x

প্রকাশিত

অর্জন আর বর্জনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ সিদ্ধান্তের নিরিখে দোলাচলে।সেখানে প্রতিবাদও ভঙ্গুর।আর যথার্থ প্রতিবাদের থেকে উঠে আসে টায়ার পোড়ার গন্ধ।আঘাত প্রত্যাঘাতের মাঝখানে জন্মদাগও মুছে যায়।সংশোধনাগার থেকে ঠিকানার দূরত্ব ভাবেনি কেউ।ভাবেনি হাজার চুরাশির মা’র প্রয়াণ কোন কঠিন বাস্তবকে পর্যায়ক্রমিক প্রহসনে রূপান্তরিত করেছে।একটা চরিত্র কত বছর বেঁচে থাকে ?কলম যাকে চরিত্রের স্বীকৃতি দেয় তেমন পোস্টমর্টমের পড়ও আরও কয়েকযুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে কলমই। অভয়ারণ্যেও ঘেরাটোপ! সেই আপ্তবাক্য -

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

ভাববার সময় এসেছে। প্রতিবাদটা কোথা থেকে আসে—বোধ ?মস্তিষ্ক ?মুঠো? না বাহুবল?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

বিদিশা সরকার

সোমবার, জুলাই ৩১, ২০১৭

নীপবীথি ভৌমিক

sobdermichil | জুলাই ৩১, ২০১৭ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
শ্রাবণ
 শখের বাইকটা হঠাৎই রাস্তার বাঁদিক ঘেষে দাঁড় করিয়ে শ্রাবণ নেমে আসতে বললো অনুরাধাকে।

-কি বলিস কি রে তুই? তোর কি মাথাটা সত্যিই খারাপ টারাপ হয়ে গেলো নাকি ? এই অসময়ে এখন হস্টেলে ফিরে না গিয়ে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে চা খেতে বলছিস ? ...অনুরাধা বেশ খানিকটা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলো শ্রাবণ কে।

-আরে আয় না বাবা ! তুই তো কোথায় শান্তিনিকেতনের মেয়ে,কোথায় এই ভরা বর্ষায় আকাশ ছেয়ে যাওয়া মেঘের নিচে দাঁড়িয়ে আমার হাতে হাত রেখে একটু গাইবি, কয়েক লাইন কবিতার সুরে ভরিয়ে দিবি তোর হবু জীবনসঙ্গীকে, আর তা না করে, তুই বলছিস এটা একটা অসময় ! এখন হস্টেলে ফিরতে ! ধুর তোদের শান্তিনিকেতন আজকাল বড় আধুনিক হয়ে যাচ্ছে বুঝলি, আমার কলকাতাই বরং ভালো । ... মুখে মৃদু অনুযোগের রঙ চড়িয়ে শ্রাবণ দুকাপ চায়ের অর্ডার দিলো।

#

জানলার ভিজে যাওয়া কাঁচের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অনুরাধার আজকাল ভীষণ ভাবে মন চায় একটু ভিজতে। দু’একটা বাড়ি ছাড়া শহরের সব বাড়িগুলোই এই মুহূর্তে ঘুমের দেশে ওদের সংসার সাজিয়ে বসেছে। অথচ দ্যাখো,রাস্তার ত্রিফলা বাতিগুলো এভাবেই কেমন করে জেগে থাকে সারা রাত! আর তাই মনেহয় এত সহজ সুন্দর স্বর্গীয় অনুভূতি নিয়ে রাত-বৃষ্টি জলের সাথে আনন্দ স্নানে ডুবে যেতে পারে।

-চল,এবার ঘুমাবি চল।
কাধেঁর ওপর রাখা হাতের স্পর্শেই অনুরাধা বুঝতে পারে,এই স্পর্শ কার হতে পারে আসলে। 
-কি হবে বল না এসব ভেবে ভেবে? আমি বুঝি অনু। বয়সটা তো নেহাত কম হলো না রে! তোর বয়সটাও আবার আমারও একটা সময় ছিলো। সরমা ... ওনার একমাত্র পুত্রবধু অনুরাধার কাঁধে হাত রেখে কথাগুলো তাকে বলে গেলেন ...

এ বাড়িতে আসার পর থেকে অনুরাধার অভিভাবক, বন্ধু, মা বাবা সবকিছুই বলতে ওর শ্বাশুড়ি মা সরমা। বড় ভালো মানুষটা। আর ভালো বলেই বোধহয় সুখ ওনাকে ছুঁয়ে দেখতেও চায় না একবারের জন্যও। শ্রাবণের বাবা ওনাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকে একটু বড় শ্রাবণ আর মাত্র বছর চারেকের মেয়ে নীলাঞ্জনাকে নিয়েই তার জীবনের পথ চলা। সরলাবালা দেবী বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা সরমা দত্ত মনেহয় সহজেই কোনোদিন ভাঙতে শেখেননি। ছেলেকেও দাঁড় করিয়েছেন ভালোভাবে, আর দাদার প্রিয় আদরের নীল তো আজ  বেশ একটা উচ্চপদে চাবুক ঘোরাচ্ছে। তবে ওই যে,সুখ নামক বস্তুটি সরমার সতীন, নাহলে কেনই বা শ্রাবণ এভাবে বেঁচে থেকেও আজ  বেঁচে নেই, আর কেনই বা নীলের জীবনের একমাত্র রঙ আজ  শুধু সাদা ধার্য করেছে ওর ভাগ্য !

এখনো বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। কডিডোরের দেওয়াল ঘড়িটা জানিয়ে দিয়ে গেলো এখন রাত দুটো। অথচ,এই অবেলা রাতে কত ভিজতে ইচ্ছে করছে আজ  না! এই শ্রাবণে ! শরীরের ভিতরে বয়ে চলা অবিরত উষ্ণ তাপগুলো যেন ক্রমশঃ ধুয়ে মুছে যেতে চাইছে এক অনাবিল শান্তির দেশে শুধুমাত্র ওরই নিজস্ব শ্রাবণের সাথে…

নীলাঞ্জনার ঘরে উঁকি মেরে দ্যাখে তারও চোখে ঘুম নেই। ল্যাপটপের স্ক্রিনের মধ্যে গভীর চিন্তায় ডুবে আছে কোনো একটা কাজে। হয়তো নীলের অফিসের কাজ’ই হবে। সামনেই ওদের অফিসে অডিট আছে, সেদিন সরমার সাথে নীলের কথাবার্তায় অনুর কানে এসেছিলো। অবশ্য নীল আজকাল আর ওর বৌদিমণিকে সেই আগের মতো ভালোবাসে না,হয়তো বা বাসতেই চায় না ইচ্ছে করেই। আসলে সেই সন্ধ্যের স্মৃতি যে আজও  দাদার আদরের নীলের মনে গভীর ভাবে ছাপ ফেলেছে, সেটা বলাবাহুল্য । আসলে নীল ছিলো শ্রাবণের চোখের মনি। বাবা ওদের ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকেই ছোট্ট শ্রাবণের নীলকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা। এক মুহূর্তের জন্যও নীল চোখের আড়াল হলেই মা সরমার উপর কি প্রচণ্ড রেগে যেতো শ্রাবণ। নীল ও তাই,বরং মায়ের থেকে ওর দাদার প্রতি টান বেশি।  কিন্তু অনুরাধাই বা কি করবে ? শান্তিনিকেতনের মেয়ে হলে কি হবে, বৃষ্টিতে ভেজা কোনো সময়ই সে পছন্দ করতো না। বরং আকাশের মুখ গোমরা হলেই অনু ঘরে আলো নিভিয়ে বেশ রহস্য রোমাঞ্চ কাহিনীর ভিতর ডুবে থাকতে ভালোবাসতো। তবুও,মানিয়ে তো নিয়েছিলো ধীরে ধীরে,পাগল শ্রাবণের স্বভাবের সাথে। অবশ্য এটা মানানো না, সত্যিই ভালোবাসলে এভাবেই মনেহয় সবকিছুই শিখে নেওয়া যায় সহজেই সেই ভালোবাসার মানুষটার জন্য।

মাত্র তিন মাসের প্রেগনেন্সি তখন,যেতে মন চাইছিলো না অনুর সেবার শ্রাবণের এই বৃষ্টি ভেজা খেলায় সাড়া দিতে। পাগল শ্রাবণের সেই একগুঁয়ে জেদ! সবজান্তা মনোভাব! ওর চোখে মা আর অনুরাধার এসব যুক্তি এযুগে আর ধোপে টেকে না,এখন ডাক্তারির পরিভাষা অনেক উন্নত। সেদিন সরমারও যেন অসুখি মনটা খুব খারাপ একটা কিছু জানাতে চেয়েছিলো।কিন্তু এই বয়সে ছেলের সাথে পেরে ওঠা ! সেই সাথে, শনির সাক্ষী মাতাল নীল ! আকাশ ভাঙা বৃষ্টিতে ভেজা রাস্তায় হঠাৎ করে চলে আসা একটা কুকুরের বাচ্চাকে বাঁচাতে গিয়ে শ্রাবণের বাইক পাল্টি খেতে খেতে সজোরে ধাক্কা ধাক্কা মারে লাইট পোস্টের গায়ে।

না মা আর হওয়া হলো না অনুরাধার এজন্মে। আর ওর পাগল শ্রাবণ আজ  বেঁচে থেকেও বেঁচে নেই। চিনতে পারে সবাইকে,শুধু বলতে পারে না কিছুই। ঘুমটাও নেই দুচোখে,অথচ, বিছানা আজ  সঙ্গী। নীল আজও  মেনে নিতে পারিনি ওর দাদার এই অবস্থাকে। কেন জানিনা, এত উচ্চশিক্ষিতা হয়েও  কেন যে তার মনে পয়া অপয়ার ধারণা বাসা বেঁধেছে, সরমাও অবাক হয়ে যায়। হয়তো ওর জীবনের সাদা রঙটাই এর জন্য দায়ী ! মানসিক দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে মন তো অনেক কিছু ভ্রান্ত ধারণার বাসা বাঁধে।---বুঝতে পারে সরমা, অনুও বোঝে নীলের মানসিক যন্ত্রণা ।

প্লিজ ওয়েক আপ !ইট ইস টাইম টু এইট ও’ক্লক! নীলের রুম থেকে ভেসে আসা ঘড়ির অস্পষ্ট কথাগুলোয় ধড়মড়িয়ে ওঠে অনুরাধা।
-আরে আস্তে,আস্তে। মাথাটা ঘুরে পড়ে যাবি যে। গায়ে রাখা হাতের স্পর্শ পেয়েই অনু বুঝতে পারে এই স্পর্শ কার হতে পারে। এঘরে এতো আলো কিভাবে এলো সারা রাতের বৃষ্টি কাটিয়ে। কাল রাতে সে কান্নার সাথে ভিজতে ভিজতে বারান্দার পাশে এই ছোট্ট ঘরেই ঘুমিয়ে পড়েছিলো এক সময় ... বুঝতে পারে অনু।

-আয় স্নান করে আয় তাড়াতাড়ি,আজ  তোদের তিনজনের প্রিয় ইলিশের সেই প্রিপারেশনটা রেঁধেছি। শ্রাবণ হয়তো এর গন্ধেই গব্ গব্ করে ভাত খাবে আজ ... সরমা জানে সবটাই সে মিথ্যে বলছে। ... আর শোন্ অনু, তুই ফিরে এসে যদি আজ  সন্ধ্যাতেও কালকের মতো বৃষ্টি হয়,খুব করে ভিজবো আজ ,তুই আর আমি। জানিস তো আজকাল আমার ও খুব বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করে রে...”

অনু বেরিয়ে গেলো ওর কলেজের পথে। নীলাঞ্জনাও তার অফিসে, শুধু এই বাড়িটাই একমাত্র জানে,শীত,বসন্ত,হেমন্ত সব ঋতুতেই সরমা ভেজে এই সময়টুকু,ওর অদৃশ্য ক্ষত বিক্ষত মন আর বিছানার এক কোণে পড়ে থাকা জোয়ান ছেলের জীবন্ত লাশের সাথে।



Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.