x

প্রকাশিত ৯৬তম সংকলন

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

রিয়া চক্রবর্তী

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৭ | |
 প্রথম বাঙালি খ্রিস্টান
এ দেশে ইংরেজ শাসন কায়েম হওয়ার পর ধর্মের ক্ষেত্রেও তাদের প্রভাব বিস্তার করবার প্রয়োজন অনুভূত হল। দলে দলে ইংরেজ মিশনারিরা এ দেশে পৌঁছোলেন। তাঁরা খ্রিস্টের বাণী সম্বল করে দেশীয় জনসাধারণের মধ্যে খ্রিস্টের মহিমা প্রচার করতে লাগলেন। বাংলাদেশে শ্রীরামপুর মিশনকে কেন্দ্র করেই খ্রিস্টধর্মের প্রচার শুরু হল। আঠারোশো সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও শ্রীরামপুর মিশন প্রতিষ্ঠা হল। এর আগে কেরি, মার্শম্যান, ওয়ার্ড প্রভৃতি পাদ্রিরা এ দেশে এসেছেন বটে, কিন্তু ধর্মপ্রচারে উদ্যোগী হননি। শ্রীরামপুর মিশন প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর তাঁরা ধর্মান্তরকরণের কাজে এগিয়ে এলেন।

কোম্পানির শাসকগণ পাদ্রিদের সুনজরে দেখল না। ইউরোপে ইংরেজদের সঙ্গে নেপোলিয়নের যুদ্ধ চলছিল। তাদের ধারণা ছিল পাদ্রিরা গুপ্তচর হিসাবে নেপোলিয়নকে সংবাদ সরবরাহ করতেন। তাছাড়া ভারতীয়দের ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত দেওয়াও সরকারের ইচ্ছে ছিল না। সিপাই বিদ্রোহকে কোনরকমে ঠাণ্ডা করা হয়েছিল। সাম্রাজ্য রক্ষা করার জন্য ইংরেজ শাসকবর্গ নানা ভাবে এ দেশের লোককে তোয়াজ করত। এ জন্য কোম্পানির তহবিল থেকে কালীঘাটে পুজো দেওয়ার নজিরও আছে। ভারতীয়দের মধ্যে জাতিভেদপ্রথা, নানা প্রকার কুসংস্কার, অজ্ঞানতা ইংরেজ শাসনের পক্ষে অনুকূল বলেই খ্রিস্টের সমান অধিকারের বাণী ভারতে প্রচার নিষিদ্ধ হয়। তাই ইংরেজ এলাকায় পাদ্রিদের ঠাঁই হল না। তাঁরা চলে এলেন ডেন অধিকৃত শ্রীরামপুরে।

কিন্তু এ দেশীয়দের মধ্যে পাদ্রিরা প্রথম কাকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করেছিলেন! এ সম্বন্ধে উইলিয়াম কেরির জীবনীকার পিয়ার্স কেরির সুন্দর বিবরণ আছে।

কেরি ও তাঁর বন্ধু ড. টমাস ভেবেছিলেন— মুন্শি রামরাম বসু খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হবেন। কিন্তু রামরাম বসু তাঁদের সে চেষ্টাকে নিষ্ফল করে দিলেন। সকলেই বলল— পাষাণের বুকে হাল চাষ করে কোনও লাভ নেই। কেরি ও টমাস নিতান্ত মর্মাহত হয়ে পড়লেন। প্রথমত এবং প্রধানত তাঁরা খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য এ দেশে এসেছেন, কিন্তু একজনকেও খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করতে পারেননি। ‘ফকির’ নামে এক ব্যক্তি এঁদের কাছে খ্রিস্ট-মহিমা শোনবার জন্য যাতায়াত করছিল বটে, কিন্তু ধর্মান্তরিত হওয়ার আগেই নিখোঁজ হয়।

খ্রিস্টধর্ম প্রচার করতে কেরি ও টমাসকে গ্রামে গ্রামে যেতে হত। সূর্যতাপ টমাসের মোটেই সহ্য হত না। তবু বের হতে হত। গ্রামের পথে ঘুরতে ঘুরতে টমাসের সঙ্গে বহু লোকের আলাপ হয়। টমাস তাঁর এই অভিজ্ঞতার কথা সুন্দর ভাবে বিবৃত করেছেন। তখনকার গ্রামবাংলার অনেক চমকপ্রদ বিবরণ এতে পাওয়া যায়।

অবশেষে টমাসের সঙ্গে কৃষ্ণ পাল নামে এক ব্যক্তির আলাপ হয়। কৃষ্ণ পালের বাড়ি শ্রীরামপুর; আদি বাড়ি ছিল রিষড়া অঞ্চলে। উনিশ বছর বয়সে তিনি ঘোষপাড়ার রামচরণ পালের শিষ্য হন। এগারো বছর ধরে তিনি শুদ্ধাচারের সঙ্গে গুরুর আদেশ ও উপদেশ পালন করেন। কিন্তু মনে শান্তি পাননি। তিনি প্রতিদিন নিয়মিত গঙ্গাস্নান করতেন। সন্ধে-আহ্নিক করতেন।

এক দিন গঙ্গাস্নান সেরে ওঠবার সময় ঘাটের সিঁড়িতে পড়ে গিয়ে কাঁধে প্রচণ্ড আঘাত পান এবং কাঁধের হাড় সন্ধিচ্যুত হয়। দেশীয় ডাক্তারদের দেখালেন কিন্তু কিছুই হল না। নিরুপায় হয়ে পাদ্রি ডাক্তারদের ডেকে পাঠালেন। কেরি, টমাস উভয়েই ডাক্তার ছিলেন। কেরি, মার্শম্যান ও টমাস কৃষ্ণ পালের বাড়ি যান। কৃষ্ণ পাল ক্রমে আরোগ্যের পথে আসেন। পাদ্রিদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। কৃষ্ণ পাল ভগবান যিশুর প্রতি অনুরক্ত হন। কৃষ্ণর স্ত্রী রসময়ী এবং শ্যালিকা জয়মনিও ভগবান যিশুতে বিশ্বাসী হয়ে পড়েন।একদিন কৃষ্ণ পাল, তাঁর স্ত্রী, শ্যালিকা এবং বন্ধু গোকুল পাদ্রিদের সঙ্গে একত্রে ভোজন করেন। পরদিন শ্রীরামপুর ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সাড়া পড়ে যায়। লোকে দল বেঁধে চিৎকার করতে থাকে—‘কৃষ্ণ পাল ফিরিঙ্গি হয়েছে!’ স্থানীয় লোকজন কৃষ্ণ পালকে ধরে নিয়ে হাকিমের কাছে যায় এবং নালিশ করে — ‘এ ব্যক্তি ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে একত্রে আহার করে ফিরিঙ্গি হয়েছে। একে সমুচিত শাস্তি দিন।’তদানীন্তন ডেনিস গভর্নর কর্নেল বি সমস্ত ব্যাপারটা জানতে পারেন এবং কর্নেলের চেষ্টাতে সে যাত্রা রক্ষা পান কৃষ্ণ পাল। 

১৮০০ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্রথম বাঙালি কৃষ্ণ পাল খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হন। উইলিয়াম কেরির জীবনীকার পিয়ার্স কেরি লিখেছেন— কৃষ্ণ পালই বাংলাদেশ ও উত্তর ভারতের ‘প্রথম ফসল’, এ সম্বন্ধে কেরির সহচর ওয়ার্ড বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন। শ্রীরামপুর মিশনচার্চের সামনে বিভিন্ন জাতীয় অগণিত জনতার সমক্ষে উইলিয়াম কেরির পুত্র ফেলিকস কেরি ও কৃষ্ণ পাল ডঃ কেরির দ্বারা খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হলেন। কেরি উভয়কে জলে নামিয়ে দিলেন এবং পবিত্র আত্মার নামে দীক্ষা-স্নান দান করলেন।

কিছু দিন পরে কৃষ্ণ পালের শ্যালিকা জয়মনি খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা নিলেন। বাঙালি মহিলাদের মধ্যে ইনি সর্বপ্রথম এই ধর্ম গ্রহণ করেন।

খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করার পর কৃষ্ণ পালের উপরে যে অত্যাচার হয়েছিল তা অবর্ণনীয়। এই অঞ্চলে কৃষ্ণ পাল সকলেরই সমালোচনার বস্তু হয়ে পড়লেন। তাঁকে বধ করার ষড়যন্ত্র হয়। জমিদার তাঁকে বাড়ি থেকে উৎখাত করার চেষ্টা করেন এবং তাঁর জামাতা তাঁকে প্রহার করে অর্ধমৃত করে ফেলেন।কৃষ্ণ পাল খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের পর তাঁকে ইব্রীয় বা ইউরোপীয় নাম দেওয়া হয়নি। কারণ কেরি মনে করতেন— ধর্মান্তরকরণ শুধু আত্মিক উন্নতির জন্য। দেশীয় লোকদের থেকে দেশীয় খ্রিস্টানদের বিচ্ছিন্ন করা কেরির উদ্দেশ্য ছিল না। 

বাঙালি খ্রিস্টান সমাজে প্রথম বিয়ে হয়েছিল কৃষ্ণ পালের কন্যা আনন্দময়ীর সঙ্গে ব্রাহ্মণ কৃষ্ণ প্রসাদের। কৃষ্ণ পালের বাড়ির সামনে এক গাছতলায় এই বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

হুগলি জেলার ইতিহাসকার এবং ঐতিহাসিক ক্রুফোর্ড সাহেব কৃষ্ণ পালকে প্রথম বাঙালি খ্রিস্টান বলে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গ সমাজ’ গ্রন্থে শিবনাথ শাস্ত্রী মহাশয় পীতাম্বর সিংহকে প্রথম বাঙালি খ্রিস্টান বলে অভিহিত করেছেন। এ তথ্য সঠিক নয় বলেই অনুমান হয়। কারণ কৃষ্ণ পাল তার দু’বছর আগেই খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হন। দু’বছরে আরও বেশ কিছু লোক খ্রিস্টান হয়। সুতরাং পীতাম্বর সিংহকে প্রথম বাঙালি খ্রিস্টান বলা যায় না।

পীতাম্বর সিংহ সম্বন্ধে যতদূর জানা যায়, যৌবন থেকেই তিনি ধর্মের প্রতি আসক্ত হন, কিন্তু কোনও ধর্মই তাঁর মনঃপূত হয় না। ধর্মের জন্য তিনি ভারতের নানা স্থানে পরিভ্রমণ করেন। শ্রীরামপুর থেকে প্রকাশিত মিশনারিদের একটি ট্র্যাকট পড়ে তিনি খ্রিস্টধর্মে অনুরক্ত হয়ে খ্রিস্টান হন। ধর্মান্তরিত হওয়ার পর তিনি জ্বালাময়ী ভাষায় খ্রিস্টের প্রচার করেন। ধর্মপ্রচারে তিনি কেরির সঙ্গে সুখসাগরে যান। মৃত্যুর পর মার্শম্যান প্রমুখ পাদ্রিগণ তাঁর শবাধার বহন করেন।

প্রথম বাঙালি খ্রিস্টান হিসাবে কৃষ্ণ পাল ইংল্যাণ্ডের খ্রিস্টিয় সমাজ থেকে যথেষ্ট সমাদর পান। পীতাম্বর সিংহের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল। খ্রিস্টান হওয়ার পর কৃষ্ণ পাল নিজেকে যথেষ্ট শিক্ষিত করে তোলেন। তিনি নিজে এক জন গায়ক ও কবি ছিলেন। বাড়িতে একটা ছোট ঘরে খ্রিস্টের সুসমাচার রচনা করে তা প্রচার করতেন। উত্তর ও পশ্চিম অঞ্চলের লোকেদের কাছে প্রচার করবার জন্য তিনি হিন্দি ভাষা শেখেন এবং ইলাহাবাদ পর্যন্ত ধর্মপ্রচার করতে যান। কৃষ্ণ পাল বলতেন, ‘যীশুর কথা প্রচার করবার জন্য আমি জগতের অপর প্রান্ত পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত আছি।’ যশোরে ধর্মপ্রচারে তাঁর যথেষ্ট অবদান ছিল। দেশীয়দের মধ্যে খ্রিস্টধর্ম প্রচারে ও প্রসারে কেরির পথ তিনি প্রথম প্রস্তুত করেন।

এখানে উল্লেখ যে ইংরেজদের পূর্বে , পর্তুগীজ রা শ্রীরামপুরেই খ্রীস্ট -ধর্ম প্রচারের চেষ্টা করেছিলেন । তাঁদের হাত ধরেই প্রথম বাংলা মুদ্রিত বই বের হয় । হরফ তৈরী করেছিলেন , শ্রী পঞ্চানন কর্মকার । প্রথম দুটি বাংলা মুদ্রিত বই এর নাম - কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ এবং ব্রাহ্মণ - রোমান ক্যাথলিক সংবাদ । লেখকের নাম সম্ভবতঃ - মানুয়েল দা আস সুম্পসাও । অবশ্য খুব সফল হননি পর্তুগীজ রা । উল্লেখ্য , হুগলী জেলার প্রথম চার্চ বা গির্জা , ব্যান্ডেলে পর্তুগীজ দের-ই তৈরী । ।এখনো দর্শনীয় স্থান ।



Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.