খরায় নগ্ন বাঁশির আলাপ। উদার আকাশ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত লেখকের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থঃ তবু বগলে তোমার বুনো ঘ্রাণ। শিশু বিতান প্রকাশনী থেকে দুটি শিশু ও কিশোর গল্প গ্রন্থঃ (১) গোপাল ও অন্য গোপালেরা (২) রাতের ভূত ও ভূতুড়ে গল্প, প্রকাশিত হয়েছে। নান্দনিক থেকে প্রকাশিত লেখকের গল্প সঙ্কলন, গুলাবী তার নাম। এ ছাড়া প্রসাদ, সারাক্ষণ, পথের আলাপ, লং জার্নি, দৌড়, কালি কলম ও ইজেল, রেওয়া, কর্কট ক্রান্তি, দিগন্ত, নিরুক্ত, কবিতার সাত কাহন, অঙ্কুর, আত্মদ্রোহ, বেদুইন ইত্যাদি বেশ কিছু পত্রপত্রিকায় লেখকের গল্প, কবিতা ছাপা হয়েছে। এ ছাড়া ঐহিক, কালিমাটি, কৌরব, আদরের নৌকা, সৃষ্টি, পরবাস ইত্যাদি আরো কিছু  অন লাইন পত্রিকাতে তিনি লেখেন। শিশু-কিশোরদের পথের সুজন, কিচিরমিচির, জয়ঢাক, ম্যাজিক ল্যাম্প,  ইচ্ছামতি, কচিকাঁচা ইত্যাদি পত্রিকায় লেখকের উপন্যাস, গল্প ও কবিতা প্রকাশিত হয়েছে।


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.