x

প্রকাশিত

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৭

অভিজিৎ পাল

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৭ | |
মহাদেবীর আরাধনা : সেকাল ও একাল
দুর্গাপূজা, বিশেষ করে শারদীয় দুর্গাপূজা ভারতীয় জনমানসে সমন্বয়ের প্রতীক। এই পূজায় হিন্দুদের পঞ্চাঙ্গ শাখার (শাক্ত, শৈব, বৈষ্ণব, গাণপত্য, সৌর) প্রধান দেবতাদের একাসনে পূজার প্রচলন চোখে পড়ার মতো। তদুপরি সনাতন হিন্দু বহু দেব-দেবীদেরও এই পূজা চলা কালে অর্ঘ্য দান চলে নিয়ম মতে। ভেদহীন এক ঐক্যতান দুর্গাপূজার যেন সমার্থক শব্দ। এই পূজায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশ গ্রহণ করেন সমাজের উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত, ব্রাহ্মণ থেকে পতিতা। তবে দুর্গাপূজা কালে কালান্তরে অনেক বদলেছে। মূল নৈষ্ঠিক পদ্ধতি এক থাকলেও, বাহ্যিক রীতিপদ্ধতি বদলে গেছে অনেকটাই। এমনকি গত শতাব্দীর নয়ের দশকের পূজা ও এই শতাব্দীর এই দশকের পূজার বাহ্যিক উপকরণের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে বিস্তর পার্থক্য। 
   
দুর্গাপূজার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ দেবী প্রতিমা। ভারতের অধিকাংশ প্রাচীন দুর্গা মন্দিরে দেবী দুর্গার একক প্রতিমায় পূজা চলে। সেখানে অধিকাংশই দেবীর মহিষমর্দ্দিনী রূপ। বঙ্গ সংস্কৃতিকে দুর্গার সাথে এসে বসেন কার্ত্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী। মনে করা হয় দেবী দুই পুত্র, দুই পুত্রী নিয়ে সপরিবারে অধিষ্ঠিতা। অবশ্য লক্ষ্মী ও সরস্বতী যে পৌরাণিক ভাবে দেবীর কন্যা নয়, বরং তাঁরই অংশ, তা সকলেরই জ্ঞাত। বঙ্গীয় পরিবারের আদলে দুর্গা প্রতিমার এই একচালা রূপ কোনো এক সময়ে রচিত হয়ে গেছে। ভারতের সব প্রান্তে এই ছবিটি এখনও এক নয়। বেশ কয়েক দশক আগে অবধি দেবীর অবস্থান ছিল একচালায়। মাঝে দেবী দুর্গা। তার দু'পাশে লক্ষ্মী সরস্বতী এক পা সামান্য বাঁকিয়ে পদ্মের বা বাহনের উপর দাঁড়ানো। ঠিক নিচেই গণেশ ও কার্ত্তিক। এই আদলটি এখনও নিখাদ রয়েছে সবচেয়ে ভালো বেলুড় মঠের দুর্গা প্রতিমায়। কারণ মঠে প্রতি বছর বিজয়াতে দেবীর নিরঞ্জনের পর কাঠামোটি পুনশ্চ তুলে রাখা হয়, পরের বছরের পুজোর জন্য। ফলে এখনও পূর্বসূরীদের ঐতিহ্য মেনে মঠের দেবীও রয়ে গেছেন অবিকৃত। সাধারণত এই ধরণের একচালা প্রতিমা উচ্চতায় বেশি বড় হয় না। ফলে বারোয়ারি পুজোয় একসময়ের পর থেকে একচালার ঐতিহ্য শেষ হতে থাকে। প্রত্যেক দেব-দেবীর সমান উচ্চতার প্রতিমা নির্মাণ হতে শুরু হয়, এবং তুলনায় দেবী দুর্গার প্রতিমা একটু বড় রাখা হয় পুরাতন ঐতিহ্যের রেশ টেনে। কলকাতা ও শহরতলির পুজোয় এই ধরণের সাবেকি প্রতিমা এখনও অনেক রয়েছে। তবে একচালা প্রতিমার উচ্চতার সমস্যাকেও পার করে বাগবাজার ও ম্যাডাক্স স্কোয়ারের মতো পূজাসংঘের পুজোয় এখনও দেবী একচালা। ধরণ সাবেকি। এই একচালা ও পৃথকচালার পাশাপাশি অতি আধুনিক এক ধরণের দেবী প্রতিমা কলকাতায় দেখা যায়। যা থিম ঘেঁষে তৈরী। অধিকাংশ ক্ষেত্রে থিমের পুজোয় দেবীর সাবেকি রূপ থাকে না। ফলে ছোট একটি দেবী প্রতিমা অতিরিক্ত আনা হয় এবং যাবতীয় বিধি মেনে সেই প্রতিমায় পূজা চলে। থিম নির্মিত এই প্রতিমাগুলি যেন শুধু শো-করার জন্য! থিম নিয়ে আরও কিছু কথা পরে বলব। কারণ পরিসর অনেকটাই সীমিত। 

     সেকাল ও একালের পুজোর মধ্যে আরও একটি লক্ষ্যনীয় পার্থক্য প্রতিমা নির্মাণকারী শিল্পীর পরিচয়। এই কয়েক বছর আগে পর্যন্ত বাংলার নামজাদা বড় বড় পূজাসংঘের অধিকারীরা প্রতিমা নির্মাণের বায়না দিতেন মূলত কুমোরটুলি ও কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পীদের কাছে। যেসব পূজাসংঘের বাজেট কম  তারা বায়না করতেন কাছাকাছির কুমোরবাড়ি থেকে। ইদানীং নামজাদা ডাকসাইটে সেলিব্রিটি ভাস্করকে দিয়ে প্রতিমা নির্মাণের একটা চল দেখতে পাচ্ছি। অবশ্যই এর পিছনে পুরস্কারের অমোঘ লোভ রয়েছে পূজাসংঘগুলির। সেটির মধ্যে বিশ্বায়নের প্রভাব রয়েছে পরোক্ষে এবং সেই সব প্রতিমা নির্মাণের উপকরণও বদলে যাচ্ছে অনেক। মাটির বদলে পাথর, দামী কাঠ, ধাতু বা অন্য দীর্ঘস্থায়ী উপকরণ দিয়ে তৈরী হচ্ছেন মাতৃরূপেন সংস্থিতা মৃন্ময়ী আনন্দময়ী দেবী। লক্ষ্যনীয় এই সব মূর্তি কিন্তু সরকারী ও বেসরকারী সংস্থার মাধ্যমে পূজার পর ক্রয়পূর্বক সংরক্ষণ চলছে। মূর্তিটি জায়গা করে নিচ্ছে এলিট মানুষদের বিচরণের পার্কে কিংবা নামী সংরক্ষণশালায়! পূজা সংক্রান্ত এই প্রথাটির কিন্তু বেশি বছর হয়নি এখনও। অথচ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ক্রমশ এই ভাবনাটি। শিল্পের সংরক্ষণ ভালো বিষয়। কিন্তু এক পিছনে যে সব কর্মকান্ড কিছু ক্ষেত্রে থাকে, তা শিল্প ও শিল্পী উভয়ের কাছেই ক্ষতিকারক। তবে সেসব এখানে আলোচনার বিষয় নয়। যেহেতু কর্মটি সত্য, তাই পূজবিষয়ক আলোচনায় সে প্রসঙ্গে আংশিক কথা না বলাও উচিত হত না।

     দুর্গাপূজার রীতিপদ্ধতির মধ্যে অন্যতম বিষয় কাঠামোপূজা। রথযাত্রা কিংবা জন্মাষ্টমীর দিন বিধি মেনে কাঠামো পূজার রেওয়াজ সেকালের নিয়ম মেনে এখনও চলে বহু ঐতিহ্যবাহী মন্দির ও বনোদী বাড়ির পুজোয়। পুরাতন কাঠামোয় নতুন খড় ও মাটির প্রথম প্রলেপ এই কাঠামো পূজার অন্যতম প্রধান কাজ। এরপর ধারাবাহিক নিয়মে চলে মৃন্ময়ী প্রতিমার নির্মাণ। কাঠামো নির্মাণের এই ভাবনাটি সুপ্রাচীন। বিসর্জনের পর থেকে কাঠামো পূজার আগে পর্যন্ত গত বছরের জীর্ণ কাঠামোই দেবীর স্মারক। এই কাঠামো পূজা বারোয়ারি পুজোয় খুব একটা প্রচলন নেই। তারা মূর্তি সংগ্রহ করে কুমোরবাড়ি থেকে। বরং ইদানীং বিভিন্ন বারোয়ারি পুজোয় প্রচলন ঘটেছে খুঁটিপূজার। এই পূজার ভাবনাটি একেবারে নতুনতর। কাঠামো পূজা সংক্রান্ত সমস্ত আয়োজন যেমন দেবী প্রতিমাকে কেন্দ্র করে, তেমনই এক্ষেত্রে মূল বিষয় মণ্ডপ। খুঁটিপূজা একটি মাত্র খুঁটিকে কেন্দ্র করে সমাপ্ত হয় এবং নামজাদা কারও হাতের স্পর্শে হৈ হৈ করে সেটিকে মাটিতে প্রথম পুঁতে মণ্ডপ নির্মাণের শুভ সূচনা করা হয়। এই খুঁটিটির অবস্থান বদলানো হয় না ভুলেও। সম্পূর্ণ দুর্গোৎসবের সাক্ষী থাকে এটি। বিশ্বায়নের যুগে এটি অন্যতম পূজাসংঘের বাণিজ্যিক প্রচারের হাতিয়ার। তবে এখনও এই প্রথাটি বহুল জনপ্রিয় হয়নি, কিন্তু বলতেই হয়, কম জনপ্রিয়ও হয়নি এটি।
   
 ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় বিল্ববৃক্ষমূলে দেবীর বহুবিধ উপকরণের মাধ্যমে বোধনের মধ্যে দিয়ে চিরাচরিত দুর্গাপূজার সূচনা করা হলেও ইদানীং দেবীর বোধনের আগে উদ্বোধন চলছে! দেবীর উদ্বোধন করছেন নামী-দামী মানুষেরা। দেবী প্রতিমার মোড়ক উন্মোচিত করে জন সাধারণের চোখে দেবীকে দৃশ্যমান করার এক এলিট পন্থা এই উদ্বোধন। পূজাবিধি অনুসারে বেল গাছের তলে দেবীর আবাহনীর পর শুরু হয় দেবীর অধিবাস পর্ব। যদিও নগরাঞ্চলে গাছের অভাব চিরকালই থাকার দরুণ বেল গাছের কাটা শাখাকেই বেল গাছের প্রতীক মনে করে বোধন সমাধা হয়। পরদিন সকালে নবপত্রিকা স্নানের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় দুর্গাপূজা। এই নিয়মানুগ বোধনের বহুআগেই উদ্বোধন সম্পন্ন হয় মহালয়া থেকে চতুর্থী খুব জোড় হলে পঞ্চমীর মধ্যে। উদ্বোধনের সেলিব্রিটি জমকের দেবীদর্শনের সুযোগ মেলে জনসাধারণের। 

     এই সময়ের দুর্গাপূজার অন্যতম একটি বাণিজ্যিক দিক হল বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের এমন বহুমাত্রিক ব্যবহার আগে ছিল না। পূজাসংঘগুলির প্রচারের অন্যতম সেরা মাধ্যম বিজ্ঞাপন। চমকদার ভাষ্য এর উপজীব্য। স্তরে স্তরে পূজাসংঘগুলি একটু একটু করে তাদের ভবনার প্রকাশ করেন একটি সাসপেন্স ধরে রেখে। প্রথম বিজ্ঞাপন থেকে শেষ বিজ্ঞাপনের ভাষায় দেখা যায় আকাশ-পাতাল তফাত। স্তরে স্তরে চমকের যেন মোড়ক খোলা চলে। শুধু তাই নয়, এখন শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞাপনের জন্যও রয়েছে পুরস্কারের আয়োজন। তার মূল্যও বেশ কয়েক লাখ টাকা। তবে এই সব বিজ্ঞাপনগুলিতে দুটি মোটা দাগের পার্থক্য রয়েছে। কিছু বিজ্ঞাপন গ্র্যাফিক্সের রকমে চকমে ভরপুর, কিছু বিজ্ঞাপন শুধু শব্দের বয়ানেই বাজিমাত করতে আসরে নামে। বড় দুর্গা ছোট দুর্গা বিষয়ক সামান্য কিছু শব্দের অপূর্ব বিন্যাসই এক্ষেত্রে যথেষ্ট। বাদ যায় না চটুল বাক্যও। সারা কলকাতায় এখন ব্যানারের রমরমা দেখলেই বোঝা যায় কতটা বিজ্ঞাপনের এমন ব্যবহার কতটা মূলত কলকাতার পূজাসংঘগুলিকে আকর্ষণ করেছে।

     থিমের সাজে পূজামণ্ডপ নির্মাণের প্রকল্পটি বেশ কিছুদিন হল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাঁশ কাপড় ও চারুশিল্পের যে সুসম বিন্যাস বিশ শতকের শেষভাগ অবধি বিশেষ জনপ্রিয় ছিল, তা এখন ক্ষয়ীষ্ণু। থিমের হাত ধরে বিশেষ কোনো স্থান, স্থাপত্য, সংস্কৃতি, সভ্যতার আদল যেমন উঠে আসছে, তেমনই উঠে আসছে উপাদানের রকমফের। প্লাস্টিক, মুক্ত, ঝিনুক, ভাঁড় প্রভৃতি উপাদানের মাধ্যমে গড়ে উঠছে মণ্ডপ। থিমের সরাসরি ছোঁয়াচ লাগছে দেবী প্রতিমাতেও। আবহমান দেবীরূপের থেকে সরে এসে থিমের সাথে মানানসই প্রতিমা নির্মাণের একটা হিড়িক এখন চোখে পড়ে। কিছু ক্ষেত্রে দেবীর বিচিত্র মূর্তি পীড়াকর মন হলেও, বহুক্ষেত্রে দেবী মূর্তি শৈলীগত সুস্থ। অনেক মণ্ডপেই এই ধরণের থিমজ দেবীতে পূজা চলে না। থিমের প্রতিমার পাশাপাশি একসাথে মণ্ডপে থাকে পূজার জন্য আরেকটি ছোট প্রতিমা, যা নিয়ে কিছু কথা আগে বলেছি। পাশাপাশি একথাও সত্য, এখনও বহু মণ্ডপে থিমের চমক থাকলেও দেবী প্রতিমায় তার প্রভাব পূজাসংঘগুলি সচেতন ভাবেই রাখেন না। পূজার এই বাহ্যিক দিকটিকে বাহ্যিকই রাখেন তারা। 

     দুর্গাপূজার অন্যতম আকর্ষণ ছিল বিচিত্র বর্ণময় আলোকসজ্জা। মূলত চন্দনগরের লাইনিং একটি সময়পর্ব পর্যন্ত কলকাতাতে দাপিয়ে বেড়িয়েছে। সুচারু নক্সা ও আলোর জ্বলা-নেভার নান্দনিকতা কলকাতার পুজোগুলির একচেটিয়া ছিল। আলোর গেটের পর আলোর গেট একসময় পার হয়ে মূল মণ্ডপে পৌঁছাতে হত, এখন বিজ্ঞাপনের গেট এসে এর আংশিক আভিজাত্য হারিয়েছে। থিমের পুজোর হাত ধরে আলোক শিল্পের একদিক যেমন উন্মোচিত হয়েছে, তেমনই বন্ধ হয়েছে আরেকটা দিক। থিমের মতো করে উপযোগী আলোর ব্যবহার এখন অহরহ দেখা যায়। অবশ্য কলকাতার কলেজ স্ট্রিট কিংবা গড়িয়াহাট অঞ্চলের পুজোয় এখনও আলোক সজ্জার চমক রয়েছে। সেটি অনেকাংশে আভিজাত্য বজায় রাখার জন্য সাজানো। ঠিক একইভাবে ক্ষয় ঘটেছে পুজোর বাদ্যিতে। ঢাকবাদকের অসধারণ ভঙ্গিমায় নেচে নেচে প্রাণবন্ত ঢাকের বোল ও পূজাপর্বের সাথে মিলিয়ে ধ্বনির ওঠা-পড়া পূজার অন্যতম উপকরণ ছিল বলা চলে। ঢাকের শব্দের মধ্যে কেমন যেন মন কেমন করা পুজো পুজো ভাব আছে। ঢাকের পর্যায় ক্রমিক যে নিনাদ ধ্বনি গায়ে কাঁটা ধরিতে তুলত, তা বন্ধ হয়ে গেছে থিম সঙ্গীত ও সিডিতে বদ্ধ ঢাকের বোলের মাধ্যমে। থিম সঙ্গীত ও সিডির ডাক কতটা পুজোর গন্ধ মাখায় সে বিষয়ে একটু সংশয় তো আছেই। বিশেষ করে থিমের পুজোয় ঢাকবাদকেরা দেবীর আরাধনা ও আরতির সময় ছাড়া তাদের প্রতিভার নির্দশন ঘটাতে তেমন পারেন না। যে বঙ্গীয় ভাব ও আগমনীর গন্ধ ঢাকের ধ্বনিতে আছে, তার কতটা থিম সঙ্গীতে রয়েছে, তা নিয়ে সংশয় আছে যথেষ্ট।

      বিশ্বায়ন গ্রাস করছে আমাদের প্রতিপদে। বাদ যাচ্ছে না ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিমবঙ্গও। বিশ্বায়ন ও বিশ্ববাণিজ্যের পরোক্ষ প্রভাবে পূজাসংঘগুলি সচেতন ভাবেই নেমে আসছেন পুরস্কারের লড়াইয়ে। শ্রেষ্ঠ আলো, শ্রেষ্ঠ মণ্ডপ, শ্রেষ্ঠ আবহ, শ্রেষ্ঠ প্রতিমা সহ নানা দিক নিয়ে চলছে তুল্য-মূল্য বিচার। আমাদের সংস্কৃতি সভ্যতার থেকে দূরে বিশ্বায়নের গ্রাসের দিকে এগিয়ে আসছি আমরা। এখনও সে ধারণাটি খুব স্পষ্ট নয়। সময় লাগবে বুঝতে। আধুনিকতার তীব্রতর লড়াইয়ে আমাদের বঙ্গীয় সংস্কৃতির প্রবহমান আনন্দোৎসব হয়তো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা হয়তো সরে আসছি শিকড় থেকে। পূজার নৈষ্ঠিক পদ্ধতির চেয়েও বর্তমানে মনোযোগ থাকছে সকলের বাহ্যিক প্রকরণে। এতটাও হয়তো উগ্রতা কাম্য নয়। শিকড়ের বিচ্যূতি ঘটলে গাছের দৃঢ়তা নষ্ট হয়ে যায়, এটি আমাদের বোঝা উচিত। পূজার মতো মনোজ্ঞ বিষয়ে আধুনিকতা হয়তো ততটুকুই কাম্য, যতটা আধুনিকতায় আমরা আমাদের প্রবহমান আনন্দোৎসবের ঐতিহ্যের রেশ স্পর্শ করে থাকতে পারি প্রজন্মের পর প্রজন্ম। মিলনোৎসবের ভাব মিলনোৎসবে সীমাবদ্ধ থাকুক, বিশ্বায়নের কূট প্রভাব আমাদের দেশজ সংস্কৃতি থেকে বাণিজ্যমুখীন যতদিন পর্যন্ত কম করে, ততদিনই আমাদের পক্ষে মঙ্গল। অন্তঃসার শূন্য বাহ্যিক আয়োজনের শৌখিন মজদুরী একটি সময়পর্বে ভয়ংকর হলেও হতে পারে। আমাদের পূজার সঙ্গে শিল্প সংস্পর্শিত। শিল্পের কঙ্কাল ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতির বিপরীত মেরুর বিন্দু। সময়ের অভিযাত্রায় পূজাবিষয়ক অনেক কিছুতেই এসেছে বিবর্তন। শুধু গ্রহণ বর্জনের দায়িত্ব এখন আমাদের বহন করতে হবে। 



Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.