x

প্রকাশিত

অর্জন আর বর্জনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ সিদ্ধান্তের নিরিখে দোলাচলে।সেখানে প্রতিবাদও ভঙ্গুর।আর যথার্থ প্রতিবাদের থেকে উঠে আসে টায়ার পোড়ার গন্ধ।আঘাত প্রত্যাঘাতের মাঝখানে জন্মদাগও মুছে যায়।সংশোধনাগার থেকে ঠিকানার দূরত্ব ভাবেনি কেউ।ভাবেনি হাজার চুরাশির মা’র প্রয়াণ কোন কঠিন বাস্তবকে পর্যায়ক্রমিক প্রহসনে রূপান্তরিত করেছে।একটা চরিত্র কত বছর বেঁচে থাকে ?কলম যাকে চরিত্রের স্বীকৃতি দেয় তেমন পোস্টমর্টমের পড়ও আরও কয়েকযুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে কলমই। অভয়ারণ্যেও ঘেরাটোপ! সেই আপ্তবাক্য -

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

ভাববার সময় এসেছে। প্রতিবাদটা কোথা থেকে আসে—বোধ ?মস্তিষ্ক ?মুঠো? না বাহুবল?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

বিদিশা সরকার

সোমবার, জুলাই ৩১, ২০১৭

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

sobdermichil | জুলাই ৩১, ২০১৭ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
  রুদ্রাক্ষ
ছোট্ট গ্রাম, নাম তার হরিনারায়াণপুর । চাষ আবাদ করে চলে গ্রামবাসীরা । অর্থনৈতিক সাচ্ছিলতা নেই বললেই হয় । কৃষি প্রধান গ্রাম । সকলেই মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কঠিন পরিশ্রম করে সংসার চালায় । যে বছর ভাল বৃষ্টি হয় ফসল ভাল , নাহলে কপালে হাত । ফি বছর বন্যা তে গ্রাম প্লাবিত হয় আর ফসল হানি হয় । গ্রামে কুঁড়ে ঘরই বেশী। যারা গ্রাম ছেডে শহরে  চলে গিয়েছে তারা প্রায় গ্রামের মুখ দেখেনা বললেই চলে ।দুর্গা পুজর সময় আসে , কদিন থেকে চলে যায় । এমনি এক গ্রামের বাসিন্দা কুঞ্জ বিহারি প্রধান । তার এক মাত্র ছেলের নাম রুদ্রাক্ষ প্রধান । শিব রাত্রীর দিন রুদ্রাক্ষ র জন্ম তাই নাম ‘রুদ্রাক্ষ’ । ছেলেটা ধীর স্থীর মিষ্ট স্বাভাবের । 

কুঞ্জ আর তার স্ত্রী , লক্ষ্মী দুঃখে কষ্টে দিন কাটাত । রুদ্রাক্ষ গ্রামের স্কুল এ ক্লাস থ্রী তে পড়ত । ভালই পড়াশুন করত । মাস্টার মশাই রুদ্রাক্ষ কে খুব স্নেহ করতেন । মা বাবার চোখের মণি যেমন গুনে তেমন কাজে । পড়াশুন থেকে আরম্ভ করে খেত খামারের কাজ সব করত রুদ্রাক্ষ বাবার সঙ্গে । 

একদিন গ্রামেতে লোকের ভিড় । অনেক গাড়ি তার সঙ্গে কিছু নেতা , গ্রামের মোড়ল নিশিকান্ত চৌধুরী । বাবুদের দেখে গ্রামের ছেলে ছোকরা, বুড়ো বুড়ি সকলেই একজোট হল। নিশিকান্ত বাবু বললেন, এই গ্রামের সুদিন এল । আপনাদের আর দুঃখ কষ্ট থাকবে না । আপনারা এবার গাড়ি ঘোঁড়া চড়ে বাবুদের মত থাকবেন । এখানে বাঁধ হবে । সরকার আপনাদের জন্য এখানে বাঁধ করলে কৃষির উন্নতি সাধন এর সঙ্গে অর্থনৈতিক সাচ্ছলতা আসবে । আপনাদের ছেলে মেয়ে পড়াশুন করে অনেক বড় হবে। বিস্থাপিত ৭২৬ পরিবারের জন্য সরকার আলাদা বসতি নির্মাণ করবেন । আজ তাই আপনাদের কাছে আমাদের অঞ্চলের মাননীয় বিধায়ক, শ্রী ভগবান চৌধুরী মহাশয় উপস্থিত থেকে এই প্রকল্পের বিষয় বিস্তারিত সূচনা দেবেন। সভাতে, করতালীর বদলে বিরোধিতা আরম্ভ হল। স্কুলের এক শিক্ষক শ্রী পঞ্চানন প্রধান বিরোধিতার  সুর আরম্ভ করে বললেন ,সরকার আগে বিস্থাপিতদের জন্য নতুন বসতি, রাস্তা, স্কুল, ডাক্তারখানা, পানীয় জলের ব্যাবস্থা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ করুন তারপর আমরা এই বিষয়ে সম্মতি জানাবো । নিশিকান্ত চৌধুরী খেঁপে লাল। গর্জে উঠলেন আপনার মাস্টারিটা বিধায়াক মহাশয় এক্ষুনি ঘুঞ্চিয়ে দেবেন, আপনার সাহস তো কম নয়! শিক্ষক মহাশয় বিনম্রতার সঙ্গে বললেন আপনারা এই গরীব গ্রামবাসী দের জমি নিয়ে নেবেন আর তার বিনিময়ে যা যা ঘোষণা করছেন তার ... 

বিধায়ক মাহাশয় হাত থামিয়ে নিশিকান্ত কে বসতে বললেন । তার পর শুরু করলেন আমি এখানে কারুর পেটের দানা ছিনিয়ে নিতে আসিনি বরং কিছু দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে এসেছি । আপনারা ধৈর্য্য ধরে শুনুন সমস্ত বিষয়টা তারপর আপনাদের কথা শুনব। এই যোজনার জন্য সরকার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন এবং এর সুবাদে সমুদায় ৯৯৫০ হেক্টার জমিতে সেচের সুবিধে হবে । আপনাদের পরিবারের কেউ একজন সরকারি চাকরী পাবেন। সাতটি পুনর্বসতি কলোনি তে সকল বিস্থাপিতদের থইথান করা হবে । 

এর মধ্যে কিছু লোক চেঁচা মিচি শুরু করে দেয় । নিশিকান্ত সরকারী দালাল আমরা এ ভিটে মাটি ছাড়বনা। আমাদের বাপ দাদার ভিটে মাটি ছেড়ে কোথাও যাবনা । ছেলেদের চিৎকারের সঙ্গে অন্যরাও সুর মেলাল । বিধায়ক মহাশয় যত বোঝালেও কেউ রাজি হলনা কি চিৎকার থামল না । অগত্যা সরকারি বাবুদের নিয়ে সবাই ফিরে গেলেন । তার পরের দিন পুলিশ এসে পঞ্চানন বাবুকে ধরে নিয়ে যায়।

প্রথমে পঞ্চানন বাবু ওয়ারেন্ট দেখতে চান কিন্তু পুলিশ কিছু না দেখিয়েই ধরে নিয়ে যায় তাঁকে । সবাই নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থেকে যে যার ঘরে চলে যায় । রুদ্রাক্ষ সব দেখে নির্বাক হয়ে যায় । বয়স অল্প হলেও তার মনে প্রতিবাদের বহ্নিশিখা জ্বলতে থাকে সে বোঝে যা হচ্ছে সেটা অন্যায় । পেছন থেকে পুলিশ এর জীপ কে লক্ষ্য করে ঢিল ছোঁড়ে । তারপর বাড়িতে দৌড়ে চলে যায়। বাবাকে বলাতে, বাবা গুম হয়ে বসে থাকেন, মা কিছু বললে বিরক্ত হন । আকাশ পানে চেয়ে কিছু বিড় বিড় করেন। 


এর পরের ঘটনা গ্রামেতে ক্যাম্প বসে । তাহসিলদার, আর আই,আমিন চেন নিয়ে মাপ জোপ আরম্ভ করে দেয় । পল্লিসভা হয় তাতে কিছু লোক নিশিকান্ত বাবুর গুণ্ডাদের ভয়ে টুঁ শব্দটি করেনা। হঠাৎ বাবা বাড়ি থেকে একটা কাটারি নিয়ে নিশিকান্তর দিকে দৌড়ন রাগে গজরাতে গজরাতে ; বলেন তোর চোদ্দ পুরুষের বাপের জমিদারী যে আমাদের জমি নিতে এসেছিস । সবাই রে রে করে বাবাকে আটকান । তহসিলদার বোঝান তোমরা ক্ষতি পুরন পাবে । অনেক টাকা পাবে । এখানে সই কর । বাবা কাগজটা ছিঁড়ে কুটি কুটি করে ফেলেন । রাগে বলেন বাবু আপনারা আমাদের অন্ন র থালা ছিনিয়ে নিয়ে টাকা দেখাচ্ছেন । টাকা আমরা চাইনা । নিশিকান্ত গর্জে উঠে বলল এই কুঞ্জ তোর গায়ে মেলা চর্বি হয়েছে না ? দেখাচ্ছি তোকে মজা। গ্রামের উন্নতি চাসনা তো গ্রাম  ছেড়ে চলে যা । 

পরের দিন পুলিশ এসে কুঞ্জকেও নিয়ে গেল কোন ওয়ারেন্ট না থাকা সত্তেও । দেশের আইন ব্যবস্থার প্রতি কুঞ্জর ঘৃণা ধরে গেল । পুলিশের দারোগা বাবু বললেন “তোর এত সাহস তুই লোক প্রতিনিধির কথা না শুনে কাটারী নিয়ে মারতে গিয়েছিলিস ; সেটা কি তুই অস্বীকার করবি” । সাক্ষী প্রমান তোর বাড়ির লোক ই দেবে । ওয়ারেন্ট এর কি প্রয়োজন ? কুঞ্জর নিজের জন্যে চিন্তা হয়না । তার বৌ ছেলের যদি কোন ক্ষতি হয় তারচেয়ে তার মৃত্যু ভাল । কুঞ্জ হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো । হাজতে নিশিকান্ত আর ভগবান চৌধুরী , বিধায়ক এসে কুঞ্জ কে বললেন , “দেখ কুঞ্জ আমরা তোকে ইচ্ছে করলেই জেল হাজতে পাঠাতে পারি কিন্তু তাতে কি লাভ তোর বৌ ছেলে না খেয়ে মারা যাবে । তুই কি তাই চাস ?” কুঞ্জ হাউ হাউ করে কেঁদে বলে “না বাবু ওরকমটি করবেন না ! আমি আপনারা যা চাইবেন তাই করব”। নিশিকান্তর ক্রুর হাঁসি কুঞ্জ র চোখে পড়ল । কাথায় আছে ....হাতি কাদায় পড়লে ব্যাং এও লাথি মারে । কুঞ্জ র অবস্থা কিছুটা তাই । দারোগা বাবু বললেন , বাবুদের অশেষ দয়া তা নাহলে তোর নামে ৪ টে দফা লাগিয়ে তোকে জেলে ভরতাম বুঝলি । কালকেই কোর্ট এ হাজির করা হত ৷ ভগবান বুঝলি সাক্ষাৎ ভগবান , যেমন নাম সেইরকম কাজ । আমাদের বিধায়ক মহাশয় তোকে ছাড়াতে নিজে এসেছেন । তুই কিনা কাটারি নিয়ে গিয়েছিলিশ মারতে । ধর্ম নেইরে এ যুগে ধর্ম নেই । যার ভাল করবি সেই তোকে বাঁশ দেবে । আঃ কি হচ্ছে ? আমি যে জন্য এসেছি সেটা করুন । কুঞ্জ র বেল এর কাগজ নিয়ে এসেছি । ওকে ছেড়ে দেন । হ্যাঁ সার । এক্ষুনি ছেড়ে দিচ্ছি । 

এই সময় বাইরে লক্ষ্মীর গলার আওয়াজ এল ! লক্ষ্মী গজরাতে গজরাতে ভেতরে ঢুকল , আ মরণ মিনসে ! আদিখ্যেতা দেখলে গা জ্বলে যায় !! আমার বর ছাড়া কি কেউ ছিলনা এ গেরামে মুখপোড়ারা ? হাজতে ভরতে তোদের হাত কাঁপ-লোনা ? কাল থেকে মানুষটা ভাতে মুখ দেয়নি-গো ! রোগা কাঠি হয়ে গেছে গা । মরণ হয় না তোদের ? গরীবের ভাতের থালা ছিনিয়ে নিলে ভগবান তোদের কি শাস্তি দেবে খেয়াল রাখিস ! হাতে কুড়ি কুষ্ঠ হবে যে !! আমি যদি কোন পাপ না কোরে থাকি এর জবাব দিও হে ঠাকুর ! তুমি ভরসা !! এই বলে হাত জোড় করে আকাশ পানে ঠাকুর নমস্কার করে । 

“দেখছিস কুঞ্জ তোর বউ এর চোপা?” দারগা বাবু বলে উঠলেন । স্যার এর একটা বিহিৎ করুন । মেয়েমানুষের চোপা ? এই ! কে তোকে থানাতে আসতে বলেছে ? যা এখান থেকে নাহলে তোকেও লক আপে ভর্তি করে দেব । সাধে কি আর বলে মেয়ে মানুষ ? মুখের কথা দেখ ? যেন খই ফুটছে । উঁহহ... । আবার গালা গালি দিচ্ছে । সাহস্ !! 

লক্ষ্মী বলে , “কেন যাব ? কেন যাব শুনি ?? কি দোষ ওনার শুনি ? গরীবের কি কেউ নেই গা ? দেশে কি আইন নেই ? আমরা কার কি ক্ষতি করলাম এ্যাঁ ?” 

দারগা বাবু বলেন , “তুই কি জজ্ না ম্যাজিস্ট্রেট ? তুই কি বিচার করবি কার অন্যায় আর কার ন্যায়”! তোর সাহস তো কম নয় । থানায় এসে থানা বাবুকেই ধমকাচ্ছিস ? 

“আহ্ কি হচ্ছে ?” বিধায়ক মহাশয় বিরক্তির সঙ্গে বললেন । দেখুন আমরা কুঞ্জ কে ছাড়াতে এসেছি আপনি ঘরে যান। সব ঠিক হয়ে যাবে । 

যাচ্ছি যাচ্ছি , কে আর থানা তে আসে বাবু আমার সোয়ামি আছেন তাই এলুমকো । আমার সোয়ামিকে ছেড়ে দেবেন ত বাবু ?

হ্যাঁ হ্যাঁ ভগবান বাবু বলেন । 

এতক্ষন নিশিকান্ত চুপ ছিল । লক্ষ্মী যাওয়াতে বললেন স্যার দেখলেন তো ? এরা লাথীর ভাষা বোঝে ভাল কথা বললে আপনার মান ইজ্জৎ সব যাবে । 

কুঞ্জ মনে মনে ভাবছিল ওই শালাকে গিয়ে গালে একটা জোরে ঠাপ্পড় কোসিয়ে দেয় । কিন্তু নিরুপায় । হাজৎ বাস ! ছীঃ ! আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে হচ্ছে ওর । গা ঘিন ঘিন করছে । নিজেকে ছোট মনে হচ্ছে । কিন্তু মাস্টার মশাই ? উনি তো কোন দোষ করেন নি ! তবে কেন ওকে ছাড়া হচ্ছেনা? এরা কিছু একটা অভিসন্ধ্যি করছে না তো ?? 

তোমাকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে কুঞ্জ । এবার ঘরে যেতে পার । এই কে আছিস্ লক আপ টা খুলে দে । যত পাজির পা ঝাড়া সব । দারগা গর গর করলেন ।

কুঞ্জ বাড়ি ফিরল তার পরদিন মাষ্টার মশায় ফিরে এলেন । মাস্টার মশায় এর এখানে কেউ থাকেন না । উনি একাই এই গ্রামে প্রায় বছর দশেক আছেন ।তিনি নিজে ছাত্রদের শিখিয়েছেন অন্যায়কে সহ্য করা এবং অন্যায় করা দুটোই এক অপরাধ । অন্যায়কে প্রতিবাদ কর হিংসা দিয়ে নয় যুক্তি দিয়ে । কুঞ্জ যেটা করল সেটা ভূল । সে ভূলের মাসুল তাকে দিতে হল।

#

হাজৎ থেকে ছাড়া পাওয়ার পর কুঞ্জ ঘরে ফিরে যায় । দু দিন হল ক্ষেত খামারের কাজ না হওয়াতে ফসলের ক্ষতি হতে পারে । আজকাল যা পোকার উৎপাত কোন কিটনাশক ই কাজ করে না । গ্রামের কৃষি গ্রামসেভক যে কিটনাশক এর চিরকুট টা লিখে দিয়েছিলেন সেটা কিনে এনেছিল কিন্তু স্প্রে করা হয়ে ওঠেনি । আজকে দেখা যাক ফসলের অবস্থা বুঝে স্প্রে করবে । 

কুঞ্জ মাঠে যাচ্ছিল ফসলের অবস্থা দেখতে । রাস্তায় নিশিকান্তর সঙ্গে দেখা। “কিরে কুঞ্জ তোর রাগটা কমেছে না আগের মতন” বলে  মুচকি মুচকি হাঁসতে লাগলো”। 

কুঞ্জ উত্তর না দিয়ে পাস কাটিয়ে চলে গেল। ছেলেটার জন্য কুঞ্জ মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছে তারওপর লক্ষ্মী মাথার দিব্বি দিয়েছে। নাহলে ওই নিশিকান্তর দফা গয়া করে দিত । 

রাস্তায় যেতে যেতে রুদ্রর জন্য ভাবে । ওকে এই গ্রাম থেকে শহরে পাঠিয়ে দেবে ওর কাকার কাছে । বলাবাহুল্য ভাইকে অনেক কষ্টে ডাক্তারি পড়াতে পেরেছে ।এখন সে মস্ত ডাক্তার। রুদ্র পড়াশোনাতে ভালো তাই ওর সম্ভাবনা বেশি ডাক্তার হবার। ভাইএর ডাক্তারি পড়ার খরচ সামলাতে না পেরে কুঞ্জ জমি বন্ধক রাখে নিধিরাম বেনের কাছে । আজ সাত বছর হল সুদ গুনছে । ফসল যা আমদানি হয় তাতে সংসার টেনে টুনে চলে যায়। কোনদিন ছোট ভাইকে ওর অভাবের কথা জানায় নি । সেও কোনদিন দাদা বৌদি কি ভাবে আছেন খোঁজ নেয়নি । কিন্তু কুঞ্জর কোন অভিযোগ নেই তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে । সে সকলকে গর্ব করে বলে তার ভাই শহরের মস্ত ডাক্তার ! এই সব চিন্তার সঙ্গে গোল ঘাঁট বেঁধে যায় । জমি তে গিয়ে যা কুঞ্জ দেখল সেটা ওকে আরো আঘাত করলো । ওর জমি মাফজোক হচ্ছে দেখে কুঞ্জ হতবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো আমিন কে। 

আমিন : " নিধিরাম তার নামে জমি করিয়ে নিয়েছে ,এখন রেকর্ড তার নামে তুই আপত্তি করিসনি কেন সেটিলমেন্টে এ ? " 

কুঞ্জঃ আমার কাছে কি কোন নোটিস এসেছে যে আমি আপত্তি করব ? 

আমিনঃ নোটিস তো তোর নামে পাঠান হয়েছে তুই পাসনি তো আমরা কি করব?

কুঞ্জ ; মানে ? আমার জমি আমার বাপ দাদার আমলের ; নিধিরাম এর নামে কি করে হয় ?

আমিনঃ হয় হয় ! তুই কি আইন জানিস ? তোর ভাইকে গিয়ে জিজ্ঞেশ কর সব ঠিক করে বুঝে যাবি । ও বোধ হয় সই করে দিয়েছে । 

কুঞ্জর মাথায় বজ্রাঘাত হল যেন ! কুঞ্জ বিশ্বাস করতে পারলোনা ? আমিন কে বললো “ তুই ই যত নাটের গুরু । আমার ভাইয়ের নামে মিথ্যে বলে পার পেয়ে যাবি ! আজই সত্যা সত্য ধরা পড়বে । ” 


গ্রাম থেকে কিছু দূরে একটা টেলিফোন বুথ আছে সেখানে কুঞ্জ সাইকেলে যায় টেলিফোন করতে । তখন মোবাইলের যুগ ছিলনা । রাত প্রায় দশটা কুঞ্জ নম্বর মিলিয়ে ডায়াল করল । অনেকক্ষন রিং হওয়ার পর ওপার থেকে নিতাইএর কন্ঠ স্বর ভেশে এল “হ্যালো!” । কুঞ্জ উৎসাহের সঙ্গে বললো হ্যাঁরে নিতাই তুই ভাল আছিস ? বৌমা কেমন আছে ? সবাই ভালো তো ! 

হ্যাঁ ! কেন ? 

না , মানে , আমি বলছিলাম কি তুই আমাদের জমির কোন কাগজে কি সই করেছিলি ? 

আমাদের মানে ? হ্যাঁ ! আমার ভাগটা আমি বেচে দিয়েছি। কেন ওটা কি একা তোমার নাকি ? “হ্যাঁ ! আমার ভাগটা আমি বেচে দিয়েছি।..... আমার ভাগ আমি বেচে দিয়েছি ।” কথাগুলো কুঞ্জর কানে বারে বারে বাজতে লাগলো । 

ওপার থেকে নিতাই বলল,“কাল অপারেশান আছে ঘুমতে দাও। রাত দুপুরে বিরক্ত করতে এলে!” কুঞ্জ আর নিজেকে সামলাতে পারলনা । হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো । ফোন তার হাত থেকে পড়ে গেল । বাড়িতে ফিরে এলো । গুম হয়ে বসে রইলো কিছুক্ষন তারপর যে কিটনাশক টা কিনে এনেছিল পোকা মারার জন্য সেটা সকলের অজান্তে খেয়ে নিল রাত্তিরে । 

কি হল ? কি হল ? লক্ষ্মী, কুঞ্জকে বমি করতে দেখে ঘাবড়ে যায় । কি হল ? মাগো আমার সর্বনাশ হল গো । দৌড়ে যায় পাশের বাড়িতে সুভ্র কে খবর দিতে । বলে মাস্টার মশায়কে খবর দিতে, ডাক্তার কে ডাকার জন্য । 

এ গ্রামে ডাক্তার নেই আছে এক কম্পাউন্ডার, সেই সব রোগি দ্যাখে আর অসুধ দেয় । কম্পাউন্ডার এসে দেখেন কুঞ্জর মুখ থেকে গ্যাঁজা বেরুচ্ছে । দেখে সন্দেহ হয়। এটাতো সুইসাইড কেস । 

রুদ্রাক্ষ সব দেখছিল শুনছিল কিছুই মুখ থেকে শব্দ না করে গুম হয়ে বসে ছিল । হঠাৎ বাবা যে কাটারি টা নিয়ে নিশিকান্ত কে তাড়া করেছিল সেটা নিয়ে দৌড়তে লাগলো । সবাই কে মেরে ফেলব । আমার বাবাকে আমায় ফিরিয়ে দাও নাহলে সকলকে মেরে ফেলব । আমার বাবাকে আমায় ফিরিয়ে দাও ... নাহলে সকলকে মেরে ফেলব । রুদ্রাক্ষ আর পরের দিন ফেরেনি, কোথায় গেল কেউ জানেনা । 

এরকম হাজার হাজার রুদ্রাক্ষ র জন্ম হচ্ছে এ দেশে এরকম হাজার হাজার কুঞ্জ দারিদ্রের কষাঘাতে মৃত্যু কে স্বাগত করতে বাধ্য হচ্ছে । থেকে যাচ্ছে কিছু নিশিকান্ত, নিতাই, নিধিরাম, পুলিশ দারোগা র মতন স্বার্থপর রক্তচোষা মানুষ রুপি পশু । পরের দিন কাগজে বড় বড় করে খবর বেরুলো “হরিনারায়ণপুরে চাষির মৃত্যু” । এন জি ও,  পত্রিকা , টিভি চ্যানেল এর রিপোর্টার , বিরোধী নেতাদের স্রোত ছুটল । কেউ কি রুদ্রাক্ষর খোঁজ নীল ? কেন কুঞ্জ আত্মহত্যা করতে বাধ্য হল ? কি হবে লক্ষ্মী র সিঁদুরের ? কেউ কি তার সোয়ামি কে ফেরাতে পারবে গো ? এ সব প্রশ্ন আপনাদের কাছে রাখলাম ।

গোধূলি লগ্নে সূর্য অস্তগামী । রক্তিম বর্ণে আকাশ লাল । সেই লাল আকাশের মধ্যে দূর থেকে দেখা-গেল একটি ছোট্ট ছেলে হাতে কাটারী নিয়ে কারুর কোলে আসছে। কাছে আসতে বোঝা গেল রুদ্রাক্ষ মাস্টার মশাইয়ের হাতধরে তাদের ঘরে ফিরছে । লক্ষ্মী দূর থেকে দেখেই বুঝতে পারলো। দু চোখে কান্নায় তার জল শুকিয়ে গিয়েছে কিন্তু রুদ্রাক্ষ কে দেখে ছুটতে লাগল লক্ষ্মী তার এক মাত্র সন্তানকে কাছে পাওয়ার জন্য । কান্নায় আবার ভেঙে পড়লো লক্ষ্মী । রুদ্রাক্ষ মায়ের চোখের জল পুঁছে দেয় ছোট্ট হাতে । তারপর বলে , "মা কেঁদনা আমি আছি তো ।” 

মাস্টার মশাই রুদ্রাক্ষ র মাথায় হাত বুলিয়ে চলে যান । সন্ধ্যে ঘনিয়ে আসে । চারিদিকে শঙ্খ ধ্বনিতে মনে হয় যেন স্বয়ং মা লক্ষ্মী সকলের ঘরে ফিরে এলেন । রুদ্রাক্ষ র চোখ দুটো জ্বল জ্বল করছিল। মনে হচ্ছিল সংসারের সব পাপকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে ওই ছোট্ট ছেলেটির চোখের জ্যোতি যা থেকে অগ্নি বর্ষণ হচ্ছিল। স্বয়ং মহাদেব বোধ হয় মর্তে অবতারণ করলেন রুদ্রাক্ষ অবতারে । এবার সব পাপীর শাস্তি হবে । 




Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.