x

প্রকাশিত বর্ষপূর্তি সঙ্কলন

দেখতে-দেখতে ১০ বছর! শব্দের মিছিলের বর্ষপূর্তি সংকলন প্রকাশের সময় এ খুব অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু অজস্র লেখক, পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থনে আমরা অনায়াসেই পেরিয়ে এসেছি এই দশটি বছর, উপস্থিত হয়েছি এই ৯৫ তম সংকলনে।

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৭

সুমন সেন

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৭ | | মিছিলে স্বাগত
 নেমেসিস্‌
সে’দিন বিকেলে বাড়িতেই বসেছিলাম। শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছিল। ইচ্ছা ছিলঃ একটু হাঁটা-হাঁটি করতে বেরোব! কিন্তু শরীর সায় না দেওয়াতে – মনমরা হয়ে বাড়িতেই বসে রইলাম। হঠাৎ ই এক আগন্তুকের আবির্ভাব হ’ল। দরজা খুলতেই দেখিঃ একজন সাতাশ-আঠাশ বছর বয়সী যুবক। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “দাদা একটা বিড়ি হ’বে?”

প্রশ্ন শুনে একটু অবাক হ’লাম! আমি যে বিড়ি অথবা সেই জাতীয় কিছু খাইনা সেটা আমাদের পাড়ার সকলেরই জানা। অথচ কোত্থেকে যে ইনি খবর পেলেনঃ আমার কাছে বিড়ি পাওয়া যেতে পারে, কে জানে?!

আমি বললাম, “বিড়ি তো নেই! তবে গরম গরম চা দিতে পারি। চলবে?”

ভদ্রলোক আনন্দের সহিত বললেন, “দৌড়াবে!”

আমি ফ্লাস্ক থেকে চা ঢালতে ঢালতে – ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেল। একটা মোমবাতি জ্বালব, কিন্তু দেশলাইটা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছি না। ভদ্রলোক নিজের পকেট থেকে একটা লাইটার বের করে আমাকে দিলেন, কাজ চালানোর জন্য।

চা খেতে খেতে দু’জনের মধ্যে আলাপ হ’ল। ভদ্রলোক যেই জানতে পারলেন - আমি ভূতের গল্প করতে ভালোবাসি, অমনি আমায় বললেন, “আমি একটা গল্প বলব, শুনবেন নাকি?”

আমি বললাম, “নিশ্চই শুনব! গল্প শুনতে তো আমি ভালোই বাসি! তাও যদি আবার ভূতের গল্প হয়…!” 

উনি শুরু করলেন- 

চারবছর আগের কথা। সে’বার শীতে খুব ঠান্ডা পড়ল। তাপমাত্রা ১২ ডিগ্রি সেলসিয়স-এর নীচে নেমে গেল। এমনই একটা রাতে অফিস থেকে ফিরছি। ঘড়িতে তখন সাড়ে-দশটা বাজে। কি ভাবছিলাম জানি না। শিবতলার মোড়টা ঘুরতেই একটা খচ্‌-মচ্‌ শব্দে আমার আনমনাটা একেবারে ভেঙ্গে গেল। ‘চোর-ডাকাত নাকি!’ আমার হাতে সাইকেলের দুটো হাতল ছাড়া আর কিছুই নেই। আজই সবেমাত্র মাইনেটা পেলাম। চোর-ডাকাতে ধরলেই আমার সর্বস্ব যাবে! কিন্তু ভয়ের তেমন আর কোনো কারণ ঘটল না দেখে - সাইকেল চালনায় মনোনিবেশ করলাম।

কিছুদূর এগোতেই আবার একই রকম আওয়াজ। এইবার বুকের ভিতরটা ধুক্‌পুক্‌ করতে শুরু করল। বাধ্য হয়ে সাইকেলের গতি দিলাম বাড়িয়ে। দিশেহারা ভাবে সাইকেল চালাতে গিয়ে একটা পাথরে - সামনের চাকা ধাক্কা লেগে ছিট্‌কে পড়লাম সাইকেল থেকে। জ্ঞান হারালাম।

কতক্ষন ও’ভাবে পড়ে ছিলাম জানি না। যখন চোখ খুললাম তখন দেখলামঃ আমার সামনে গোটা কতক্‌ কুকুর, লাইন ধরে বসে আছে আমারই দিকে তাকিয়ে। পাশে দেখলামঃ একটা জায়গায় আগুন জ্বলছে। কেই বা সেটা জ্বালালো - তখন এক মূহুর্তের জন্যও আমার মাথায় এল না। কিছুদূরে তাকিয়ে দেখলামঃ আমার সাইকেলটা একপাশে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে। চোখ ফিরিয়ে আবার কুকুরগুলির দিকে তাকালাম। আশ্চর্য! তারা একইভাবে এখনও আমার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। আমি ওঠার চেষ্টা করলাম। মাথাটা ঝিম্‌ঝিম্‌ করছে। দু হাতের কনুই আর ডান পা-টার কিছুটা অংশ ছড়ে গিয়েছে। হাঁটা শুরু করলাম। কুকুরগুলিও আমার সাথে পিছু নিল। এবার ভয় করতে শুরু করলঃ ‘এরা কামড়াবে নাতো!’ একবার ঘুরে দাঁড়ালাম। তাড়াও করলাম। কিন্তু আশ্চর্য! কুকুরগুলোর তাতে কোনরকম ভ্রুক্ষেপ নেই। তারা একইভাবে চুপচাপ আমার দিকে তাকিয়ে রইল।

হঠাৎ  একটি কুকুরের চোখের দিকে তাকিয়ে - আমায় মাথায় যেন বিদ্যুত্‌ তরঙ্গ খেলে গেল। ঠিক এইরকমই দেখতে একটা কুকুর গত বছর ঠিক একই ভাবে করুণ চোখে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে, মারা যাবার ঠিক আগের মূহুর্তে।

সে’বার একটি এলাকায় কুকুরের উৎপাত প্রচন্ড পরিমাণে বেড়ে যা’বার ফলে - মিউনিসিপ্যালিটি থেকে আমাকে কুকুর ধরার গাড়ি দিয়ে পাঠানো হ’ল। সাধারনত, কুকুরের সংখ্যা বেশী হয়ে গেলে - তাদের বিষযুক্ত রসগোল্লা খাইয়ে মেরে ফেলা হয় এবং তাদের নিয়ে ভাগাড়ে ফেলে দেওয়া হয়। আমি এলাকায় পৌঁছে দেখলাম প্রচুর সংখ্যক কুকুর পাড়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আমি আমাদের স্বাভাবিক পন্থাই অবলম্বন করলাম। প্রতিটি কুকুরের সামনে একটি একটি করে বিষাক্ত রসগোল্লা ফেলতে থাকলাম। এরই মধ্যে একটি সাদা-কালো ছোপ-ছোপ কুকুর এসে একটি রসগোল্লা তুলল এবং গিলে ফেলল। কিছুক্ষনের মধ্যেই সে বুঝতে পারল যে- সে কি অঘটন ঘটিয়ে ফেলেছে! সে করুন চোখে আমার দিকে তাকিয়েই শেষ বারের মত মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

ঘটনাটা হয়তো অন্যান্য বারের মতই ভুলে যেতাম, কিন্তু তার পরের ঘটনাটা দেখা মাত্রই আমার মত কঠোর হৃদয় মানুষের চোখ থেকেও জল বেড়িয়ে পড়েছিল। তাই ঘটনাটা আমার মনে চিরতরে গেঁথে গিয়েছে।

আমি দেখলাম কোথা থেকে একটি বাচ্চা কুকুর এসে লুটিয়ে পড়া কুকুরটির স্তনবৃন্তে মুখ লাগিয়ে চুষতে শুরু করল। সেই চরম মূহুর্তে আমি বুঝতে পারলাম যে- আমি কি অন্যায় করে ফেলেছি! এক দুগ্ধপোষ্য শাবক-কে তার মায়ের থেকে চিরতরে আলাদা করে দিয়েছি!

আর আজ প্রায় এক বছর পর, ঠিক একই রকমের সাদা-কালো ছোপের কুকুর এবং তার চোখের করুণ দৃষ্টি - আমার পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন করিয়ে দিল।

হঠাৎ আবার চম্‌কে উঠলাম – একি! এতো সেই কুকুরটার মতন নয়, সেই কুকুরটাই! ওইতো... তার বাচ্চাটি পাশ থেকে বেড়িয়ে আসছে! তবে কি...? তবে কি এরা সেই কুকুর গুলোর আত্মা?! এইতো এখানে মোট সাতটা কুকুর আছে! আমিতো সে’বার গোটা ছয়-সাতটা কুকুরকেই বিষাক্ত রসগোল্লা খাইয়েছিলাম।

এরা কি আজ এক বছর পর আমার উপর প্রতিশোধ নিতে এসেছে? কই... তবে এরাতো আমাকে কামড়াচ্ছে না? আমাকে ছিঁড়ে কুটিকুটি করে খেয়ে ফেলছে না? উফঃ আমি আর ভাবতে পারলাম না! প্রচন্ড জোরে দৌড় লাগালাম সাইকেলটার দিকে। গায়ের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে দিলাম - সাইকেলের প্যাডেল দুটির উপর। পিছনে তাকিয়ে দেখলাম কুকুরগুলি তখনও আমার পিছু করে চলেছে। যখন সামনে তাকালাম তখন দেখলাম আমার সাইকেলের সামনের চাকা - রমেন সরকারের পঁচা ডোবার ভিতর, এবং সাইকেল সমেত আমি ধীরে ধীরে ডোবার পাঁকে তলিয়ে যাচ্ছি। আর উঠতে পারলাম না। রাস্তার মোড় যে কখন শেষ হয়ে গেল আর আমি পঁচা ডোবার পাঁকে এসে পড়লাম তা বুঝে ওঠার সময়ও পেলাম না। সম্পূর্ণ ডুবে যাওয়ার আগে রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখলামঃ কুকুরের দল ধুলো হয়ে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে।”

আগন্তুক, গল্প শেষ করেই আমাকে বললেন, “আমাকে এক্ষণই একটা জায়গায় যেতে হ’বে। আমি আসছি। নমষ্কার!” 

গল্পের প্রতি আমার অভিমত - না জেনেই, হন্‌হন্‌ করে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলেন তিনি।

হঠাৎ  আমার নজরে পড়ল আগন্তুক তার লাইটার-টা টেবিলে ফেলে রেখেই চলে গেছেন। আমি তাড়াতাড়ি সেটা নিয়ে বাইরে বেড়োতে যাব, এমন সময় আমার পায়ে ঠেকল একরাশ কাদা। তাড়াহুড়ো করে আমি বাইরে বেড়িয়ে আগন্তুককে অনেক খোঁজার চেষ্টা করলাম। কিন্তু পেলাম না। ঘরের ভিতরে এসে দেখলাম, আগন্তুক যেই পথ ধরে বেরিয়েছেন - সেই পথে কাদা দিয়ে গোটা কতক্‌ পদচিহ্ন আঁকা হয়ে রয়েছে।



Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.