Header Ads

Breaking News
recent

রুমকি রায় দত্ত

ভ্রমণ ডায়েরির পাতা থেকে নৈনিতালঃ
আচ্ছা, কখনও শীতকালে শীতের দেশে গিয়েছেন? শুনেই ভয় লাগছে তো? না না, বিষয়টা কিন্তু তেমন নয়, সে এক আলাদা আনন্দ! শৈলশহরে শীতের সকাল এক অনন্য অনুভূতি। সেবার মানে ২০১৩ সাল। ছেলে খুব ছোটো এই দুই বছর বয়স। ২০১০ এর পর আর ঘুরতে যাওয়া হয়নি। মাঝের দুই বছর ঘটে গিয়েছে অনেক ঘটনা। ছেলে এসেছে, আমার বাবা হঠাৎ এক দুর্ঘটনায় চলে গিয়েছেন। বাবার মৃত্যুটা খুব ভঙ্গুর করে তুলেছিল আমাকে। সবসময় একটা অস্থিরতা তাড়া করতো। বদ্ধ ঘরের চার দেওয়ালের মাঝে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে উঠছে তখন, শুধু শুনতে পেতাম যেন প্রকৃতির ডাক। ২০১২ সালের ডিসেম্বর, বাড়িতে আসা সাপ্তাহিক বর্তমান নিয়ে বসে পড়লাম। প্রতিবছর এপ্রিল মাস থেকে শুরু হয় এদের পুজোর ভ্রমণ প্রকাশ। প্রতিবছরের এই সংখ্যা গুলো যত্ন করে রাখি। ঠিক করলাম আগামী ফেব্রুয়ারিতে যাবো নৈনিতাল। ভাবা মতই কাজ। সাপ্তাহিক বর্তমানের পুরানো যত নৈনিতাল সংখ্যা বার করে সাজাতে বসলাম ট্যুরটা। একটা দীর্ঘ ভ্রমণ। আলমোড়া-মুন্সিয়ারী-চৌকরি- কৌশানি- রানীখেত- নৈনিতাল। সেই মত কাটা হলো ট্রেনের টিকিট লালকুয়া এক্সপ্রেসের। তবে,এই ভ্রমণে আমরা একা না, আমাদের সঙ্গে যুক্ত হলো সুজিতের অফিসের একটি নবদম্পতি প্রসেনজিৎ,শর্মিষ্ঠা।

১৫ই ফেব্রুয়ারী আমাদের ট্রেনের টিকিট আবার ওই দিনই সরস্বতী পুজো। বাড়িতে আমার উদ্যোগেই পুজো হয়, বাদ তো দেওয়া চলবে না তাই খুব ভোরে পুজো সেরে আমরা বেরিয়ে পড়লাম বাড়ি থেকে। বর্ধমানে লালকুয়া এক্সপ্রেসের টাইম ৯ঃ৩১ মিনিট। আমরা পৌনে ন’টার মধ্যে স্টেশনে পৌঁছে দেখলাম, প্রসেনজিৎরা আগেই এসে গিয়েছে। প্রথম পরিচয় ওদের সাথে। সময়েই ট্রেন ছাড়লো বর্ধমান স্টেশন। দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যে,তারপর রাত। বেশ সুন্দর একটা অনুভুতির সাথে কাটছিল সময়টা হঠাৎ মাঝরাত তখন, ছেলে কেঁদে উঠলো। সন্ধ্যের পর সুজিতের শরীরটা একটু খারাপ হওয়ায় ও তখন ঘুমাচ্ছে। ছেলের শুরু হলো বমি। চলন্ত ট্রেনে অজানা আশঙ্কায় সারারাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারলাম না। প্রতীক্ষা করতে লাগলাম সকালের। দিনের আলোর একটা অদ্ভূত ঔষধি গুন আছে মানতেই হবে। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কামড়ায় সারাসরি রৌদ্রকে ছোঁয়া যায়না ঠিকই তবুও, জানালার কাচ ভেদ করে আলোর ছটা আসতেই মনে যেন অনেক সাহস পেলাম। দেখলাম, ছেলে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে,আমিও পাশ ফিরলাম হালকা চোখ বুঁজে। চোখ খুলতেই দেখলাম, একে একে সাবাই উঠে বসেছে আছে। আমরা গন্তব্যের প্রায় কাছাকাছিই চলে এসেছি। কিন্তু জানালার কাচ দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম কোনো কোনো স্টেশনে ভীষণ বৃষ্টি হচ্ছে। ট্রেন যখন লালকুয়াতে পৌঁছালো,আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ভারি মেঘ যেন মাটি ছুঁতে চায়ছে। 

গাড়ি আগেই বুক করা ছিল। কথা মত লালকুয়া স্টেশনেই গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন দিওয়ান সিং রাওয়ত। আমরা পৌঁছাতেই দেখা হলো দিওয়ান জি’র সাথে। স্টেশন থেকে গাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার পথেই শুরু হলো টিপটিপ বৃষ্টি। জিনিস ঢুকিয়ে গাড়িতে বসতেই দেখলাম বৃষ্টি তার বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। গাড়ির কাচের গা বেয়ে ক্রমাগত এঁকেবেঁকে গড়িয়ে পড়ছে জল। ঘড়িতে তখন ন’টা, গাড়ি এগিয়ে চললো উত্তরাখন্ডের মূল বাণিজ্য শহর হলদোয়ানির দিকে। যত সময় গড়াতে লাগলো বৃষ্টির তান্ডব যেন তত বেশি হতে লাগলো। ভিতর থেকে বাইরের সবকিছুই তখন ধোঁয়াশার মত অস্পষ্ট। আমাদের পরিকল্পনা অনুসারে ওই দিনটা আলমোড়াতে থাকার কথা। গাড়ি হলদোয়ানি ছাড়িয়ে আলমোড়া যাওয়ার রাস্তায় পড়তেই শুরু হলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সম্ভার। হিসাবমত আমাদের সাড়ে বারোটা থেকে এক টা’র মধ্যেই আলমোড়া পৌঁছানোর কথা কিন্তু বৃষ্টির কারণে গাড়ির গতি বেশ কম। পথে কোথাও প্রচন্ড বৃষ্টি আবার কোথাও হালকা। এর আগেও আমরা পাহাড়ে ঘুরেছি ঠিক একই সময় এই ফাল্গুন মাসেই কিন্তু কখনো পাহাড়ের বৃষ্টি দেখা হয়নি এর আগে। সেই অর্থে এও এক নতুন অভিজ্ঞতা আমাদের। পাহাড়ের বৃষ্টি সম্পর্কে যা শুনেছিলাম ঠিক তাই, যেমন এর সৌন্দর্য তেমনই ভয়ঙ্করও। এই পর্যন্ত পথে শুধু সৌন্দর্যকেই দেখলাম,তখনও ভয়ঙ্কর দেখা বাকি। কিছুটা এগোতেই শুরু হলো ভয়ঙ্কর বৃষ্টি, বেশ সরু রাস্তা। পাহাড়ি রাস্তার বাঁকে বাঁকে যেন লুকিয়ে আছে মৃত্যুদূত। ডানদিকের খাদের গায়ের ভেজা সবুজ ঘন জঙ্গলের রূপে চোখ ঝলসে যাওয়ার উপক্রম। দূর থেকে দেখতে পেলাম এই দীর্ঘপথের একমাত্র চায়ের দোকান। একেই শীতকাল তাতে বৃষ্টিভেজা। ঠান্ডাটাও উপভোগ করার মত। আমাদের ট্রাভেরা গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়লো রাস্তার ধারে। গাড়ি থেকেই দেখতে পেলাম, দোকানে পকোড়া ভাজা চলছে। ইতিউতি ছড়ানো গুটিকয় লোক। কারোর হাতে পকোড়ার প্লেট কেউবা চায়ের গ্লাস হাতে। বৃষ্টিতে ছেলেকে নিয়ে বাইরে নামা ঠিক হবে না,তাই সুজিত বসে থাকলো গাড়িতে আমি নামলাম ছাতা নিয়ে, সঙ্গে প্রসেনজিৎ। একটা ছাতায় তিনজন নামলে ভিজে যাবো তাই গাড়িতেই বসে রইল শর্মিষ্ঠা। আমরা বাইরে থেকে ওদের সাপ্লাই দিতে লাগলাম চা আর পকোড়া। দোকানের সেডের কিনারা বেয়ে ঝরে পড়ছে বৃষ্টিধারা,মাটিতে পড়ার পর ছিটানো জলের টুকরো ছোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে গায়ে মাথায়,হাতে ধরা গরম চায়ের গ্লাসে আয়েসের চুমুক, সামনে অবাধ,উন্মুক্ত বৃষ্টিভেজা প্রকৃতি। এমন কিছুটা সময় আজও স্থিরচিত্র স্মৃতিপটে।

শুরু হলো আবার পথচলা। বৃষ্টির সাময়িক বিরতি চলছে।কিন্তু পথ আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। এমন গভীর ঘন ধোঁয়াশা আগে কখনও দেখিনি! গাড়িটাকে যেন ঘিরে ধরে গিলতে চায়ছে। গাড়ির হেডলাইটও এই ধোঁয়াশা ভেদ করে এক হাতের দুরত্বও অতিক্রম করতে পারছে না। তখনই অনুভব করলাম জীবন আর মৃত্যুর মাঝের সূক্ষ্ণ দেওয়ালটাকে আর অনুভব করলাম আমাদের কান্ডারির পোক্ত অভিজ্ঞ গাড়ি চালানোর হাত।

বাঁ-দিকে নৈনিতাল যাওয়ার রাস্তা ছেড়ে আমরা সোজা এগিয়ে চললাম। পথে দেখা পেলাম কোশী নদীর। কিছুটা গিয়ে আবার একটা পাহাড়ি রেস্তোরাঁ। বাঁ-দিকে প্রায় খাদের উপর ঝুলে আছে,নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে স্বচ্ছ জলের নদী। রেস্তোরাঁর ভিতরের বারান্দায় দাঁড়ালে দেখা যায় সামনে অবাধ উন্মুক্ত সবুজ প্রকৃতি। নিচে বয়ে চলা নদীতে বর্ষায় দেখা যায় অজস্র মাছের লাফালাফি। তাই এই জায়গাটার নাম “ফিস ভিউ পয়েন্ট”। ঘড়িতে প্রায় একটা বাজতে চলেছে। সাবার হাতে গরম কফির কাপ। দিওয়ান জি জানালেন আমরা আলমোড়ার প্রায় কাছাকাছি এসে পড়েছি। মিনিট কুড়ির বিশ্রাম নিয়ে আবার শুরু পথ চলা একটা ছোট্ট সেতুর কাছে এসে কোশীনদী মিলে গিয়েছে বিশ্বনাথ নদীর সাথে। সেতু পেরিয়ে আধঘণ্টার পথ যেতেই এসে পৌঁছালাম আলমোড়া। একটা ছোট্ট পাহাড়ি জনপদ। বৃষ্টিতে দোকানপাট বন্ধ শুনশান রাস্তা। দিওয়ান জি একটা সুন্দর প্রস্তাব দিলেন। আমরা যদি আলমোড়াতে না থাকি তবে উনি একটা সুন্দর জায়গায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দেবেন, জায়গাটার নাম ধৌলচিনা (ইকো- বিনসর)। এমনিতেই আলমোড়াতে আমাদের দেখার কিছু ছিলনা,খুব হলে বিকালে বাজারে ঘোরা,তাও বৃষ্টিতে সম্ভব নয়। ঠিক করলাম দিওয়ানজি’র প্রস্তাব মেনে আমরা আরো কিছুটা এগিয়ে যাবো। দেখাই যাক দিওয়ান জি আমাদের কোথায় নিয়ে যান। আরো দেঢ় ঘণ্টার রাস্তা চলার মত ক্ষমতা আমাদের কারোরই প্রায় নেই তখন। গাড়ি থেকেই দিওয়ান জি ফোন করলেন সেখানে। আগে থেকে খাবার অর্ডার না দিলে সময়ে খাবার পাওয়া যাবে না। 

কতদূর আর কতদূর ভাবতে ভাবতে ২ঃ৪৫ নাগাদ আমাদের গাড়ি পিচের রাস্তা ছেড়ে বাঁদিকে বেঁকে উঠে এলো মাটির কাঁচা রাস্তায়। বেশ সরু রাস্তা তারউপর পিচ্ছিল,গাড়ির চাকার একহাত পর থেকেই নেমে গিয়েছে খাড়া খাদ। আমরা এই পথে চড়াই উঠতে লাগলাম। একটা বাঁকের কাছে এসে দেখলাম লেখা আছে ‘ধৌলচিনা ( ইকো-বিনসর)। তার একটু পরেই আরেকটা জায়গায় লেখা “মা আনন্দময়ী আশ্রম”। বুঝলাম পথচলা আজকের মত শেষ হতে চলেছে। গাড়ি এসে দাঁড়ালো একটা সবুজ লজের পাশের বাগানে। বৃষ্টিতে ঘাস ডুবে আছে জলে। ছাতা নিয়ে একে একে এসে দাঁড়ালাম লজের বারান্দায়। চারিদিকে চেয়ে দেখলাম,এই লজ ছাড়া আর কোনো বসতি চোখে পড়লো না। পাহাড়ের কোলে নিঃসঙ্গ একটা লজ একা দাঁড়িয়ে।বুঝলাম এখানে এখনও শহুরে চোখের দৃষ্টি পড়েনি। লজের বাঁ-দিকে কিছুটা গিয়ে লজ থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে খাবার ঘর। কিছুক্ষণ পর একটি ছেলে এসে আমাদের জিনিসপত্র নিয়ে লজের পিছনের দিকে একটা সিঁড়ি দিইয়ে উপরে উঠতে লাগলো, আমরা পিছন পিছন পৌঁছালাম দোতলায়। সিঁড়ি দিয়ে উঠে ডানদিকে দুটি ঘর আমাদের জন্য বরাদ্দ। সামনে টানা বারান্দা আর বারান্দা ছাড়িয়ে দৃষ্টি সীমানাহীন প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যায়।

ঘরটা ছিমছাম, একটা খাট,মাথার দিকে ছোট্ট একটা কাচের জানালা,একটা ড্রেসিংটেবিল আর একটা টেবিলের উপর টিভি রাখা। বাথরুমে গিজার নেই দেখেই চমকে উঠলাম। এত ঠান্ডায় গিজার না থাকলে স্নান করবো কি করে। আমাদের সবার আবার একটা বাতিক আছে ঠান্ডা যতই হোক স্নান বাদ দেওয়া যাবে না। না, শেষ পর্যন্ত গরম জলের সমস্যা হয়নি। আমাদের পিছন পিছনই একজন এক বালতি গরম জল দিয়ে গেল ঘরে, যাবার সময় জানালো লাগলে আরো দেবে। ঠান্ডা-গরম জলে পথের ক্লান্তি ধুয়ে আমরা নেমে এলাম নিচে। ডাইনিং হল পর্যন্ত যাওয়ার রাস্তায় পায়ের পাতা ডোবা জল। পা ভিজিয়ে পৌঁছে গেলাম খাবার ঘরে। একেবারে ঘরোয়া খাবার, ডাল,ভাত, সয়াবিনের তরকারি আর আলুভাজা। খাওয়া সেরে ডাইনিং হল থেকে বেরোলাম যখন, তখন প্রায় সাড়ে চারটে হবে। লজের নিচের তলায় লম্বা খোলা বারান্দা, সেখানে কয়েকটা চেয়ার পাতা। সামনে বারান্দার ঠিক নিচ থেকেই সবুজ ঘাসের লন, আর লনের শেষ প্রান্ত থেকেই নিচে নেমে গিয়েছে গভীর খাদ। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে মনে হয় যেন আকাশটা ছোঁয়া যাবে। লজটা দক্ষিণ-পশ্চিম মুখী। চেয়ারে বসে থাকতে থাকতেই দেখলাম, আকাশে অস্তরাগের রং লেগেছে। সূর্যটা রঙীন হতে হতে ঔজ্জ্বল্য হারাচ্ছে যত, তত যেন আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে খাদের কিনারার দিকে আর যেন খাদ থেকে উঠে আসছে ঘন অন্ধকার। 

ক্রমশ...।

কোন মন্তব্য নেই:

সুচিন্তিত মতামত দিন

Blogger দ্বারা পরিচালিত.