x

প্রকাশিত বর্ষপূর্তি সঙ্কলন

দেখতে-দেখতে ১০ বছর! শব্দের মিছিলের বর্ষপূর্তি সংকলন প্রকাশের সময় এ খুব অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু অজস্র লেখক, পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থনে আমরা অনায়াসেই পেরিয়ে এসেছি এই দশটি বছর, উপস্থিত হয়েছি এই ৯৫ তম সংকলনে।

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

সঞ্জীব সিনহা

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৭ |
মুক্তি
সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি ঝির ঝির করে বৃষ্টি পড়ছে, বারান্দায় বেরিয়ে দেখলাম আকাশটা কালো মেঘে ঢাকা, একটু জোরেই হাওয়া বইছে, সামনের নারকেল সুপারি গাছের সারি একানাগারে মনের আনন্দে মাথা দুলিয়ে নেচে চলেছে। শেষ রাতেই ঘুমের ঘোরে মেঘ ডাকার আওয়াজ পেয়েছিলাম, আর ঘুমন্ত অবস্থায়ও বিদ্যুৎ চমকের আলো অনুভব করেছিলাম। গত সন্ধ্যায় আবহাওয়া দপ্তরের নিউজ বুলেটিনে ঘোষণা করেছিল যে আগামী চব্বিশ ঘন্টায় গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে হালকা থেকে মাঝারি ধরণের ঝড় বৃষ্টির সম্ভবনা আছে। ভারতীয় আবহাওয়াবিদদের ঘোষণা যে বাস্তবের সঙ্গে কতটা মেলে তা আমাদের সকলেরই জানা আছে, কিন্তু কালকের ঘোষণা বাস্তবের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় সঠিক ঘোষণার জন্য আমি মনে মনে ওদের ধন্যবাদ দিলাম। যাই হোক সকালে চা খাওয়ার পর আটটা নাগাদ রোজকার অভ্যাস মত বাজারের ব্যাগটা নিয়ে আমি বেরচ্ছি এমন সময় গিন্নি আমাকে বললেন, - এখন এই জলবৃষ্টির মধ্যে কোথায় যাচ্ছ? বৃষ্টিতে ভিজে ঠাণ্ডা লেগে আবার সর্দি কাশি হবে, আজ আর বাজার যেতে হবে না, আমি খিচুরি করব।

- খিচুরির সাথে কিছু তো লাগবে সেটা কি করবে? 

- সেটা তোমায় ভাবতে হবে না, কিছু তো একটা করবই। 

- আরে বলই না কি করবে। 

- ঘরে আলু তো আছেই, সব্জির ঝুরিতে কয়েকটা পটল পড়ে আছে, ভাবছি পটল ভাজা আর পাঁপড় ভাজা করব। 

- জাম্পিস হবে, আমি অনেকটা সাঁটাবো, একটু বেশি করে কর। 

- ঠিক আছে বাবা তুমি যতটা পার পেট ভরে খেও, তাহলে আমি খুশিই হব।

মনালি অর্থাৎ আমার স্ত্রী জলখাবার বানাতে রান্নাঘরে ঢুকল, আর আমি সোফায় বসে টিভিতে নিউজ শুনতে গিয়ে দেখি কারেন্ট নেই, কখন যে কারেন্ট চলে গেছে জানতেই পারিনি, অবশ্য আজকের এই ওয়েদারে এখানে কারেন্ট বাবাজীকে আশা করাটাই আমার ভুল হয়েছিল। এখন কি আর করি খবরের কাগজটা খুলেই বসলাম, সব পাতার খবরে একবার করে চোখ বোলানর পর সুদোকুর ছক ভরতে লাগলাম। এরই মধ্যে মনালির চা জলখাবার বানানো হয়ে গিয়ে টেবিলে তা সাজানও হয়ে গেছে। এবার আমার ডাক পড়ল, - টেবিলে চলে এস খাবার দেওয়া হয়ে গেছে। 

- এইটা করেই যাচ্ছি, এক্ষুনি হয়ে যাবে। 

- তুমি আবার সুদোকু নিয়ে বসেছ? কি মানুষরে বাবা, সুদোকু পেলে আর উঠবে না। আগে এস, না হলে খাবার ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। 

অগত্যা খবরের কাগজটা রেখে আমাকে উঠতে হল। হাত ধুয়ে খাবার টেবিলে মৌজ করে বসে দেখি গরম গরম আলু ভাজা আর ব্রেড টোস্ট প্লেটে সাজানো রয়েছে। আমরা দুজন বসে গল্প করতে করতে খাচ্ছি, স্বাভাবিক ভাবেই কথার মধ্যে ছেলে বউমা আর নাতি নাতনিদের কথা উঠে আসছিল। আমাদের বড় ছেলে কর্মসূত্রে দিল্লীতে থাকে, বড় বউমা ওখানকার একটা স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল। আর আমাদের ছোট ছেলে ব্যাঙ্গালুরুতে একটা আইটি সেক্টরে কাজ করে। আমি বছর পাঁচেক আগে চাকরি থেকে অবসর নেবার পর ব্যারাকপুরে একটা ফ্ল্যাট কিনেছি, আমরা বুড়ো বুড়ি দুজনে এখানেই থাকি। ছেলেরা মাঝে মাঝে এসে কয়েক দিন আমাদের সাথে কাটিয়ে যায়, আর আমরাও মাঝে মাঝে ছেলেদের কাছে গিয়ে কয়েক সপ্তাহ কাটিয়ে আসি। খেতে খেতে মনালি বলল, - অনেক দিন হল ছেলেদের কাছে যাইনি, এবার চল ওদের কাছে কিছু দিন কাটিয়ে আসি। 

আমি বললাম, - আজ দেবেশকে ফোন করে জেনে নেব ওরা কবে ফ্রি থাকবে, যাতে ওখানে গেলে সবাই মিলে এক সাথে আনন্দ করে কয়েকটা দিন কাটানো যায়। আর ছোট ছেলের কাছে শীত কালে যাব, ব্যাঙ্গালুরুতে তো শীত কালে বেশি ঠাণ্ডা পড়ে না। 

- ঠিক আছে তুমি যা ভাল বোঝ কর। 

চা খাওয়া হয়ে গেলে মনালি রান্নাঘরে গেল আর আমি আবার সোফায় বসে পেন আর খবরের কাগজটা নিয়ে সুদোকুতে মন দিলাম। হঠাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সাড়ে দশটা বাজে, এর মধ্যে বৃষ্টিও থেমে গেছে। ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে দেখি বৃষ্টি থামলেও আকাশটা ঘন কাল মেঘে ঢাকা থম থমে হয়ে আছে, যে কোন সময় আবার বৃষ্টি নামতে পারে। আজ মাসের চার তারিখ, ঘরে যা টাকা তোলা ছিল তা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আলমারি থেকে এটিএম কার্ডটা বার করে মনালিকে বললাম, - আমি একটু বেরচ্ছি, পাড়ার এটিএম থেকে পেনশনের টাকাটা তুলে আনি, আমার কাছে টাকা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।

- ঠিক আছে, ছাতাটা সঙ্গে নিও, দেখ ওটাকে আবার ফেলে এস না। 

আমি কত বার যে ছাতা হারিয়েছি তার ঠিক নেই। আমি বললাম, - ঠিক আছে, আমি এখন আসছি। এই বলে ছাতাটা হাতে নিয়ে আমি বেরলাম। 

বাড়ীর কাছেই রাস্তার ধারে এটিএম, আজকের এই আবহাওয়ার জন্যই বোধ হয় এটিএমের সামনে অন্য দিনের মতন লাইন নেই। এটিএমে কার্ড ঢুকিয়ে যথারীতি বোতাম টিপে আর টাচস্ক্রীনে আঙুলের পরশ দিয়ে গেলাম, কিন্তু টাকা না বেরিয়ে শুধু ‘সরি’ লেখা একটা স্লিপ বেরিয়ে এল। এটিএম ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি অল্প অল্প বৃষ্টি আবার শুরু হয়েছে। একটা অটো করে পাশের পাড়ায় ব্যাঙ্কের লাগোয়া যে এটিএম আছে সেখানে গেলাম। ওখান থেকে টাকা তুলে বেরিয়েছি ওমনি ঝেপে বৃষ্টি এল। অগত্যা ব্যাঙ্কের ভিতরে গিয়ে বসলাম। বৃষ্টিতে আটকে পরেছি ফিরতে একটু দেরি হতে পারে বলে মিসেসকে ফোন করতে যাচ্ছি এমন সময় কেউ একজন পিছন থেকে আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, - কে, মিলন না?

ঘার ফিরিয়ে পিছন দিকে তাকিয়ে দেখি আমার চাকরি জীবনের পুরানো দিনের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী বন্ধু শ্যামল। আমরা দু জনে এক সাথে এবং একই জায়গায় চাকরিতে যোগ দিয়েছিলাম, যতবার প্রমোশন হয়েছে একই সাথে হয়েছে আর যখন বদলি হয়েছি দুজনাই একই জায়গায় বদলি হয়েছি। কেবল মাত্র বছর দশেক আগে আমি বদলি হলাম পাটনায় আর ও হল ভূবনেশ্বরে। তারপরেও কয়েক বছর আমাদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল, কালের নিয়মে কখন যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল খেয়াল নেই। মনে পড়ল শ্যামলদের আদি বাড়ী এই ব্যারাকপুরেই। সম্বিৎ ফিরে আসতেই বললাম, - শ্যামল, তুই এর মধ্যেই এত বুড়ো হয়ে গেছিস? আগে তো তুই সব সময় কত টিপটপ হাসিখুশি থাকতিস আজ তোকে এত বিষণ্ণ লাগছে, তাছাড়া তোর এত মলিন বেশ, কয়েক দিন দাড়িও কামাসনি দেখছি। মনে হচ্ছে তোর শরীর ঠিক নেই, কেমন আছিস তুই?

- আমি ভালই আছি রে, তবে এখন গেলেই বাঁচি। তুই এখানে?

- কি বাজে কথা বলছিস, তুই তো আগে এই রকম কথা বলতিস না। আমি পাঁচ বছর আগে চাকরি থেকে অবসর নেবার পর তোদের এই ব্যারাকপুরেই একটা ফ্ল্যাট কিনে দুই বুড়ো বুড়ী এখানে আছি। ছেলেরা নিজের নিজের কাজের জায়গায় থাকে।

এই সব কথা হতে হতে বৃষ্টিটা একটু কমেছে দেখে আমি বললাম, - তোর ব্যাঙ্কের কাজ হয়ে গেছে?

- হ্যাঁ, পেনসন তুলতে এসেছিলাম তা তোলা হয়ে গেছে।

- বৃষ্টিটা একটু কমেছে, চল এগোন যাক, চলতে চলতে সব কথা হবে। তোর কাছে ছাতা আছে তো? 

- না রে, ছাতাটা ভেঙ্গে গেছে তারপর আর ওটা সারানো হয়ে ওঠে নি। 

- চল অটো করে যাওয়া যাবে, আমাদের ফ্ল্যাটটা ষ্টেশনের কাছেই। তোদের বাড়ীটা কোন দিকে, একই দিকে হলে অটোতে একসাথেই যাওয়া যাবে। 

- না রে তুই যা, আমাদের বাড়ীটা একটু ভিতর দিকে, ওদিকে অটো যায় না। 

- ঠিক আছে তুই এখন আমার সাথে আমাদের ফ্ল্যাটে চল, ওখান থেকে আমি আমার গাড়ী করে তোকে তোদের বাড়ী পৌঁছে দেব। এত দিন পর তোকে দেখে মনালিও খুব খুশি হবে। 

- না রে দেরি হয়ে গেলে বাড়ীতে রাগ করবে, আমি অন্য এক দিন তোর বাড়ী গিয়ে দেখা করে আসব। 

- এই বৃষ্টি বাদলের দিনে সঙ্গে ছাতা নেই, তোর বাড়ীর লোকেরা নিশ্চয়ই বুঝবেন যে তুই বৃষ্টির মধ্যে কোথাও আটকে গেছিস। তাছাড়া আমি তো একটু পরেই তোকে তোর বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে আসব।

প্রায় এক রকম জোর করেই আমি শ্যামলকে অটোয় তুলে নিয়ে তিন চার মিনিটের মধ্যেই আমাদের আবাসনের গেটের সামনে পৌঁছে গেলাম। লিফটে করে পাঁচ তোলায় উঠে আমাদের ফ্ল্যাটের ডোরবেল এর বোতাম টিপতে মনালি দরজা খুলে আমার সঙ্গে শ্যামলকে দেখেই একটু হেসে দু হাত তুলে নমস্কার করে বলে উঠল, - আরে শ্যামলদা যে, আসুন আসুন, কত বছর পর আপনার সাথে দেখা হল। 

শ্যামলও হেসে প্রতিনমস্কার করল, এবার আমরা দুজনে সোফায় বসলাম। মনালি বলল, - তোমরা কথা বল, আমি একটু চা করে এক্ষুনি আসছি। 

#

আমরা দুজনে পুরানো দিনের জমা সব কথা বলে যাচ্ছিলাম। এরই মধ্যে মনালি একটা ট্রে করে চিড়ে বাদাম ভাজা আর চা নিয়ে এসে সেন্টার টেবিলে ট্রেটা রেখে একটা কাপ শ্যামলের হাতে তুলে দিল। চা খেতে খেতে ও জিজ্ঞাসা করল, - শ্যামলদা, আপনি কেমন আছেন, বৌদির খবর কি, উনি কেমন আছেন, একদিন বৌদিকে আমাদের এখানে নিয়ে আসবেন। সারাদিন একসাথে গল্প করে সন্ধ্যায় ডিনার করিয়ে তবে ছাড়ব। 

শ্যামল একটু হেসে বলল, - আমি ভাল আছি সে তো দেখতেই পাচ্ছেন, আর আপনাদের বৌদি ওখানে নিশ্চয় ভালই আছেন। 

- ওখানে বলতে কি ছেলের কাছে? আপনার ছেলে এখন কোথায় থাকে। ও এখন কত বড় হয়ে গেছে, অনেক বছর হল ওকে দেখিনি। 

আকাশের দিকে তার আঙুলটা দেখিয়ে শ্যামল বলল, - ওখানে বলতে দূর আকাশের কোন তারায়, ওখানেই উনি আছেন। আর আমাদের ছেলে ব্যারাকপুরেই থাকে, আমি ওর কাছেই থাকি। 

এর পর শ্যামলের কাছে যা শুনলাম তা বড় বেদনা দায়ক, না শুনলেই বোধ হয় ভাল হত। 

শ্যামল যা বলে গেল তা মোটামুটি এই রকম। 

- তোর মতন আমিও পাঁচ বছর আগে চাকরি থেকে অবসর নিই। অবসর নেবার সময় যে থোক টাকাটা পেয়েছিলাম তার থেকে আমাদের পুরানো বাড়ীটা ভালোভাবে সারিয়ে রঙ করালাম, বাকি টাকাটা ব্যাঙ্ক আর ডাকঘরের বিভিন্ন স্বল্পসঞ্চয় প্রকল্পে জমা রেখে দিলাম। আমাদের একমাত্র ছেলে একটা ব্যবসা করছিল, তার থেকে ওর ভালই লাভ হচ্ছিল। আমার পেনশনের টাকা, আর জমা টাকার যা সুদ পাচ্ছিলাম তা দিয়ে আমাদের ভালভাবেই চলে যাচ্ছিল। আবার ওই টাকার থেকে বছরে একবার সবাই মিলে বেড়াতেও যাচ্ছিলাম। এই ভাবে বছর দুই বেশ সুখে শান্তিতে কেটে গেল। এর পর এক দিন আমার স্ত্রী আর আমি ঘরে বসে আছি, এমন সময় ছেলে আর বউমা আমার ঘরে এসে আমার পাশে বসল। তারপর দেখি ছেলে আমতা আমতা করে কিছু বলতে চাইছে কিন্তু বলতে পারছে না। আমি তখন ওকে বললাম, - তুই আমাকে কি বলতে চাইছিস বল না, বাবাকে বলতে অত সঙ্কোচ কিসের? 

- বাবা, তোমার বয়স হয়েছে, তাই আমি বলছিলাম যে তুমি এই বাড়ীটা আমার নামে লিখে দাও যাতে ভবিষ্যতে আর কোন ঝামেলায় না পড়তে হয়।

আমি হাসতে হাসতে বললাম, - তুই তো আমাদের এক মাত্র সন্তান, আমাদের অবর্তমানে তুইই তো আমাদের স্থাবর অস্থাবর যা আছে তা সব পাবি। তবে তুই যখন বলছিস তোকে দানপত্র করে দিতে আমার কোন আপত্তি নেই। 

এর এক মাসের মধ্যেই উকিলকে ডেকে আমি বাড়ীটা আমার ছেলের নামে দানপত্র তৈরি করে রেজিস্ট্রি করে দিলাম। আগের মতনই বেশ সুখে শান্তিতে আমাদের দিন কাটছিল। মাস ছয়েক পরে আবার এক সন্ধ্যায় ছেলে আর বউমা আমার ঘরে এসে আমার পাশে বসল। তারপর দুই একটা সাধারণ কথা বলার পর ছেলে বলল, - তোমাদের নাতনি এখন বড় হয়েছে, উঁচু ক্লাসে পড়ছে, ওর তো এবার একটা আলাদা ঘরের দরকার। আমাদের এই ছোট বাড়ীটাতে তো আর ওর জন্যে আলাদা করে ঘর দেওয়া যাবে না, তাই আমরা ঠিক করেছি একটা বড় ফ্ল্যাট কিনব। আমাদের পাড়াতেই একটা বড় ফ্ল্যাট বাড়ী তৈরি হচ্ছে, আমি প্রমোটারের সঙ্গে কথা বলে এসেছি। বড় বড় তিনটে বেডরুম, দুটো এ্যাটাচড বাথ, একটা কমন বাথ, একটা বড় লিভিং কাম ডাইনিং রুম, আর রান্না ঘরটাও বেশ বড়। একটা ছোট্ট ঘরও আছে, মা ওটাকে ঠাকুর ঘর হিসাবে ব্যবহার করতে পারবে। 

- তা তুমি যখন নিজে থেকে সব ঠিকই করে ফেলেছ আমি আর কি বলব, আমার তো আমাদের এই পুরানো বাড়ীটা ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করবে না।

- বাবা, ফ্ল্যাটটার দাম হয়েছে আটাশ লাখ টাকা । আমাদের এই বাড়ীটা বেচে দশ পনেরো লাখ টাকার মতন পাব, আর আমি পাঁচ ছয় লাখ টাকার মতন যোগার করতে পারব। তুমি আমাকে বাকি আট নয় লাখ টাকা দিলে আমি ফ্ল্যাটটা কিনতে পারব, এই ফ্ল্যাটটা হাত ছাড়া করতে চাই না। এই দামে নিজেদের পাড়ায় এত বড় ফ্ল্যাট আর পাওয়া যাবে না। 

- দেখ, আমার শেষ সম্বলটুকু দিয়ে দিলে তো আমার নিজের টাকা কিছু থাকবে না, এ ব্যাপারে আমাকে একটু ভাবতে দে। 

- বাবা, দেরি হয়ে গেলে ফ্ল্যাটটা অন্য কেউ বুক করে ফেলবে, ওটা হাত ছাড়া হয়ে যাবে। তুমি আর মা যখন আমার কাছেই আছ, তোমার নিজের তো কোন খরচ করার দরকার নেই। তোমাদের একটা ঘর থাকবে, মায়ের একটা ঠাকুর ঘর থাকবে, কত সুবিধা হবে। 

আমার নিজের ইচ্ছা না থাকলেও আমার স্ত্রীর অনুরোধে কয়েক দিনের মধ্যেই আমার সারা জীবনের সঞ্চয়ের সব টাকা ছেলের হাতে তুলে দিলাম। ভাবলাম ছেলের কাছে আছি, আর মাসে মাসে আমার পেনসনের টাকাটা তো আছে, ওতেই আমাদের স্বামী স্ত্রীর টুকিটাকি হাত খরচ যা লাগে চলে যাবে। তারপর টাকাটা পেয়ে ছেলে ওর পছন্দের ফ্ল্যাটটা বুক করে এল। আট নয় মাসের মধ্যে আমাদের নতুন ফ্ল্যাটে আমরা চলে এলাম। আমাদের পুরানো বাড়ী বিক্রি আর নতুন ফ্ল্যাটে আসার মাঝে কয়েক মাস কাছেই একটা ভাড়া বাড়ীতে আমরা ছিলাম। পুরানো বাড়ীটার জন্য মন খারাপ করলেও এই নতুন ফ্ল্যাটটা আমার ভালই লাগছিল। এই ভাবে আগের মতনই হাসি খুশিতে দিন গুলো চলে যাচ্ছিল। বেশ কয়েক মাস পর এক সন্ধ্যায় বউমা আমার স্ত্রীকে এসে বলল, - মা, আমি নানা কাজে ব্যস্ত আছি, এবার থেকে আপনি রান্নার দায়িত্বটা নেবেন। 

ওই বয়সে আমার স্ত্রীকে রান্নার হাল ধরতে হল। তার কয়েক মাস পরে মেয়ের লেখাপড়ার খরচ আর সংসার খরচ বেড়ে গেছে বলে বউমা বাড়ীর কাজের মাসীকে ছাড়িয়ে দিল। রান্না ঘরের সব কাজ তো ছিলই তখন থেকে তার সাথে বাড়ীর সব কাজ আমার স্ত্রীকেই করতে হত। এই সব দেখে সহ্য করতে না পেরে আমি এক দিন ছেলেকে ডেকে বললাম, - তোর মাকে এই বয়সে রান্নাবান্না আর বাড়ীর সব কাজ করতে হচ্ছে, তুই বউমাকে কিছু বলছিস না কেন, তোর মায়ের শরীর দিন দিন ভেঙ্গে যাচ্ছে দেখতে পাচ্ছিস না? 

- বাবা, আমি এ নিয়ে কিছু বললে সংসারে অশান্তি বাড়বে বলে আমি কিছু বলতে পারছি না। 

অগত্যা আমিই এক দিন বউমাকে বললাম, - বউমা, তুমি কাজের মাসীকে ছাড়িয়ে দিয়ে তোমার শাশুড়ি মাকে দিয়ে বাড়ীর সব কাজ করাচ্ছ, আবার রান্নাও করাচ্ছ। এই বয়সে এত পরিশ্রম করলে ও যে অসুস্থ হয়ে পরবে। তুমি কাজের মাসী রেখে দাও, আমার পেনশনের টাকা থেকে প্রতি মাসে আমি ওর মাইনে দিয়ে দেব। 

– আপনার পেনশনের টাকা তো আপনাদের দুজনের খাওয়া খরচেই শেষ হয়ে যায়, তার থেকে আবার কাজের মাসীর মাইনে কি করে দেবেন? 

গজ গজ করতে করতে চলে যাবার সময় বলে গেল, ‘এই বুড়ো বয়সে বউ এর উপর পিরিত দেখছি উথলে পড়ছে, আদিখ্যেতা দেখে বাঁচি না।’ লক্ষ্য করলাম যে রোজ রাতে বিছানায় শুয়ে আমার স্ত্রী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদত। আমি বলতাম ‘জীবনে অনেক ভুলের মধ্যে সব চেয়ে বড় ভুল করেছি আমাদের বাকি জীবনটার কথা না ভেবে আমার বাড়ীটা আর আমার জীবনের সমস্ত সঞ্চয় ছেলের হাতে তুলে দিয়ে।‘ আমাদের নাতনিকে বউমা আর তার ঠামমার কাছে আসতে দিত না। এত কষ্ট সহ্য করতে না পেরে কয়েক মাস পর আমার স্ত্রী একটা বড় অসুখে পড়ল। প্রথম প্রথম পাড়ার ডাক্তার দেখিয়ে ওসুধ নিয়ে আসছিলাম, সেবা যত্ন পথ্য তো একদম পাচ্ছিল না। দিন দিন অবস্থা খারাপের দিকে চলে যাওয়াতে এক দিন বড় ডাক্তারকে দেখালাম, কিন্তু মাস খানেকের মধ্যে সে আমাদের ছেড়ে চলে গেল। এখনও আমি রোজ সন্ধ্যায় ছাদে গিয়ে দূর আকাশের উজ্জ্বল তারাটার দিকে যেখানে সে চির শান্তিতে আছে তাকিয়ে থাকি আর মনে মনে তার সাথে কথা বলি। আমার স্ত্রী তো চলে গিয়ে মুক্তি পেল, এবার আমার উপর অত্যাচারের পালা। প্রতি মাসে পেনশন তুলে এনে সব টাকাটা বউমার হাতে তুলে দিতে হত, আর তা না দিলেই চলত নানা ভাবে নির্যাতন। আমারই পেনশনের টাকাটা থেকে ও তিন শ টাকা করে আমাকে আমার হাত খরচ দিত। এর পর এক দিন আমার বউমা আমাকে বলল, - আপনাকে এই রোদে কষ্ট করে আর পেনশন তুলতে যেতে হবে না, আপনার এটিএম কার্ডটা আর ওটার পিন নম্বরটা আমাকে দিন আমি টাকাটা এটিএম থেকে তুলে আনছি।

তারপর থেকে বউমা নিজেই প্রতি মাসে আমার পেনশনের টাকাটা তুলে আনে। আর যে মাসে যেতে পারে না আমাকে পাঠায়, যেমন আজ এই ঝড় বাদলের দিনে আমাকে পাঠিয়েছে। বাজার করা, রেশন তোলা, নাতনিকে ওর গৃহশিক্ষকের কাছে রেখে আসা, আবার পড়া হয়ে গেলে এক ঘন্টা পরে বাড়ী নিয়ে আসা এই সব তো এখন আমার রুটিন ডিউটি হয়ে গেছে। এ ছাড়া বাজার করে আনার পর সবজি মাছ ধুয়ে ফ্রিজে তুলে রাখাও এখন আমার কাজ। রান্না এখন বউমা নিজে করলেও আমাকে সবজি কেটে ধুয়ে দিতে হয়। কাজের মাসী না এলে ঘর পরিষ্কার করা, বাসন ধোয়া জামা কাপড় কাচা সবই আমায় করতে হয়। প্রায়ই দেখি ওরা গরম ভাত খাচ্ছে আর আমাকে ফ্রিজ থেকে আগের দিনের বাসি ভাত বার করে দিচ্ছে। ছেলেকে বলে কোন লাভ হয় না। নাতনি যদি বলে, ‘মা, দাদুকে বাসি ভাত দিচ্ছ কেন?’ তাহলে সে বকুনি খায়। মাস খানেক হল বউমা আমার মোবাইল ফোনটা নিয়ে নিজের কাছে রেখে দিয়েছে যাতে আমি বাইরের কাউকে আমার কষ্টের কথা বলতে না পারি। 

ঘরের পরিবেশটা ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ছিল, এর মধ্যে বৃষ্টিও থেমে গেছে। আমি শ্যামলকে বললাম, - চল তোকে এবার বাড়ী পৌঁছে দিয়ে আসি।

- এত দিন আমার দুঃখের কথা কাউকে বলতে পারিনি, নিজের দুঃখের কথা নিজের মনের ভিতর চেপে রেখেছিলাম। আজ আমার দুঃখের কথা তোকে বলতে পেরে একটু হালকা হলাম। জানি এটিএম থেকে পেনশনের টাকা তুলে বাড়ী ফিরতে এত দেরি হল বলে আমাকে বউমার কাছ থেকে কথা শুনতে হবে, তাকে কৈফিয়ত দিতে হবে, তবু আজ একটু হালকা হয়েছি কাউকে আমার দুঃখের কথা জানাতে পেরে। 

- তোকে তো আজ এই মেঘ বাদলার দিনে ছাতা ছাড়াই ব্যাঙ্কে আসতে হয়েছে। এতক্ষণ বৃষ্টি পড়ছিল, তাই তো তুই আটকে পড়েছিলি, এতে দেরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। 

আমার গাড়ীটা বার করে আমি শ্যামলকে নিয়ে বেরলাম। শ্যামল আমাকে বলে দিল যে ওদের বাড়ী পর্যন্ত যেন আমি না যাই, আমি যেন ওদের বাড়ী থেকে একটু দূরেই ওকে নামিয়ে দিই, যাতে ওদের বাড়ীর কেউ দেখতে না পায় যে ও গাড়ী থেকে নামছে। সেদিন শ্যামলকে তার ইচ্ছা মতন জায়গায় নামিয়ে দিয়ে ভারাক্রান্ত মনে আমি বাড়ী ফিরে এলাম। এরপর কয়েক মাস হয়ে গেল শ্যামলের সাথে আর দেখা হয় নি। মাস চারেক পর শ্যামলের খবর নিতে এক দিন ওদের পাড়ায় গেলাম। ওদের বাড়ী তো আমি চিনি না, তাই সেদিন ওকে আমার গাড়ী থেকে যেখানে নামিয়ে ছিলাম তার কাছেই একটা চায়ের দোকানে গিয়ে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, - ভাই, এখানে শ্যামলবাবুর বাড়ী কোনটা বলতে পারেন? শ্যামল শীল, ঠিক আমার মতনই বয়স হবে, এই পাড়াতেই একটা ফ্ল্যাট বাড়ীতে উনি ওনার ছেলে বউমা আর নাতনি থাকেন। 

- ও, আমাদের শ্যামল জেঠুর কথা বলছেন? থাকেন নয়, থাকতেন।

- থাকতেন মানে? তবে এখন কোথায় থাকে?

- বড় ভাল আর নিরীহ মানুষ ছিলেন। ছেলে বউ এর অত্যাচার আর সহ্য করতে না পেরে মাস তিনেক আগে শ্যামল জেঠু গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। জেঠিমাকেও ওনার বউমা খুব অত্যাচার করত, তিনিও অযত্নে আর প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা গিয়েছিলেন।

শ্যামল সংসার থেকে মুক্তি পেয়ে চির শান্তির দেশে তার স্ত্রীর কাছে চলে গেল। আর আমি ভারক্রান্ত বিষাদ মনে বাড়ী ফিরে এলাম। জানি না এটা মুক্তি না বর্তমান সমাজের বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের পরিণতির একটা রূপ, না শুধুই এক ব্যতিক্রম মাত্র। 




Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.