x

আসন্ন সঙ্কলন


যারা নাকি অনন্তকাল মিছিলে হাঁটে, তাদের পা বলে আর বাকি কিছু নেই। নেই বলেই তো পালাতে পারেনা। পারেনা বলেই তারা মাটির কাছাকাছি। মাটি দ্যাখে, মাটি শোনে, গণনা করে মৃৎসুমারী। কেরলের মাটি কতটা কৃষ্ণগৌড়, বাংলার কতটা তুঁতে! কোন শ্মশানে ওরা পুঁতে পালালো কাটা মাসুদের লাশ, কোন গোরেতে ছাই হয়ে গেলো ব্রহ্মচারী বৃন্দাবন। কোথায় বৃষ্টি টা জরুরী এখন, কোথায় জলরাক্ষুসী গিলে খাচ্ছে দুধেগাভিনের ঢাউস পেট। মিছিলে হাঁটা বুর্বক মানুষ সেসবই দেখতে থাকে যেগুলো নাকি দেখা মানা, যেগুলো নাকি শোনা নিষেধ, যেগুলো নাকি বলা পাপ। দেশে পর্ণ ব্যন্ড হল মোটে এইতো ক'টা মাস, সত্য নিষিদ্ধ হয়েছে সেই সত্যযুগ থেকে। ভুখা মিছিল, নাঙ্গা মিছিল, শান্তি মিছিল, উগ্র মিছিল, ধর্ম মিছিল, ভেড়ুয়া মিছিল যাই করি না কেন এই জুলাইয়ের বর্ষা দেখতে দেখতে প্রেমিকের পুংবৃন্ত কিছুতেই আসবে না হে কবিতায়, কল্পনায়... আসতে পারে পৃথিবীর শেষতম মানুষগন্ধ নাকে লাগার ভালোলাগা। mail- submit@sobdermichil.com

ভালোবাসার  আষাঢ় শ্রাবণ

অতিথি সম্পাদনায়

সৌমিতা চট্টরাজ

সোমবার, জুলাই ৩১, ২০১৭

পিনাকি চক্রবর্তী

sobdermichil | জুলাই ৩১, ২০১৭ |
ছাউমাস
কাশটা ভালো ভাবে ফর্সা হয়ে ওঠেনি। দুর্গার মা ,সবে মাত্র উঠানে পা রেখেছে। বাইরে একটা মোটা মতন লোক দাঁড়িয়ে আছে । জোরে বলল - হাভেলি থেকে খবর এলো , হুজুর তলব করেছে। 

বাবুরাম তাড়াতাড়ি লোকটির কাছে গেল । 

ঘরের ভিতর মেয়েটা বিছানায় ঘুমিয়ে কাদা হয়ে আছে । জানলার খুলে যাওয়া পাল্লা দিয়ে শেষ রাত অব্দি মরুভূমির তপ্ত বাতাস এসেছে । এখন ভোরের পাতলা আলো মুখটায় ক্রমশ ছড়িয়ে পড়েছে! মেয়েটার চুলের গোছা খুব সুন্দর, তবে তেমন একটা যত্ন নেওয়া হয়না । কিছুক্ষণ বাদে দুর্গা , গতরাতের বাসি রুটি খেয়ে স্কুলে যাবে । উমেশি সেই ব্যবস্থা করছিল । 

এই তল্লাটে মেয়েদের লেখাপড়ার ঝোঁক খুব একটা নেই ;দুর্গার রয়েছে। ওর বয়স ১২ । পাতলা চেহারার । সারাদিন জোয়ার-বাজরা ভেঙে যে পয়সা হাতে আসে, তাতে দু বেলা কোন রকমের দিন চলে যায় । রাত নামলে , পুরাতন কুপির আলোয় বাবা-মায়ের অসহায়তা ধরা পরে । উমেশি নিজেদের ব্যর্থতা লুকিয়ে রাখে । 

অনেক রাত পর্যন্ত কাঁপতে থাকা আলোয় , বাবা-মায়ের মুখে চিন্তার ছায়া বুঝতে অসুবিধা হয় দুর্গার । সেই ছায়ায় লুকিয়ে থাকা অন্তর্ভেদী উৎস খুঁজে পায়না তার নিরুপায় চোখ । এই চোখের দিকে তাকিয়েই বাবুরামের এক-একটা দিন কাটতে থাকে । 


ঘুম ভেঙে গেল । খাট থেকে নেমে , দুর্গা মেঝেতে বসল । দুর্গার ঘরের বাইরে , উঠানের ধারে, ছোট্ট পাতকুয়ার জল ছিটিয়ে- ছিটিয়ে বাবুরাম বলল

- উমেশি , হুজুর আমায় কেন ডাকল বলত ? 

দুর্গার মা উমেশি বলল - না গেলে আপনি বুঝবেন কেমন করে?

-তোর কি মনে হয় ? হাভেলিতে কাম দেবে? আসলে নায়েবটার সাথে আমার কথা হয়েছিল। জমিটাকে সরস করতে টাকা তো লাগবে ! 

-আপনি ঠিক জানেন , তাই ডেকেছে ! 

-কিন্তু ধর যদি জমিটা নিজের নামে লিখিয়ে নেয় ! 

-আপনি বলবেন হবেনা । 

- হিঃ হিঃ । এ তল্লাটের মাইবাপ কে বলব –হবেনা ! তাছাড়া চাষের জন্য টাকা ধার করেছি । সে টাকা আজ নয় কাল শোধ দিতেই হবে । ঘরে লড়কি বড় হচ্ছে । তার বিয়ে দিতে হবে । 

-টাকা ধার করেছেন বলে , সব কিছু মেনে নিতে হবে ? 

-তা নয় । এখন অবশ্য , হুজুর আমার ঘাড় ধরে লোক পাঠিয়ে লিখিয়ে নিতে পারবে না। খবর বাবুরা চেপে ধরবে। সে ভয় করিনা। উমেশি , তারপর ?

-তারপর কী ?

-এতো দেনা আছে । সরকারতো ঋণ মকুব করবেনা । তারমানে সংসার চালানোর জন্য , সাউকারের কাছেই তো যেতে হবে । 

দুর্গা চোখ দুটো হাতের চেটো দিয়ে ডলছিল । উমেশি ঘরে ঢুকে বলল , আয় তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে নিবি । 


২।

মাঠের নগ্ন –পাতাহীন পিপুল গাছের মাথার উপর রাতের নক্ষত্র ফুটে উঠেছে । তারপাশে বালি ভরা ছোট্ট পায়ে হাঁটা পথ , সেই পথ ধরে অনেকেই ফিরছে । সন্ধ্যা নামছে । বাবুরাম সেই পথ ধরেই ঘরে এল । কাঁধের ময়লা ঝুলিটা মাটির দাওয়ায় ধপ্ করে ফেলল । মুখে খুশি । উমেশি জানে না , তখনও বুঝতেও পারেনি , তার গৃহের সব চেয়ে দামি জিনিসটা নিলামে উঠেছে ! কথাটা পেরে ফেলতেই, খারিজ হয়ে গেল । 

-দুর্গা কি বাপু , দিমাগ ঠিকানে ম্যায় হ্যায়না ? বাচ্চা মেয়েটাকে ওই বুড়ো লোকটার হাতে তুলে দেবে ! 

-কেন ?? 

-ওর আগের পক্ষের বউ রয়েছে ! এই তল্লাটে সবাই জানে । 

- আমিও জানি । বউতো আর হাভেলিতে থাকে না । তাহলে , দুর্গার অসুবিধা কোথায় ? 

-সব জেনেও ? তুমিতো বাবা ! 

--শুন , হুজুর তোর জামাই হলে হামাদের ইজ্জৎ ভি বাড়বে ।

-না চাহে হাম ইয়ে ইজ্জৎ । এর চেয়ে মেয়ে আমার সারাজীবন বিয়ে করবেনা । তাও ভালো ...... 

-বোকামো করিস না। 

-আমি কিছু শুনব না। 

-আমি যে কথা দিয়েছি ।

-বলে দিও , লড়কি শাদি করতে চাইছে না । 

-কথা একবার দিলে , ফিরিয়ে নেওয়া যায়না ! তুইতো জানিস । 

-ইয়ে ভি জানি , বিয়ে হলে বেটি বেঁচেই থাকবে । কিন্তু এই থাকা , মৃত্যুর চেয়েও ভয়ানক । আমার লাডলি’কে এর চেয়ে বিষ দাও ।

-উমেশি আমাদের কাছে রুপাইয়া আছে ? বিষ কিনতেও টাঁকা লাগে রে ? 

উমেশি কথা না বাড়িয়ে রান্না ঘরের দিকে চলে গেল । বাবুরাম বলল  ... 

-ভাগ্য ভালো সুযোগ এসেছে । বেশি বুঝলে মেয়ে আর এই জীবনে শ্বশুর বাড়ির মুখ দেখবে না ! তখন আর কেঁদেও কিছু করতে পারবিনা ।


৩।

পাঁচ দিন পর । 

নায়েব বাঁজা জমিটার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল । বাবুরাম শুকনো মাটির ডেলা তুলছে । সূর্য আকাশের মাঝখানে । নায়েব হাত নাড়ল । 

-বড়া হুজুর ডেকেছে। জমির ব্যাপারে কথা আছে। 

- মালিক হামার বেটি এখন শাদি করতে চাইছে না । সাবের সাথে কথা হয়েছে । 

- আরে আগে বাতচিত হোক তারপর বলবি । শুন , তোর হাতে এখন কাম নেই, মালুম আছে তো ? হুজুর তোকে মেহেরবানি করবে । চলে আসবি ।

- আপ সামঝাও না। আমি কিছু করতে পারব না। বাড়িতে মেয়ের মা মানছে না। 

নায়েব হাঁটতে শুরু করল । কানে যাতে না পৌঁছায় , অন্তত যতটা দ্রুত যাওয়া যায় ; পা চালাল । নায়েব জানে বাবুরামেরা খুব অল্পেই ভেঙে পড়ে । আরে সবই অভ্যাস , মানে রক্তের বংশ পরম্পরাগত দাসত্বের থেকে পালানো –সহজ কাজ নয় । যদিও ইদানীং ব্যাটারা সেই চেষ্টা করছে ! যতদিন জমি আছে , ততদিন ঋণ আছে আর ততক্ষণই সুদের ফাঁসে , জড়িয়ে ফেলেবার সুযোগ রয়েছে । 

স্বাধীনতার বহু পরেও , এখানে সামন্ত্রতন্ত্রের কঙ্কাল পড়ে রয়েছে। রাজস্থানের সিরহি জেলার এই হত দরিদ্র গ্রামে জমিদারি হয়ত নেই ; অর্থের জোরে জমি ক্রয় করে প্রজা বানাবার নেশা আজও রক্তে প্রবাহিত । যাদের হাতে বিলাস করবার মতন প্রচুর অর্থ রয়েছে , তাদের শখ নেহাত কম নেই । এই তল্লাটের ধন কুবের , প্রতাপ চৌহানের এখন একটাই সাধ , একটা কুমারি মেয়ের সুখ নেওয়া । 

শেষ বয়েসে একটা বংশধরের আকাঙ্ক্ষা মারণ রোগের মতন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে । তাছাড়া রাজপুতানায় বীর রমণীর কাহিনীর অভাব না থাকলেও , রমণীর উর্বর যোগানে এখন ভাঁটার সময় চলছে । অবস্থা এতটাই বাড়ন্ত , আশে পাশের পাঁচটা গ্রামে হাতে গোনা বিবাহযোগ্য মেয়ে পাওয়া যাচ্ছে । এখানেই থেমে থাকেনি রীতিমতন সন্তান উৎপাদনের চাহিদা থেকে , মেয়েদের টাকার বিনিময়ে একাধিক বিয়ে দেওয়া হয় । 

বাবুরাম নায়েবের গন্তব্যের দিকে তাকিয়ে রইল একদৃষ্টিতে । নায়েব যদি একবার অন্তত ঘাড় ফেরায় ! নায়েব যদি একবার অন্তত শুনতে পায় ! শেষে , বছর পঁয়তাল্লিশের অসহায় মানুষটি বছর ষাটের নায়েবের চলে যাওয়া দেখে , আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল । এই আকাশে মেঘ খেলা করে আচমকাই । বহুদিন চাষিরা রোদকেই মেঘ ভেবে নেয় । বাড়ি ফিরেই নায়েবের কথা গুলো উমেশিকে জানাবে । 

#

বাবুরাম রুটিটা কপাত করে মুখে দিল । চোখের কোণ দুটো থেকে জল গড়িয়ে নামছে। রাত দশটা মানে এখানে গভীর রাত । দাওয়ায় দু’জন বসেছে । উমেশি আর বাবুরাম । বাবুরাম বুঝে গিয়েছে, প্রতাপ চৌহান তার জায়গা থেকে একটুও সরবে না । 

স্বাধীনতার বছর ঘুরেও, এই দেশে এখনো যথার্থ স্বাধীনতার দেখা মেলেনি । এক বাবা নিজের মেয়েকে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে ! তাও এই কথা বলা যাবেনা , কেননা খবরের কাগজ যেখানে সবার হাতে এসে পৌঁছায়না , সেখানে শহর থেকে বাবুরা আসবেন বাঁচাতে ! 

বাবুরাম জানে এই আধপোড়া গ্রামে আর পাঁচটা মেয়ের যে পরিণতি , দুর্গা র তাই হবে । পঞ্চায়েত , গ্রামের লোকজন , সবাই অন্ধ হয়ে থাকবে । ওদেরকে হুজুর কিনে নিয়েছে । আকাশের বুকে চোখ রেখেছে , বাবুরাম । গরুর বাঁট দুধে ভরে গেলে , যখন গোয়ালা সবটুকু দুইয়ে নেয় ; কিছু দুধ নিজের সন্তানের জন্য রাখবার করুণ চিত্র দেখা যায় মায়ের মুখে ; তেমন কাতর ভাবে বাবুরাম মনে মনে বলল - “বৃষ্টি না দাও, টাকা তো দিবে রাম ! ’ 

বাবুরাম খেয়ে উঠল । কুয়ো তলায় গিয়ে মুখ ধুয়ে দাওয়ায় উঠে বলল – তোরা শুয়ে পর । 

#

গভীর রাত । আকাশের জ্যোৎস্না , বাবুরামের বাড়ির ভিতরের উঠান ভিজিয়ে দিচ্ছে । সে সন্তর্পণে জানলার কাঠে মুখ রেখে, বিছানার উপর ঘুমিয়ে থাকা মেয়েটাকে দেখছে । দুর্গার মুখ মণ্ডল এক অসহায় বাপের ঋণ মুক্তির দলিল হয়ে পড়ে রয়েছে ! 

ঘরে খাটের এক পাশে উমেশি ঘুমোচ্ছে। বাবুরামের সংসারের প্রতি যত টান , অনেকটাই দখল করে রেখেছে দুর্গা। বয়স বাড়ছে মেয়েটার । শহর থেকে পছন্দে ছেলে পেতে হলে অনেক টাকা চাই । হাতে তাও নেই । বাবুরাম আর পাঁচটা বাপের মতনই ক্রমশই যেন নিজের মেয়ের সুখ - অর্থ , প্রভাব , আর প্রতিপত্তির মিথ্যা স্বপ্নে হারিয়ে যাচ্ছে ! বাবুরাম নিজেও জানেনা , কেমন ভাবে এই চোরাবালি থেকে নিজে উদ্ধার পাবে । সে খুব গরীব । ঋণগ্রস্ত কৃষক । সে এতটুকু বুঝতে পারছে , এতদিন বাদেও , এই দেশে কৃষকদের জন্য বিন্দুমাত্র সুযোগ তৈরি হয়নি । রাজনীতি শুধুই ক্ষমতা দখলের জন্য । তার মতন কৃষক আজও প্রতাপ চৌহান মতন সুদখোরদের হাতের পুতুল । 


৪।

বাবুর নেক নজরে দুর্গার পড়ে যাওয়ার কথা , এখন আর শুধু মাত্র কথা নেই । বাবুরাম পীঠটাকে মাটির দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসল । যেদিকটায় বসেছে, পাতলা হয়ে আসা উটের আলপনা রয়েছে ; বাড়ির ছোট্ট দু হাতের আদর লেগে রয়েছে। দাওয়ার উল্টো দিকে উমেশি , বাসন মাজছিল । 

রাত হয়ে এল । খাওয়া –দাওয়া শেষ হল । বাবুরাম বলল - সন্ধ্যা বেলা , বাহাদুর খাঁ এসে বলে গিয়েছে , এই বেলা বেটিকে পার করে দিতে , তা নাহলে বিপদ । গ্রামের মোড়ল কিন্তু হুজুরকে চটাতে চাইছেনা । 

বেশ কিছুটা মনোমালিন্যে এবং অনেকটাই বাধ্য হয়ে , একসময় দুর্গা হাভেলির মালকিন হয়ে গেল । মালিকের এটা তৃতীয়বার । উমেশি জানে তাদের সরস জমি বাঁজা হতে যতটা সময় নেয় , তার থেকেও দ্রুত ওদের ভাগ্য ফিরবে । 

বাবুরাম জানে , এর পরও তার জীবন একটা আতঙ্কের উপত্যকা হয়ে উঠবে । হুজুর , লগ্নি করেছেন । উনি লাভই দেখেন । সেই সুদ সমেত লাভ ঘরে না এলে , বাবুরামের ছাড় নেই । ঋণ মকুব করাটা যদি বিনিয়োগ হয় ; দুর্গার পুত্র সন্তান লাভ - সুদ সমেত ফেরত হবে । 


#

বছর ঘুরতে না ঘুরতেই , দুর্গার পেট তরমুজের মতন ফুলে ওঠে । ঘন ঘন হাভেলি থেকে বাদাম আসছে, গরুর দুধ আসছে। পাগড়ি পড়া পাহারাদাররা মনে করিয়ে দেয় , দুর্গার পিছনে সাউকারের লগ্নি কোন অংশেই কম নয় । বরং সেটা আদায় না করে কোন মতেই ছাড়া যাবেনা । তাকে বংশধরের জন্ম দিতেই হবে । 

যেদিন প্রসব বেদনা উঠল , মেয়েটার ছট ফট যন্ত্রণায় , ঘরের বাইরে বাবুরাম ভগবানজি কে দুষছিল । ভিতরে দাই আর উমেশি । মেয়েটা বেঁচে থাকলে ওকে আবারও মা হতে হবে। এমন ঘটনা এই তল্লাটে নতুন নয়, সব বাবাকেই এমন একটা দিনের অপেক্ষায় থাকতে হয় । 

ছোট্ট মেয়েটার গোঙানি শুনছে । কান ফেটে যাচ্ছে । বাবুরাম জানে, উমেশি তার স্বামীকে দালাল ভাবছে । ভাবুক। 

#

বাবুরাম বাইরের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল । 

-দাই কি হল? 

উমেশি বলল । 

-বাইরে , শোনা যাচ্ছে না ? 

বাবুরাম বুঝতে পাচ্ছে , উমেশি কিছুটা রেগে গিয়েই বলেছে । বাবুরাম বলল  ... 

-দুর্গার খুব কষ্ট হচ্ছে ? 

- কী করব ? জহর দিও । মার দিও । 

- আমাকে যত পারিস বল । 

-আপনি এই বিয়ে নাও দিতে পারতেন, দুর্গার বাপু । 

- তুই তো জানিস , ওরা পাহারাদার পাঠাত , লড়কি কে তুলে নিয়ে যেত । তারপর... । এখানে থাকতে পারতিস ! হুজুর ছেলে চায় । নায়েব বলল , আইবুড়ো মেয়ে জোর করে তুলে নিয়ে যাবে । তখন এই গ্রামে আমরা থাকতে পারব না। হামাদের জা যাওয়ার তা যাবেই । তাই বুদ্ধিমানের কাজ এটাই । আমি এটা না করলে মেয়েটা বাঁচত না রে ! 

- ইয়ে জিন্দেগী ভি কোয়ি কামের , দুর্গা কি বাপু ? 

#

ভগবান মুখ তুলে তাকাল না। এই দেশে মেয়ের জন্ম দেওয়া , মরা বাচ্চা হওয়ার চেয়েও খারাপ খবর । দুর্গা সেই পাপ কাজটা করল । এমন খবর ছড়িয়ে গিয়েছে মুহূর্তেই । সারা গ্রাম ,আর গ্রামের পর মরু প্রান্তর পেড়িয়ে এক উত্তপ্ত দুপুরে মহাজন প্রতাপ চৌহানের কানেতে পৌঁছাল । তার দুচোখ ভরা লোকসানের রাগ । 

বাবুরাম নিজের সর্বনাশের খবর দিতে গিয়ে , হুজুরের ঘাড় ধাক্কা খেয়েছিল । ঘাড় গুঁজে ফিরে যেতে হবে । 



৫।

বছর ঘুরছে । দুর্গার অপুষ্ট শরীরটা খুব অল্প –অল্প করে বেড়ে উঠছিল । মানুষের জীবন এগিয়ে চলে। ছন্দ পতন ঘটলেও , নিজ হাতে থামিয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে চলা সম্ভব নয় । সেটা ভালো হতে পারে, নতুবা মন্দ । গ্রামের কাছে বাবুরামের ঘর , শয়তানের বাসা। আর চোপাটিতে গিল্লি-ডাণ্ডা খেলা বাচ্চারাও ওদিক পানে ফিরেও তাকায় না । পঞ্চায়েত ওদের একঘরে করেছে । 

#

গরমের ভাঙাচোরা বিকালে আকাশে খাপছাড়া আলো মেখে আছে । হাভেলির ভিতর কাঁচের ঝাড়বাতির আলো শরবতের গ্লাসে খেলা করছিল । বাবুরাম হাভেলিতে এসেছে। সামনে নরম গদিতে থলথলে দেহ ছড়িয়ে শুয়ে রয়েছে , প্রতাপ চৌহান । সামনের টেবিলে বিদেশি ব্র্যান্ডের মদের বোতল। বাটি ভরা কিসমিস আর কাজু । রুপোর গ্লাস হাতে তুলে নিয়ে , বড় সাব বাবুরামকে হুকুম করল ...

-তুই ! এতদিন বাদে ! টাকাটা শোধ কবে দিবি ?

বাবুরাম দেখল , হুজুর সাদা ধুতি –পাঞ্জাবি পড়ে রয়েছে । ধুতিটা ডানদিকে হাঁটু পর্যন্ত ওঠানো । নেশায় হুঁশ নেই । 

বাবুরাম বলল 

-হুজুর আপনি ডাকছিলেন । 

-সে ঠিক , তা একমাস আমার লক্ষ্মণ কে ফিরিয়ে দিচ্ছিলি কেন ? 

-হুজুর মেয়েটা বড় হচ্ছে । তাই ভাবছিলাম আপনার কাছে...

-সেই জন্যই তো লোক পাঠাচ্ছি । মেয়ে না দিবি , তো টাকা দিবি ? 

-অত টাকা আর এই জীবনে দিতে পারবনা হুজুর । মেয়েতো আপনারই ।

কথাটা শুনে , আচমকাই প্রতাপের মুখের রঙ পাল্টে যাচ্ছে । বলল ...

- বেটী ক্যা ভেইজ দিজিয়ও । বিন্দিনি(বউ) হ্যা হামার । তুম রুপিয়ে পাবে। লেকিন হারামের বেটী যেন না আসে। হামার পণ্ডিত বলেছে । এবার লেড়কা হবে।তাই রাতের মধ্যে বন্দবস্থ করও। 

-হুজুর দুর্গার শরীর ভালো নেই । 

-ক্যা !! আমার বংশধর আগে না তোমার মেয়ের শরীর ? জমির জন্য যে ধার আছে মকুব করতে হবে না ? 

-হুজুর মাইবাপ , আমায় এত্ত বড় সাজা দেবেন না। মেয়েটা মারা যাবে। আখরি মোকা দিজিয়ে। । দুর্গা এখন বিমার আছে। 

- তুম শালে রুপাইয়া নেবে কুত্তা মাফিক । আর কুছ কামে আসবে না !! 

-হুজুর আপনারতো ছেলে চাই ! না হলে এই সম্পত্তি দেখবে কে ?

-ঠিক ...

প্রতাপের চোখ নেকড়ের মতন শিকারমুখী হয়ে উঠেছে । বাবুরাম হাত জোর করে বলল 

-হুজুর আমি যদি আপনাকে পথ বলে দি । 

-কী উপায় ?

- হুজুর , আমি মুখটা আপনার কানের কাছে নিয়ে যাচ্ছি । চারপাশ ভালো নয় । দেওয়ালের পিছনেও কান আছে । 

হাভেলির হাল্কা আলোয় দুই ছায়া মূর্তি , মাখামাখি হয়ে গিয়েছে । বাবুরাম কিছু একটা বলছে । প্রতাপ চৌহান মন দিয়ে শুনছে । এখানে আর অন্য কেউ নেই । 


#

সন্ধ্যায় উঠানের মাঝখানে প্রদীপ রাখতে গিয়ে , উমেশি দেখল , বাবুরাম দাঁড়িয়ে । 

-কি হয়েছে দুর্গার বাবা ?

-হুজুর আবার দুর্গাকে পাঠাতে বলেছে ।

-মেয়ের যে হাঁপ ধরেছে । কিচ্ছু নেই শরীরে । 

- জমির জন্য আমরা যে টাকা নিয়েছিলাম , সুদে অনেক হয়েছে ! 

-মেয়েটাও যে একটা ? দুর্গার ক্ষতি আমরা করেছি । এইবার মেরে ফেলব ! 

-ধুর... শুধু দুর্গা নেই এইবার তার মেয়ে আছে । তাকেও বাঁচাতে হবে । 

-দুর্গা মারা যাবেই । 

-যাবেনা ।

-ওর শরীরে সব শুকিয়ে যাচ্ছে ।

-দেখ উমেশি , বাবু একটা ছেলে চাইছে । দুর্গার ছেলেই যে হতে হবে তা নয় ।

-মানে ?

হাতের ইশারায় উমেশিকে কাছে ডাকল । কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলল ।  ঘরের ভিতর দুর্গা আর তার মেয়ে । 


৬। 

এক অন্ধকারের রাতে, ভাঙা তারা গুলোর আলো - বালির সমুদ্রে চিক চিক্ করতে করতে মিশছে । গোটা গ্রাম ঘুমিয়ে পড়েছে । তখনই ঘটে গেল ! গোটা পৃথিবী এই খবর জানল না ; বাবুরাম আর উমেশির দুটো হৃদয়ে গোপন চুক্তি ঘটে গেল । খোলা বারান্দায় ,ওরা পাশাপাশি শুয়ে রয়েছে । উমেশি উঠে বসল ।

-হামার ডর লাগছে , দুর্গা কি বাপু । 

-কুছ ভাবিস না । হামাদের নসিব আসমানের আন্ধারের মাফিক । মালিকের পণ্ডিত বলেছেন , যা হওয়ার আজ রাতেই হবে । 

-যদি আমরা ভুল হই ! 

-মেয়েটাকে বাঁচাতে হবে । 

-ভয় হচ্ছে । 

-আরে ভয় কিসের ? এই তল্লাটে কেউ হুজুরের মুখের উপর কথা বলেনা । কেউ কিছু বলতে সাহস করবেনা । 

- যদি আমরাও ভুল হই ! 

- তোর অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল না , একটা ছেলের মুখ দেখার ?

-আর ছেলে ! মেয়েটাকেই বাঁচাতে পারছি না ! 

- তুই ওয়াদা ভুলে যাস না !! মেয়েটা বাঁচবে । 

আলোআঁধারিতে বাবুরাম কাছে টেনে নেয় উমেশিকে। সোহাগ , ভালোবাসা, আশা ভরসায় আরও একবার গর্ভবতী হল উমেশি ...  


#

আরও এক বছর পর ,বাবুরাম হাভেলিতে এলো । মদের নেশায় সাউকার চোখ বুজে রয়েছে । তখন হাভেলির বাইরে রাত যেন বাবুরামের ঋণ মুক্তির বার্তা বহন করে চলেছে । হাতে সদ্যজাত মাংস পিণ্ড ,নড়ছে , উল্লাসে । বাবুরামের হাত কাঁপছে।  তালুতে , সদ্যজাত শরীরের উষ্ণতা । 

বাবুরামকে দেখে , নেশায় ঝাপসা হয়ে ওঠা প্রতাপ চৌহানের চোখ , ছাইচাপা আগুন হয়ে জেগে উঠল । 

-বোলও রাম । আমার জন্য , কি এনেছ ? 

-হুজুর বেটা । 

বুড়ো চোখ চোখ দুটো লাভের নেশায় মশগুল হয়ে উঠেছে । 

হুজুর বলল ...

-তুই কি করেছিস !!!!! দাঁড়া ।

প্রতাপ চৌহান জোরে ডাকল , - দাই 

বছর ষাটের এক বৃদ্ধা অন্তর মহল থেকে বেরিয়ে এল । মুখে ঘোমটা দেওয়া । সে হাত বাবুরামের সামনে দু’হাত পেতে দিল । বাবুরাম কাঁপতে –কাঁপতে সদ্যজাতকে দিয়ে দিচ্ছে । বৃদ্ধা ভিতরে চলে গেল । 

বাবুরাম , হুজুরের দিকে তাকিয়ে বলল ...

-শয়তান চলে গিয়েছে হুজুর , দুর্গার ছেলে হয়েছে । আপনি বলেছিলেন , আপনার ছেলে চাই । নিন বংশধর । 

-বাবু তু , হামার রাম আঁচিস । তুই কী পাগল হয়ে গেলি ! এটা তো তোর ছেলে । আমি তোকে বলেছিলাম দুর্গা বা উমেশি যে কেউ একজন আমায় বংশধর দিলেই হবে । তা তুই আর উমেশি ছেলে নিলি । সেই ছেলে আমাকে দিলি । আর দুর্গা আর আমার মেয়ে হয়েছে , তুই নিয়েছিস ।তুই নিজেই তো সেই দিন হাভেলিতে এসে আমাকে বললি ! আরে এতটা বফাদার হতে হবেনা । আমার সামনে মিথ্যা না বললেও চলবে । শুধু বাইরে কেউ জানবে না । 

-না হুজুর । হামি বাপ । এক লাচার বাপ । এই ছেলের বাপ আর দুর্গার বাপ । আপনি নিন । ছেলেটাকে নিন । আমি ওকে ভুলতে চাই । আমার শুধু আজ থেকে দুই মেয়ে । 

বাবুরামের গাল ভরা কয়েকদিনের বাসি দাড়ি । চোখে কালো ছাপ দেখা যাচ্ছে । সেই চোখের দিকে তাকিয়ে বুড়ো হুজুর বলল 

- তুই ক্যামন আছিস ? 

এই প্রথম বাবুরাম বুঝতে পারল ; হুজুর খুশ হয়েছে। শরীর খারাপ কেবল মাত্র মনিবদেরই করে। হুজুরের প্রশ্নে টের পেল বাবুরাম , বংশধর রক্ষার দায়িত্ব সে ভালোভাবেই পালন করতে পেরেছে । বাবুরামের দাদা-পরদাদার মুখ ,সে রেখেছে। 

বাবুরামের শুকনো মুখে , হাসতে - হাসতে পোকায় ক্ষয়ে যাওয়া দাঁতের পাটি বেড়িয়ে এল । মাথা নাড়িয়ে বলল ...

- ম্যায় ঠিকঠাক হু ... হুজুর। 

-তোর বিন্দিনির ঠিক আছেতো ? দেখিস বউটাকে আবার অযত্ন করিস না। এতবড় ধকল গেল !

বাবুরাম বুঝতে পারছে না , হুজুর কোন ধকলের কথা বললেন ? উমেশি নিজের হাতে , নিজের ছেলেকে দিয়ে দিয়েছে , মেয়েটাও শেষ পর্যন্ত আর শ্বশুর বাড়ির মুখ দেখবে না হয়ত ! মায়ের কাছে সত্যিই কি ছেলে আর মেয়ের শোকের মধ্যে ফারাক আছে ? হুজুর যে ঋণ দিয়েছে , তাকে বংশধর দিতেই হবে । বাবুরাম এতটুকু বুঝে গিয়েছে , সে মুক্তি পাবেনা । নিজের গলার ভিতরে বমি হয়ে আটকে থাকা চাপা আর্তনাদ গিলে ফেলেছে, বাবুরাম । বলল ...

-সে ঠিক হুজুর । ওই বলল , আপনাকে খুশি করতে পারলেই সে খুশি । 

-হ্যা হ্যা হ্যা হ্যা............। ইলে মিঠাই খা । তোর বউকে একবার আনিস । একটা সোনার হার দিব । 

-না হুজুর । ওই সব কেন ? অনেকতো দিয়েছেন । 

-কিউ ? শরম ! 

বাবুরাম ঘাড় নামিয়ে রেখেছে । হুজুর বলল 

-লে , খানা খাঁ । ইলে সরাব। আরে তোর লড়কির সাথে শাদি হয়েছে , তাই শরমাচ্ছিস ? 

- না হুজুর , মাই বাপ । রাম কসম ,এটা হামি বিলকুল ভাবিনি । উমেশিভি জানে , ওটা একটা সওদা । কোথায় আপনি আর কোথায় আমি আর আমার দুর্গা ! আপনার হাভেলির সাথে রিস্তেদারির বাত ! আপনার মেহেরবানি হুজুর । তাই আপনি দুর্গাকে পসন্দ করলেন । হুজুর দয়া করুণ ।

বাবুরাম কেঁদে ফেলল । দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল , প্রতাপ চৌহানের পা । 

বাবুরামের মাথায় হাত আলতো ভাবে ছুঁইয়ে প্রতাপ বলল 

- মসহারা পাঠিয়ে দিব । অত ভাবছিস কেন ? আমি অত খারাপ নই । 

- হুজুর একটা অনুরোধ আছে । 

- বল । 

- দুর্গাকে নিন ।

-দেখ হাভেলিতে এমনিতেই অনেক বাড়তি জিনিস আছে । এগুলো সাফ করতে হবে । আবার বাড়তি মাল রাখা কেন ? দুর্গা আমার কাছে বেকার হয়ে গিয়েছে । 

বাবুরাম কাঁদতে –কাঁদতে বলল 

-মাঝে মাঝে দুর্গা কে হাভেলিতে আসতে দেবেন ? না হলে আমি মুখ দেখাতে পারব না। 

- কেন ? রাখনা তোদের মেয়ে , তোদের কাছে । 

-লোকে খারাপ বলবে হুজুর । 

-কিচ্ছু বলবে না । আর শোন , তোদের কাছে যখন টাকা থাকবে সুখ থাকবে , জমি থাকবে, খুশি থাকবে । এই তল্লাটের লোক চুপ থাকবে ।

-উমেশিকে বোঝাতে হবে হুজুর । 

-তাহলে শোন । দুর্গা আসবে । তবে আমি যখন চাইব তখন । 

-ঠিকাছে হুজুর ?

- আর হ্যাঁ , তোঁরা কখনো জানাবিনা ইটা তোদের ছেলে । 

- জরুর হুজুর । আমার কাজ চাই ... 

- দেখ বাবুরাম । আমি তোর মেয়েকে বিয়ে করেছিলাম দুটো কারণে । তোর মেয়ের জন্য আর তার থেকে বংশধর পাব বলে । দুটোই তুই দিলি । মানলাম , এই ছেলে উমেশির , দুর্গার নয় । তাতে আমার কোন অসুবিধাই নেই । গোটা মহল্লা এই কথা কোনদিনই জানতে পারবে না । তাই তুই কাজ নিয়ে ভাবিস না। 

-হুজুর সে ঠিক । আমি উমেশিকে তাই বলেছি । গাঁও চোখে দেখতে পায়না । আর কানেও শুনতে পায় না। 

- আমি আজ খুব খুশি । 

-হুজুর আমার কাজটা হবে তো 

- আরে জরুর জরুর । 

#

প্রতাপ চৌহানের হাভেলিকে পিছনে ফেলে , বাবুরাম মন্থর গতিতে হেঁটে চলেছে। দু চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে । এই মরুভূমির প্রান্তরে , ঘামও ঝরেনা ! জলের বড্ড অভাব । শেষ অব্দি দুর্গা হাভেলিতে আসবে – এটাই অনেক বড় কথা । এত আনন্দের মধ্যেও উমেশি কাঁদবে ; ছেলের জন্য। বউটার সাধ ছিল। সবটা পূরণ নাইবা হল , এখণ দুর্গার মেয়েই তাদের সব । 

বাবুরাম আরেকটু ভাবল । এই যে নিজের সন্তান , হুজুরকে দিয়ে দেওয়া । এই ফন্দি তার নিজের । হুজুরের নাম দিয়ে চালিয়েছে শুধু , তা নাহলে উমেশি দিত না । সেই যে সবচেয়ে বড় সওদাগর ! তাও এই মুহূর্তে সে নিজকে ঘৃণা করতে পারল না । তারকাছে দুর্গার আর তার মেয়ের জীবন বাঁচানো বেশি দরকার ছিল । 

বাবুরাম ভাবছে , দুর্গার মেয়ের বিয়ে দিলেও ঘরে টাকা আসবে । বহুদিন বাদে সুখ আসছে , বৃষ্টির আভাসের মতন । এই তল্লাটে শাদির জন্য লড়কির অভাব রয়েছে । ওর লড়কি , পুরুষ সন্তান দিয়েছে ; খবরটা আশপাশের অনেক গ্রামে ছড়িয়েছে । গ্রামে ফিসফিসানি হবে , সাহস হবে না । কেননা চৌহানের সম্মানের সামনে এরা খুবই দুর্বল । 

বাবুরাম রাতের মরুভূমির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল - উমেশি এইবারের মতন বাঁচিয়ে দিল ! বউটাকে কিছুই দিতে পারলাম না ! ওর কাছে ঋণীই হয়ে রইলাম । 

মাউন্ট আবুর বুক ঘেঁষে হাল্কা জলীয় বাষ্প ভরা হাওয়া , নোংরা পাগড়িটা ছুয়ে গেল । টের পাচ্ছে । ঘরটাকে পাকা করতে হবে। দালান বাঁধাতে হবে। খুব দেরী নেই, ছাউমাস (বৃষ্টির মাস ) আসছে। গরমের মাস কাটলেই বৃষ্টি নামবে । গোটা রাজস্থান সাজবে নতুন ভাবে । সবাই ভেসে যাবে । সকলেরই দুঃখ , আনন্দের অজুহাতে ঘর থেকে রাস্তায় নেমে আসে । পথে – পথে গানের আসর বসে । মেলা বসে । উটের শরীর রঙিন কাপড়ে মুড়ে , প্রদর্শনী করা হয় । সেখানে কত সাদা –চামড়ার সাহেব আসে । উমেশি নতুন একটা ওধনি কিনবে , হলুদ –গোলাপি রঙের । বাবুরাম এতসব ভাবছিল । 

এত কিছুর ভিতরেও আচমকাই বাবুরাম কেঁদে ফেলল । ছোট্ট মাংস পিণ্ডটার অমোঘটানে । সে বুঝতে পারল , এটাই বেঁচে থাকা । না হয় উমেশি , বাকি জীবন বাবুরাম কে ঘেন্নাই করবে । নাহয় বাকি জীবন বাবুরাম হুজুরের হাভেলি তে ঘুসবার জন্য , ছুঁতো খুঁজবে । না হয় নিজের ছেলে একটা পাক্কা সাউকার হয়ে উঠল । মা ও ছেলের মাঝে এক শক্ত দেওয়াল থাকল । এত সব কিছুর শেষেও অসহায় বাপ বেঁচে রইবে ! 

ছাউমাস আসছে । তপ্ত মরুভূমির বুকে বৃষ্টি ঝরবে । দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষার শেষে , আকাশ থেকে নামবে ফুলের মতন জলের ফোঁটা । সে এক স্বর্গীয় মুহূর্ত ! বাবুরামের চোখে এখন ছাউমাসের জল । দীর্ঘ অপেক্ষার শেষে প্রাণের সঞ্চার ঘটতে চলেছে । সে আর ছেলেটাকে নিয়ে ভাবতে চায়না । 

এই প্রথম সে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে , উমেশির দুটো মেয়ে আছে । দুর্গার জীবনে যে ঝড় উঠেছিল , বালির ঝাপটা মাত্র । এখন সেই ঝাপটা ক্রমশই পরিষ্কার হয়ে চলেছে। কষ্ট যদি সত্যি হয় , তবে সুখের আনন্দে মেতে থাকাটাই জীবন । তার এখন পিছুটান বলতে উমেশি , দুর্গা আর দুর্গার মেয়ে । 


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.