Header Ads

Breaking News
recent

জয়িতা দে সরকার

আড্ডা
ভদ্রলোকের বয়স কত হতে পারে? ওনার দিকে তাকিয়ে এটাই ভাবছিল মৈত্রী। ভাবতে ভাবতেই কথাগুলোও কানে উড়ে আসছিল। ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে আবার ভদ্রলোকের কথাগুলো মন দিয়ে শুনছিল মেয়েটা। লোকটির আশেপাশের খেয়াল ছিল না। কিন্তু মহিলাটি বারবার মৈত্রীর দিকে তাকাচ্ছিল বিরক্ত চোখেই। এই জায়গাটায় একদমই নতুন ওরা। এখানকার সবকিছুই খুব অচেনা। অভিজ্ঞতাগুলোও বড্ড আনকোরা মৈত্রীর কাছে। অথবা খুব খুঁটিয়ে দেখলে শহর এবং গ্রাম্য ছবির মধ্যে যে পার্থক্য তা বেশ স্পষ্ট হয়েই উঠে আসে এইধরনের টুকরো কোলাজে। 

লোকটি বলে যাচ্ছইলেন। ছেলে,বৌ,  দুই নাতির সংসারে তিনি কতখানি ব্রাত্য। অথচ সংসারের প্রায় অধিকাংশ কাজের বোঝা ওনার উপরেই চাপিয়ে দিয়েছে ওরা। এতকিছুর পরেও এক কাপ চা চাইলে বৌমাটি বিরক্ত হয়। অসুখে তাকে দেখার কেউই নেই ইত্যাদি আরও কত। মহিলাটি এক মনে শুধুই শুনছিলেন না। সাথে সাথে সান্ত্বনাও দিচ্ছিলেন। ঠিক কি কি করলে এইসবের সুরাহা হতে পারে তারও কিছু কিছু টিপস দিচ্ছিলেন মানুষটিকে। এবং সর্বোপরি উনিও যে নিত্যদিন এইসবের মধ্যে দিয়েই যাচ্ছেন সেটাও বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন ভদ্রলোকের ওই মহিলা বন্ধুটি। মৈত্রীর বেশ মজাই লাগছিল ওনাদের গল্প শুনতে। গল্পের মধ্যে যদিও অনেক অসহায়তার ছবি উঠে আসছে। তবুও ওদের আড্ডার মধ্যে কোথাও যেন একটা রিলিফ ফুটে উঠছে। ইচ্ছে করছিল গিয়ে যোগ দেয় ওনাদের আড্ডায়। কিন্তু এই গ্রাম্য পরিবেশে মৈত্রীর পোশাকআশাক বেশ বেমানান অথবা ওর হাতের বড় ফোন বা আধপোড়া সিগারেটটিও। এই এক বদ নেশা ও কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারছে না মেয়েটা। রাহুল বহুবার বারণ করেছে। মৈত্রীও প্রতিবার কথা দিয়েছে ও সিগারেট ছেড়ে দেবে। কিন্তু পারছে কই! 

-কি হল চলো।
রাহুলের আচমকা ডাকে হুঁশ ফেরে মৈত্রীর। 
-হ্যাঁ চলো। রাহুল?
-কি?
-আজ একটু হাইরোডের দিকে নিয়ে যাবে?
-এখন? ক’টা বাজে দেখেছো! 
-মাত্র তো সাড়ে আটটা। চলো না প্লিজ।
আজ অবধি মৈত্রীর কোন আবদার অপূর্ণ রেখেছে রাহুল যে এটায় না বলবে? মৈত্রীকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসে রাহুল। 
-বেশ চলো। 
-সত্যিই যাবে! 
বলেই একটা চকচকে হাসি হাসে মৈত্রী। মৈত্রীর মুখের এই হাসিটাই সবসময় দেখতে চায় রাহুল। আর তার জন্য ও সব কিছুই করতে পারে। 

বাড়ি ফেরার পথে রাহুল জানতে চাইল,
-আজ হঠাৎ করে অসময়ে হাইরোডের ড্রাইভে আসতে বললে কেন? কি ভাবছ বলতো তখন থেকে? পুরো রাস্তায় একটাও কথা বললে না...! 
-তুমি যখন বাজার করছিলে আমি ওনাদের গল্প শুনছিলাম। 
এমনটা প্রায়ই হয়। রাহুল নিজের কাজে ব্যস্ত থাকে আর মৈত্রী নিজের খেয়ালে বুঁদ হয়ে যায় অন্য জগতে। আজকাল এতে আর অবাকও হয় না রাহুল। 
-কাদের আড্ডা...! 
-উফ্‌ রাহুল তুমি কি কিছুই দেখতে পাওনা? দোকানের পাশের বেঞ্চটাতে দুজন বসে কথা বলছিল দেখনি? 
-না তো! 
-হুঁ। এক ভদ্রলোক,ভদ্রমহিলা। বয়স ওই ষাটের ঘরেই হবে। কথাবার্তা শুনে একে অপরের পরিচিত বলেই মনে হচ্ছিল আমার। নিজেদের শেষবেলার অসহায়তার কথা বিনিময় করছিলেন ওনারা। বিনিময় করছিলেন সান্ত্বনাও। সহজ করে বলতে পারো আড্ডার মধ্যে দিয়েই মুক্তি খুঁজছিলেন দুজনেই। 
রাহুল মুচকি হাসল ঠোঁটের ফাঁকে।
-পরকীয়া? 
-হয়তো তাই...!
উদাস গলায় বলল মৈত্রী। 
-রাহুল তুমি শেষ দিন অবধি আমার সাথে থাকবে তো? 
-তুমি থাকবে কি?
আসলে এর উত্তরটা কেউই জানে না। কে কখন কোথায় যে থাকবে তার মানচিত্র আগেই তৈরি করে রেখেছেন অন্যকেউ। এই যে গত একবছর ধরে ওরা দু’জন একসাথে আছে। আগামী একবছরও হয়তো থাকবে। এর সবটাই তো আগে থেকে ছক করা। 

হাইরোড শেষ করে গ্রামের পথ ধরে ঘরমুখো গাড়িতে বাড়ি ফিরতে ফিরতে আলতো আদুরে গলায় রাহুলের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল মৈত্রী, 
-থাকবো। শেষ দিন অবধি আমি তোমার সাথেই থাকবো। 


কোন মন্তব্য নেই:

সুচিন্তিত মতামত দিন

Blogger দ্বারা পরিচালিত.