x

প্রকাশিত বর্ষপূর্তি সঙ্কলন

দেখতে-দেখতে ১০ বছর! শব্দের মিছিলের বর্ষপূর্তি সংকলন প্রকাশের সময় এ খুব অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু অজস্র লেখক, পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থনে আমরা অনায়াসেই পেরিয়ে এসেছি এই দশটি বছর, উপস্থিত হয়েছি এই ৯৫ তম সংকলনে।

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

স্বপনকুমার ঠাকুর

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৭ |
প্রত্নতাত্বিক
বামুনের ঘরে লেখাপড়া না জানলে তার কি দশা সরু ঠাকরুন ভালোই জানতো। সুযোগ পেলেই সুর করে ফোড়ন কাটতো--কি আর করবি তিন ফুঁ মারবি। ওই কানে ফুঁ; মানে গুরুগিরি করা। তবে পাবলিকের যা ভক্তিছেদ্দা তাতে ঐ পথে আজকাল আর কেউ পা রাখে না। উনুনে ফুঁ দিয়ে হালুইকর হওয়া সে গুড়ে বালি। কেননা যত রাজ্যের হালুইকরের বাড়িতো চন্দননগর। তা সে বর্ধমানের এঁদো গ্রামের বাসিন্দাই হোক আর হিল্লি-দিল্লির'ই হোক। আজকাল আর জাতের বিচার কে করে বলো। রান্নায় হাত দেখালেই ঠাকুরমশাই। তাহলে আর হাতে রইলো-শাঁখে ফুঁ। আড়াই পাক মন্তর ঝেড়ে, আলোচাল আর পচালাগা কলা নিয়ে বার কতক শাঁখের ধুদ্দুরুনি। কিন্তু সেটাতে আবার হরিদাস ব্যাঁড়ুজ্জ্যের ঘোরতর আপত্তি। কথায় কথায় বলে-- লেখাপড়া না জানতে পারি তাই বলে যযমেনে বামুন? আমার চোদ্দগুষ্টিতে কেউ এ কাজ করেছে!

স্ত্রী মনোরমা যেন এই কথাটার জন্যই আপেক্ষা করছিল। কালনাগিনীর মত ডালা ঠেলে ফোঁস করে ওঠে--ওঃ ভারি মুরোদ! তাও যদি ছেলে টাকে রাখতে পারতিস রে...।!!

এই কথাতেই হরিদাস কেমন ঝিম মেরে যায়। বুঝলো লাইন বেগরবাঁই করেছে। অতএব ফোলা বেলুন ফুসস! মুখ দিয়ে সব বাক্যি হরে গেল। চুপচাপ চা খেয়ে উঠে পড়ে হরিদাস। তেতো পিল যেমন কোঁৎ করে গিলে নেয় তেমনি যন্ত্রনাটাকে কোন রকমে চাপা দিয়ে পাঠিয়ে দিল মনের তেপান্তরে।তবে অন্য একটা ভাবনা গেল চেগে।

সত্যিতো কি এমন রোজগার। দোকান বলতে ফুটপাতে সাইকেল সারান টিনের এক লজঝরে চালা।একটা মান্ধাতা আমলের পাম্পার।একটা ছোট বাক্স।তাতে জং ধরা কাঁইচি। ঝামা পাথর আর আঠা। এইতো সম্বল। সারাদিনে খদ্দের বলতে টিনভাঙা লোহাভাঙা কেনা হকারের গোটা কতক ভাঙাফুটো সাইকেলের লিক সারানো । মেরে কেটে রোজগার ৫০ টাকা। এ কটা টাকায় সংসার চলে? ভাগ্যিস মনোরমা্র মন ভালো থাকলে বিড়ি বাঁধে।তাতেই কোনরকমে চলে দুটো পেট। চলতে আর চায় না। ফাটাফুটো গ্যাটিস দেওয়া টায়ারের মতো সংসারগাড়ির চাকা ঘস্টা মেরে মেরে চলে আর কী! কিছু একটা করা দরকার।

দোকানে সাইকেল সারানোর খদ্দেরের থেকে অন্য লোকজনের আমদানি বেশি। রাস্তার অদূরে প্রতিবেশী শক্তির মুরগিকাটা মাংসের দোকান।ধারালো চপার দিয়ে মুরগির গলা কাটতে কাটতে জনৈক খদ্দেরকে বলে --দেখছেন? সকাল থেকে চার বার চা আনানো হয়ে গেলো। আর খদ্দের দেখুন প্যান্ট শার্ট পরা ভদ্দরলোক। খোঁজখবর নিতে এয়েছে। কি যেন বলে নামটা--দূর ব্যাং! নামটা পেটে আসছেতো মুখে আসছেনা! হ্যাঁ মনে পড়েছে-পেত্নতাত্ত্বিক।

মুরগির খদ্দের আড়চোখে একবার ওজন দেখে বলে --কি বললি পেত্নিতাত্বিক! অধাম্মিকটা আবার ভুত পেত্নি ছাড়াতে শিখলো কবে!

--তুমিও তেমনি! ভুত নয়!ঐ মাটির তলা থেকে কি সব বেরোয় না? মূর্তি ,পাথর...ইঁট...

--হ্যাঁ হ্যাঁ শুনেছিলাম বটে । মিনমিনেটা নাকি তাল তাল সোনা পেয়েছে! ও এবার কি রকম বাড়ি হাঁকাবে দেখবি! 

--আর সোনা!নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। পাগলি বউটার কি কান্না! দুঃখ করছিল আমাদের হারুর মায়ের কাছে! বাড়িতে যাও-- যত সব ছেতো খোলামকুচি। পাগল মানুষ বটে। হেসে গড়িয়ে পড়ে মুরগিবালা শক্তি।

২।

কথাটা নেহাতই মিথ্যা নয়। হরিদাসের যত নেশা ওই মাটির তলা থেকে বেরিয়ে আসা জিনিষ নিয়ে। কবেকার পুরানো ইঁটের টুকরো।চিত্রিত খোলামকুচি।ভাঙাচোরা মন্দির। পাথরের মূর্তি।একথায় প্রত্ন-ইতিহাসের পোঁকা। রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে হঠাৎ নজরে এলো একটা কালো খোলামকুচি। ব্যস! তাতেই মগ্ন।কে কি ভাবলো তাতে ওর কি যায় আসে! দেখছে তো দেখছেই। যেন ঐ খোলামকুচিটা একটুকরো যাদু আয়না। ওর মধ্যে একটা রহস্যময় সময় যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। কিম্বা একটা প্রত্নসুন্দরীর মুখের কারুকার্য্য! ভারি অদ্ভুত দেখতে। তার থেকেও অদ্ভুৎ হয়ে ওঠে হরিদাস নিজে। যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে সেই মুখটি। ওর সঙ্গে কথা বলে।মুখ টিপে টিপে হাসে । লোকে বলে পাগল! পাগল। নিজের ব লিখতে বৈকাল কামাই আর পাকামি দেখে ইয়ে শুদ্ধু জ্বলে যায়!

কেউ কেউ বলে শয়তান। দেখলে না ওই ঢিবির উপর ঘর করে দিয়েছিল পাঁচি বিধবার । শয়তানটার আর সহ্য হলো না। ঠিক বিডিওকে লাগিয়ে লাগিয়ে উচ্ছেদ করে দিলে বাপু! আবার লোককে বলে বেড়ায় এই ঢিবিতে লুকিয়ে আছে আমাদের কত ইতিহাস। সংস্কৃতি। যখের মতো এই ঢিবিকে সে আগলে রাখবে।

-- ছাড়তো ! পাগলে কি না বলে আর ছাগলে কিনা খায়!

হরিদাসকে এসব কথা অনেকেই শুনিয়ে শুনিয়ে বলে। যে যা খুশি বলুকগে তার কিচ্ছুটি যায় আসে না।কিন্তু খুব কষ্ট পায় স্ত্রী মনোরমা যখন কথার মারাত্মক হুলগুলো বিঁধিয়ে বিঁধিয়ে তার মর্মস্থলে রক্তক্ষরণ শুরু করে দেয়। ছোট থেকেই এই নেশার শুরু। তার জন্মভূমি মানেই ডাঙা ডহর। এর ভিতরই লুকিয়ে আছে সাতরাজার ধন। ডাঙার উপরেই তাদের পৈত্রিক বাড়ি। ছোট থেকে দেখে আসছে কারণে অকারণে মাটির তলা থেকে বেরিয়ে আসে অতীত দিনের তৈজসপত্রাদির ভাঙাচোরা জিনিষ। মাটির পুতুল।মাটির বল। ঠাকুর দেবতার মূর্তির অংশবিশেষ।পোড়াচাল। হাতির দাঁতের টুকরো। তামার কাঠি।কাজললতা। মাটির শিলমোহর। মূর্তি ফলক।

প্রথম প্রথম এগুলো ফেলে দিত আর পাঁচটা সাধারণ লোকের মতো।লোকে বলে কোনকালে এখানে কু্মোরবাড়ি ছিল।তাই রাজ্যের এইসব জিনিষপত্তর। কিন্তু একদিন তার বাড়িতে চলে এলেন কলকাতার এক নামকরা প্রত্নতাত্বিক গবেষক। ছাত্র-ছাত্রি। রিপোর্টার। বিডিও পঞ্চায়েত প্রধান। দুচারটে নমুনা হরিদাসের কাছে দেখতে পেয়ে বোঝাতে শুরু করলেন প্রত্নতত্ত্বের যাদু । ব্যস শুরু হয়ে গেল জন্মান্তর। যেন গুরু প্রদত্ত বীজমন্ত্র। যেন একটা অভিনব দৃষ্টি  ।যেন এক অভূতপূর্ব জাগরণ। সব কিছুকে সে কেমন একটা নতুন চোখে দেখতে লাগলো।

একী হলো তার! কেমন একটা ভয় ভয় বেদনা মিশ্রিত বিচিত্র অনুভূতি তাকে পেয়ে বসলো।লোকে ঠাট্টা করে নাম দিল---রাখালদাসের ভাইপো !হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। বলুকগে! তার কিছু যায় আসে না। তারই প্রচেষ্টায় পর পর দুবার গ্রামের দুটি প্রত্নডাঙার খনন কাজ হয়েছে ।কুনুর নদির গর্ভ থেকে দুটি পালসেন আমলের প্রস্তরবিগ্রহ উদ্ধার করেছে হরিদাস। তারই প্রচেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয় মিউজিয়ামে সংরক্ষিত হয়েছে। টাকা পয়সা নেইতো কি হয়েছে। যশ সুনাম পেয়েছে প্রচুর ।পত্রপত্রিকায় তার ছবি ছেপেছে ।ভালোই চলছিল। হঠাৎ ঘটে গেল মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটা।

৩।

সাংসারিক অশান্তি কার না থাকে? অশান্তি কথা কাটাকাটি নিজের বউ'র সঙ্গে হবে নাতো কার সঙ্গে হবে? কিন্তু হরিদাসের ব্যাপারটাই আলাদা। মনোরমার রাগ অন্য জায়গায়। সিরিয়াস হয়ে বলে ---দেখো তোমার সব আবদার মেনে নেব। দরকার হলে আমি পাঁচবাড়ি মুড়িভেজে সংসার চালাবো। কিন্তু ওই ক্ষ্যাপামি আমি মেনে নেব না।

---ক্ষ্যাপামি? কিসের ক্ষ্যাপামি করি? হরিদাস অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে।

---ন্যাকাচন্ডী! রাজ্যের এই খোলামকুচি জোগাড় করা খ্যাপামি নয়।লোকে তোমাকে দেখে হাসে।।আত্মীয় স্বজনরা তামাশা করে। কিছু বোঝ তুমি?

--আমিতো তাদের ক্ষতি করিনি।তারা কি বলল আমার কি যায় আসে।

---তোমার না এলেও আমার আসে। লোকে আমাকে কথা শোনায়। তাছাড়া কে তোমার ঢিবিতে থাকবে আর কে থাকবে না তুমি বলার কে হে? নিজে খেপে বাস তুলেছো বলে সবাই ছাড়বে নাকি!

--সে তুমি বুঝবে না।এর ভিতরে কি আছে ।

মনরমা ক্ষেপে গিয়ে বলে আমার বাবার মাথা আছে। কথায় কথা বাড়ে। সব থেকে কষ্ট পায় পনেরো বছরের ছেলেটা। কাঁদতে কাঁদতে বলে ওগো তোমরা চুপ করোগো!

বিলু একমাত্র সন্তান।খুব সেনসেটিভ। লাজুক ছেলে। অশান্তি সইতে পারে না। এদিকে রোজ রোজ অশান্তি বেড়েই চলে। হরিদাস বললে তুই পড়গে বাবা। ছেলের প্রতি দুর্বলতা জেনে মনোরমা আরো আক্রমণ শানায়। ওইটুকু ছেলের যা বুদ্ধি তোমার তার ছিটেফোঁটাও নেই। মাথামোটা কোথাকার---

হরিদাস কতবার মনে করেছে এই নিয়ে আর একটা কথাও মনোরমাকে বলবে না। এক একবার ভাবে কি হবে এসব করে। না জানে বেশিদূর লেখাপড়া। নেই রোজগারপাতি। এইসব নিয়ে যাদের কাজ তাদের মধ্যেও এই মায়া মোহ নেই । তবে তার মধ্যে এলো কেন? এ কি কোন অসুখ!তাই বা হয় কি করে! দূর !আর ভাল্লাগে না। তারচেয়ে বরং সব বেচেবুচে দিয়ে পালিয়ে যাবে অন্যত্র।

কিন্তু ঐ যে নেশা। নেশাগ্রস্থ মানুষ কতবার শপথ করে। মা কালীর দিব্ব্যি সে আর মদ ছোঁবে না । আর যদি এক ফোঁটা খেয়েছিতো তার নামে কুকুর পুষবে। কিন্তু মদ দেখলেই সব কিছু হারিয়ে যায়। তখন পূর্বের থেকেও বেশি করে খেয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। মাতালের মাতলামি্টাই লোকে দেখে। তার অন্তরের কান্না কেউ শুনতে পায়?

হরিদাসের অবস্থা তার থেকে বিন্দুমাত্র আলাদা নয়। তাই পাশের গ্রামের একজন যখন খবর দেয় পুকুরে পাঁক তুলতে গিয়ে পাথরের ঠাকুর পাওয়া গেছে । হয়ে গেল। সব প্রতিজ্ঞা ভুলে গিয়ে হাজির হলো ঠাকুর দেখতে। তারপর মিউজিয়ামের কিউরেটার থেকে এসডিওকে চিঠি লিখে ফেললো মূর্তি উদ্ধারের জন্য। পুলিশ প্রবল বিক্রমে হাজির হলো সেই গ্রামে। সঙ্গে হরিদাস। নামসংকীর্তনের আসর থেকে মালা সিঁদূর চর্চিত ঠাকুরকে গ্রেপতার করে নিয়ে হাওয়া । আর যত রাগ গিয়ে পড়লো হরিদাসের উপর। 

গাঁয়ের লোক জোটপাট করে হরিদাসের বাড়ি এসে ঝামেলা পাকাতে শুরু করে দিল।একাজে ইন্ধন দিল বেশ কিছু মাতব্বর। প্রথমে উদোম খিস্তি খেউর। তারপর মারধোরের হুমকি আর অকথ্য গালিগালাজ। চাপে পড়ে সে অন্যায় স্বীকার নিতে বাধ্য হল। জীবনে এমন অপরাধ আর সে করবে না তারও মুচলেখা দিতে হলো। একবার মনে করলো প্রশাসনকে জানাবে। কিন্তু হিতে বিপরীত হতে পারে বলে হজম করে গেল।আস্তে আস্তে বাড়ি ফাঁকা। সামনে তাকিয়ে দেখল বারুদের বস্তার মতো মনোরমা বসে আছে। ছেলেটা মাথা হেঁট করে বসে আছে। হরিদাস বুঝতে পারলো আসল অশান্তির ঘূর্ণিঝড়তো এবার বইবে।

মনোরমা?

---তোমার জন্য আমি গলায় দড়ি নেবো। আবার শুরু হলো কথাকাটাকাটি।চিৎকার।

রাত বেড়ে গেল। তবু ঝগড়া থামার নাম নেই। বিলু কাঁদতে কাঁদতে এসে বলে ওগো তোমরা চুপ করো চুপ করো আমি আর সহ্য করতে পারছিনা। কিন্তু কে কার কথা শোনে।

সকালে ঘটে গেল সেই বিপর্যয়।বিলু গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। মনোরমা কেঁদে কেঁদে শয্যাশায়ি হলো। ভালো করে কথা বলতো না। কেমন পাগলের মত আচরণ করতো। অনেক ডাক্তার দেখিয়েছে। কিন্তু সেই একই অবস্থা। শুধু রেগে গেলে ডাক্তারবাবু বলেছিলেন আপনি চুপ করে থাকবেন। আর হরিদাস যেন আরও প্রত্নসন্ধানী হয়ে উঠলো। এক অদ্ভুত মানসিকতা ওকে গ্রাস করলো। জীবিত মানুষের এই বাস্তব পৃথিবীর থেকে বড়ো বাস্তব হয়ে উঠলো কল্পনা আর বাস্তবতার আলোছায়ার মায়াবি প্রত্নজগত। বিলুর শোক সে ভুলে গেল।ইতিমধ্যে তার নামে চিঠি এলো। তার আবেদন মঞ্জুর হয়েছে। বাড়ির কাছে পালরাজার ডাঙা উৎখনন করতে আসছে আর্কিয়োলজি বিভাগ। 

৪।

প্রায় বিঘে খানিক আয়তন জুড়ে পালরাজার ডাঙা। জড়িয়ে আছে কবেকার এক পালরাজাকে কেন্দ্র করে কিংবদন্তি জনশ্রুতি।পালরাজা ছিলেন মা ভবানীর ভক্ত।একবার হলো কি-- তাররাজ্যে এক গাজিসাহেব এসে নদির ধারে বনে আশ্রয় নিল। সেখানেই নামাজ পড়ে। গরুবাছুরের অসুখ বিসুখ হলে জড়িবুটি দেয়। সতিদাহ হলে বিরোধিতা করে। দলে দলে সাধারণ মানুষ তার অনুগামী হলো। রাজার কানে গেল কথাটা । শুরু হলো লড়াই। সে লড়াইয়ে একে একে গাজীরা নিহত হলো। রক্তের দরিয়া সৃষ্টি হলো। তারপর কুড়ুলধারী এক গাজিবাবা এলো রনংদেহী বেশে। লোকে বলত কল্কি অবতার। রাজার সঙ্গে সেই একাই যুদ্ধ করলে। রাজা গেল হেরে। আজও ডাঙার পাশে সেই গাজির মাজার। চোত মাসের শেষ মঙ্গলবারে হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে মাজারে সির্নি দেয়।চাদর চাপায়।

এখন অনেক বাড়ি ঘর হয় গেছে ঢিবির উপর। খানিকটা অংশ রয়েছে ফাঁকা ।মিঃ মুখার্জির নেতৃত্বে সেই ডাঙায় খননকার্য চলছে।ছাত্র ছাত্রীরা অংশ গ্রহণ করেছে। তিনটে ট্রেঞ্চ কাটা হয়েছে। বেশ কিছু প্রত্নদ্রব্য পাওয়া গেছে দুটি ট্রেঞ্চ থেকে। লাল-কালো কৌলাল। মানে মাটির জিনিষ--পত্তর। ধুসর রঙের মাটির ভাঙাচোরা পাত্র। ছোট ছোট শ্বেতাভ কলস। দু একটা মাটির ফলক। কপারকাস্ট কয়েন। যক্ষিণী মুর্তি।মুখার্জিবাবু এসব বুঝিয়ে দিচ্ছেন তাঁর ছাত্র ছাত্রীদের। সঙ্গে রয়েছে হরিদাস। কথাগুলো যেন হরিদাস গিলছে। ইদানিং মনোরমা অনেকটাই সুস্থ। মুখার্জিবাবু হরিদাসকে বলেছেন স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য যা খরচ হবে চিন্তা করবেন না আমি সব ব্যবস্থা করে দেব। বেশকিছু টাকাও তার হাতে দিয়েছেন।

বেশ কয়েকদিন হয়ে গেল কাজ।আজকে তৃতীয় ট্রেঞ্চ কাটা হবে। সকাল থেকে কেটেই চলেছে। তেমন কিছু মেলে নি। গুপ্তপর্বের কয়েকটা মাটির সিল ছাড়া। বৃষ্টির পূর্বাভাস মিলেছে। আজকেই যতটা পারে কাটা শেষ করবে। বেলা শেষ হয়ে আসছে। হরিদাস গেছে বাজারে।মুখার্জিবাবু দাঁড়িয়ে আছেন গর্তের উপরে। তাঁর সন্ধানী চোখ তখন আবিস্কারের উত্তেজনায় কাঁপছে। । আস্তে চালাও,আস্তে।একটু কাটতেই উঠে এল একটা আস্ত কংকাল। মাথার গোড়ায় একটি কলসি। মুখার্জিবাবু বললেন মানবসমাধি। খুবই গুরুত্বপূর্ণ আবিস্কার। ততক্ষণে লোক জমে গেছে। ধীরে ধীরে কঙ্কালটিকে তুলে নিয়ে আসা হলো।পরিস্কার করে নেওয়া হলো। মাপজোপ পরীক্ষার জন্য আনুষঙ্গিক যা যা দরকার নেওয়া হচ্ছে। হরিদাস এসে হাজির।এতো বড় একটা আবিস্কার তার জন্য যে হলো কথাটা বার বার বার মুখার্জিবাবু তাকে বলছেন।

অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল কঙ্কালটার দিকে হরিদাস।তারপর ধীরে ধীরে বলল

--এ ছেলে না মেয়ে স্যার?

আমারতো মনে হয় ছেলে। সবটাইতো অনুমান করে বলা। মনে হচ্ছে দু হাজার বছরের পুরাতন সমাধি। তবে কিশোর বয়সের।

--ও কি আত্মহত্যা করে মারা গিয়েছিল স্যার? 

মুখার্জিবাবু মৃদু হেসে বললেন তা কি করে জানবো।আবার হতেও পারে! পরীক্ষা করলে জানা যাবে।

আত্মহত্যাই হবে স্যার।ওর নাম কি জানেন?

মুখার্জিবাবু অবাক হয়ে যান। নাম মানে---

---ওর নাম বিলু।

বলেই কঙ্কালটিকে হাত দিয়ে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো। বিলুরে ......।

সবাই কেমন অপ্রস্তুত।একজন মুখার্জিস্যারকে ডেকে কিছু বলল। সান্ত্বনার ভঙ্গিতে মুখার্জিবাবু হরিদাসের কাঁধে হাত রাখতেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো হরিদাস। 

--আমি ঠিক জানি ওর নাম বিলু। মা বাবাকে জব্দ করার জন্য ও আত্মহত্যা করেছিল স্যার!

মুখার্জিবাবুর চোখে জল।অন্ধকার নেমে এসেছে। পাখিরা ফিরে আসছে বাসার দিকে। দূরে কোথাও বেজে উঠলো সন্ধ্যা শাঁখের আওয়াজ।আবছা আলোয় একটা কঙ্কাল। আর আর তার সামনে বসে কঙ্কালের বিস্তৃত পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে প্রত্নতাত্বিক বাবা।



Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.