x

আসন্ন সঙ্কলন

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

বৃহস্পতিবার, আগস্ট ৩১, ২০১৭

অনিন্দিতা মণ্ডল

sobdermichil | আগস্ট ৩১, ২০১৭ |
প্রাপ্তি
বিশাখা বুঝতেই পারেনা হঠাৎ করে তিন্নি এত উদ্ধত কেন হয়ে উঠছে । কি সমস্যা ওর? নাহ, আর সম্ভব নয় এভাবে ওর কথা ভেবে আর ওকে নিয়ে পড়ে থেকে নিজের অমূল্য সময় নষ্ট করা। শমীক তো মেয়ের ব্যাপারে কোনও কথা শুনতেই চায়না। ‘কেন শুধু শুধু ওকে খোঁচাও বুঝিনা! ওকে ওর মতো থাকতে দিতে পারো না? তোমার বড্ড নাক গলানো স্বভাব’। আগুনে ঘি পড়ার মত চড়বড়িয়ে ওঠে বিশাখা। ‘আরও মাথায় তোলো, আমার কি! দেখবে এরপর আর আয়ত্ত্বে রাখতেই পারছ না। শমীক গলা নামিয়ে বলে- ও বড় হচ্ছে। একটু বুঝতে শেখো। সারাক্ষণ ওরকম টিকটিক কোরো না। 

আজ সকাল থেকেই বিশাখার মাথা গরম। অফিস বেরোনোর সময় শমীক তাকে গুচ্ছের ফরমাশ করে গেছে। নেটে বসে ইলেকট্রিকের বিল, ফোনের বিল দেওয়া। গাড়িটা নিয়ে ব্যাঙ্কে যাওয়া। ক্লিনারের থেকে স্যুট এনে রাখা। একবার চার্টার্ডকে ফোন করে রিটার্নের কথা মনে করিয়ে দেওয়া। চার্টার্ড গ্রিন সিগন্যাল দিলে ফাইল টাইল গুলো হাতের কাছে, মানে শমীকের একেবারে নাকের কাছে বের করে রাখা। ইত্যাদি ইত্যাদি। আর হ্যাঁ, আজ ডিনারে ওদের কলেজের বন্ধুরা আসবে। রান্নাবান্না নিজের হাতে না করলে আবার শমীক সবার সামনেই বলবে, ইশ মাংসের কোনও টেস্ট হয়নি কেন বলো তো? এমন ন্যাকা! মানে নিজের মুখে স্বীকার করতে হবে যে ওটা ও নয়, পিয়া রান্না করেছে। সঙ্গে সঙ্গে দেবযানী, কৌশিকরা বলে উঠবে, আরে ঠিক আছে ঠিক আছে। চলে যাবে। আড্ডাটাই তো আসল। খাওয়াটা গৌণ। তখনও শমীক বলবে, কিন্তু আমি যে ভালো রান্না ছাড়া খেতে বা খাওয়াতে, কোনটাই পারিনা। এইসব সময়ে বিশাখার এত রাগ হয়! মনে হয় বলে, রান্না একদিন নিজে করলেই পারো। কিন্তু সবার সামনে ওরকম সিন ক্রিয়েট করাটাও শমীক ভালো চোখে দেখেনা। বিশাখার এত দুঃখেও হাসি পেলো। মেন্টাল ডায়ালগ শুরু হয়ে গেছে মাথার মধ্যে। মানে ডিপ্রেশন, পাগলামি। এরই মাঝে সে তিন্নির ঘরে একবার উঁকি দিয়ে দেখল তিন্নি কানের ওপরে বালিশ চাপা দিয়ে ঘরটা অনাবশ্যক ঠাণ্ডা করে হাত পা ছড়িয়ে ঘুমোচ্ছে। মেয়েটাকে আর শেখানো গেলো না। এত করে বলেছে একটু সভ্যভব্য হয়ে শুতে। কে শোনে কার কথা। বিশাখার মনে পড়ে, ছেলেবেলায় পাঁচ ভাইবোন একঘরে শুত। মাও শুত ওদের সাথে। শোওয়ার সময়ে সচেতন থাকতে হত। যেন জামা উঠে না যায়। আর এ মেয়ে তো একা একটা ঘর পেয়ে দিশেহারা। সারাক্ষণ ল্যাপটপে মাথা ডুবিয়ে। কানে ইয়ারপ্লাগ। কিছু জানতে চাইলে দশ মিনিট পর প্লাগ সরিয়ে মুখ তোলে। ‘কিছু বলছিলে?’ গা জ্বলে যায় বিশাখার। গম্ভীর মুখে বলে জলখাবারে কি খাবে? উত্তর আসেনা। আসবেও না। অগত্যা নিজেই যাহোক কিছু বানিয়ে মুখের সামনে ধরে। আজ তিন্নিকে ও বলবে ভেবেছিল, এইযে অন্য শহরে গিয়ে পড়াশুনো করতে হবে, আর তো মাত্র কটা মাস হাতে। তখন কি মা সেখানেও সঙ্গে যাবে? এখন না হয় একটু ঘরের কাজকর্ম শিখে নেওয়া হোক! ওই বিচ্ছু ছেলেমেয়েগুলোর সঙ্গে আড্ডাটা কমিয়ে, সারাদিন নেটলগ্ন বসে না থেকে দেহটা তুলে একটু কাজ করলে কি মহাভারত অশুদ্ধু হয়ে যাবে? কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা। তিন্নি গভীর ঘুমে। ডাকার চেষ্টা করতেই জড়ানো গলায় বলল, কাল নাকি সে সারারাত গেম অব থ্রোন্স এর সব কটা এপিসোড দেখেছে। তিনটের সময় বন্ধ করেছে তার কোলতুতো বন্ধুকে। রাগ হবেনা? কাজ না করুক, উঠে নিজে খেয়েও তো উদ্ধার করতে পারে মাকে! বললেই নাকি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, অধিকারে হাত । ভালো লাগেনা বিশাখার। আঠেরো হলেই যদি স্বাধীনতা পাওয়া যেত তাহলে তো হয়েই যেত। আসল শেকল যে কোথায় তা যদি বুঝত এই মেয়ে। 

সন্ধ্যে হতেই বিশাখার হাত পা অবশ হয়ে এলো। সারাটা দিন রাস্তায় চক্কর কেটে, শমীকের কাজকর্ম সেরে, নিজেদের খাওয়ার ব্যবস্থা করতে করতেই সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কি করে যে রাতের আটজন বন্ধুর রান্না করবে! অথচ, বাজার করে এনেছে। শমীক আবার এক দু পদ পছন্দ করেনা। সকলে খেতে বসে বলবে, বাব্বা, এই না হলে শমীক! গোল্ডেন হার্ট। মনটা এরকমই রাখিস রে। সেই তো। শরীরটাকে টানতে টানতে কিচেনে এসে ফ্রিজের থেকে মাছ মাংস বার করবে ভাবছে, দ্যাখে তিন্নি ফ্রিজ খুলে রেখে জলের বোতল বের করে ঢকঢক করে জল খাচ্ছে। কতদিন যে বলেছে এইভাবে ফ্রিজ খুলে রাখিস না, এমন করে ঠাণ্ডা জলটা খাসনা, কে শোনে কার কথা! বিশাখা যেন একটা অদরকারী লোক। কিছু না বলে নীচু হয়ে সব্জির ট্রেটা বের করতে যেতেই তিন্নি বের করে আনল ট্রে। মায়ের দিকে আড়চোখে দেখে বলল- আর কি চাই? বিশাখা উত্তর দিলো – দেখি কি রাঁধি। বলার সঙ্গে সঙ্গে উঃ আওয়াজ তুলে মেঝেতে বসে পরল সে। 

তিন্নি একেবারে রেডি। পিয়াকে ডেকে সে সব জোগাড় করিয়েছে। নির্দেশ দিয়ে দিয়ে ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন বানানো করিয়েছে। টেবিলে সাজিয়ে রেখে প্লেট গ্লাস দিয়েছে। বিশাখার বিছানা থেকে ওঠা মানা। কোমরে এরকম যন্ত্রণা, বিশ্রামে থাকতেই হবে। বিশাখা মরমে মরে যাচ্ছে। সকলে আসবে। তিন্নি এমনিতে চুপচাপ। কিন্তু আজ সে নিজের গুহা থেকে বেরিয়ে বাইরে ড্রয়িং স্পেসে বসে আছে। ল্যাপটপের বদলে হাতে ধরা বই। বিশাখার বদলে তিন্নি দরজা খুলতে শমীক একটু অবাক হল। ‘কি ব্যপার? তুই দরজা খুলছিস?’ ‘মা তো আগেই এসে খুলে দেয়, যেন তুমি এক মিনিটও দাঁড়াতে পারো না। অপরাধ হয় মায়ের। তাই আমি উঠতে চেষ্টা করিনা’। শমীক থমকালো। ‘ওহ, তা, মা কই? রান্নাঘরে নাকি?’ তিন্নি আঙুল তুলে শোবার ঘর দেখিয়ে দিলো। শমীক খুশি। ‘আচ্ছা। তাহলে সব রেডি?’ তিন্নি সোফায় বসে পরল আবার। হাতে বইটা তুলতে তুলতে বলল – বাবা, মায়ের কোমরে মাটিতে বসতে গিয়ে লেগে গেছে। আমি বাম লাগিয়ে শুইয়ে রেখেছি। মা আজ শুয়ে থাকুক। টেবিলে ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন রাখা আছে। প্লেট গ্লাস চামচ সব গোছানো আছে। সবাই নিজে নিজে নিয়ে নেবে’। শমীক অবাক হয়ে দেখছে মেয়েকে। ‘সব তুই অ্যারেঞ্জ করলি?’ তিন্নি মাথা নাড়ে। ‘পিয়াদিদি সঙ্গে ছিল। আসলে আমি লক্ষ করেছি মায়ের পক্ষে এতো কাজ বেশ অসুবিধের। চাপ পরছে। মেজাজ হারিয়ে ফ্যালে। হাইপার হয়ে যায়। মায়ের একটু মি-টাইম দরকার বাবা’। ‘সেটা কি?’ শমীক বিভ্রান্ত। ‘সেটা হলো মায়ের নিজের সময়। মা গল্পের বই পড়তে পারে। শপিং এ যেতে পারে। বন্ধুদের সঙ্গে ডে আউট করতে পারে। ভালো লাগবে’। তিন্নি হাসে। মেয়েটা খুব কম হাসে। শমীক লক্ষ করে হাসলে মেয়েকে বড্ড সুন্দর লাগে। সোফায় ওর পাশে বসতে বসতে শমীক মেয়ের কাঁধে হাতটা তুলে দেয়। বলে ওঠে ‘হ্যাঁ রে, তোর মায়ের বড্ড চাপ যায়। শুয়ে থাক ও। সবাই এলে বরং এইখানে সোফায় এসে টানটান হয়ে থাকবে। গল্প করবে’। তিন্নি আবার হাসে। ‘একবার মাকে দেখে এসো বাবা’। 

ঘরে শুয়ে শুয়ে বাপ মেয়ের বাক্যালাপ শুনতে শুনতে বিশাখা টের পায় মেয়ে সত্যিই বড় হয়ে গেছে। প্রাপ্তবয়স্ক অষ্টাদশী। সে তাকে যতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন হৃদয়হীনা ভাবে, মেয়ে ঠিক সেরকম নয়। তারই বুঝতে ভুল হয়েছে।


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.