x

প্রকাশিত | ৯৪ তম মিছিল

কান টানলেই যেমন মাথা আসে, তেমন ভাষার প্রসঙ্গ এলেই মানুষের মুখের ভাষার দৈনন্দিন ব্যবহারের কথাও মনে পড়ে যায়, বিশেষত আজকের দিনে। ভাষা দিবস মানেই শুধু মাতৃভাষা নিয়ে আবেগবিহ্বল হয়ে থাকার দিন বুঝি আজ আর নেই!

কেননা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাঁরা মাথায় বসে আছেন, বিশেষত যাঁরা রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতাভােগী এবং লােভী, তাঁদের মুখের ভাষা এবং তার প্রয়ােগ আজ ঠিক কতটা শিক্ষণীয় এবং গ্রহণীয় সেটা শুধু ভাবার নয়, রীতিমতো শঙ্কার এবং সঙ্কটের।

সবই কি তবে মহৎ ভাবনা, অনুপ্রেরণার জোয়ার? নাকি রাজনৈতিক কারবারিরা 'সুভাষিত' শ্রবণাতীত বয়ানে নিজেদের অক্ষমতার মদমত্ত প্রকাশ করছেন? সাধারণ ছাপােষা মানুষ বিস্ফারিত চিত্তে এই ভাষাসন্ত্রাস,এই ভাষাধর্ষণ দেখতে শুনতে ক্লান্ত। এর থেকে উত্তরণের উপায় এখনও অবধি কোনাে ভাষা দিবস দেখাতে পারেনি। এবারের ভাষা দিবসের কাছেও কি সেই উপায় আছে? নাকি এই খেলা হবে, চলবে ... মেধাহীন গাধাদের দৌলতে?

চলুন মিছিলে 🔴

বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৭

কাজী ফয়জল নাসের

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৭ | | মিছিলে স্বাগত
অনাচার
বাপি তার পয়লা ট্রিপের প্যাসেঞ্জারকে মেডিকেলের গেটে নামিয়ে অপেক্ষা করছিল নতুন কোন প্যাসেঞ্জারের জন্যে। একজন টাই পরা সাহেব গোছের ছোকরা জানালায় মুখ গলিয়ে জানতে চাইল, 'বেহালা'? বাপি মাথা নাড়িয়ে জবাব দিল 'ভাড়া আছে'। আসলে মেট্রোর কাজের জন্যে তারাতলা পেরোলেই যা জ্যাম, ওদিকে যেতেই ইচ্ছে করে না। তাছাড়া মেডিকেলের পেশেন্ট পার্টি পেলে বেশ জমে যায়। পেশেন্ট পার্টির মন মেজাজ এমনিতেই খারাপ থাকে তাই তাদের কাছ থেকে ইচ্ছে মত খিঁচে নেওয়া যায়। আর পার্টি যদি একটু মফস্বলের হয় তবে তো সোনায় সোহাগা।

ভাবতে ভাবতেই একজন জানালায় মুখ বাড়ায়, 'যাবে নাকি ভাই?' গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, বছর চল্লিশের রোদে পোড়া চেহারা।

- 'মধ্যমগ্রাম যাবে?'

- 'মিটার খারাপ আছে...কন্ট্রাক্ট-এ যেতে হবে'- বাপির উত্তর তৈরিই ছিল।

- 'কত নেবে?'

- 'দেবেন বুঝেসুঝে'।

লোকটা একটু ইতস্তত করে ডাকল, 'ও জামাইবাবু ...এদিকে এসো।'

ডাক শুনে যে লোকটা এগিয়ে এলো তার কোলে সাদা কাপড়ে মোড়া এক শিশুর মৃতদেহ। দেখে বাপির ভিতরে খুশি ঝিলিক দিয়ে উঠল। জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলে দিল, 'বারোশো টাকা লাগবে'।

- 'সে কি ভাই? এই তো বললে বুঝেসুঝে দেবেন। তা তুমিও একটু বুঝে সুঝে চাও'। 

- 'লাশ আছে, বুঝতেই পারছেন...'

- 'একটু কমসম করে নিয়ো ভাই'।

- 'হবে না, দুপুরে খালি ফিরতে হবে...অন্য গাড়ি দেখে নিন'। বাপিও মনে মনে মুরগি মেপে নিয়েছে।

'জামাইবাবু' ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু স্বরে বলে উঠলেন,

- 'চলো শিবু। কাল রাতের আর আজ সকালের টাকাগুলো তো বেঁচেই গেল। তাছাড়া সকালে যে ওষুধ কেনার কথা ছিল, তাও তো লাগেনি। এখন আর গাড়ির জন্যে ছুটোছুটি করে কাজ নেই'।

বাপির বুকের মধ্যে খুশি চলকে ওঠে। এই না হলে মরা পেশেন্টের পার্টি।

শিবু বসল সামনে, আর বাচ্চার লাশটা পাশে শুইয়ে নিয়ে জামাইবাবু পিছনের সীটে। বাপি স্টার্ট দিল।

উল্টোডাঙা পৌঁছনোর আগেই বাপি জেনে গেল যে সাড়ে চার বছরের বাচ্চাটা মাত্র দু'দিনের জ্বরেই চলে গেল। বারাসাত স্টেট জেনারেল, আর.জি.কর পেরিয়ে মেডিকেলে জায়গা পেতে পেতে গতকাল দুপুর গড়িয়ে যায়। আর আজ ভোর রাতে ডাক্তারবাবু তার মরার খবর দেন। তবে এসব কথা বাপিকে স্পর্শ করেনা। তার কাছে এরা শুধুই খদ্দের বা আরও পরিস্কার করে বলা চলে মুরগি। অবশ্য এই কেসটা বাচ্চার বলে একটু যেন মনটা কেমন কেমন করছে। হাজার হোক, বাপির ছেলেটাও তো বছর চারেকেরই।

এয়ারপোর্ট দু'নম্বর গেটের কাছে সামান্য জ্যাম ছাড়া বেশ ভালো ভাবেই পৌঁছে গেল তারা। মধ্যমগ্রাম চৌমাথা থেকে বাঁদিকে ঘুরে সামান্য রাস্তা এগিয়ে একটা গলিতে ঢুকে বাড়ির দোরগোড়ায় থামল ট্যাক্সি। বাইরে থেকেই বাড়ির মধ্যেকার দারিদ্রের আঁচ পাওয়া যাচ্ছে। গাড়ি দেখেই শান্ত বাড়িটার ভিতর থেকে কান্নার রোল উঠল। তার মানে খবর আগেই এসে গেছে। এক মাঝবয়সী বৌ ছুটে এসে বাচ্চার লাশটাকে প্রায় ছিনিয়েই নিল বলা চলে। তারপর সেই দরজার বাইরে রাস্তার ওপরেই সাদা কাপড়ে মোড়া ছোট্ট শরীরটাকে বুকের সঙ্গে আঁকড়ে বসে পড়ল... তার কান্না যেন গ্রীষ্মের নিঝুম দুপুরের বুক চিরে বেরিয়ে আসা আর্তনাদ। আশেপাশে সকলেই তাকে সান্ত্বনা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এসব দৃশ্য বাপির গা সওয়া হয়ে গেছে। সে কেবল ভাবছে ভালোয় ভালোয় পেমেন্টটা নিয়ে ফেরার পথে প্যাসেঞ্জার পেলেই হল। কিন্তু সবাই যেভাবে ওদিকে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, কখন ছাড়া পাবে কে জানে! বাপিও ট্যাক্সি থেকে নেমে শিবু নামের লোকটাকেই খুঁজছিল। এমন সময় পিছন থেকে কে যেন কাঁধে হাত রাখল। তাকিয়ে দেখে শিবুর জামাইবাবু। তার হাতে কিছু দোমড়ান-মোচরান একশো টাকার নোট গুঁজে দিল। বাপি গুনে দেখল আটশো। 

- এটা কি দিচ্ছেন?

- ভাই এটুকু ছাড় দাও। বুঝতেই তো পারছ।

- না না...এই জন্যেই শ্লা বুঝে সুঝে প্যাসেঞ্জার নিতে হয়। পুরোপুরি বারোশো ছারুন।

লোকটা কাঁচুমাচু মুখ করে পকেট হাতরে আরও দুটো একশো টাকা আর কয়েকটা দশ টাকার নোট বের করে আনল। 

- ভাই এই মুহূর্তে যা আছে সব রাখো। সামনে আরও তো খরচ....

তাকে শেষ করতে না দিয়েই বাপির ক্রুদ্ধ স্বর,

- তো আমি কি করব! শ্লা এই ভাবে লোকের কথা ভাবতে গেলে তো আমার সংসার চলবে না দাদা...

লোকটা কাঁচুমাচু মুখ করে মাটির দিকে চেয়ে... পায়ের সস্তার প্লাস্টিকের চটি দিয়ে মাটিতে আঁচড় কাটছে। বাপি মনে মনে বলে উঠল, 'এ আবার কেমন বাপ রে! সামনে ছেলের লাশ রেখে দামাদামি করছে শ্লা'। 

লোকটা এবার তার শালা শিবুকে ডাক দিল, তারপর ফিসফিস করে কিছু বলল। শিবু তার ফতুয়ার বুক পকেট থেকে বেশ কিছু কাগজপত্র আর তার সাথে মিশে থাকা টাকা বের করে বাপির দিকে এগিয়ে এল,

- ভাই ট্যাক্সি, অন্তত একশোটা টাকা কমাও।

বাপির ক্ষোভ এবার ফেটে পড়ল,

- ধুর মশাই, আপনাদের তোলাই আমার ভুল হয়েছে। এখান থেকে খালি ফেরা মানে বোঝেন? হুজ্জুতি বন্ধ করুন আর বাকি চারশো দিয়ে আমাকে ছাড়ুন।

শিবু আর কিছু না বলে চারটে একশো টাকার নোট গুনে গুনে বের করে আনে। বাপির হাতে টাকাগুলো তুলে দিতে দিতে স্বগতোক্তির সুরে বলে ওঠে,

- এত অনাচার সইবে না রে ভাই। 

কথাটা বাপির কানে গিয়ে ধাক্কা মারল। শ্লা অভিশাপ দিচ্ছে নাকি? টাকাটা বুঝে নিয়ে আর কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে স্টার্ট দিল সে। সোজা মধ্যমগ্রাম চৌমাথা পেরিয়ে একটু এগিয়ে বাঁদিকে চায়ের দোকান দেখে দাঁড় করালো গাড়ি।

গাড়িথেকে নেমে দোকানের জগে জল নিয়ে মুখটা ধুয়ে একটা চা দিতে বলেছে সবে, অমনি দুটো ছেলে-মেয়ে হাজির, 'ট্যাক্সিটা কার?'

বাপি দোকানের সামনে রাখা বেঞ্চিতে বসেই জিগ্যেস করল, 'কোথায়?'

- নাগেরবাজার।

- চা-টা খেয়ে নিই?

- ঠিক আছে ঠিক আছে, আমরা বসছি।

বলেই ছেলেটা পিছনের দরজা খুলে মেয়েটাকে নিয়ে উঠে বসল। 

- শ্লা ঘষাঘষি করার আর তর সইছে না... মনে মনে বলে ওঠে সে। 'এত অনাচার সইবে না রে ভাই'... শিবুর কথাটা হঠাৎ কানে বেজে ওঠে... কেন কে জানে। মাছি তাড়াবার ঢঙে হাতটাকে মুখের সামনে দুবার ঘুরিয়ে তাড়াবার চেষ্টা করে শিবুর কথাগুলো। বরং ভাবে যে এই ভাড়াটা মেরে দিয়ে সোজা বাড়ি ফিরে আজ একসাথে খাওয়া দাওয়া করলে হয়। ছেলেটা আইসক্রিম ভালোবাসে, ফেরার পথে কিনে ফিরবে...আজ পকেটও বেশ গরম।

চায়ের দাম মিটিয়ে একটা সিল্ক-কাট ঠোঁটে নিয়ে স্টিয়ারিং ধরে আবার। সামনের আয়নাটাকে ঠিকঠাক সাইজ করে নিয়ে টিন-এজ দুই ছেলেমেয়ের ঘনিষ্টতা দেখতে দেখতে এগোতে থাকে। কিন্তু মাঝে মাঝেই মনে পড়ে যায় 'এত অনাচার সইবে না রে ভাই'... আনমনা হয়ে পড়ে বাপি।

নাগেরবাজারে ওদের নামিয়ে দিয়ে সোজা শ্যামবাজারের দিকে এগিয়ে চলে সে। খালপাড় দিয়ে গাড়ি বস্তির দিকে ঢোকানোর আগে একটা এক লিটারের বার আইসক্রিম কিনে নেয়। দাম দিতে দিতে ভাবে, কিসের অনাচার? যার যেমন সুযোগ, সেই তো কোপ মারে। শ্লা গাড়ির কাজ করাতে গেলে অখিলের গ্যারেজে একটা নয়া-পয়সা কম করে না...আর শ্লা আমি করলেই অনাচার? বেশ করেছি শ্লা...করেছি বলেই না ছেলেটার জন্যে একটা আইসক্রিম কিনতে পারছি।

বস্তির মুখটাতে এসে গাড়িটা সাইড করে দেয় মিন্টুর দোকানের পাশে। আজ সব দোকানগুলো এত তাড়াতাড়ি বন্ধ করে দিয়েছে কেন কে জানে। বেশ কিছু লোকজনের ভিড় মনে হচ্ছে তাদের গলিতে ঢোকার মুখে! বাপির বুকের মধ্যেটা কি যেন এক অজানা আশঙ্কায় ধুকপুক করে ওঠে... 'এত অনাচার সইবে না রে ভাই'...। দুজন মহিলা তার পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যায়। তাদের আলোচনা শুনে মনে হল গলিপাড়ার কোন এক বাচ্চা পুকুরে ডুবে মরেছে। বাপির পা জড়িয়ে আসে। আইসক্রিম ধরা হাতটা যেন অবশ হয়ে গেছে। ভিড়ের মাথাগুলোর ফাঁক দিয়ে খোঁজার চেষ্টা করে নিজের ঘরের দরজাটা... খোঁজার চেষ্টা করে তার চার বছরের নীলুকে...মানুষের ভিড়ে একচুল এগোতে পারে না সে। প্রত্যেকটা মানুষ যেন হাতে হাত ধরে তাকে ব্যারিকেড করে আটকাতে ব্যাস্ত। প্রত্যেকেই যেন গুন গুন করে বলে চলেছে,....' এত অনাচার সইবে না রে ভাই'...'এত অনাচার সইবে না রে ভাই'... ভিড়ের মধ্যে কথাগুলো প্রতিধ্বনিত হয়ে বাপির মাথার মধ্যে যেন হাতুড়ির ঘা মারতে থাকে। বাপি আর এগোনোর সাহস পায় না....হাতের আইসক্রিম গলতে থাকে...গলতেই থাকে...



Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.