x

প্রকাশিত বর্ষপূর্তি সঙ্কলন

দেখতে-দেখতে ১০ বছর! শব্দের মিছিলের বর্ষপূর্তি সংকলন প্রকাশের সময় এ খুব অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু অজস্র লেখক, পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থনে আমরা অনায়াসেই পেরিয়ে এসেছি এই দশটি বছর, উপস্থিত হয়েছি এই ৯৫ তম সংকলনে।

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৭

পিনাকি চক্রবর্তী

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৭ | | মিছিলে স্বাগত
বুকের উপর দাগ
।১।

এখন ভোর । যমুনার স্বচ্ছ জলে ছায়া পড়েছে , আলোর ; নদীর উপর অতি সন্তর্পণে যে আলো একটু –একটু করে ছড়িয়েছে , জেলেদের মুখ গুলো ঠিক স্পষ্ট হয়নি , পরস্পরের কাছে , এমন ভাবেই যমুনায় ভোর হয় । মধ্যরাত থেকেই জেলেরা মাছের জন্য নদীতে ছোট –ছোট নৌকো নিয়ে ঘুরতে থাকে । তাদের সাথে থাকে জাল । এই জাল ছড়িয়ে দেয় যমুনার বুকে আর রুপালি মাছে ভরে ওঠে নৌকা । দিনের আলোয় সেই মাছের পীঠে সূর্যের আলো খেলা করে , ঝলসানো আলোয় প্রতিটা মাছ যেন জল মুদ্রা হয়ে ওঠে ! 

জেলেরা আজ আগের দিনের তুলনায় কম এসেছে । আগের রাতে উৎসব ছিল । প্রাপ্ত বয়স্ক যুবক –যুবতিরা নিজেদের সঙ্গী নির্বাচন করবে আর দু’জনেই রাজি থাকলে সঙ্গমে লিপ্ত হবে । অবশ্য তাদের ভিতরের সম্পর্কে গভীরতা থাকতে হবে । এটা প্রতিবছরই হয় । বিশেষ একটি দিনে সদ্য ঋতু স্নাত যুবতিদের জন্যই আয়োজন করা। ধীবর সমাজে যুবতিরা স্বাধীন ভাবেই নিজের ভালোবাসার মানুষ বেছে নেয় । এখানেই আর্য সমাজ থেকে আলাদা । ধীবর সমাজে স্বয়ম্বর বলতে কিছু নেই । মেয়েরা উৎসবে অংশ গ্রহণ করে , নিজেদের মনের মতন সঙ্গী বেছে নেয় । তারপর সঙ্গম মুহূর্ত কাটায় । তারপর বিয়ে করে । তবে যদি কোন মেয়ে চায় নিজের পুরুষটির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে , করতেই পারে , মাতৃতান্ত্রিক সমাজ । মেয়েরা স্বতন্ত্র । 

নদীর চারপাশে গভীর অরণ্য ছড়িয়ে রয়েছে । এই অরণ্যে ধীবরদের জনবসতি । অবশ্য নদীটি বেঁকে বহুদূর ছড়িয়ে আছে । এমন –এমন পথ আছে , যা এই শীতের সকালে কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে ,সেই সাদা ঘষা দর্পণের মতন ধোঁয়া মুখরিত স্থান দিয়ে নিরীহ আর সরল জীবনে অভ্যস্থ ধীবররা কেউ যেতে চায়না । ফলত সেই সব পথ আজও অজানাই থেকে গিয়েছে । তুমি যদি তোমার চেনা গণ্ডীর বাইরে পা না রাখো , চেনা পরিসরের সীমা টপকানোর সাহস না রাখো , কিম্বা রহস্য ভেদক মন প্রস্তুত না করতে পারে কেউ ; সে নতুন কিছুই জানতে পারেনা । নদীর এমন অনেক জায়গা আছে , যেখানে দুর্গম ও বিপদজনক ঝুঁকি রয়েছে । সেই সব স্থান মাছের স্বর্গ রাজ্য হয়ে উঠেছে । কিন্তু ধীবররা কোন ভাবেই সেই সব জায়গায় যাবে না। চেনা সীমার বাইরে পা রাখতে তাদের খুব ভয় পায় । 

ধীবর জনপদটির যিনি নেতা , তার নাম হল দাসরাজ । শেষ এক বছর তিনি একটি সাধনায় মগ্ন । যমুনা নদীর এমন অনেক গুপ্ত পথ আছে , যেখানে বলা যায় মাছেদের অভয় অরণ্য রয়েছে । সেই সব স্থান খুঁজছে । এমনটা করলে ধীবর কূল রক্ষা পাবে । নচেৎ বানিজ্যে টান পড়ছে যে ভাবে , আর বেশীদিন এই রাজত্ব চলবেনা ! ধীবররা অনুৎসাহী । নতুনের প্রতি তাদের আগ্রহ নেই । তারা মাছ ধরা , বিক্রি করা আর সন্ধ্যা হলেই অলস সময় কাটানো --- এমন জীবনেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে । 

দাসরাজ নিজে বহুবার বোঝাবার চেষ্টা করেছে , এমন ভাবে দিন কাটালে শত্রু আক্রমণ করবে । ধীবররা শুনতেই চায় না । তাদের মতামত হচ্ছে – যখন সব উপায় বন্ধ , তখন নতুন রাস্তা খুঁজবার প্রয়োজন হবে । দাসরাজ জানে এমন ভাবে চালানো যাবে না । যেহেতু তিনি ধীবরদের প্রধান । তাঁর দায়িত্ব রয়েছে । তাই খুব ভোরে একরকম বাধ্য হয়েই ছোট্ট ডিঙি নিয়ে নদী পথে বেরিয়ে পড়েন । কখনো কোন সজ্জন ব্যক্তি পেলে , বিনা শুল্কে নদী পারাপার করে দেন ,বদলে ব্যক্তিটির কাছ থেকে জ্ঞান নিয়ে নেয় । দাসরাজ জানে এমন ভাবেই কখনো যদি কোন ঋষির দেখা পেয়ে যান !তার ভাগ্য পাল্টাতে বেশি সময় লাগবে না । ধীবর জাতির উন্নতি হবে । এমন পরিকল্পনা মনে –মনে তিনি শেষ একবছর পালন করে চলেছেন । তার এই পরিকল্পনার আঁচ এক মুহূর্ত অব্দি তৃতীয় কেউ জানে না । শুধু দ্বিতীয়জন বাদে । দাসরাজের মেয়ে সত্যবতী । 

সদ্য ঋতুমতি হয়েছে সত্যবতী । বুদ্ধিমান আর ব্যক্তিত্বময়ি । সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে বাবার সমস্ত কাজে সে পাশে থাকে । এখানেই বাবা আর মেয়ের বোঝাপড়া । 

সত্যবতী এই নতুন পথের সন্ধানের জন্য , দাসরাজের বিনাশুল্কে নদী পাড় করে দেওয়ার পরিকল্পনাটির ভিতরের কারণটি জানে । সেও বাবাকে উৎসাহ দিয়ে চলে । শিশুকাল থেকেই সত্যর অজানাকে জানা বা জ্ঞান আহরণের তীব্র অনুসন্ধিৎসা রয়েছে । ধীবর কন্যা হয়েও , ক্ষত্রিয়দের জীবন তার ভাল লাগে । সে নিজে বুঝেছে , শুধু ক্ষত্রিয়দের প্রতি বঞ্চনার গল্প শুনে দিন কাটালেই ভাগ্য ফিরবে না। দরকার চেষ্টার । তাই সে চাইছে , বাবা যদি নতুন পথ পায় যেখান থেকে ব্যবসায়িক লাভ আসে । তারপর ধীরে – ধীরে সামাজিক উন্নতির দিকটিও ভাবা যাবে । কিন্তু সবার আগে দরকার আর্থিক উন্নতি ।

দাসরাজ এত ভোরে ছোট্ট ডিঙি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে , যমুনার পশ্চিম দিকের বিশাল গভীর অরণ্যের মুখ দিয়ে কেউ আসবে , তাকে উল্টোদিকের জনবসতির দিকে নিয়ে যাবে , এমনটাই সে করেছে দীর্ঘ একবছর ধরে । অনেক কিছুই সে শিখেছে , বিশেষত মাছেদের বশে আনবার আধুনিক পদ্ধতি , আবার মাছ ধরবার আধুনিক সরঞ্জামের খোঁজ । 

রুগ্ন শরীর , নিম্মাঙ্গে পাতলা বস্ত্র , ঊর্ধ্বাঙ্গ ধীবর সুলভ পোশাক , গাল ভরা দাড়ি রয়েছে । গায়ের রং ঘন কালো আর মাছের আঁশটে গন্ধে ভরা । এটাও একটা বড় প্রতিকূলতা , কেননা এমন দুর্গন্ধ যাদের শরীরে , আর্য সমাজ তাদের এড়িয়ে চলে । 

ডিঙিতে বসে , দাসরাজ ভাবছিল – আজ এমন ভাবেই বেলা যাবে ! নাকি আজ কৃপা হবে । জঙ্গলের যে দিকটা ভোরের হাল্কা আলোয় ধুয়ে গিয়েছে , সেই দিকটায় তাকিয়ে রয়েছে । 

একটা মূর্তি দাসরাজের দিকে এগিয়ে আসছে । বেশ দীর্ঘ । অরণ্যের অন্ধকারের মতনই মিশমিশে কালো গায়ের রং। জটাধারী মধ্যবয়স্ক এক সাধু । গাল ভরা দাড়ি , রাতের অন্ধকারের মতন । নিম্মাঙ্গে বাঘছাল পড়েছে । ঊর্ধ্বাঙ্গে বস্ত্র নেই । এক হাতে ত্রিশূল আর আরেক কাঁধে ঝোলা রয়েছে । 

সাধুকে দেখেই দাসরাজ ডিঙি থেকে নামল । হাত জোর করে তফাতে গিয়ে বলল – প্রভু অনুগ্রহ করুন। আমি ধীবর জাতির নেতা দাসরাজ । আপনি আমার ডিঙিতে আসুন । আমায় উদ্ধার করবেন । 

সাধু নিজের নাকে হাত রাখল ; নাকে যাতে দুর্গন্ধ না প্রবেশ করে । বলল – তুই যে ধীবর আমি বুঝতে পেরেছি । গোলাপের সুবাস যেমন তার পরিচয় বহন করে , তেমনই ধীবর জাতির অভিশাপ তাদের শরীরের গন্ধ । আমি বিলক্ষণ টের পেলাম । 

দাসরাজ মুখ নিচু করে বলল – আপনি ভগবান , আপনি যদি সেবা করবার সুযোগ না দেন । আমাদের উদ্ধার কে করবে ! প্রভু আমরা উন্নত সমাজের থেকে অনেক পিছিয়ে । আসুন অনুগ্রহ করুন । এই রাজত্ব আমার , এখানকার ভূখণ্ডে আপনি কয়েক দিন কাটিয়ে যান , আমরা উদ্ধার হব । 

সাধু ভাবছে , এমনিতেও সুদূর হিমালয় থেকে পদযাত্রায় সে ক্লান্ত , পরিশ্রান্ত । কয়েকদিন বিশ্রামে আনন্দই হবে । তার উপর ধীবর রাজার নিশুল্ক সেবা , মন্দ নয় । 

সাধু বলল – ঠিকাছে , আমি একটু নির্জনে থাকতে চাই । দেখিস যেন কেউ বিরক্ত না করে । নিজের রান্না , ফল সংগ্রহ নিজেই করে নেব । শুধু নির্জন স্থান আর ফলে ভরা ছোট্ট ভূমি দিলেই চলবে ।

দাসরাজ ডিঙি ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে । যমুনার মাঝখানে , স্বচ্ছ জলের ভিতর রুপালি মাছের ছটফটানি দেখে আন্দাজ করছে , এখানে মাছের প্রাচুর্যতা রয়েছে । সে সাধুর দিকে তাকিয়ে মনে –মনে ভাবল – তার ভিতরের ইচ্ছাটা বলে ফেলা যাক । সাধু অন্তর্যামী । হয়ত বুঝেই ফেলেছেন । 

দাসরাজ বলল – প্রভু , দয়া করুন । 

সাধু চোখ বন্ধ করে , ভোরের একান্ত অনুদিত শব্দ শুনছে । নদীর শব্দ , গাছের পাতায় পল্লবিত পাখির শব্দ , এই সব কিছু নিয়ে ভোর আস্তে – আস্তে ভারী হতে শুরু করেছে । 

সাধু বলল – তোর মনে যদি কোন কিছু জানবার ইচ্ছা থাকে বলে ফেল । আমি শুনছি । 

দাসরাজ , ডিঙির দাড় বেয়ে চলেছে । ছোট্ট নৌকো , একান্ত ব্যক্তিগত , এই তরী মৎস্যতরী নয় । নদীতে স্রোত নেই । জলের মন্থরিত হাওয়ায় , বেশ সুন্দর ভাবে ঘুরে চলেছে । এই কৌশল দাসরাজ আয়ত্ত করেছে । সাধু এমন নৌকা বিহার এর আগে উপভোগ করেনি ।

দাসরাজ বলল – আপনাকে একটা জন্মবৃত্তান্ত জানাবার আছে । 

সাধু নিরুৎসাহী ভাব নিয়ে বলল – খুব সুন্দর , চমৎকার , অনেক দিন বাদে এমন নৌকাবিহার করছি । 

দাসরাজ বলতে শুরু করল – রাজা উপরিচর বসু একদিন যমুনার তীরে এলেন । দেখতে পেলেন অদ্রিকা নামে এক ধীবর কন্যার । উভয় যখন পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছিল , নিজেদের মন দিয়ে ফেলে । রাজা অদ্রিকার সাথে সঙ্গম করেন । তাদের এক পুত্র আর কন্যা জন্মায় । পুত্রকে রাজা নিজের পালিত পুত্র রুপে উপাধি দেন ‘মৎস্যরাজ ’ এর । কন্যাটিকে ত্যাগ করলেন । আসলে কন্যাটি রূপবতী হলেও , ফর্সা নয় এবং ক্ষত্রিয় রক্ত থাকলেও আর্য সমাজ তাকে নেবে না। সেই কন্যার নাম কালী বা মৎস্যগন্ধা । তার শরীরে ধীবর জাতির মতনই গন্ধ রয়েছে । 

সাধু , নিজের দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলল – তুই সেই মেয়ের দায়িত্ব নিয়েছিস ? তুই চাস আমি তোর কন্যাকে ক্ষত্রিয় সমাজে প্রতিষ্ঠা করি ? 

দাসরাজ বলল – প্রভু আমি তার পালিত পিতা । আমি জানি কালী ক্ষত্রিয় । আর্য সভায় মানানসই । তাইতো আপনার অনুগ্রহ চাই । 

সাধু বলল – আমি তোর কন্যার সাথে একান্তে সময় কাটাতে চাই । যদি দেখি ওর মধ্যে ক্ষত্রিয়ের গুন রয়েছে , আমি তোর মেয়েকে বর দেব , আমার আশীর্বাদে সে মুক্তি পাবে । ওই যে পর্ণকুটীর ওখানেই কাল ব্রাক্ষ্ম মুহুর্তে অপেক্ষা করব । ওকে বলিস সাদা সুগন্ধি ফুলে ভরা বেশ সুন্দর তরী নিয়ে অপেক্ষা করতে । ও আমার জন্য অপেক্ষা করবে , তবেই আমি আসব । 

সাধু নেমে গেল । দাসরাজের মুখটা বেশ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে । 


।২।

সত্যবতী এত ভোরে আজ এমন ভাবে নিজেকে সাজিয়েছে , অরণ্যপ্রদেশের বুক কামোচ্ছাসে ভেসে যায় ! দাসরাজ তাকে বলেছে , এই তরীতে সে এক দিব্য সাধুর সন্ধান পাবে । সেই সাধুর জন্য সে অপেক্ষা করছে । এই তরীটি সে এমন নির্জন স্থানে নিয়ে এসেছে যে , কেউ দেখতে পাবেনা । এখন তার কিশোরী বুক একটু কাঁপতে শুরু করেছে । সে ভাবছে , সাধু যদি না আসেন । আবার ভাবছে তার মতন কালো ধীবর মেয়ের প্রতি সে করুণা কেন দেখাবে ? সাধুরতো গুণগ্রাহীর অভাব নেই । 

এই সময় বসন্ত সমাগত ঋতু । কামনার আগুন শরীরের অন্তর্ভেদী কোষে –কোষে । পাঁচমাস ধরে সত্যবতী এক নতুন অভিজ্ঞতা অনুভব করছে । তার শরীরে এক হিল্লোলিত ক্ষণে , রক্তের স্রোত ছোটে , এটাকে মাসিক পর্ব বলে , এই সময় কিছুতেই ঘরে মন থাকেনা। বান্ধবীদের নিজেদের প্রিয় পুরুষ রয়েছে । সত্যবতীর তেমন কেউ নেই । থাকলে বেশ হত । পুরুষের বুকের লোম , ঘামের গন্ধ , আঙুলের তীব্রতা – তাকে স্বপ্নের মতন বিভোর করে রাখে। ধীবর জাতির পুরুষের প্রতি সত্যবতীর তীব্র অনীহা। যদিও সে নিজে কালো , দুর্গন্ধে ভরা , তাও ক্ষত্রিয়টান অমোঘ । 

আকাশে আলোর পাতলা সর দেখা যায় । তরীতে একলাই সত্যবতী এত কিছু অগোছালো ভাবনা ভাবছে । এমন সময় একটি ভারী কণ্ঠস্বর শুনতে পেল !

সত্যবতী ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে পেল , এক লম্বা কালো বর্ণের জটাধারী সাধু , মাথার চুল গুলো কুচ –কুচে কালো ; খালি গা আর বুক ভরা রুক্ষ চুল , চোখ দুটো বেশ গভীর । সাধু বলল – কন্যা , তুমি আমায় ওই পাড়ে নিয়ে যাবে ?

সত্যবতী জীবনে এই প্রথম পুরুষের আশ্রয় মাখানো কণ্ঠ স্বর শুনল । সব কিশোরীর এক গোপন ইচ্ছা থাকে , একান্ত পুরুষ থাকবে । আচমকাই এই ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠল ! সত্যবতী বলল – আসুন , দেব আপনি আমার নৌকায় উঠুন। 

সাধু বলল – তুমি কে ?

সত্যবতী – দাসরাজ কন্যা সত্যবতী ।

সাধু দেখছে । কুমারী মেয়েটি যেন সদ্য বসন্তের কলস ! যেখানে কানায় – কানায় ভরা কামনার সুরা । কালো বর্ণের হলেও , নাক টিকালো আর কোমরে মেদ নেই । নিতম্ব উত্তম । বুকের স্তন দুটো বেশ নিটোল । মাথার দীর্ঘ কোমর অব্দি ঘন কেশ , সেখানে সাদা সুগন্ধি ফুলে সাজিয়েছে । কামনার অগ্নি দাউ –দাউ করে জ্বলছে । 

সাধু এর আগে অনেক ধীবর যুবতীকে সম্ভোগ করেছে । তাদের প্রতি দৈহিক চাহিদা থেকেই সঙ্গম হয়েছিল । এই কন্যার শরীরে সত্যিই রাজ রক্ত বইছে । সত্যবতীর চোখ দুটো যেন আবেদন করছে , পুরুষের ছোঁয়ার । 

সাধু নৌকায় উঠে বসল । 

সত্যবতী দাঁড় বাইছে । সাধু সামনে বসে থাকা মেয়েটির কুমারী স্তনের দিকে লোভাতুর হয়ে আছে । সে টের পেল , মেয়েটি যে ধীবর , এখন বোঝা যাচ্ছে । এতক্ষণ কামনার আগুনে দাউ –দাউ করে জ্বলছিল । তাই খেয়াল করেনি। সত্যবতীর শরীর থেকে দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে । মাছের আঁশটে গন্ধ । 

সত্য বলল – ভগবান , আমি অতি তুচ্ছ ধীবর কন্যা ।

সাধু – তুমি ধীবর কন্যা এই কথা সত্য । তবে সামান্য , নও । ভবিষ্যৎ তোমার জন্য রাজ সিংহাসন উপহার দেবে ।

সত্য – আমি ধীবর রমণী হয়েও , ক্ষত্রিয় সঙ্গম কামনা করি ! প্রভু আমার এমন হয় কেন ?

সাধু – আমি জানি , আমি ভগবান তাই তোমার অতীত আমি দেখেছি । তুমি আসলে ক্ষত্রিয়জাত । রাজ বংশে বিয়ে করলেই তোমার মুক্তি ঘটবে । 

সত্যবতী লজ্জায় লাল হয়ে উঠল । নৌকা যমুনার বুকে ধীর গতিতে ভেসে বেরাচ্ছে । অরণ্য জুড়ে বসন্তের আসর বসেছে । 

সাধু বলল – তোমাকে দেখে আমি মুগ্ধ । তোমার ভক্তি আমাকে বিভোর করে দিয়েছে । এসো ...

সত্য ঘাবড়ে গেল ! সাধু এই দিনের আলোয় , তাকে চাইছে ; এটা সম্ভব কি ! তবে নিজেকে সে মিথ্যা বলবে না , ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার পর থেকেই , পুরুষের সঙ্গ সে কামনা করেছিল । সাধুকে ফেরাতে মন চাইছে না । আবার কুমারী দশা নষ্ট হলে, সমাজে মুখ দেখাতে পারবেনা । তাছাড়া পিতা হয়ত ভরসা করেই পাঠিয়েছে । 

সত্যবতী বলল – ভগবান , আমি সামান্য নারী । আমি নিজেকে আপনার সেবায় নিয়োজিত করতে চাই । এই দিনের আলোয় সম্ভব এমনটা সম্ভব নয় । 

সাধু বলল – দূরে , ওই জলসীমার বাইরে নৌকা নিয়ে চলো । তোমরা ধীবররা , সীমা টপকাও না । ওখানে সবসময় আলোর খেলায় প্রকৃতি কুয়াশায় আছন্ন হয়ে থাকে । আমরা নিরাপদ ভাবে সঙ্গম করতে পারব । আমাকে বিশ্বাস করতে পারো । 

এমন উত্তম প্রস্তাবে , সত্যবতী পাগল হয়ে উঠল । এই নদীর উপর , আকাশের নিচে ,তার প্রেমিক তাকে আহ্বান করছে ! হতে পারে দুজনের বয়সের ফারাক , তাও সাধু তার প্রেমিক । যে কোন নারীই , জীবনের প্রথম প্রেমকে স্মৃতি করে রাখতে চায় । 

সাধু বলল – দেরী করছ কেন ? তোমার শরীরেও কামনা উঠেছে। সময় গলতে থাকা বরফের স্তূপ। জল হয়ে প্রবাহিত হয়ে যাবে। এসো ... 

সত্যবতী কুয়াশায় ঘেরা এক বিশেষ স্থানে নৌকা নিয়ে গেল । সাধু বলল – এই নাও , এই তরল পদার্থটা গায়ে মেখে নাও । দেখবে দুর্গন্ধ থাকবেনা । 

সত্যবতী পাথরের পাত্রে থাকা, সেই তরল শরীরে মাখছে । বক্ষবন্ধনী খুলে ফেলেছে । সাধু দেখছে, কুমারীর নিষ্পাপ স্তনের ভার । কোমরের নীচের কাপড়টিও খুলে ফেলল । সত্যবতী সম্পূর্ণ রুপে নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে । তার শরীর জুড়ে সুগন্ধি তরলের হাতছানি । সাধু দু’হাত দিয়ে তাকে বুকে টেনে নিল ।

সাধু বলল – আমি হিমালয় থেকে এসেছি ,প্রিয়া । আমার নাম পরাশর । তোমার শরীরে এই সুগন্ধি থেকে যাবে । আমি তোমার শরীরের সব দুর্গন্ধ নির্গত করে , এই কামনার গন্ধ ভরে দেব । তুমি আমায় শান্ত করো । 

সত্যবতীর কুমারী বুকের উপর মধ্যবয়সী পরাশর । তাদের দুজনের নগ্ন শরীরে কুয়াশা ভেজা আলো - চাদরের মতন জড়িয়ে আছে । সত্যবতী বুঝতে পারছে , কিছু একটা দেহে প্রবেশ করছে । তীব্র উত্তেজনায় পরাশরের পীঠ খামচে দিল । কাঁধে কামড় দিল । 

পরাশর সত্যবতীর থুতনিতে চুমু খেল । কণ্ঠে জিভ ছুঁইয়ে রেখেছে । বুকের উপর মুখ রেখে , দুটি অপরিণত স্তন নিজের মুখে নিয়ে নিল । তাদের ঘিরে যে কুয়াশা বলয় , তাতেও যেন ঘাম জমছে ! তীব্র যৌন উত্তেজনায় , কিশোরী সত্যবতী উপুর হয়ে শুয়েছে । নরম স্তন যুগল, ফুলের সজ্জার উপর কুসমিত হয়ে উঠেছে ! পরাশর তার পীঠে চুম্বন করছিল । যেমন করে মেঘ বর্ষার আকাশেকে ভিজিয়ে দেয় ; এক মধ্যবয়সী পুরুষের জীভের তৃষ্ণা , সত্যবতীকে অভিজ্ঞ করছে । সিক্ত করছে । 

এমনটা কতক্ষণ হয়েছে , সত্যবতী জানে না । তবে উত্তেজনায় সে বিভোর হয়ে সময় ভুলে গিয়েছিল । আচমকাই খেয়াল হল , পরাশর নিম্মাঙ্গে বাঘছাল পড়তে ব্যস্ত । 

উত্তেজনা শেষ হতেই , পাপাবোধ আর লোক লজ্জার ভয় তাকে চেপে ধরল । মেয়েটা কিশোরী সুলভ কান্না কাঁদতে শুরু করেছে । 

পরাশর মুখ কুঁচকে বলল – প্রথমবার রক্তপাত হবে । যন্ত্রণা করবে । তোমার যোনি ছিদ্র এখনো পরিণত হয়নি । তবে সত্যবতী, তুমি পুরুষকে খুব সুন্দর বশে রাখতে পারবে । আমি মুগ্ধ । কাঁদছ কেন ?

সত্যবতী বলল – ভগবান , আমি কুমারী অবস্থায় সঙ্গম করলাম । এখন আমি আর কুমারী নই ! মুখ দেখাবো কেমন করে ?বিবাহের আগে এমনটা উচিত ছিল না । 

পরাশর যেন এই মুহূর্তের অপেক্ষাতেই ছিল । বলল – দেখো স্বতীচ্ছদ এক ধরণের অর্ধচন্দ্রাকার শ্লৈশ্মিক ঝিল্লি । যোনির মুখেই এর অবস্থান , অভিজ্ঞ পুরুষ প্রথমবার সঙ্গম করেই বুঝতে পারবে , তার নারীটি প্রকৃত অর্থে আগে ভোগ হয়েছে কিনা । আমাদের সমাজ এমন ভাবেই বোঝে । তবে কঠিন অসুখেও এই পর্দা ছিঁড়ে যেতে পারে । একবার কোন মেয়ে কুমারী দশা হারালে , পুনরায় ফিরে পায়না । তবে আমি ভগবান পরাশর । জটিল প্রক্রিয়ায় চিকিৎসার মাধ্যমে তোমাকে পুনরায় কুমারী করে দেব । এই চিকিৎসা আসলে এক গুপ্ত বিদ্যা । আমি আয়ত্ত করেছি। চিন্তা নেই , ভরসা করতে পারো । 

সত্যবতী কান্না থামিয়ে বলল – আপনি সত্যিই আমাকে উদ্ধার করবেন ? 

পরাশর হাসতে হাসতে বলল – এই ভারতীয় সমাজ পুরুষতান্ত্রিক । সত্যবতী আমি জানি , পুরুষের কাছে নারীর স্বতীচ্ছদ ঘটানো , এক পুরুশোচিত আস্ফালন । সমাজে নারীকে ভোগ্য বস্তুর মতন নিয়ন্ত্রণ করবার জন্যই এই মনোবিকার । তুমি নিশ্চিন্তে থাকো । শুধু এর জন্য আমাদের একান্তে সময় কাটাতে হবে ।এসো আমার সাথে ।

-পিতা জানতে পারলে রাগ করবেন ।

- তোমার পিতা জানলে রাগ করবে না । ওই দ্বীপে নৌকা ঘুরিয়ে নিয়ে চলো । দাসরাজ নিজে তোমার কথা বলেছে । আমি যেন তোমাকে কিছু অধ্যায়ণ করাই , তাও অনুরোধ করেছে । 

সত্যবতী বুঝতে পারল না , নিয়তি তাকে নিয়ে খেলা খেলছে ! এখন পরাশরের কথা শোনা ছাড়া , উপায় নেই । 

যমুনার টানে যেমন শ্যাওলা ভেসে আসে , তেমনই নিয়তির টানে দ্বীপের দিকে এগিয়ে চলেছে সত্যবতী । নৌকায় পরাশর তার পাশে বসে আছে । মাথার উপর আকাশে তখন বসন্তপ্রহৃত বিকেলবেলা । ভোর থেকে সকাল, সকাল থেকে মধ্যবেলা হয়েছিল । ওরা দু’জনে একসাথে ফলাহার করল । পরাশর বলল – সত্যবতী , নৌকা এগিয়ে নিয়ে চলো । ওই দিকে একটা দ্বীপ আছে । আমি পর্যটক , আমার অনুমান মিথ্যা হবেনা । 

এখন এই বিকেলের আলোয় , সত্যবতী আর কিশোরী নেই ! নারীত্বে উন্নীত হয়েছে । পরাশর তাকিয়ে দেখল । মেয়েটার কালো রঙ , আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে । সত্যিই ক্ষত্রিয় আর ধীবর রক্ত সত্যবতীর শরীরে প্রবাহিত । মিলনের মুহূর্তে , ভারতীয় পুরুষরা চায় নারীদের কব্জা করতে । নারীর দেহে আত্মসমর্পণ তাদের যৌনতাকে সন্তুষ্টি করে ।মেয়েটি তেমন ভাবেই আত্মসমর্পিত । 

এই নারীকে সে অনেক কিছু শেখাতে চায় । 

।৩।

জঙ্গলের ভিতর পর্ণকুঠীর রয়েছে । ওরা দু’জনেই ভিতরে বসে আছে । সত্যবতীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে পরাশর । বলল – আমি যত দিন এখানে থাকব । এই দ্বীপে নিভৃতে মিলিত হব । ভয়ের কারণ নেই কেউ জানতে পারবে না । আমার পুত্রের নাম রাখবে দ্বৈপায়ন । ও কিছুকাল তোমার সাথেই থাকবে । তারপর আমি নিয়ে যাব আমার সাথে । 

সত্যবতী , নিজের মাথাটি পরাশরের , লোমে ঢাকা পড়া রুক্ষ বুক থেকে তুলল । 

বলল – আমি জানি আপনার প্রয়োজনে , আপনি এই সন্তান নেবেন । আমি চিন্তা করছি অন্য এক ভয়ের ।

-সংশয় না রেখে বলতে পারো । এই সন্তান তোমায় ক্ষত্রিয়কূলে প্রতিষ্ঠা দেবে । 

-আমার চিন্তা হচ্ছে , কুমারী অবস্থায় গর্ভবতী হলে , সমাজে মুখ দেখাবো কেমন করে ?

-আমি সব বলে দেব । তোমাকে সঠিক আশ্রয়ে পাঠিয়ে দেব । সবাই জানবে তুমি আশ্রমে গিয়েছ । সেখানে তোমার যত্ন নেওয়া হবে । শিশুটিরও যত্ন নেওয়া হবে । সঠিক সময়ে দাসরাজকে জানিয়ে দেওয়া হবে । চিন্তা নেই , দাসরাজ তোমার সাথে , সেখানেই থাকবেন । আর আমিও মাঝে –মাঝে এসে দেখা করতে পারব । তোমায় কুমারী অবস্থায় ফিরিয়ে আনবার জন্য , চিকিৎসা চলবে । আমি আছি । 

কুটীরের বাইরে সন্ধ্যা নামছে । গাছের ঝুড়ি বেয়ে , পাখিদের কোলাহল মিশে যাবে অরণ্য ভূমিতে । ডুবতে থাকা সূর্যের আলোয় মিশে যাওয়া যমুনার বুকটা দেখে মনে হয় - কোন পুরুষ গভীর ভাবে স্তনে খামচি দিয়েছে । স্তন বৃন্ত রক্তাভ হয়ে উঠল ! 

পরাশর হিমালয় থেকে অরণ্য প্রদেশ আসছিল । মাঝে মৎস্যরাজের কাছ থেকে আমন্ত্রণ পায় । 

মৎস্যরাজ , উপরিচর বসুর পালিত পুত্র । রাজা অনুরোধ করল , তার শরীরে দুর্গন্ধ নির্গত করতে হবে । পরাশর এর বদলে ক্ষত্রিয় রমণীর গর্ভে নিজের সন্তান চাইল। 

পরাশর চিকিৎসা বিদ্যায় পারদর্শী । এক বিশেষ উপায়ে তৈরি সুগন্ধি মৎস্যরাজকে দেয় । পরিবর্তে এক ক্ষত্রিয় নারী চায় , যার গর্ভে সে নিজের সন্তান দিতে পারবে । সেই ক্ষত্রিয় নারীর গর্ভে আগত পুত্র সন্তান নিজের কাছেই রাখবে , কন্যা সন্তান হলে , দায়িত্ব নেবে না । কেননা পরাশর মনে করে তার নিজস্ব জ্ঞান , শিক্ষা , গুপ্তবিদ্যা আর সাধনার উত্তরাধিকারী হতে পারে একমাত্র পুত্র সন্তান । 

পরাশরের বিকট আর বন্য চেহারা দেখে , কোন ক্ষত্রিয় রমণী সঙ্গম করতে রাজী হলনা । সকলেই অনিচ্ছা প্রকাশ করল । ক্ষত্রিয় রমণীদের ভয় হচ্ছিল , যদি কন্যা সন্তান হয় তবে সর্বনাশ হবে । কেননা সমাজে পুত্র সন্তান বহুমূল্যের ছিল । কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ার নিন্দা , কেউই নিতে চাইছে না । পরাশরকে খালি হাতেই ফিরতে হল। 

পরাশরকে মৎস্য রাজ কোন মতেই চটাতে চাইলেন না । এই অভিজ্ঞ বিপ্রকে হাতে না রাখতে পারলে , বিদ্রোহিদের সাথে সহযোগিতা করতে পারে । মৎস্যরাজের মতন এক ধীবরের সিংহাসনে বসা , ক্ষত্রিয়রা মেনে নেয়নি। বিপক্ষ শিবির প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ; ক্ষমতাচ্যূত করবার জন্য । 

মৎস্যরাজ একদিন , পরাশরকে ডেকে বলল - বোন সত্যবতী ধীবর প্রধান দাসরাজের তত্ত্বাবধানে বড় হচ্ছে । সেই মেয়েই আপনার সন্তানের মা হতে পারে । আপনার শর্তপূরণ হবে । কুমারী নারী বিবাহের পুর্বে পিতার অধীন থাকে । পিতার অবর্তমানে , বড় ভাই পিতার সমান । আমি তার বড় ভাই । আমি সত্যবতীর জন্য আপনার সঙ্গম প্রার্থনা করছি । 

পরাশর কিছুক্ষণ থেমে ছিল । বলল – রাজন , আমি গৃহী নই বাউন্ডুলে মানুষ । আমার ঘর আছে ,তবে তা চিরস্থায়ী নয় । সে ঘর খুব অল্প সময়ের জন্য থাকে । ঋতুতে পাতা ঝরে যাওয়ার অনেক আগেই আমি স্থান ত্যাগ করি । সন্তান ধারণ থেকে পৃথিবীতে তাকে আনবার মুহূর্ত অব্দি , যে পরিচর্যার আয়োজন দরকার তা পাবো কোথায় ? আমার নিজের কোন পরিচিত নেই । দাসরাজ কুমারী গর্ভবতী নারীকে নিজের কাছেও রাখতে চাইবেন না । মেয়েটা আমার কথায় রাজী হলেও , মনে সংশয় , সংকোচ থাকবে । যা সুপ্রজননের পরিপন্থী । 

মৎস্যরাজ নিজে এসেছেন পরাশরের কক্ষে । পরাশর নরম পালঙ্কে বসে আছেন । রাজা হাত জোর করে ভূমিতে বসেছে । বলল - হে ভগবান , সত্য আমার বোন । সুতরাং এই সময়ে ওকে পরিচর্যা করা আমার কর্তব্য । ওর সন্তান যত দিন যথার্থ বড় হয়ে না যাচ্ছে । আপনি আপনার সাথে নিয়ে যাওয়ার উপযুক্ত মনে না করেন , ততদিন আমার এখানেই থাকবে । আপনি দাসরাজকে এই প্রস্তাব দিন । আমার এখানে থাকলে ওরা সব দিক থেকে সুরক্ষিত হবে । 

পরাশর যমুনার তীরে আসতেই দেখতে পেল দাসরাজকে ! তিনি নিজের মেয়ের প্রকৃত জন্মের ইতিহাস শুনিয়ে ছিল । 

পরাশর ভাবল , যদি দাসরাজ সম্মত হয় , তবে খুব সহজেই সত্যবতীকে রাজী করানো যাবে । সত্যবতী স্বাধীনচেতা নারী , তাই মৎস্য রাজের পরিচয় দিল না। পাছে স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হয়েছে বলে বেঁকে বসে । কেননা সে অপরিচিত কোন ক্ষত্রিয়ের কাছে থাকতে রাজী হবে না । 

পরাশরের পুত্র সন্তান চাই । তার গুপ্ত বিদ্যার অধিকারী হবে একমাত্র পুত্র সন্তানই । কন্যা সন্তান যদি জন্মায়, তবে তাকে ফেলে রেখে চলে যাব । আরেকজন সত্যবতী লালিত হবে ! মৎস্যরাজ আর সত্যবতী হচ্ছে দাসরাজের বোনের ছেলে –মেয়ে। এই বোন পালিত হতেও পারে । কুমারী বোনের কন্যা প্রসব , দাসরাজার কাছে লজ্জার ছিল । রাজা উপরিচর পুত্র সন্তানের স্বীকৃতি দিয়েছিল , কেননা রাজা উপরিচরের রাজ্যরক্ষার প্রয়োজন ছিল । কন্যা সন্তানটি দাসরাজ নিজের কাছে রেখে মানুষ করেছে । 

পরাশর পর্যটক । নানা দেশে পরিভ্রমণ করে অনেক গুপ্ত চিকিৎসা শাস্ত্র শিখে ফেলেছে । বিশেষ ধরণের সুগন্ধি তৈরি করে , মানুষের দেহের যে কোন দুর্গন্ধ মিলিয়ে দিতে পারে । এত কিছুর থেকেও সতীচ্ছেদ এর পুনঃস্থাপনের জটিল চিকিৎসা , তার শ্রেষ্ঠ খোঁজ । এই পদ্ধতির মাধ্যমেই সে সত্যবতীকে পুনরায় কুমারী করবে । সত্যবতী রাজী হয়েছে গর্ভ ধারণ করতে ; পুনরায় কুমারী হলে আর লোকলজ্জার ভয় থাকবেনা । 


।৪।

সত্যকে নৌকায় তুলে দিল পরাশর । দ্বীপের সামনেই , স্থির জলে জলযান দাঁড়িয়ে আছে । চারপাশে সন্ধ্যা হওয়ার প্রাকমুহূর্ত আয়োজন শুরু হল । সত্যবতীর , সকাল থেকে এই সন্ধ্যা অব্দি জীবনের এক গভীরতম অভিজ্ঞতায় , নিজেকে খুব ক্লান্ত আর বিদ্ধস্থ মনে হচ্ছে । 

মেয়েটির নরম দু’হাত ধরল । কপালে চুমু খেয়ে, পরাশর বলল – সত্য তোমায় আমি কামকলায় পারদর্শী করেছি । যে কেউ ক্ষত্রিয় তোমার প্রেমে পড়তে বাধ্য । তোমায় বিশেষ সুগন্ধি তৈরির পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়েছি , সারা জীবন শুধু নিজের জন্য ব্যবহার করবে ।

সত্যবতী সরল চোখে তাকিয়ে রয়েছে । বলল - কেন ? 

পরাশর এই সরলতায় মুগ্ধ হয়ে ঠোঁটে চুমু খেল । বলল – গোটা ধীবর জাতি এর ব্যবহার শিখে গেলে , তারা আর তোমায় সমীহ করবেনা । আমি দাসরাজকেও শেখাই নি । মনে রেখো মানুষ রহস্যকেই ভক্তি করে ভয় পায় । 

সত্যবতী বলল – ঠিকাছে । 

পরাশর বলল – নিজের ক্ষমতা ধীবর জাতির উন্নতির জন্য ব্যবহার করবে ।ক্ষত্রিয়কূলের সাথে বিবাহ হওয়াটা আবশ্যক । আমি দাসরাজের সাথে কথা বলব । এখনই আমাদের ব্যপারটা জানাতে হবে না । মনে থাকে যেন , এই একমাস আমরা এই দ্বীপেই মিলিত হব । 

সত্যবতী বলল – প্রভু আমার সন্তানের উপর আমার কি কোন অধিকার থাকবে না ?

পরাশর বলল – ওর শিক্ষা সম্পূর্ণ হলে তুমি দেখা করতে পারবে । কখনো ক্ষত্রিয়কূলে সন্তান উৎপাদনের জন্য নিয়োগপ্রথায় দ্বৈপায়নকে আহ্বান করতে পারবে । সেই সন্তানের উপর আমার বংশের কোন অধিকার থাকবেনা । নাও এইবার তুমি নৌকার দাঁড় টানো । সন্ধ্যা হয়েছে । বাড়িতে এরমধ্যেই চিন্তা শুরু করে দিয়েছে । 

নদীর হাওয়ায় বুকের আঁচল খসতেই , কামড়ের ক্ষত দেখা গেল ! সত্যবতী মনে –মনে বলল – এই দংশন ভগবান পরাশরের নয় । এই দংশন প্রেমিক , বুদ্ধিমান , পর্যটক , জ্ঞানী আর কামুক পরাশরের । 

আচ্ছা , সত্যবতী যদি পুত্র সন্তানের জন্ম না দিয়ে , কন্যা সন্তানের জন্ম দেয় , তখন গল্পটা কোন দিকে বইবে ? পরাশর সেই কন্যা সন্তানকে নিজের আত্মজা বলে স্বীকৃতি দেবে না । সমাজ তাকে মানবে না । সেও আরেক সত্য হয়ে উঠবে ! 

ভারতবর্ষে এমন অনেক সত্যই হারিয়ে গিয়েছে । পরাশরের স্বার্থ আর পুরুষতান্ত্রিক নির্বুদ্ধিতা , এই দেশকে অনেক পিছনে নিয়ে গিয়েছে । 

সত্যবতীকে নিয়ে তরণী , পরাশরের দ্বীপকে পিছনে ফেলে , এগিয়ে চলেল । 




Comments
1 Comments

1 টি মন্তব্য:

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.