x

প্রকাশিত বর্ষপূর্তি সঙ্কলন

দেখতে-দেখতে ১০ বছর! শব্দের মিছিলের বর্ষপূর্তি সংকলন প্রকাশের সময় এ খুব অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু অজস্র লেখক, পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থনে আমরা অনায়াসেই পেরিয়ে এসেছি এই দশটি বছর, উপস্থিত হয়েছি এই ৯৫ তম সংকলনে।

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

নাসির ওয়াদেন

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৭ | |
# জনজীবনের চিরাচরিত ঐতিহ্যিক নিয়ম নিগূঢ়ে আবদ্ধ উৎসব #
বাঙালির জনজীবনে উৎসব এক অপরিহার্য অঙ্গ। কবিতা যেমন হাজার বছরের, তেমনি বাঙালির উৎসবও হাজার বছর অতিক্রান্ত। "বারো মাসে তেরো পার্বণ " বলে একটা প্রবাদ আছে, তাই জাতে বাঙালি, তেমনি উৎসবে মাতোয়ারা । মানুষের জীবনের ক্লান্তি, হতাশা, দুঃখ, যন্ত্রণা পরাশ্রয়ী উদ্ভিদের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে, তেমনি কর্মজীবী, পরিশ্রমী বাঙালি জাতিও শোক যন্ত্রণা ভুলে হৈ-হুল্লোড়ে আত্মসমর্পণের ভেতর দিয়ে আনন্দ ও তৃপ্তি খুশির মধ্য দিয়ে জীবনকে জগত কেন্দ্রিকতার হাত থেকে সাময়িক উত্তেজনার মধ্যে নতুনত্বের স্বাদ গ্রহণে প্রবৃত্ত হয়। জীবনের অঙ্গ হিসেবে, সামাজিক ক্রিয়াকলাপ হিসেবে, উৎসুকের আধিক্য,লালিত্য,রসাস্বাদনের অঙ্গ হিসেবে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা বিদ্যমান। বিশ্ব প্রকৃতির বিভিন্ন ঋতুর মধ্যে বৈচিত্র্যের ধারা আবহমান প্রবাহিত। মানুষ শুধুই নিজের জন্য বাঁচে না, সমাজের অন্যান্য খণ্ডিত খণ্ডিত অংশকে সাযুজ্য করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে তারা উৎসবে সামিল হয়। আত্মীয় পরিজন, স্বার্থ, নিঃস্বার্থ,ধনী -দরিদ্র, সোনার চামচ যাদের ঠোঁটে, তাদের সাথে পথের শিশুদের মনেও উৎসবের কয়েকটা দিন যেন একাত্ম হয়ে ওঠে। পার্থিব জগতের দেনাপাওনা, ভালমন্দ,লঘুগুরু, মানদণ্ডকে সাময়িক ভুলে যেতে চায়--এগিয়ে আসে সম্মিলিত মনের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস। উৎসব একপ্রকার "A joyful of honorific celebrity."

পাশ্চাত্য দেশের বিভিন্ন মণিষীদের বক্তব্য থেকে স্পষ্টতর হয়ে আসছে যে, বাঙালি জাতি কর্মহীন, উৎসব প্রিয়। সভ্যতার অগ্রগতির সাথে গতিশীল হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ভিন্ন ধারণা আজও প্রবহমান। এখনও পাশ্চাত্য সভ্যতার সাথে সাযুজ্য ঘটাতে পারছে না,ফলে তারা নিজেরাই নিয়ত পিছিয়ে যাচ্ছে। শুধু বাঙালি জাতির মধ্যেই উৎসব প্রবণতার প্রাধান্য বেশি এটা যেমন আংশিক সত্য, তেমনি বিভিন্ন জাতির মধ্যেও তাদের নিয়ম নীতি, কর্ম পদ্ধতি ও উৎসবের বৈচিত্র্যও নানান ভেদে প্রকাশমান ••••

মিলনের উদ্দেশ্য আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে, সাময়িক আনন্দঘন মুহূর্তে গা ভাসিয়ে দিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে সোহাগের সংস্কৃতির যৌবন ঢেউয়ের ভেতর দেহ অবগাহন করার মধ্যদিয়ে বাঙালি জাতি আজও ঐশ্বর্যে উজ্জ্বলিত।

বিশেষ করে, জাতিগত ইতিহাসকে দেখি, বিভিন্ন গোষ্ঠী তাদের আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধবদের একত্রীকরণের মধ্যদিয়ে মূলতঃ ধর্ম কেন্দ্রিক সম্প্রদায়গত অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে । সেই অনুষ্ঠান ব্যক্তিক বা পারিবারিকতন্ত্রকে উৎখাত করে সর্বজনীন রূপ পায়। সম্প্রদায়গত আভ্যন্তরীণ রীতি নীতি যা তাদের জীবন যাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং পথ চলতে সাহায্য করে । সেই, আচার, অনুষ্ঠান ধর্মীয় বাতাবরণ উপছিয়ে বন্যার স্রোতের মতো পথঘাট ঘরবাড়ি, গাছপালা ইত্যাদি ভেঙেচুরে সংস্কৃতির নতুন পথের জয় ডঙ্কা বাজাতে শুরু করে । চেতনা সমৃদ্ধ জাতি কেন্দ্রিকতার বিন্দু থেকে উত্থিত হয়ে শব্দানুরণের মতো পরিধি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার মতো জীবনের মুক্ত গণ্ডিতে বিচ্ছুরিত হয়।

উৎসবের কতকগুলি শর্ত দেখতে পাই, তারমধ্যে সবচেয়ে যেটিকে আমরা সমধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকি তা হচ্ছে, অহঃ কেন্দ্রিকতার উদ্খালন করে আমিত্বের পরিবর্জন ঘটানো , শব্দের অনুরণের মতো ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক ক্ষেত্রে ।একান্ত গণ্ডী থেকে নিজের মুক্তির ভেতর থেকে বহুত্ববাদীর সংযমী মোহনায় মিশেল ঘটিয়ে মহাসাগরে প্রবেশ করে । এক আনন্দঘন মুক্তির সোপান থেকে ধাপে ধাপে অন্তর্লীন ,অন্তহীন সুখের দিকে ধাবিত হয়।

ভারতীয় সভ্যতার ক্রমবিকাশের ইতিহাসে,আমরা দেখি যে, বৈচিত্র্যময় এ দেশ। বহুত্ববাদীদের আশ্রয়স্থল। হাজার বছরের চিরাচরিত ঐতিহ্য, ধর্মীয় সংস্কার,বি-সংস্কার,অপসংস্কৃতি, বিমিশ্রিত হয়ে আছে,যার মধ্যে থেকেও চিরন্তনী রূপ, জৌলুস, গরিমা বহন করে চলেছে। বহু শ্রেণি বিভক্ত সমাজ, বিভিন্ন ভাষার প্রতিবন্ধকতা, ভৌগলিক অসমতা,বিভিন্ন ধর্মীয় ভাবনা, বিচিত্র রীতিনীতি প্রগাঢ় রূপে জমে আছে। তথাপিও বিচিত্র ধ্যানধারণা, পোশাক আশাক, রুচিবোধ, চিন্তা চেতনার ফারাক থাকা সত্ত্বেও বাঙালি তথা ভারতীয়দের নানা উৎসবের সূচনা করে আত্মনিবেদনে নিমগ্ন হয়ে, মুক্তির কল্পনার রূপধারণে অবগাহন করে, যন্ত্রণার আগুনে বারি সিঞ্চনের মাধ্যমে আনন্দে মেতে ওঠে । তখনই জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ভাষা -বিভাষার বৈচিত্র্য সত্বেও এক ভারতীয় চেতনা,ভাবনায় রসসিক্ত হয়ে উৎসবে সামিল হয়।

তাইতো দেখি বাঙালির অতীব প্রিয় দুর্গোৎসবে বাঙলার বাতায়ন অতিক্রম করে বিশ্বময় হয়ে দাঁড়িয়েছে । রথযাত্রা, রাসপূর্ণিমা, লক্ষ্মীপূজা, সরস্বতী পূজা, মহ্হরম, ঈদ উৎসব, জন্মাষ্টমী, বাঁধনা পরব,খ্রিস্টমাস ডে যেমন ধর্মীয় বন্ধন অতিক্রম করে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে , তেমনি বর্ষামঙ্গল, নবান্ন, বসন্ত উৎসব, টুসু, ভাদু উৎসব, একুশের ভাষা দিবস, উনিশের বরাক শহীদ উৎসব ইত্যাদি জনজীবনে প্রভাব বিস্তার করে আছে ।

"বর্ষামঙ্গল " উৎসব প্রসঙ্গে রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর চরম উৎসাহ প্রকাশ করেছেন। ••

বর্ষার আগমনে বাঙালির কৃষিজীবনে যে, আনন্দস্রোত আন্দোলিত হতে থাকে, তার মোহমুগ্ধ ভালবাসা, আত্মবিশ্বাস, সাংবৎসরিক আহারের উপাদান বপনের সূচনা তা পাশ্চাত্যবাদীদের মনে কতখানি রেখাপাত করে জানি না --তবে 'বাঙালির হিয়া অমিয় মথিয়া 'জীবনকে সুরারোপিত করে নিঃসন্দেহে । মহাকবি কালিদাসের " আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে মেঘমাশ্লিষ্ট সানুঃ--" ছন্দ সুর বাঙালির বিশুদ্ধ চিত্তের উদ্ঘাটন ঘটায়।

উৎসবের প্রাঙ্গণে উঠে দাঁড়ালে সরাসরি বর্ণভেদের প্রাচীর আর থাকে না, ধর্মীয় প্রাচীরও উধাও হয়ে যায়। গোষ্ঠীর সংকীর্ণতাবোধ,চিন্তা চেতনার অনগ্রসর,লুপ্ত হয়ে, বিকাশমান চেতনার বিস্তার ঘটে । অর্থনৈতিক চিন্তার ফারাক ভেঙেচুরে এর সাথে ডিসকো নাচ যেখানে নারীপুরুষ,কিশোর কিশোরী, খোকাখুকি নাচতে পারে । এটাই বাঙালির চিরন্তনী বহিরঙ্গের রূপ -প্রতিভাস। বাঙালি মুসলমানের বিদেশীগত ইসলামী চর্চা ও উৎসবের নানান আকর বাঙালিত্ব পেয়ে গেছে । মহামিলনের আঙ্গিনায় একাকার হয়ে তেলে-জলে, ঝোলে অম্বলে মিলমিশ হয়ে পড়েছে। 

পরিশেষে বলা যেতেই পারে যে, বাঙালির জনজীবনে পরম্পরাগত চিরন্তনী ঐতিহ্যের বাহকরূপী উৎপাদক উৎসব আজ বিভিন্ন উপাদান সংগ্রহের দ্বারা আধারসিক্ত জাতির মেরুদন্ডে সাপোর্ট করে এগিয়ে যাচ্ছে ।যদিও এরই মধ্যে কিছু বেসুরো ধ্বনি যে বেজে ওঠে না, তা এককথায় না বলা যাবে না ।তৎসত্ত্বেও আপামর জনজীবনে যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমস্যা, খণ্ড খণ্ড গাত্র ছ্যাঁক দগদগে হলেও ঐক্যের স্বার্থে, মহামিলনের স্বার্থে, ভালবাসার স্বার্থে, দেশের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হতে তারা উৎসবে মেতে ওঠে । হিন্দু ধর্মের সংস্কৃতি কিংবা মুসলিম জাতির ধর্মীয় সংস্কৃতিই হোক,বাংলার বাস্তব জীবনের চিত্রাবলী, বাঙালি জাতিকে বড়ো হতে দেবে না, যদি না আমরা অনুধাবন করি, আমরা বাঙালি, জাতি, ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে -- আনন্দ হৈ-হুল্লোড় নয় --প্রকৃত উৎসবের যে দ্যোতনা ধ্বনিত হয়, যা জীবনের চেতনাকে বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করে। বিচ্ছিন্নতা থেকে সম্মিলনী --যোগসূত্র রচনার ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে ।কবি বলে : " বিচ্ছেদের ডগা থেকে ফের একদিন /মুছে যাওয়া মানুষ ফিরে আসে?••• /আমি এক স্মৃতি ভুক উড়ো হাঁস পাখি / আবার এসেছি ফিরে বিচ্ছেদের ডগা /ধরে ধরে। খেয়াঘাটে কুহেলি ঘনায়। "-- সেই কুহেলি ভেদ করে উৎসবের নিয়ন আলো জ্বলবে বাঙালির, ভারতীয়র,বিশ্বময় জাতির ঘরে ঘরে ।
কবি লেখে, কবিতা হয়ে ওঠে -"-এসো গ্রাম এখানেই দু-মুঠো / ভালোবাসার গন্ধ ---/ এঁকে যাওয়া ভোর ।/ বিজ্ঞাপন --থেকে অনেক দূর / ওই তো -- এখানেই লাল, নীল --/ আরো কত রঙের উৎসব ।" 

Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.