x

প্রকাশিত বর্ষপূর্তি সঙ্কলন

দেখতে-দেখতে ১০ বছর! শব্দের মিছিলের বর্ষপূর্তি সংকলন প্রকাশের সময় এ খুব অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু অজস্র লেখক, পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থনে আমরা অনায়াসেই পেরিয়ে এসেছি এই দশটি বছর, উপস্থিত হয়েছি এই ৯৫ তম সংকলনে।

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

তপশ্রী পাল

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৭ |
খুঁজি তারে আমি আপনায়
সাড়ে ছটা বাজতেই ঘন ঘন ঘড়ি দেখতে লাগলো শ্রীতমা। ক্লায়েন্ট কল আছে একটা ... ইউ এস টাইম আটটায়। কিন্তু না, আর অপেক্ষা করতে পারবে না সে। বাড়ি থেকেই কল নেবে। বাড়িতে অপেক্ষা করছে তার পুঁচকে টিনটিন। সন্ধের সময়টা ওর , শুধুই ওর। কচি মুখটা দেখার জন্য মনটা ছটফট করে উঠলো শ্রীতমার। চটপট ল্যাপটপ বন্ধ করে ব্যাগ এ পুরে ,নিচে নেমে গাড়িতে উঠলো শ্রীতমা। সেক্টর ফাইভ থেকে দক্ষিণ কলকাতায় ওর ফ্লাট এ পৌঁছতে আজকাল হাফ ধরে যায়, রাস্তায় এতো জ্যাম। গাড়িতে এফ এম চালিয়ে দিতে বললো ড্রাইভার কে। হঠাৎ বসএর কল ! "শ্রীতমা তোমার সন্ধের কল ছিল না ? তুমি বেরিয়ে গেছো !" "স্যার, বাড়ি থেকে কল জয়েন করবো। " কোনোরকমে বলে শ্রীতমা। "তোমাদের এই ডিসটেন্স কল গুলোতে কোনো লাভ হয় না। তুমি এক জায়গায় আর প্রজেক্ট টীম অফিস এ ! তুমি না লিডার ! তোমার ওপর কিন্তু প্রজেক্ট এর সাকসেস নির্ভর করছে। আমি কোনো ক্লায়েন্ট কমপ্লেইন পেতে চাই না। " গমগম করে ওঠে মিস্টার বকশির গলা ! "না স্যার, আমি সব ম্যানেজ করে নেবো। সন্ধেবেলা টিনটিন খুব ঝামেলা করে স্যার !" বললো শ্রীতমা। ওর কাজের সুনামের জন্য মিস্টার বকশি ভালোবাসেন ওকে। তাই আর কিছু বললেন না। 

সাড়ে সাতটা নাগাদ দরজায় বেল বাজতেই দরজা খুললো আয়া রিনা। আর তার পিছনে ছুটে এসেছে টিনটিন ! "মা চলো, পড়তে বসি " ও জানে মায়ের সঙ্গে সব আদর, আবদার, গল্পের সময় হলো এই সন্ধেবেলা, যখন মা ওকে নিয়ে পড়তে বসায় ! ছোট শিশু ঠিক বুঝতে পারে কি বললে মা খুশি হবে। ক্লাস টু এর ছোট্ট টিনটিন। কোলে তুলে নিলো ওকে শ্রীতমা। ছোট্ট লাল গেঞ্জি আর হলুদ প্যান্ট পরে পুতুলের মতো টিনটিন ওকে চুমু খেলো। ওর গায়ের পাউডার মেশানো বুনো বুনো গন্ধটা কি যে ভালো লাগলো শ্রীতমার ! খুব একচোট চটকে নিলো ওকে। তারপর হাতমুখ ধুয়ে বসে গেলো। প্রথম আধ ঘন্টা তো স্কুল এর গল্প করেই কাটিয়ে দিলো টিনটিন। কাল ওর ইংলিশ এসেসমেন্ট। আন্টি আলমানাক এ লিখে দিয়েছেন।

ঠিক আটটায় কল নিতে চলে গেলো শ্রীতমা, টিনটিন কে ইংলিশ প্রোজ পড়তে দিয়ে। পাশের ঘরে দরজা বন্ধ করে কল নেয় শ্রীতমা। এইবার শৈবালেরও ফেরার সময় হলো ! টিনটিন খানিক্ষন বাবার সঙ্গে দৌড়োদৌড়ি খুনসুটি করবে, ডিনার করবে, নিত্য কর্ম শেষ করবে। তারপর আয়া চলে যাবে। ততক্ষনে শ্রীতমার কল শেষ হবে। 

আজ কল শেষ হতে প্রায় সাড়ে ন টা বাজলো। ইউ এস ক্লায়েন্ট এর তো অফিস টাইম। তার ভারতীয় সময়ের কোনো খেয়াল নেই। অন্যের যে পার্সোনাল টাইম সে খেয়াল ও নেই। কিন্তু ডলার আয় করতে গেলে আর কোনো উপায় নেই। এভাবেই চলছে ভারতীয় তথ্য প্রযুক্তি সংস্থা গুলো। শ্রীতমা বেরিয়ে দেখে শৈবাল তখন আসে নি। আয়া চলে গেছে আর মন দিয়ে ইংরেজি বই খুলে বসে আছে টিনটিন তার জন্য অধীর অপেক্ষায়। গল্পের চেয়ে ছবি দেখতেই বেশি মন টিনটিনের। আবার খাটে এসে ওর পাশে বসে শ্রীতমা। টিনটিন রিডিং পড়ছে আর একটু করে তার মানে বুঝিয়ে দিচ্ছে শ্রীতমা। গল্পটা একটা বাচ্চা ছেলে আর তার মায়ের। মায়ের আবার বাচ্চা হবে। ছেলের তা নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। তার বেবি সিস্টার আসছে ! একটা ছবিতে আসন্ন প্রসবা মায়ের পেটে হাত রেখে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে ছেলেটি। হঠাৎ টিনটিন জিজ্ঞাসা করে উঠলো "মা , বেবি রা তার মায়ের পেটে থাকে ?" শ্রীতমা বললো "হ্যাঁ টিনটিন, নাইন মন্থ থেকে তারপর বের হয়। " টিনটিন বললো "আমিও ছিলাম মা ? তোমার পেটে !" হঠাৎ থমকে যায় শ্রীতমা। হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে ওর। কি বলবো সে ! ছোট্ট টিনটিন কে সে নিয়ে এসে ছিল মিশনারিজ অফ চ্যারিটি থেকে। কিচ্ছু বোঝার বয়স হয় নি তখন ওর।

একেবারে শ্রীতমা আর শৈবালের সঙ্গে মিশে গিয়ে বড়ো হয়েছে টিনটিন। মা বাবা অন্তপ্রাণ। কোনোদিন কিছু বলার প্রশ্নই আসে না এই শিশু কে। তার সন্তান টিনটিন কে। সে তো ওর ই ছেলে। কিন্তু গত মাসে মিশনারি থেকে ডেকে পাঠিয়েছিল ওদের, সঙ্গে টিনটিন কে। কেমন ভাবে সে মানুষ হচ্ছে তা দেখার জন্য। গেছিলো শ্রীতমা আর শৈবাল, কিন্তু টিনটিন কে নিয়ে যায় নি। ওই পরিবেশে গিয়ে টিনটিন যদি গাদা গাদা প্রশ্ন করে ! কি উত্তর দেবে? যদি সিস্টার রা ওকে কিছু বলেন ও কি তা নিতে পারবে? ওখানে টিনটিনের ছবি দেখিয়েছিল ওরা। সিস্টার বললেন "আপনারা ওকে জানান নি যে ও এখারকার ছেলে ?" "না" শুকনো মুখে বলেছিলো শ্রীতমা। "তবে কি বলেছেন যে ও আপনাদের নিজের ছেলে ! জানেন বড়ো হয়ে জানলে ওর কত শক লাগবে ! যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওকে বলে দিন, নইলে আমরাই আপনার বাড়ি গিয়ে বলে আসবো। " ভয়ে ভয়ে ফিরে এসেছিলো তারা।

কিন্তু প্রাণে ধরে ঐটুকু বাচ্চাকে কিছুই বলতে পারে নি। ওর ওই বিশ্বাস, ওই আনন্দ, ওই হাসি কি করে কেড়ে নেবে ওরা ! কিন্তু আজ শ্রীতমার মুখ আটকে গেলো। এই তো সুযোগ। যদি আজ মিথ্যে কথা বলে , কচি শিশু সরল বিশ্বাসে তা মেনে নেবে। আর কোনো দিন আসল কথা বললে সে মিথ্যেবাদী হয়ে যাবে। তাকে আর বিশ্বাস করবে না শিশু। কিন্তু সে তো জানে না এর ফল ! শৈবালটাও আজকে দেরি করছে ! কি যে করে এখন এক শ্রীতমা ! সাহস সঞ্চয় করে কোলের কাছে টেনে নেয় টিনটিন কে। বলে "তুই আমার পেটে নয়, আমার বুকের মধ্যে ছিলি বাবা ! দু ভাবে বেবি রা জন্মায়। অনেকে মায়ের পেটে থাকে , আর কোনো কোনো বেবি যাদের মা বাবা ছোট্ট বেলা মারা যায়, তাদের কুড়িয়ে এনে রাখে সিস্টার রা। তারপর যে সব মায়ের বেবি থাকে না তাদের দিয়ে দেয় ! তারপর সেই সব বেবি রা নতুন মা পায় আর তার বুকের মধ্যে থাকে। নতুন মা বাবা তাকে অনেক অনেক ভালোবাসা দিয়ে বড়ো করে। " টিনটিন গোলগোল চোখে তাকিয়ে থাকে। "আমার মা মরে গেছিলো ?" শ্রীতমা বলে "আমি জানি না বাবা ! আমি তোমাকে সিস্টারদের কাছে পেয়েছি। তারপর আমার বুকে করে মানুষ করেছি তোমাকে। " "মা তোমার বেবি হলো না কেন ?" প্রশ্ন করে এবার টিনটিন। শ্রীতমা কি বলবে এই শিশু কে ? কি উত্তর দেবে এই সরল প্রশ্নের ? জানে না শ্রীতমা। কি চলছে ওর ছোট মনে? শ্রীতমা বলে "তোমাকে বড়ো হলে সব বলবো বাবা। এখন পড়ো - কাল পরীক্ষা না?" আনমনে পরে চলে ছোট্ট টিনটিন। শ্রীতমা জানে এই কঠিন দ্বন্দ্বের সমাধান। আজ এই মুহূর্তে সে কি হারালো তার টিনটিন কে না কি সত্য দিয়ে আরো আপন করে জয় করে নিলো তাকে ? সময়ই বলবে। সে কি মা ভাববে তাকে নাকি তার মধ্যে খুঁজে বেড়াবে তার নিজের মাকে। রাতে শৈবালকে বললে সে কি এর দায়িত্ব নেবে? জানে না জানে না শ্রীতমা। কাল থেকে আবার অফিস আবার প্রজেক্ট কোথায় সময় বসে ভাবার !


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.