x

প্রকাশিত বর্ষপূর্তি সঙ্কলন

দেখতে-দেখতে ১০ বছর! শব্দের মিছিলের বর্ষপূর্তি সংকলন প্রকাশের সময় এ খুব অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু অজস্র লেখক, পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থনে আমরা অনায়াসেই পেরিয়ে এসেছি এই দশটি বছর, উপস্থিত হয়েছি এই ৯৫ তম সংকলনে।

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

বৃহস্পতিবার, আগস্ট ৩১, ২০১৭

সুপ্রিয় গঙ্গোপাধ্যায়

sobdermichil | আগস্ট ৩১, ২০১৭ | | | মিছিলে স্বাগত
সুকান্তের প্রিয়তমাসু  ঃ  বাতিওয়ালার আত্মকথা
"এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি —
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।"

     ‘ছাড়পত্র’ কবিতার ত্রই দুই চরণের মধ্য দিয়ে কবি সুকান্তের সাথে প্রথম পরিচয়, প্রথম ভালোলাগা, হয়তোবা প্রথম দৃপ্ত এক যুব-মানসকে নিজের বুকের কোলাজে স্থাপন করা ৷ বিংশ শতাব্দীতে কবি নজরুলের নিপীড়নকারীদের বিরুদ্ধে সাম্যবাদী সুর, সুভাষের মার্কসীয় বীক্ষনবাদ, কিংবা বিষ্ণু দে’র ঐতিহ্য অনুসরনে প্রগতিশীল কবিতাধারা হয়তো গান হয়ে মনের তারে টান দেয় ৷ কিন্তু সুকান্তের দৃঢ় অঙ্গীকারবদ্ধ বাচনভঙ্গি যেন গান নয় , সংকল্পরূপ মন্ত্র হয়ে হৃল্লিখিত হয়, স্পন্দিত হয় ; যা কবিতার সীমাবদ্ধ একরৈখিক বাউন্ডারি টপকে পৌঁছাতে পারে শাশ্বত গন্ডিহীনতায় ৷ ‘ঘুম নেই’ কবি সুকান্তের অন্যতম শ্রেষ্ট একটি কাব্যগ্রন্হ ( প্রকাশকাল ১৯৫০ সাল, কবির মৃত্যুর পর) ৷ উল্লেখ্য কাব্যগ্রন্হের ‘ প্রিয়তমাসু ‘ কবিতাটি এক্ষেত্রে স্মরণে আনা যেতে পারে ৷ 

দশটি স্তবকে লেখা কবিতাটিতে কবি ফুল আর কাঁটা’কে যেন পাশাপাশি রেখে সেই যুগের বিভীষিকাময় বিদ্রোহের মধ্যে আজন্মলালিত প্রেমের প্রতিচ্ছবিকে স্পষ্ট করেছেন ৷ প্রথম স্তবকে কবি জানিয়ে দেন —

     “ অনেক রক্তাক্ত পথ অতিক্রম করে 
     আজ এখানে এসে থমকে দাঁড়িয়েছি —
     স্বদেশের সীমানায় ৷”

স্পষ্ট হয় পরাধীন দেশের স্বাধীনতা সন্ধানী লড়াকু চাতক আজ ধূসর তিউনিসিয়া থেকে স্নিগ্ধ ইতালি ; ফ্রান্স থেকে প্রতিবেশী বার্মাতেও নিজের জীবন বলিদান দিতে ব্যস্ত ৷ বসন্তাগত পড়ুয়া — কলমবাজ যুবক হাতে দুর্জয় রাইফেল , গায়ে সৈনিকের কড়া পোশাক চাপিয়ে অনায়াসে স্বীকার করেন — "রক্তে রক্তে তরঙ্গিত জয়ের আর শক্তির  দুর্বহ দম্ভ, / আজ এখন সীমান্তের প্রহরী আমি"।

লক্ষ করুন, সুকান্তের কবিতায় রয়েছে যুগযন্ত্রণা, কিন্তু অদ্ভুতভাবে নেই ক্লান্তি, বিষন্নতা এবং অবসন্নতা ৷ নিরাশাময় পরিস্হিতিতে সুকান্ত জ্বালিয়ে রাখতে পারেন ঋজু জনকল্লোলের রশ্মিকে ৷ আর হয়তো এটাই তার চ্যালেঞ্জ ৷ 

কবিতার অগ্রসরে স্পষ্ট হয় কবি যেন জন-নির্জনহীন পরদেশ — দ্বান্দিক মরুভূমিতে একা বিচরন করছেন ৷ তখনই  স্বদেশের হাওয়ায় নিল আকাশ ভেসে এসে "চোখের সামনে খুলে ধরেছে সবুজ চিঠি" ৷ একদিকে পরদেশের কর্তব্য এবং অন্যদিকে স্বদেশী প্রেমময়তা দুইএর দোলাচলতায় পড়েন পত্রপ্রাপক কবি ৷ তবু সবকিছু শেষ করে তিনি চলে যেতে চান নিজ দেশে প্রিয়তমার সন্নিকটে , যার জন্য যুদ্ধের ফাঁকে অবাধ্য মন ধরা দেয় ৷ হৃদয় জ্বলে ওঠে "অনুশোচনার অঙ্গারে" ৷ যৌবনের প্রারম্ভে দাঁড়িয়ে থাকা কবি যেমন পারেননি নিরবিচ্ছিন্ন কর্তব্য থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিতে, তেমনই পারেননি যুগযন্ত্রনার অগ্নিকোণে বিদ্ধ হৃদয় থেকে প্রেমের সলতেকে বিসর্জন দিতে ৷ দুর্ভিক্ষ-মড়কের মধ্যে রেখে আসা এই ‘প্রিয়তমা’ যেন হয়ে উঠেছে বহুরৈখিক কাব্যনায়িকাঃ 

সপ্তম স্তবকে এসে কবি জানান হয়তো তার প্রতীক্ষায় আজ আর কেউ নেই ৷ তবু প্রতীক্ষায় আছে একজনই , যার ‘হৃদয় নেচে উঠবে’ কবির আবির্ভাবে ৷ তাই কবি এবার ফিরতে চান ; যেন গোলাপ ফোটাতে চান নিজ রক্তে, নিজ দেশে ৷ শুভকর্ম প্রেরণাময় কবির কবিতায় এই পর্যন্ত ফুটে ওঠে সমকালীন সমাজচেতনা এবং নিজ জীবনকে নিঙড়ে কাব্য করে তোলা ৷ কিন্তু শেষ (১০ ম) স্তবকটিতে কবি নিজেকে করে তোলেন শ্বাশ্বত দৃষ্টির রূপকার ৷ কবি মিলিয়ে দেন অতীতের গতানুগতিকতার সাথে বর্তমানের বাস্তবকে , বর্তমানের বাস্তবের সাথে ভবিষ্যতের কল্পনাময় সত্যকে ৷ কবি বলে ওঠেন — 

    “ আমি যেন সেই বাতিওয়ালা,
 যে সন্ধায় রাজপথে-পথে বাতি জ্বালিয়ে ফেরে
অথচ নিজের ঘরে নেই যার বাতি জ্বালার সামর্থ “


যাঁরা আলো দিয়ে ‘আলোকপৃথিবী’ গড়ে তোলে তারাই যেন আলোকপৃথিবী পৌঁছানোর টিকিট পাননা , থেকে যান অন্ধকূপে ৷ এই আবেদন সেদিনের নয় , যেন পূর্ব নির্ধারিত এবং অবশ্যভবিতব্য ৷ 

কবি সুকান্তের এই স্বগতঘোষনা কবিতার আবেদনকে ইউনিভার্সাল পর্যায়ে উন্নিত করে ৷ লিখন-কার্য রূপান্তরিত হয় সৃষ্টি-কার্যে ৷ ত্রক্ষেত্রে বিষয়টি স্পষ্ট ভাবে বুঝে নেওয়া যাক  ঃ—



০ সমকালিন — তৎকালীন যুদ্ধময় পরিস্থিতির ছবি এবং আত্মদ্রোহিত মন ও প্রেমিক হৃদয়ের ছবি
০ চিরকালীন— অন্তহীন কালপ্রবাহের অন্ধকারাচ্ছন্ন আলোকযাত্রীর ছবি 

আসলে সমকালিন থেকে চীরকালীন পথের অন্তহীন স্রোতেই যেন কবিতার সার্থক যাত্রা ৷ কবি সুকান্ত হয়তো তা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন , কিংবা বাস্তবে আত্মমগ্ন থেকেও সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গীকে জারি রাখতে পেরেছিলেন ৷ অল্প বয়সে যুগযন্ত্রনার কুঁজ ধারণ করে বুঝে ছিলেন - “ নিজের ঘরেই জমে থাকে দুঃসহ অন্ধকার ৷” তাই আজও হাজার হাজার অতনুরা শিক্ষার আলোকে সঙ্গী করেও শেষ পর্যন্ত আত্মঘাতী হয়ে থেকে যান মৃত্যুর অন্ধকারে ৷ 
             



Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.