x

প্রকাশিত

​মহাকাল আর করোনাকাল পালতোলা নৌকায় চলেছে এনডেমিক থেকে এপিডেমিক হয়ে প্যানডেমিক বন্দরে। ওদিকে একাডেমিক জেটিতে অপেক্ষমান হাজার পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ।​ ​দীর্ঘ সাতমাসের এ যাপন চিত্র মা দুর্গার চালচিত্রে স্থান পাবে কিনা জানি না ! তবে ভুক্তভোগী মাত্রই জানে-

​'চ'য়ে - চালা উড়ে গেছে আমফানে / চ'য়ে - কতদিন হাঁড়ি চড়েনি উনুনে / চ'য়ে - লক্ষ্মী হলো চঞ্চলা / চ'য়ে - ধর্ষিতা চাঁদমনির দেহ,রাতারাতি পুড়িয়ে ফেলা।

​হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা মানুষটি লালমার্কার দিয়ে গোল গোল দাগ দেয় ক্যালেন্ডারের পাতায়, চোদ্দদিন যেন চোদ্দ বছর। হুটার বাজিয়ে শুনশান রাস্তায় ছুটে যায় পুলিশেরগাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স আর শববাহী অমর্ত্য রথ...। গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে অনেকটা জল, 'পতিত পাবনী গঙ্গে' হয়েছেন অচ্ছুৎ!

এ কোন সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি আমরা?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

সমীরণ চক্রবর্তী

সোমবার, জুলাই ৩১, ২০১৭

সুনন্দা চক্রবর্তী

sobdermichil | জুলাই ৩১, ২০১৭ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল
আজি ঝরঝর মুখর বাদল দিনে
জানিনে জানিনে 
কিছুতে কেন যে মন লাগেনা ------------মন হারাবার আজি বেলা । 

মন লাগবে কেন ? ছোট মন ভাবছে এতো বৃষ্টি নামলে মাঠঘাট কাদায় জলে ভরে যাবে কি করে খেলব? ঘরের মাঝে থোরি বসে বসে বৃষ্টি বিলাসের বয়স কি তখন ? পাশের বাড়ির বেলুদি ভাবছে এতো বৃষ্টিতে সুনিলদা সাইকেলে করে একটিবার কি যাবে ? তাও আশায় আশায় রাস্তার ধারের জানালায় আকুল চোখ । সিপার ঠাকুমা ভাবছে এমনিতেই এদিকটা একটু নিচু জল জমলে ঘরে ঢুকলে কি হবে ওদিকে বাড়ির ছোট বউটি সবে পুত্রবতী হয়েছে, তার ছেলের কাঁথাকানি শুকাবে কি করে ? এইসব ভেবে ঠাকুমা চুপ করে ভাবনাদের সাথে নিজে নিজেই আলাপে মন খারাপ করছে। ঘরে ঘরে মায়েরা ভাবছে এতো বৃষ্টিতে রেল লাইনে জল জমলে স্বামীরা আসবে কখন ? কত যে মন খারাপ লাগার কারণ। 

রেডিওতে খবর জানালো যে অনেক জেলায় ভারী বৃষ্টিতে জল বিপদসীমার বাইরে ফলে বন্যা হবে। শুনে ভয় পাচ্ছি। বড্ড ছোট বন্যা কি জিনিস জানিনা তবে লোকজনের দুর্দশার অন্ত থাকবে না তা বাড়ির বড়দের কথা শুনে বুঝতে পাড়ছি । রান্না করতে গিয়ে মা দেখে নুনের পাত্র পুরো জলজলে, ঘরের মধ্যে দিনরাত পাখা চলছে খাটের ছত্রিজুড়ে ভেজা জামাকাপড় । সামনের বারান্দায় মায়ের শাড়িটা এতো সুন্দর করে মেলা যে মনে হচ্ছে তাঁবু খাটানো তার তলায় আমার খেলনাবাটির সংসার , পুতুল খেলা নিজের মনে কথা বলা। তখন কদম ফুলের বাহার বুঝিনা , গন্ধটা বরং সোঁদা সোঁদা, একটুকুও ভালো লাগেনা। বনানিদির হাতে বেশ কটা কদম ফুল পাতাসহ। অনিন্দ্যদা দিয়েছে রাস্তার পাশের গাছ থেকে। মা জানতে পেরে হাসল । আমি ভাবছি এতে হাসির কি হল? খবরের কাগজ দিয়ে মনের সুখে নৌকা বানাচ্ছি আর উঠানের নিচু জমা জলে দিচ্ছি আর বৃষ্টিতে নেতিয়ে যাচ্ছে রাগ হচ্ছে খুব। মা একটা বড় লোহার কড়াই উঠানে রেখেছে সেটায় কাচার জিনিস ভেজানো হয়, সোডা দিয়ে বিছানার চাদর, পর্দা সেদ্ধ করা হয় নোংরা ছাড়ানোর জন্য। সেটায় জল ভরে গেলে বারান্দার এককোনায় টেনে এনে রাখছে কাকাছোট, মায়ের তাহলে কল অবধি বৃষ্টিতে ভিজতে হবেনা। বাসন ধুয়ে নেবে ঐ জলে। আমি নিরুপায় হয়ে তার মধ্যে দুটো নৌকা রেখেছি , সুন্দর ভেসে ভেসে আছে পাশাপাশি । 

তখন স্কুলে ছুটি দিয়েছে , পাশের স্কুলে কাতারে কাতারে লোকজন সম্বলটুকু নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। পাড়া থেকে কাকুরা, দাদারা সমবেত হয়ে চাল, ডাল , সব্জি , টাকা পয়সা, জামাকাপড় সংগ্রহ করে দিয়ে আসছে। শরণার্থীদের কেউ কেউ চুপি চুপি এসে কারো বাড়ির থেকে মুড়ি , চিঁরে কখনও ভাত খেয়ে যাচ্ছে । সুবিধাবাদীরা আবার তাদের একমুঠো ভাতের বদলে ঘরের কাজ করিয়ে নিচ্ছে। তখন কিছুই বুঝতাম না ঐ মা যখন বাবাকে কিম্বা কাকাকে বলত এসব হাঁ করে শুনতাম। সুমির মাসি আমাদের বাড়িতে এসে লজ্জা লজ্জা গলায় ‘ শাওন রাতে যদি’ গানটা গেয়ে কাকাছোটর বন্ধু দাসকাকুকে ভেবলে দিল। ফোঁসফোঁস করে দাস কাকু নিঃশ্বাস ফেলল মা আর কাকাছোট চোখে চোখে হেসে ফেলল । সব আমি খেলতে খেলতে ছবি আঁকতে আঁকতে দেখছি । পাড়ার দাদারা বৃষ্টির দিনে কারোর বাড়ির বারান্দায় বেশ আড্ডা জমিয়ে ফেলেছে, রকগুলো একা বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে কেমন মনের মাঝে শ্যাতলা ফেলে দিল। অভিমানী লাল রক বর্ষার জলে বেশ আরও টুকটুকে লাল হোল সাথে শ্যাওলা প্রিন্ট। এমনি একদিন আমাদের বাড়ির সামনের বারান্দায় বেশ আসর বসে গেল। চা আর হাতে হাতে মুড়ি চানাচুর কাকাছোট , মাম( আমার একমাত্র মামা) , আর পাড়ার অন্য কাকুরা, বড় দাদারা নানাগল্পে হাহা হিহি। মা ঘরের ভিতর গুনগুণ করে হাতের কাজ সারছে। অনিন্দ্যদা একটু গান জানে তাই মান্না দের গান ধরল, ‘ ওগো বর্ষা তুমি ঝরো না গো এমন করে ...’। মা কাজ ফেলে চুপ করে খাটের বাজু ধরে বসে বসে শুনল, বাবা খবরের কাগজের পাতায় চোখ স্থির রেখে গান শুনল। আর আমি সবাইকে বসে বসে দেখলাম, বৃষ্টির একটানা আওয়াজে সাদা পাতায় বেশ কিছু স্ল্যান্টিং লাইন এঁকে ফেললাম আর এককোণায় কচুগাছ আর ছাতা মাথায় নিজেকে কল্পনা করে এঁকেছিলাম । ছাতার তলায় একটা ববি প্রিন্ট ফ্রক । পায়ের পাশে মোটকা একটা ব্যাঙ । খুব বাজেই হয়েছিল ছবিটা কিন্তু আমি এঁকে বেশ পরিতৃপ্ত হয়েছিলাম মনে আছে। আসলে আমাদের বাড়ির প্রবেশপথে দুটো মানকচু গাছ ছিল আর তার তলায় সকালে একটা মোটকু ব্যাঙ দেখেছি । অনেকক্ষণ চিন্তা করেছিলাম যে বৃষ্টির জলের ঠিক কি রং ? অবশেষে সাদা মোম রং করে দিয়েছিলাম বৃষ্টির ফোটায়।

বৃষ্টি একটু হোল কি না হোল বাবার আবদার , ‘ আজ খিচুড়ি আর ডিম ভাজা হয়ে যাক’ বা কখনও খিচুড়ি ইলিশ ফ্রাই, অনেকসময় বাজারে না যেতে পারলে পাড়ার দোকান থেকে পাঁপড় কিনে আনা হতো বা পেঁয়াজ আর ব্যাসন । মা বোলত , ‘ এই বাঙালগুলোর সারাদিন শুধু খাই খাই’। আমি হেসে হেসে নেচে নেচে বলতাম, ‘ মা, তুমিও বাঙাল তুমিও বাঙাল’। 

ক্লাস নাইনে পড়ি , বেশ পেকেছি কিন্তু বাইরের কাউকে বুঝতে দিচ্ছি না। পুরো মাসুম মুখ নিয়ে দুবেনী স্কুলে যাই আসি। সেসময়ে হাজারো অভিজ্ঞতা। গৌতমদার কাছে গান শিখি তখন। মা বলল একটা বর্ষার গান শিখিয়ে দিতে। আমিও আবার তার উপর বায়না করলাম যে সেটা যেন বাচ্চাদের গান না হয়। গৌতমদা শেখালো ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান’। আমি কিন্তু বেশ ফিল করে করে গুছিয়ে গানটা গাইতাম একসময় । বিরহ বিধুর গান মানেই যেন বেশ খানিকটা বড় হয়ে গেলাম আর মনে চাপা কষ্ট আমায় কে আর কদম ফুল দেবে আমার বাবার রক্ত চক্ষুর বেড়া ডিঙিয়ে ? 

বৃষ্টিতে কোলকাতার বীভৎস রূপ দেখলাম সেকেন্ড ইয়ার পরীক্ষার সময়। আমহারস্টষ্ট্রীট এর সিটি কলেজে সিট পড়েছিল । কোমর সমান নোংরা জল ঠেলে ভিজে ঘেন্না ঘেন্না বমি বমি ভাব নিয়ে পরীক্ষা দিয়েছিলাম। তখন বর্ষাকে শত্রু ছাড়া আর কিছু মনে হয়নি। কলেজে পড়ার সময় অপর্ণা সেনের সেই ‘বৃষ্টি বৃষ্টি বৃষ্টি .........’ আমার এতো ভালো লাগত যে বাড়িতে থাকলে সুযোগ পেলেই সুমিকে ডেকে নিতাম, স্নানের আগে দুজনেই বৃষ্টির ধারাস্নানে মত্ত তখন মনের মাঝে গান বাজজে বৃষ্টি বৃষ্টি বৃষ্টি ......। মায়েরা বলল , ‘ পাগল আর কাকে বলে’। আমরা প্রশ্রয় পেয়ে আরও ভিজে নিলাম মনের সুখে। 

বিয়ের পরে গোয়াতে ঘ্যানঘ্যানে বৃষ্টি দেখে বিরক্ত লাগল , আরও বিরক্ত লাগল যখন সমুদ্রের উত্তাল হাওয়ায় বৃষ্টির অভিঘাত আমার জানালার শাটারের তলা দিয়ে এসে হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকল । সারাদিন খালি জল কাচানো কাজ বেড়ে গেল। আরেকটা বাড়িতে দেখলাম টালি এমনকি কনসিল ছাদ ভেদ করে সারাদিন টুপটুপ জল পড়ছে আর আমি তার তলায় হাঁড়ি পেতে রাখছি। ততদিনে বরষা আমার আর ভালো লাগেনা । খালি মন লাগে না মন লাগে না এই কেজোময় সংসারে ।

কোলকাতায় আসার পর নিজের ফ্ল্যাটের সামনে কিছু শখের গাছপালা লাগালাম তারা যখন বর্ষার জল মেখে আরও সবুজ হোল , আরও যৌবনবতী হোল ফুল ফুটিয়ে বাগানটাকে সুন্দরী করে দিল সেদিন থেকে বর্ষার প্রতি কৃতজ্ঞ হলাম। আমি নিজেও বর্ষাতেই জন্মেছি। শুনেছি বর্ষার প্রোডাক্টরা একটু এক্সট্রা রোম্যান্টিক হয় । কত বাদলদিন পার করে ফেললাম হায়! একখানি কদম ফুলের আশ রয়ে গেল মনের মধ্যে এই যা।


Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.