x

আসন্ন সঙ্কলন


যারা নাকি অনন্তকাল মিছিলে হাঁটে, তাদের পা বলে আর বাকি কিছু নেই। নেই বলেই তো পালাতে পারেনা। পারেনা বলেই তারা মাটির কাছাকাছি। মাটি দ্যাখে, মাটি শোনে, গণনা করে মৃৎসুমারী। কেরলের মাটি কতটা কৃষ্ণগৌড়, বাংলার কতটা তুঁতে! কোন শ্মশানে ওরা পুঁতে পালালো কাটা মাসুদের লাশ, কোন গোরেতে ছাই হয়ে গেলো ব্রহ্মচারী বৃন্দাবন। কোথায় বৃষ্টি টা জরুরী এখন, কোথায় জলরাক্ষুসী গিলে খাচ্ছে দুধেগাভিনের ঢাউস পেট। মিছিলে হাঁটা বুর্বক মানুষ সেসবই দেখতে থাকে যেগুলো নাকি দেখা মানা, যেগুলো নাকি শোনা নিষেধ, যেগুলো নাকি বলা পাপ। দেশে পর্ণ ব্যন্ড হল মোটে এইতো ক'টা মাস, সত্য নিষিদ্ধ হয়েছে সেই সত্যযুগ থেকে। ভুখা মিছিল, নাঙ্গা মিছিল, শান্তি মিছিল, উগ্র মিছিল, ধর্ম মিছিল, ভেড়ুয়া মিছিল যাই করি না কেন এই জুলাইয়ের বর্ষা দেখতে দেখতে প্রেমিকের পুংবৃন্ত কিছুতেই আসবে না হে কবিতায়, কল্পনায়... আসতে পারে পৃথিবীর শেষতম মানুষগন্ধ নাকে লাগার ভালোলাগা। mail- submit@sobdermichil.com

ভালোবাসার  আষাঢ় শ্রাবণ

অতিথি সম্পাদনায়

সৌমিতা চট্টরাজ

সোমবার, জুলাই ৩১, ২০১৭

রাবেয়া রাহীম

sobdermichil | জুলাই ৩১, ২০১৭ |
আমেরিকার ডায়েরি (পূর্ণিমা কথা )
নিউ ইয়র্ক শহরের অভিজাত কফি শপগুলোর একটি হল স্টারবাক্স । এর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কফির সুবাসে ভীষণ কফির তেষ্টা পেয়ে যায়। অফিস ফেরত অনেক মানুষের সাথে আমিও লাইনে দাঁড়িয়ে যাই কফির জন্য। এই কফি শপে কফি কিনতে হলে ক্যাশ কাউনটারে আগে দাম শোধ করে দিতে হয়। দাম শোধ করেছি। কাউন্টারে দাঁড়ানো স্প্যানিশ মেয়েটি কিছু খুচরা পয়সার সাথে খালি একটি কাগজের মগ ধরিয়ে দিয়ে চোখের তারা দুটি নাচিয়ে ---কফি দ্যাট সাইড, বলে অন্য কাস্টমারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কাউন্টারে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন ফ্লেভারের কফি, দুধ, চিনি, জিরো ক্যালরি, ক্রিম। যার যেমন পছন্দ সে অনুযায়ী  কাপে ঢেলে নিজের পছন্দ মত দুধ চিনি মিশিয়ে নিচ্ছে। ফ্লাস্ক থেকে কাপে কফি ঢালার সময় প্রথম চোখাচোখি হয় মেয়েটির সাথে। শ্যাম বর্ণ, কালো বড় বড় টানাচোখ, ঘন কালো লম্বা চুল দেখে বাঙালি' ই মনে হলো। অল্প হেসে "হ্যালো" বলে আমি কফি নিয়ে চলে আসি। 

জুন-জুলাই এই দুই মাস উত্তর আমেরিকাতে সুর্য ডোবে রাত সাড়ে আটটায়। অফিস ছুটি বিকাল পাঁচটাতে। অফিস ছুটির পর আরও সাড়ে তিন ঘন্টা পর সন্ধ্যা হয়। কারোরই তাড়া থাকেনা ঘরে ফেরার। গরম আসে এই দেশে প্রিয় কোন অতিথির মত। খুব অল্প সময়ের জন্য এসে চলে যাওয়ার পর রেশ রেখে যায়। এমন এক গরমের বিকালে বসে আছি নিউ ইয়র্কর বানিজ্যিক এলাকা ম্যানহাটনের কলম্বাস সার্কেলের একটি কফি হাউসে। আমি যেখানে বসে আছি সেখান থেকে বাইরের প্রায় পুরোটাই চোখে পড়ে। আজব শহর এই নিউইয়র্ক। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের মানুষের দেখা মেলে এখানে। অফিস ছুটি হয়েছে। রাস্তায় বেশ ভীড়। অনেক বাঙালিও চোখে পড়লো । বাইরের জগতের সাথে প্রায় একাত্ব হয়ে গিয়েছি এমন সময় মিষ্টি স্বরে কেউ বলে উঠলো --ক্যান আই সিট হিয়ার? চেয়ে দেখি বাঙালি সেই মেয়েটি। হেসে বললাম--শিওর। 

সামনা সামনি বসাতে এতক্ষনে খেয়াল করলাম হাল্কা পাতলা গড়নের মেয়েটি খুব সুশ্রী। ইংরেজীটাও পাকা। কোন এক্সেন্ট নেই। হয়তো এই দেশেই জন্ম বা এখানেই বেড়ে উঠা তাই ইংরেজি এত ভালো। আমার কফি প্রায় তলানিতে চলে এসেছে। বাকিটা হাটতে হাঁটতে শেষ করবো এই ভাবনাতেই উঠে দাঁড়াই। গ্রীষ্মের পড়ন্ত বিকেলের আলোতে ম্যানহাটনের এই রাস্তাটিকে খুব মায়াবী মনে হয়। জিন্স টি শার্ট হাই হিল পড়ে নিশ্চিন্তে আপন মনে হেঁটে চলেছি ---- "এক্সকিউজ মি" শুনে পেছন ফিরে তাকাই। কফি শপের সেই মেয়েটি ।
-আমাকে বলছো? বলো? শোনার জন্য আগ্রহ নিয়ে দাড়ালাম। 
হ্যানড শেকের জন্য হাত বাড়িয়ে বললো, আমি পূর্ণিমা উইলসন।  
তার নাম শুনে ভাবলাম মা বাঙালি , বাবা আমেরিকান। এমন তো হয়েই থাকে। কিন্তু দোআঁশলা বাচ্চাদের মত তাকে লাগছেনা। ভাবলাম স্বামীর নামের শেষ নাম নিয়েছে। 
-আমি তোমার সাথে কিছুক্ষন থাকতে পারি? 
-অবশ্যই পারো । তুমি কি এখানেই জব করো? আমিও কথা বলার একজন মানুষ পেয়ে গেলাম যেন। মেয়েটি আমার অফিস বিল্ডিং এর পাশের ত্রিশ তলার দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে বলল ---
-হ্যাঁ। গুগলে আছি । আমি ওয়েব ডেভলপার । 
বিদেশে নিজ দেশের কাউকে বড় জায়গাতে চাকরি করতে দেখলে আমি বরাবর খুব উচ্ছসিত হয়ে পড়ি,  বললাম ----- বাহ! বেশ স্মার্ট জব করো তো তুমি!   

এতোক্ষন সব কথা ইংরেজীতেই হচ্ছিল। সাধারণত এখানে আমরা বাঙালিরা এক সাথে হলে ইংরেজী বলিইনা প্রায় । কিন্তু এই মেয়েটি একটা বাংলা কথাও বলছেনা। তাই বেশ অবাক হয়েই জানতে চাইলাম----
-তুমি বাংলা একদম জানোনা? এখানে জন্মেছ? 

-আমি জন্মেছি বাংলাদেশে। কিন্তু নিজ দেশের জল মাটি আলো বাতাসে বড় হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি।
মেয়েটির চোখ ছল ছল হয়ে গেলো । আমার বুকে মোচর দিয়ে উঠলো আমি কি মেয়েটিকে কষ্ট দিলাম? 

-আমি বাংলা বলতে চাই। তুমি আমাকে সাহায্য করতে পারবে?

মেয়েটির চোখে মুখে আকুতি ফুটে উঠলো। তার বয়স প্রায় তিরিশের কোঠায়। এই বয়সে কাউকে হাতে কলমে শিক্ষা দেওয়া আমার কোন অভিজ্ঞতা নেই। তাই কিছুটা বিব্রত বোধ করলাম। বললাম ...
-নিউ ইয়র্কে এখন প্রচুর বাঙালি তুমি চাইলে আমি খোঁজ নিতে পারি কোথায় বাংলা শেখানো হয়।  কথা বলতে বলতে মেট্রো রেল পর্যন্ত এসে পরেছি। ততক্ষন ট্রেন চলে এসেছে। বিদায় নিয়ে ট্রেনে উঠার পর মনে হলো পূর্ণিমার ফোন নাম্বার নেওয়া হয় নি!  

তারপর চলে গেলো অনেক দিন প্রায় বছর হবে। চাকরি , ঘর সংসার , লেখালেখি নিয়ে বেশ ব্যস্ত সময় পার হয়ে যায়। আমি পূর্ণিমা উইলসন কে ভুলেই গিয়েছিলাম। মে মাস। দীর্ঘ শীতের পর উত্তর আমেরিকাতে এখন বসন্তের ছোয়া।


২য় পর্ব

সকাল ৮টা, ৪২ গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল পাতাল রেল স্টেশন ম্যানহাটন , অফিস টাইম। যে যার গন্তব্য নিয়ে ভীষন ব্যস্ত। সে ব্যস্ততার ভেতর আমিও একজন। পাতাল থেকে উপরে রাস্তায় উঠার জন্য ছুটছি সবাই এক্সেলেটর বা চলন্ত সিঁড়ি ধরতে। ভিড়ের ভেতর পরিস্কার বাংলায় আমার পাশ থেকে কেউ বলে উঠলো-
-দিদি সালাম, কেমন আছো, চিনতে পারছো?   
এতো বিদেশীর ভীড়ে নিজের বর্নের ভাষার কাউকে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে গেলাম অস্ফুটে বললাম-- পূর্ণিমা ! আরও বেশী অবাক হলাম তার মুখে বাংলা শুনে।   
-জানো দিদি আমি বাংলাদেশে গিয়েছিলাম। 
-কে থাকে সেখানে?--
-কেউ থাকেনা।
খুব বিষন্ন হয়ে গেলো মুখটি তাঁর ।ততক্ষন আমরা রাস্তায় উঠে এসেছি। দুজনেরই অফিসে যাওয়ার তাড়া। এইবার ফোন নাম্বার নিতে আর ভুল হলো না। তবে  "কেউ থাকেনা" কথাটা বুকে খুব বিঁধে আছে। কেউ না থাকলে সে কেন গেল? কার কাছেই বা গেল? এসব ভাবনায় লাঞ্চ ব্রেকে ফোন করি তাকে। খুব উচ্ছসিত হয়ে উঠে আমার ফোন পেয়ে। আমন্ত্রণ জানাই এই শনিবারে আমার বাসায়।  

#

সোম থেকে শুক্রবার উইকডে। সংসার সামলিয়ে অফিস করে দিন যেন পাখির পালকে ভর দিয়ে কেটে যায় ঐ পাঁচদিন।  শনি-রবি উইকএন্ড সাপ্তাহিক ছুটির দুইদিন। শনিবার সকালে বিছানা ছাড়ার তাড়া থাকেনা । বেশ আলসেমিতেই শুরু হয় এই সকাল।  যদিও উত্তর আমেরিকায় এখন বসন্ত কাল তবুও বাতাসে তীব্র শীত।  ঘুম ভেঙ্গেছে অনেকক্ষণ আগেই । কম্বল মুড়ি দিয়ে গত পাচদিনের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলার চেষ্টায় চোখ বন্ধ করে আছি। সাইড টেবিলে সেলফোন সুরেলা আওয়াজে বেজে উঠে। " পূর্ণিমা"  নামটা স্ক্রিনে  দেখে কেন যেন খুব ভাল লাগলো । মেয়েটির মায়াবী মুখটা ভেসে উঠলো। ফোন রিসিভ করতেই মিশটি আওয়াজে পূর্ণিমা বলে উঠে --
-দিদি কখন আসবো ?  
আমার সাথে দেখা করার জন্য মেয়েটির অস্থিরতা ভাল লাগলো । বললাম -
-আজ সারাদিন আমি বাসায়। তোমার যখন মন চায় চলে এসো।     

এক কাপ কফি হাতে নিয়ে আমি দুপুরের  খাবারের আয়োজনে  লেগে যাই। ঠিক এগারোটায় আমার কলিং বেলটি বেজে উঠে।  দরজা খুলে দিতে এক গাল হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে  পূর্ণিমা।  তার হাসি ঠিক তার নামের মতই।  তার সাথে নানান কথায় সময় গড়িয়ে দুপুরের খাবারের সময় হয়।  খাবারের মেনুতে বাংলাদেশি খাবার মেয়েটি বেশ আগ্রহ নিয়ে  খেলো । কয়েকটা বাঙালি পদের রেসিপিও জানতে চাইলো। সেই শুরু থেকেই খেয়াল করছি মেয়েটি যেন কিছু বলতে চায় আমাকে ।  আমিও আরও জানার আকাঙ্ক্ষায় বললাম --
-এখানে কে কে আছে তোমার । থাকো কার সাথে? আমার কথায় মলিন মুখে সে বলল ---
-আমি নিজের  ফ্ল্যাটে একাই থাকি। বাবা-মা অ্যারিজোনা তে থাকে।   
-এখনো বিয়ের কথা ভাবছনা?  
সে খুব  আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলো--
-দিদি  তোমাকে কিছু বলতে চাই  শুনবে?    
আমি তাকে আশ্বাস দিয়ে বললাম ---- আমাকে কিছু বলে তোমার যদি শান্তি লাগে অবশ্যই বলবে, আমার শুনতে ভাল লাগবে। কঠিন বাস্তবতায় ক্লান্ত, জন্ম পরিচয়হীন এক  দুঃখী মেয়ের মুখোমুখি বসে নিজেকে খুব অসহায় লাগছে। ভারাক্রান্ত মনে শুনে যাই তার কথা। দুচোখে সীমাহীন হতাশা নিয়ে পূর্ণিমা বলতে থাকে ---

-জানো  দিদি---শ্লীলতা- অশ্লীলতা, বৈধ- অবৈধ, কাঙ্ক্ষিত- অনাকাঙ্ক্ষিত এই শব্দগুলো এখনো আমার কাছে দুর্বোধ্য লাগে খুব!   
 আমি খুব অবাক হয়ে জানতে চাইলাম --এত কঠিন কঠিন বাস্তব কথা কেন তোমার  মনে!! 

তার দুচোখর পানি গাল বেয়ে নেমে আসে।
- দিদি আমার জন্মটাই  যে খুব কঠিন বাস্তবতার ভেতর ।  আমি বাংলাদেশ গিয়েছিলাম আমার জন্ম পরিচয় জানতে।  

আমি  অবাক বিস্ময়ে  শুনে যাই তাঁর কথা----

ডিসেম্বরের পনের তারিখ আমার জন্মদিন। ১৮ তম জন্মদিনের পর  "জন্মদিন" কথাটা কখনও আমার কাছে আনন্দ নিয়ে আসেনি বরং অজান্তেই ভয়ে শিউরে উঠেছি। মনের কোণে ভেসে উঠে প্লাস্টিকের প্যাকেটে প্যাঁচানো ক্রন্দনরত নবজাতক আর ভীত সন্ত্রস্ত সদ্য প্রসুতী যুবতী মায়ের আতংকিত চেহারা। "মা" কথাটি মনে পড়লেই আমার ভেতরে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। আমার তখন খুব ইচ্ছে করে মায়ের বাহুডোরে নরোম ওমের ছোঁয়ায় বুকের গন্ধে, মিশে থাকতে।

আচ্ছা, সে সময় আমার মা কি কেঁদেছিলো? তাঁর চোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু মুছে দেওয়ার মত কেউ ছিল কি পাশে ? নয় মাসের গর্ভ ধারণের কষ্ট মুহূর্তেও কি মনে আসেনি! আমার জন্মটা ছিল ঘৃণায়, না ভালবাসায়? নবজাতক কে নরম কোলে আদরে চুমু খেয়ে ঘুম পাড়ানোর বদলে তাকে নর্দমায় ফেলে দেওয়ার মত ঘৃণ্য একটি কাজের জন্য রাজী হয় যে মা---প্রহসন, পরিহাসকে চিরসঙ্গী করে সদ্য জন্মানো কচি প্রাণ থেকে মুক্তি পেতে চায় যে মা সেই মা কি কখনো ভুলতে পারে গর্ভ ধারনের কষ্ট, প্রসব কষ্ট ! গর্ভে ছোট প্রাণের নয় মাসের ছোঁয়া ! সদ্য প্রসুত মায়ের বুকে আর্তনাদ আর অনেক বেদনার জন্ম দিয়ে মাতৃত্বকে বদনাম করে নাম হয় ব্যভিচার। ঘৃণ্য অমানুষ রূপের এক প্রেমিক পুরুষ আমার বাবা--- যে পূর্ণিমা নামের ভ্রূণের সৃষ্টি করে দায়িত্ব জ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়ে কেড়ে নেয় সমস্ত সামাজিক স্বীকৃতি । সন্তানটির নাম হয় "জারজ"। সে পিতা কি মানুষ নামের দলভুক্ত ! মানবের বিস্তারে জরায়ূর দায়িত্ত্বে নিয়োজিত নারী শরীরের ভাঁজে ভাঁজে না পাওয়ার রঙ কি কোনো পুরুষ কখনো দেখেছে?   

পূর্ণিমার ক্ষোভ মেশানো কষ্টের কথা আমি বিস্ফারিত চোখে শুনে যাই । বুকের ভেতর শেল বিঁধে থাকে যেন।  

পূর্ণিমা আরও বলতে থাকে--- 

ডিস্ট্রিক বোর্ডের পাকা রাস্তাটি টিলা ঘেঁসে চলে গেছে অনেক দূর পর্যন্ত। টিলার উপরেই পর্যটন কর্পোরেশন এই বাংলোটি বেশ আধুনিক। বাংলোর সামনের অংশ সবুজ ঘাস আর মরশুমি ফুলে সজ্জিত। বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার এই বাংলোতে এসেছি আজা পাঁচ দিন।আমেরিকার বর্নিল একঘেয়েমি আর শিকড়হীন জীবনে হাঁপ ধরে গিয়েছিলাম। আমার মায়ের ফুলের সাথে আমার নাভির যোগাযোগ ছিন্ন করার সময়ই আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম আমার মা থেকে কিন্তু আমার শরীরে বইছে যে মা-বাবার রক্ত সেটা থেকে কি করে বিচ্ছিন্ন হই! তাই এসেছি আমি আমার শিকড়ের সন্ধানে এই দেশে। খুঁজে পাবো কিনা জানিনা। কেননা যে সমাজে আমি "জারজ সন্তান" নামে পরিচিত সেখানে আমার জন্মের এত বছর পর আমার প্রকৃত বাবা-মা কি আমাকে স্বীকৃতি দেবে? মেনে নেবে তাদের সন্তান হিসেবে! তাঁদের খুঁজবোই আমি কোন পরিচয়ে? নানান ভাবনায় মন অস্থির! আমার জন্মামদাত্রী মায়ের কাছে খুব জানতে ইচ্ছে করে--মা আমি জারজ সন্তান না হয়ে মানুষ হলাম না কেন ? 

দিদি ঠান্ডা লেগে যাবে গায়ে অন্তত ওলেনটা দাও---বিছানার চাদর টেনে দিতে যেয়ে খোলা বারান্দায় আরাম চেয়ারে বসে থাকা আমার দিকে চোখ যায় বাংলোর কেয়ার টেকার কলমির। ভাবনার অতলে ডুবে যাওয়া আমি তাঁর কথায় সম্ববিত ফিরে পাই। এতক্ষনে বুঝতে পারি বেশ ঠান্ডা পরছে গত কয়েকদিন যাবত। সাগরে লঘুচাপের প্রভাবে দিনভর থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ঠিক গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি না। মিহি জলের ছিঁটার মতো সূক্ষ্ম বৃষ্টি। তবে নিউ ইয়র্কের হাড় হীম করা ঠান্ডার কাছে এ খুব সামান্য। রাত দশটার মতো বাজে। পশমি শালটি নিতে ঘরে যাই। বিক্ষিপ্ত ভাবনারা মন দখল করে আছে আজ। জীবনের প্রথম ভোরে আমার কান্নায় আনন্দ ধারা বয়ে যায়নি কোথাও বা কারো প্রাণে। ঘরের ভেতর ফিস ফাস চলছে কি করে আমাকে সমাজের রক্ত চক্ষু আড়াল করে নর্দমার ময়লাতে ফেলে দেওয়া হবে। আমার জন্ম রাতেও নাকি এমন বৃষ্টি ছিলো। আমাকে প্লাসটিকের প্যাকেটে মোরানো পাওয়া যায়। আচ্ছা শেষ মূহুর্তে কি আমার জন্য আমার মায়ের মমতা কিছুটা জেগেছিলো! শাল গায়ে ফিরে আসি আবার বারান্দায়।  

জন্মের পর পর আমাকে ফেলে দেওয়া হয় ময়লা আবর্জনার স্তূপের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নোংরা নর্দমায়। করুণার প্রাণ ভিক্ষা চেয়ে আর্তনাদ করে উঠেছিলাম সেই নর্দমায় । কোন এক হৃদয়বান পথচারির চোখ যায় আমার উপর। সেই ব্যাক্তি তুলে এনে আমাকে দিয়ে আসে রাজশাহীর একটি অনাথ আশ্রমে।অনাথ আশ্রমের রেজিস্ট্রি বুকে "জনৈক পথচারী" এই নামটিই আমি খুঁজে পেয়েছি। আমার জন্ম রাতে ছিল ভরা পূর্ণিমা। তাই আশ্রম থেকে আমার নাম রাখা হয় পূর্ণিমা । 

আমি পূর্ণিমা উইলসন । নাম শুনলে সবাই ভাবে আমার বাবা অথবা মা আমেরিকান। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে সবাই একটু অবাক হয়ে যায় কারন আমার চেহারা পুরোপুরি বাঙালি। আবার কখনো ভাবে আমেরিকান ছেলে বিয়ে করে তার নাম নিয়েছি। তবে নাম আর চেহারার এই তফাতের জন্য আমাকে বেশ কৌতূহলী দৃষ্টি আর অবাক করা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।   

জুলিয়ানা উইলসন ও পিটার উইলসন দুটি পুত্র সন্তানের জনক জননী। আমেরিকার অ্যারিজোনার বাসিন্দা। একটি বেসরকারি সাহায্য সংস্থার কাজে তাঁদের বাংলাদেশে যেতে হয়। রাজশাহীর একটি অনাথ আশ্রমের নবজাতক বিভাগে আমাকে রাখা হয়েছিল। আমার বয়স তখন সাত দিন। নর্দমার পোকা-মাকড় আমার কচি নখের কোণা খেয়ে ফেলে। তাতে আমার আঙ্গুলে ও নাভীতে ইনফেশন হয়। আমি সেই সময় খুব কান্না করছিলাম।সাত দিন বয়সি ক্রন্দনরত আমার ছোট্ট মুখটির দিকে চেয়ে মিস জুলিয়ানার মনে দয়ার উদ্রেক হয় । সে কোলে নিতেই আমি শান্ত হয়ে যাই। তখন তারা সিদ্ধান্ত নেয় আমাকে দত্তক নেওয়ার। আমি হয়ে যাই পূর্ণিমা উইলসন। আমার ১৮ তম জন্মদিনে আমাকে জানানো হয় আমার প্রকৃত পরিচয়। তারা আমাকে নিজের সন্তানের মতই লালন করেন।  

আমার দুই চোখ উপচে উঠছে। ঝাপসা দৃষ্টি দিয়ে পাশে বসে থাকা পূর্ণিমার মুখটিও আমি পরিষ্কার দেখতে পারছিনা। বুকের ভেতর অনুভূতির চাপ এতোটাই প্রবল যে, আমি কেবল তাকে জড়িয়ে ধরে বলতে পারলাম ---এখন থেকে আমাকে মা ডাকবি। তোর সব রকম আদর -আবদার -আহ্লাদে আমি আছি তোর পাশে। 

হুহু করে কাঁদছে আমার মেয়েটি। কাঁদুক। মন ভরে আজ কাঁদুক।


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.