x

প্রকাশিত | ৯৪ তম মিছিল

কান টানলেই যেমন মাথা আসে, তেমন ভাষার প্রসঙ্গ এলেই মানুষের মুখের ভাষার দৈনন্দিন ব্যবহারের কথাও মনে পড়ে যায়, বিশেষত আজকের দিনে। ভাষা দিবস মানেই শুধু মাতৃভাষা নিয়ে আবেগবিহ্বল হয়ে থাকার দিন বুঝি আজ আর নেই!

কেননা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাঁরা মাথায় বসে আছেন, বিশেষত যাঁরা রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতাভােগী এবং লােভী, তাঁদের মুখের ভাষা এবং তার প্রয়ােগ আজ ঠিক কতটা শিক্ষণীয় এবং গ্রহণীয় সেটা শুধু ভাবার নয়, রীতিমতো শঙ্কার এবং সঙ্কটের।

সবই কি তবে মহৎ ভাবনা, অনুপ্রেরণার জোয়ার? নাকি রাজনৈতিক কারবারিরা 'সুভাষিত' শ্রবণাতীত বয়ানে নিজেদের অক্ষমতার মদমত্ত প্রকাশ করছেন? সাধারণ ছাপােষা মানুষ বিস্ফারিত চিত্তে এই ভাষাসন্ত্রাস,এই ভাষাধর্ষণ দেখতে শুনতে ক্লান্ত। এর থেকে উত্তরণের উপায় এখনও অবধি কোনাে ভাষা দিবস দেখাতে পারেনি। এবারের ভাষা দিবসের কাছেও কি সেই উপায় আছে? নাকি এই খেলা হবে, চলবে ... মেধাহীন গাধাদের দৌলতে?

চলুন মিছিলে 🔴

বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৭

নীপবীথি ভৌমিক

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৭ | | মিছিলে স্বাগত
দশমী
শালা,মালটাকে দেখছিস ! কি হচ্ছে রে দিন কে দিন মাইরি ।এই শাল্লা,দীপুর ছেলে,আরে তোর ঘাটের মরা বাপটাকে বল না তাড়াতাড়ি করে তোর ঘরে ঢুকিয়ে দিতে এই ল্যাংরা বিশুর ধাড়িটাকে । কি হচ্ছে দিন দিন রে ! একসাথে দুটোকে পাওয়া যাবে বুঝলি,একহাতে বিশুর শ্রীদেবী মার্কা বউ আর এক হাতে এই শালা ঊর্মিলা মাতণ্ডকর। ওয়াও----!

   প্রতিদিন চারবেলা এই কথাগুলো শুনতে শুনতে আজকাল গা সওয়া হয়ে গিয়েছে দুর্গার। আজকাল তাই আর অন্য রাস্তা ধরে না ওদের কথায় বরং বুকে সাহস বেঁধে নিয়ে চোখ আর কান খুলে রেখে ওদের সামনে দিয়েই স্কুল থেকে বাড়ি ফেরে। আর হবে নাই বা কেন? পাড়ার প্রাইমারী স্কুল থেকে পাশ করে পাশের পাড়ার সরকারি স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে ওর গা গতর শরীর মনে খেঁটে খাওয়া বাপ বিশু মা হাসিনা ।

     বাড়ির উঠোনেই দোকান বিশুর,সকালে চা মুড়ি চপ থেকে দু-চারটে সবজিও রাখতে শুরু করেছে আজকাল সে ।হাসিনা,পাশের পাড়ায় যে নতুন ফ্ল্যাটগুলো হয়েছে সেখানেই রান্নার কাজ করে মোটামুটি ভালোই মাইনে পায় মাসের শেষে । দিনের বেলায় ঘর গৃহস্থলির কাজ সেরে এতোটা সময় পায়না বলে সন্ধ্যেয় ফিরে এসে দোকানের বেশিটা দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেয় । পাঁচ রকমের পকোড়া,আলুর চপ,আর সব তেলেভাজা,বলতে গেলে সন্ধ্যে থেকে বিশুর দোকানে মা লক্ষী সচল ।

     রান্নার হাতও বেশ ভালো হাসিনার। বাবুদের বাড়িতে রান্নার কাজ করে আজকাল নানা রকমের রাঁধতেও শিখেছে সে। এই তো সেদিন,ছেলেটার জন্মদিনে,কিসব কেক টেক বানিয়ে খাওয়ালো কলোনির সবাইকে ।প্রেসার কুকারটা গত মাসের কাজের মাইনে দিয়েই শখ করে কিনে এনেছে ও,তাতেই বেশ ফটাফট বানিয়ে দিলো মিষ্টি মিষ্টি কেক। বিশু মনে মনে বেশ খুশিই হয় হাসিনার এসব কাণ্ড কারখানা দেখে ।

   রেল কলোনির এই পাশটা বরাবরই সর্ব ধর্মের বাস একসাথে ।কে যে মুসলমান,কে হিন্দু ঘরের কেউ জানে না নিজেরাও বোধহয় ।দু’ঘর বিলেতী বাবুও আছে শোনা যায়।ওর শ্বশুর হরেন দাসের কাছ থেকেই জেনেছে এই সব কথা,সেই ছোট্ট বয়সে এই ঘরে এসে । দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সাহেবরা নিজের দেশে ফিরে গেলেও সবাই তো যায়নি,মেরিদের বাড়িটাও তেমনই। মেরির মা আবার মুসলিম,খুব ভালো কাঁথা সেলাই করতো ওর মা। পুরোনো ছেঁড়া কাপড়ে রঙ বেরঙের ফুল তোলা ডিজাইন ! বিয়ের প্রথম প্রথম রাতে স্বামীর ঘেরাটোপে বন্দিনী অবস্থায় আদরে সোহাগে শুনেছে সে সব দিনের কথা ।বিশু যখন খুবই ছোটো মাত্র সাত কি আট বছরের হবে তখন মাত্র চার দিনের জ্বরে কোনো এক অজানা জ্বরে ওর মা মারা যায় । সেই থেকেই বিশুর রেল কলোনির সব মানুষ জনই বড় নিজের জন । তবে সেটাই একমাত্র কারণ নয়,এ পাড়াটাই এমন।  হঠাৎ করে দেখে কেউ বলতেই পারবেনা কেউ কারোর রক্তের সম্পর্কের নয়। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও যে আত্মীয়তার বন্ধনে বাঁধা যায়,পুরোনো রেল কলোনিই তার প্রমাণ।

   আজ  সারাটা দিন ঘরে বসে এসব কথাই ভাবছিলো ল্যাংড়া বিশু। একটা পা ওর বাঁকা। বছর কয়েক আগে পাশের গ্রামে দুর্গা পুজোর সময় হিন্দু মুসলিম দু’পক্ষের মধ্যে যে অশান্তি ঘটেছিলো তারই ফলস্বরূপ । অবশ্য বিশুর ভিতর কে হিন্দু কে অন্য জাতের এমন ধারণা কোনো কালেই বাসা বাঁধেনি। পড়া লেখা বলতে গ্রামের স্কুলে নাইন অবধি।গরীব মানুষের ঘরে যেভাবে কষ্ট করে শিখতে হয় তেমনই আর কি ! ইচ্ছা থাকলেও তো উপায় থাকেনা অনেক সময় ।বাপ,ঠাকুরদা গ্রামের এক আইনজীবির বাড়িতে কাজ করতেন,সহৃদয় উকিলবাবু নিজের উদ্যোগেই গ্রামের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখার কাজে এগিয়ে আসেন।বিশুর বাবা হরেন দাসও এভাবেই পড়াশোনা শেখেন। পরে কাজের তাগিদে বিশুর ঠাকুরদা মারা যাওয়ার পর হরেন বাবু পুরো পরিবার নিয়েই চলে আসেন রেল কলোনির এই বস্তিতে। তবে কথাটা মনে হয় এখন আর বলা ঠিক নয়,কারণ রেলের উদ্যোগে ধীরে ধীরে দুচারটে কোয়ার্টার গড়ে উঠলে এই বস্তি ক্রমশ পাড়ায় পরিণত হয়। এখন তো সেখানে প্রাইমারী স্কুল থেকে আরম্ভ করে মিউনিসিপ্যালিটির জল, কয়েকটা ছোট ছোট দোকান সবই আছে মোটামুটি। 

 এখন সময় হয়েছে বিসর্জনের। নিয়ে যাওয়া হবে ফুল মালা চন্দনের সাজে রাণী হয়ে ওঠা দুর্গাকে শ্মশানের পথে। বড় সখ করে নামটা রেখেছিলেন পাড়ার সেলিম ভাই। পেটে দানাপানির ব্যবস্থা ঠিকঠাক করতে না পারলেও কি হবে,অকৃতদার সেলিম ভাইয়ের মূর্তি গড়ার হাতটা ছিলো সাংঘাতিক। প্রথাগত শিক্ষা নেওয়ার ক্ষমতা ছিলোনা কখনই তার,কিন্তু চোখের দৃষ্টি আর মনের তাগিদ ছিলো প্রবল ।মহালয়ার দিন ভোর রাতে জন্ম হয় দুর্গার,ভয় ডর বলতে কিছুই মনে হয় প্রাণে ছিলো না কোনো কালে,তবুও বাঁচতে পারলো না আর ,বাঁচাতেও পারলো না ওর ভাই রাজুও। মেয়ে শরীরের লোভে লোভে লোভাতুর কুকুরগুলো ছিড়ে খুবলে খেয়ে যায় কিশোরী দুর্গার পবিত্র দেহটা। ছোট্ট রাজু চেষ্টা করেছিলো প্রবল ভাবে নর রাক্ষসদের হাত থেকে ওর দিদিকে বাঁচাতে,চিৎকার করে সাহায্য চেয়েছিলো রাজু, পুজোর মণ্ডপে মণ্ডপে মাতৃ মুর্তি দর্শনে আসা মানুষদের। কিন্তু মানুষ বোধহয় এত শিক্ষার আলোয় মুড়িয়ে থেকেও আজও  সেই মাটির দশভুজাকেই আসল দুর্গা মানে। স্টেশনের উল্টো দিকের পাড়ার প্যাণ্ডেলের পিছনে নির্জন স্যাঁতস্যাতে ক্লাব ঘরের ভিতর ঘটে চলে দুর্গা নিধন যজ্ঞ কলির অসুরদের হাতে। 

  সপ্তমী,অষ্টমী পার করে আজ  নবমীর নিশি ।রেল কলোনিতে এবারেও মা এসেছেন।আজ বিদায়ের সানাই যেন বড্ড বেশি করুণ সুরে বেজে চলেছে এক নাগাড়ে।হাসিনার চোখে আর জল নেই,বরং সে এখন বিনা কারণেই হেসে যায়,নিজের মনে কতো যে কথা বলে দুর্গার সাথে,ঝগড়াও করে মেয়েটার সঙ্গে... রাজু দ্যাখে,কিন্তু কি আর বোঝাবে কিই বা আর বলবে ওর মাকে ! একটু পরেই বেজে যাবে বিসর্জনের ঘন্টা। 

   ___ একটা বছর,ঠিক এক বছর পূর্ণ হলো দুর্গা বিসর্জনের । মা এসেছিলেন এ পাড়ায় ঠিকই,কিন্তু কারোরই সেভাবে আর মন নেই মা’কে যত্ন করার। প্যাণ্ডেলের দেবী প্রতিমার তাই উন্মোচনের আগেই বিসর্জন হয়ে গিয়েছে।

     

Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.