Header Ads

Breaking News
recent

সায়ন্তনী বসু চৌধুরী

অঙ্গীকার
রাস্তার মাঝ বরাবর প্রাণপ্রণে ছুটছি আমি। দুপাশের সবকিছু কেমন সরে সরে যাচ্ছে। চোখনাক মিলেমিশে গিয়ে মানুষের মুখ গুলো যেনো মাংসের পিণ্ড। নিমেষেই চোখ সরিয়ে নিচ্ছি আর দৌড়ে চলেছি। গাছের সবুজ আকাশের নীলে লেপ্টে গিয়ে কী অদ্ভুত দেখতে লাগছে। আমি দৌড়োচ্ছি, আরও জোরে ক্রমাগত দৌড়োচ্ছি। একটা মেট্রো স্টেশনের সামনে অনেক লোকের ভীড়। ছুটতে ছুটতে আমি ভীড়টার ভেতরে ঢুকে পড়লাম। আর ওমনি ভীড়টা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো। একটা কালো লম্বা লোকের সঙ্গে দড়াম করে ধাক্কা খেলাম আমি। 

-"হেই, সামলে চলো।" 

লোকটা চেঁচিয়ে উঠলো। ওর দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো একটা দৈত্য যেনো আমাকে তাড়া করেছে। সত্যিই তো কে যেনো তাড়া করেছিলো আমায়! কার ভয়ে ছুটছিলাম আমি? 

-"উফ্, কিছুতেই মনে পড়ছেনা।"

ফুটপাথের ধারে মাথাটা দুহাতে চেপে বসে পড়লাম। আর তখনই কঠিন হাতের চাপটা আমার কাঁধের ওপর প্রবল একটা ঝাঁকুনি হয়ে নেমে এলো। আধভাঙা গলায় আমি বলে উঠলাম, "বাবা!" আর ওমনি মাথার মধ্যে জটপাকানো শিরা উপশিরাগুলো পোষা সাপের মতো ফণা নামিয়ে সরে দাঁড়ালো। স্মৃতির যেটুকু অংশ হারিয়ে গিয়েছিলো, তারা অবনত মুখে আবারও নীল রঙের সমস্ত আতঙ্ক নিয়ে ফিরে এলো। 

আমার বাবা আমায় কোনওকালেই ভালোবাসেনি। আসলে বাবা আমাকে আসতে দিতেই চায়নি। একটা মেয়ে, সংসারে যে কোন কাজে তার দরকার সেটাই বাবা বুঝে উঠতে পারেনি। মেয়ে মানেই তো একটা আপদ। জন্মের পর থেকেই আগলে আগলে রাখো। নয়ি দিদার মুখে আমার জন্মের কথা শুনেই বাবা সাইকেল নিয়ে খামারটায় একবার পাক খেয়ে নিয়েছিলো। না না, আনন্দে নয়; চিন্তায়। কালো ছিলাম তো। তাই আমার কাঁথায় শোয়া বয়স থেকেই বাবার কপালে চড়চড় করে বলিরেখাগুলো ছড়িয়ে পড়ছিলো।

-"তোমার এ কালো মেয়েকে কে গছবে বলো তো?" 

মায়ের ওপর রাগে বাবা যখন চেঁচাতো আমি এই কথাটাই শুনতে পেতাম। জ্ঞান হবার আগে যদিও মানে বুঝতাম না। তবে চোদ্দো পনেরো বছর থেকেই আমি আয়নার সামনে দাঁড়ানো ছেড়ে দিয়েছিলাম। ভাই পেটে আসার পরেই মায়ের হাই প্রেশার ধরা পড়ে। নার্সের চাকরী থেকে মাকে ছাড়িয়ে নিয়েছিলো বাবা। কারণ ডাক্তার কনফার্ম করেছিলো, ছেলেই আছে।

হসপিটাল থেকে তুলতুলে নরম নীল কম্বলে ভাইকে মুড়ে নিয়ে মা বাড়ী এসেছিলো। আমি দরজায় দাঁড়িয়েছিলাম। শাঁখ বেজেছিলো, ঠাকমা উলু দিয়েছিলো; কিন্তু আমায় মায়ের কাছে ঘেঁষতে দেয়নি কেউ। চিলেকোঠায় ঠাকমার ঘরেই আমায় চালান করা হয়েছিলো। আমি চেঁচিয়েছিলাম, কেঁদেছিলাম, হাত পা ছুঁড়েছিলাম। মা বলেছিলো, 

- "চুপ, ভাই ঘুমোচ্ছে।"

বাবা বলেছিলো, 

-"তুই কি পাগল? জানিস পাগলরা এরকম অকারণে চেঁচায়।"

ঠাকমা আমার ঝুঁটি ধরে বলেছিলো, 

-"চল বলছি, তুই না গেলে আমার গোপাল ঘুমোতে পারবে না।"

বিয়ের পর বরের বাড়ীর লোকেরাও আমায় পাগল বলেছিলো। ওরা আমায় পুড়িয়েই মেরে ফেলতো, তাইতো ছুটছিলাম আমি। কিন্তু এখন কী হবে? কী হবে এখন? ওরা আমার নাকোর ডগায় এসে দাঁড়িয়েছে। বাবা, বিমল কাকা, আমার বর। ক্লাবের যেসব ছেলেগুলো আমায় আসতে যেতে টোন কাটতো তাদেরও এনেছে ওরা। লোভী লোভী চোখে ওরা আমার দিকে চেয়ে আছে। না, ভয় পাবোনা। ভয় পেলে তো চলবেনা।উঠে দাঁড়িয়েছি আমি। বুক ভরে অক্সিজেন জমিয়ে নিয়ে আবারও ছুটছি, ছুটছি... নোংরা বস্তি, এঁদো বাসস্ট্যাণ্ড, গোপন মধুচক্র পেছনে ফেলে ছুটছি। বুধবারের হাটের ভেতর ঢুকে পড়েছি আমি। খরগোশ, গিনিপিগ আর মুরগীর গন্ধওয়ালা খাঁচার সামনে সেই কালো লোকটার সঙ্গে আবারও দেখা। সে বললো, "পালাতে পারবেনা জেনেও ছুটছো? বোকা মেয়ে! মেয়ে মানে মাংস জানোনা? কী ভাবছো মুক্তি পেয়ে যাবে? ওই দেখো... "। ওর আঙুল বরাবর চেয়ে দেখি দুটো কেঁদো কেঁদো ছেলে খরগোশ নিজেদের বাচ্চা নিজেরাই চিবিয়ে খাচ্ছে। আর মাদুটো নির্বিকার। লোকটার ইশারা বুঝে নিয়ে আমি থেমে গেলাম। 

আমার বাবা আমায় শ্বশুরবাড়ীর লোকেদের হাতে তুলে দিয়েছে। চলে যাচ্ছি আমি। এরপর হয়তো আর লিখবোওনা। তাই বলি কী, তোমরাও দৌড়োনো থামাও। পালানো থামাও। বরং বারেবারে মেয়ে হয়েই ফিরে এসো, যাতে একদিন মেয়েদের মাংসে ওদের সব্বার অরুচি হয়ে যায়।



কোন মন্তব্য নেই:

সুচিন্তিত মতামত দিন

Blogger দ্বারা পরিচালিত.