x

প্রকাশিত

অর্জন আর বর্জনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ সিদ্ধান্তের নিরিখে দোলাচলে।সেখানে প্রতিবাদও ভঙ্গুর।আর যথার্থ প্রতিবাদের থেকে উঠে আসে টায়ার পোড়ার গন্ধ।আঘাত প্রত্যাঘাতের মাঝখানে জন্মদাগও মুছে যায়।সংশোধনাগার থেকে ঠিকানার দূরত্ব ভাবেনি কেউ।ভাবেনি হাজার চুরাশির মা’র প্রয়াণ কোন কঠিন বাস্তবকে পর্যায়ক্রমিক প্রহসনে রূপান্তরিত করেছে।একটা চরিত্র কত বছর বেঁচে থাকে ?কলম যাকে চরিত্রের স্বীকৃতি দেয় তেমন পোস্টমর্টমের পড়ও আরও কয়েকযুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে কলমই। অভয়ারণ্যেও ঘেরাটোপ! সেই আপ্তবাক্য -

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

ভাববার সময় এসেছে। প্রতিবাদটা কোথা থেকে আসে—বোধ ?মস্তিষ্ক ?মুঠো? না বাহুবল?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

বিদিশা সরকার

সোমবার, জুলাই ৩১, ২০১৭

শাশ্বতী সরকার

sobdermichil | জুলাই ৩১, ২০১৭ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
একলা পথিক
ড়দের যখনই প্রণাম করে শুভ্র, তাঁদের বেশীরভাগই এই বলে আশীর্বাদ করেন,“মানুষের মত মানুষ হও, বাবা মা-র মুখ উজ্জ্বল কর।” অসম্ভব সংবেদী মনের মানুষ শুভ্র ভাবে মানুষের মত মানুষ না হলে,বাবা মা-র মুখ উজ্জ্বল করতে না পারলে মানবজীবনই বৃথা। কিন্তু তার তো কোনো বিশেষ প্রতিভাই নেই, সে কি করে এসব করবে!দাদা অভ্র তার থেকে দেখতে অনেক সুন্দর, অনেক সপ্রতিভ, অনেক বুদ্ধিদীপ্ত।বাবা মার অনেক আশা দাদাকে নিয়ে।তুলনায় শুভ্র শীর্ণকায়,মুখচোরা প্রকৃতির এবং ভাবরাজ্যেই বিচরণ করতে ভালবাসে। বাবা মা ভাবেন এ ছেলেকে দিয়ে কিস্যু হবে না, তার জন্য চিন্তারও অন্ত নেই তাঁদের। দাদাও বলে দিয়েছে,তার বন্ধুদের কাছে শুভ্র যেন কোনোদিন তার ভাই বলে পরিচয় না দেয়।একদিন তো দাদা এসে সরাসরি বলল,তার বেস্ট বন্ধু ইপ্সিত বলেছে “তুই এত সুন্দর আর তোর ভাইকে দেখতে এত বাজে কেন রে!” কিন্তু আশ্চর্য, শুভ্রর তাতে কোন কষ্টই হয় নি কারণ সে নিজেও তো মানে, সত্যিই তো দাদা কত সুন্দর কিন্তু সে যে কেন এত অসুন্দর সে নিজেও জানে না যে। আস্তে আস্তে শুভ্র গুটিয়ে যেতে থাকে নিজের মধ্যে আরও ।সে ভালবাসে প্রকৃতি।প্রকৃতির মধ্যেই অনন্ত রং খুঁজে পায় সে। ছটা ঋতুকেই সে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে। তার সবচেয়ে দুটি প্রিয় ঋতু হল বর্ষা আর শরৎ। বর্ষায় বাড়ীর জানলাগুলো দিয়েই বাইরের প্রকৃতিকে প্রাণভরে দেখে সে। আর শরৎকালে ছাদের সিঁড়িতে বসে চারদিকের সবুজ ও ঘননীল আকাশে পেঁজা তুলোর সাথে তার মনও উড়ে চলে কোথায় কোন্‌ নিরুদ্দেশে। শীতকালও তার কম প্রিয় নয়।বাৎসরিক পরীক্ষার পর পুরো ছুটিটাই ছাদই হয়ে ওঠে তার আস্তানা। মফস্বলে বাড়ী হওয়ায় চারপাশে সবুজের অভাব নেই।গাছে গাছে কতরকম পাখির যে কলকলানি, জোড়া পাখিদের ভালবাসাবাসি, মা পাখিদের উড়ে উড়ে খাবার জোগাড় করে এনে ছানাদের খাওয়ানোর জন্য সদা ব্যস্ততা, বাবা পাখিদের শুকনো খড়কুটো, গাছের লিকলিকে শুকনো ডাল ঠোঁট দিয়ে ভেঙে বাসা তৈরির ব্যস্ততা,আকাশে কতরকমের রংবেরঙের ঘুড়ির উড়াল দেখতে দেখতে শুভ্র এক অপার্থিব আনন্দের জগতে ডুবে যায়।এ দেখায় কোন ক্লান্তি আসে না তার।ধীরে ধীরে যখন লাল সূর্যটা ক্রমশঃ ডুবে যেতে থাকে,পাখিরা দল বেঁধে বাসায় ফেরার জন্য উড়ে যায় মাথার ওপর দিয়ে, শুভ্র হাঁ করে তাকিয়ে থাকে ওদের দিকে।ভীষণ ভীষণ ইচ্ছে করে ওদের মত উড়ে যেতে।আহা!ও যদি পাখীজন্ম পেত!যতক্ষণ না পুরো অন্ধকার নেমে আসে,যতক্ষণ না শেষ পাখিটা বাসায় ফেরে,শুভ্র ছাদ থেকে নীচে নামে না। দাদা অভ্র ছুটি থাকলেও নতুন ক্লাসের পড়া অগ্রিম শুরু করে দেয়।বিকেলবেলায় ঘুমিয়ে নিয়ে ফ্রেশ মস্তিষ্কে পড়তে বসে সন্ধ্যায়।কিন্তু যত রাত বাড়ে শুভ্রর চোখে নেমে আসে রাজ্যের ঘুম,কিছুতেই দুটো চোখ আর খোলা রাখতে পা্রে না।বাবার মার ও মা-র বকুনি খেয়ে কোনরকমে রাতের খাওয়া সারে। দিন দিন আরও অপদার্থ হয়ে যাচ্ছে শুভ্র। কি করে যে পরীক্ষাগুলো উতরে যায় তা সে নিজেই জানে না।

আঠেরো বছরের শুভ্র এখন তার বাংলার প্রাইভেট টিউটর মাধুরীদির প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। প্রথম দর্শনেই কি অদ্ভূত আকর্ষণ অনুভব করেছিল সে। দিনে দিনে সে আকর্ষণ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে। মাধুরীদির বয়স তার দ্বিগুণের থেকেও বেশী হবে হয়ত কিন্তু নির্দিষ্টভাবে কত যে হবে তা সে কিছুতেই আন্দাজ করতে পারে না।একসপ্তাহ যদি কোনও কারণে টিউশন বন্ধ থাকে শুভ্রর পাগল পাগল লাগে। সপ্তাহের ওই একটা দিনের জন্যই যেন সারা সপ্তাহটা বেঁচে থাকা।ক্রমে শুভ্র বুঝেছে মাধুরীদির প্রতি তার আকর্ষণটা আসলেই শারীরিক। মাধুরীদির চোখে যেন জাদু আছে, বেশীক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। চোখাচুখি হলেই তীব্র শিহরণ খেলে যায় শরীরে, দ্রুত চোখ নামিয়ে নেয় সে। মাধুরীদির শরীরটা, মাধুরীদির চারপাশে ভেসে থাকা একটা অনামী গন্ধ আকুল করে ডাকে তাকে। শুভ্র প্রাণপণে অনেকবার বুঝিয়েছে নিজেকে, এ ভালবাসা নয়, এ ইনফ্যাচুয়েশন, এ অনৈতিক। মাধুরীদি প্রায় তার মার বয়সী হবেন, তাঁর প্রতি এ মনোভাব পোষণ করা অশোভন। সঙ্গে সঙ্গে তার আর এক সত্তা বলতে থাকে না না না, মাধুরীদি তার প্রেমিকা, মাধুরীদি শুধুই তার, মাধুরীদিকে অন্য কোন চোখে দেখা তার পক্ষে সম্ভবই নয়। যে করেই হোক্‌ মাধুরীদির মন একদিন সে জয় করবেই।

মাধুরীদিও বোধ হয় তার মনের খবর টের পেয়েছেন। বিজয়া দশমীর পর প্রথমদিন টিউশনে শুভ্রই সবার আগে পৌঁছয়। মাধুরীদিও সেদিন বেশ আগে আগেই চলে এসেছেন কোচিং সেন্টারে। শুভ্র বিঁজয়ার প্রণাম করতেই মাধুরীদি টেনে নিলেন বুকের মধ্যে। মাথার চুলগুলো একটু ঘেঁটে দিয়ে শুভ্রর ঠোঁটে একটা চুম্বন এঁকে দিলেন। শরীরের মধ্যে বিদ্যুৎ খেলে গেল শুভ্রর, লজ্জায় লাল হয়ে গিয়ে বসে পড়ল ঘরের একেবারে কোণায়। অন্য সব বন্ধুরা তখন একে একে আসতে শুরু করেছে। শুভ্র একটা বই খুলে তার মধ্যে মগ্ন হওয়ার ভান করল।বন্ধুদের কারো কারোর একটু অবাকও লেগেছিল কারণ শুভ্র কখনোই কোনোদিন কোণের দিকে বসে না,ও সবসময়ই মাধুরীদির পাশে বাঁদিকটায় বসে। সেখান থেকেই যেন মাধুরীদির গায়ের গন্ধটা বেশী পাওয়া যায় যাতে বুঁদ হয়ে থাকে সে।চঞ্চল জিজ্ঞেস করেই বসল, “কি রে, তোর কি শরীর খারাপ লাগছে? আজ এখানে বসেছিস? ”শুভ্র উপস্থিত বুদ্ধিতে বলল, “হ্যাঁ, একটু শীত শীত করছে, জ্বর আসছে বোধ হয় তাই ফ্যানের হাওয়া থেকে একটু দূরে বসেছি।” কি অদ্ভূত, মাধুরীদির ওপর হঠাৎ শুভ্রর খুব রাগ ও ঘেন্না হতে লাগল। মনে হল ও খুব অশুচি হয়ে গেছে। মাধুরীদির ওপর সব শ্রদ্ধা যেন নিমেষে উধাও হয়ে গেল।মাধুরীদিও যেন টের পেলেন সে কথা। কেমন একটা অপরাধবোধে অন্যমনস্ক হয়ে পড়াতে লাগলেন। শুভ্রকে ইচ্ছে করেই একটু অগ্রাহ্যকরতে লাগলেন। পড়ার শেষে সবাই যখন চলে যাবে তখন হঠাৎ শুভ্রকে ডেকে বললেন,“দাঁড়াও, তোমার সাথে একটু দরকার আছে।” ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে আস্তে করে শুভ্রর কানের কাছে মুখ এনে ফিস্‌ফিসিয়ে বললেন, “তুমি কি রাগ করেছ, শুভ্র?” রাগ হলেও মাধুরীদিকে হারানোর ভয়ে সত্যি কথাটা বলতে পারেনি সে। মুখে বলল,“না, ঠিক আছে, রাগ করব কেন!” স্বস্তি পেয়ে মাধুরীদি বললেন,”তাই বল,আমি ভাবলাম তুমি রাগ করেছ। চলি কেমন!সাবধানে বাড়ী যেও,বোকা ছেলে।” বাড়ী এসে অন্ধকার ঘরে শুয়ে ভীষণ কান্না পেল শুভ্রর। কেন যে এমন হচ্ছে বুঝতে পারছে না।এতদিন তো এটাই চেয়েছিল শুভ্র,তাহলে আজ কেন নিজেকে এত অশুচি লাগছে!প্রচলিত পাপ-পুণ্যে সে একেবারেই বিশ্বাস করে না।সামাজিক বৈবাহিক প্রথায়ও তার বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই, চারদিক দেখেশুনে সমস্তটাই ভন্ড মনে হয়।সমবয়সী বা অবিবাহিত কোন মেয়েই তাকে টানে না।বিবাহিত নারী ছাড়া কোনো নারী তাকে আকর্ষণও করে না,তাদের ইম্‌ম্যাচিওর মনে হয়।তাহলে কেন এই বিরক্তি, কেন এই স্বপ্নভঙ্গ বুঝতে পারে না শুভ্র।

আজ এক সন্তানের পিতা,পঞ্চাশ বছরের লেখক শুভ্র চলেছেন এক সাহিত্যসভায় সংবর্ধনা নিতে। বাজারে এর মধ্যেই তাঁর পাঁচটা গল্পের বই বেরিয়ে গেছে।সারা বছরে এত লেখার অনুরোধ আসে যে লিখে শেষ করতে পারেন না তিনি।এই লেখার জন্যই কেরাণীর চাকরিটাও ছেড়ে দিয়েছেন তিনি, স্ত্রীর স্কুলের চাকরিটা তো আছে।স্ত্রী অবশ্য এতে খুবই বিরক্ত।সুন্দরী মধ্যমেধার স্ত্রী সারাক্ষণই জা-ভাশুরের অতিসচ্ছল জীবনযাপনের কথা মনে করে গুমরোতে থাকেন ভেতরে। শুভ্রর সাথে তাঁর স্ত্রীর মননে বিস্তর পার্থক্য। শুভ্র আগাগোড়াই এক ভাবপ্রবণ মানুষ কিন্তু স্ত্রী তিয়াশা অতিবাস্তববাদী।ফলে দুজনের কনজুগাল লাইফও অস্বাস্থ্যে ভরা। শুভ্রর কোনো শারীরিক চাহিদাকেই তিয়াশা আমল দেয় না,বিরক্ত হয়। তার সর্বক্ষণ চিন্তা শুধু বাড়ী গাড়ী ব্যাঙ্কব্যালেন্স নিয়ে। ফলে শুভ্রর মনোজগতের অংশীদার হতেও তিয়াশা ব্যর্থ। শুভ্রর মা বাবাও দাদা অভ্রকেই তাঁদের সফল সন্তান বলে মনে করেন। দাদার দেখার মত বাড়ী গাড়ী নিয়ে মা-বাবার গর্বের অন্ত নেই। শুভ্র বুঝতে পারেন না,পাঁচ-পাঁচটা বই মা বাবা স্ত্রী সন্তানকে উৎসর্গ করেও, অগুণ্‌তি মানুষের কাছে তাঁদের ও নিজেকে পৌঁছে দেওয়ার পরও তাঁদের মুখ উজ্জ্বল করতে পেরেছে্ন কিনা। একা,মাঝে মাঝে ভীষণ একা লাগে শুভ্রর। মনে হয় এ দুনিয়াটা ওঁর জন্য নয়। মা বাবা তিয়াশা – কারো কাছেই সম্পর্কের প্রয়োজনীয় উষ্ণতাটুকু তিনি পেলেন না। কেউই তাঁকে বুঝল না ঠিকমত। মাধুরীদির কাছেও কমবয়সী শুভ্র হয়ত প্রেম-শ্রদ্ধা-স্নেহ-যৌনতা-অভিভাবকত্ব সব কিছুর এক মিশ্র স্বাদ পেতে চেয়েছিল কিন্তু বিবাহিত জীবনে অতৃপ্ত মাধুরীদিও তীব্র এক শারীরিক উল্লাস ছাড়া আর কিছুই দিতে পারেন নি তাঁকে। শ্রদ্ধাহীনতা কোনো সম্পর্ককেই দীর্ঘদিন টিঁকিয়ে রাখতে পারে না। ধীরে ধীরে মাধুরীদির মোহজাল কেটে নিজেই বেরিয়ে এসেছিলেন তিনি। আজ এত বছর পরেও তিনি একা, এই একাকীত্বের ভার বুঝি আর কখনও নামবে না তাঁর জীবন থেকে। ক্রমে ক্রমে শুভ্র যেন আবার তাঁর ছোটবেলায় ফিরতে থাকেন।হ্যাঁ, এইবার দিশা পেয়েছেন তিনি। প্রকৃতি, একমাত্র প্রকৃতিই দিতে পারে তাঁকে অনন্ত ভালবাসার সন্ধান। সে যেন আবার ডাকছে তাঁকে তুমুল ইশারায় হাতছানি দিয়ে। এবার আর পথভ্রষ্ট হবেন না তিনি, বেরিয়ে পড়বেন প্রকৃতির টানে। একা, একাই বেরিয়ে পড়বেন সেই মহামন্ত্র স্মরণ করে,“যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে"...



Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.