x

আসন্ন সঙ্কলন

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

সোমবার, জুলাই ৩১, ২০১৭

কাজী ফয়জল নাসের

sobdermichil | জুলাই ৩১, ২০১৭ |
পত্রলিখন
প্রতিদিন অফিসে কত কত চিঠির ড্রাফট লিখছি। তাদের নির্দিষ্ট ফর্ম্যাট, যা অফিসিয়াল। কিন্তু ব্যক্তিগত বা পার্সোনাল চিঠি শেষ কবে লিখেছি, আজ আর মনে পড়ে না। একটা সময় ছিল যখন দুপুরবেলা পিওনকাকু কাঠের বাঁকানো বাঁটওয়ালা ছাতা মাথায় দিয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে অনেকেই উৎসুক হয়ে নিজের বাড়ির ঠিকানা বলে জানতে চাইত, কোন চিঠি আছে কিনা। আর সেই অপেক্ষার বেশীটাই কিন্তু পার্সোনাল চিঠির জন্যে। কোথাও মা-বাবা অপেক্ষায় থাকতেন প্রবাসে কর্মরত ছেলের দুটো ভালোমন্দ খবরের, কোথাও বা ভিনরাজ্যে বিয়ে হয়ে চলে যাওয়া মেয়েটা অপেক্ষা করত বাপের বাড়ির মানুষগুলোর কথা শুনবে বলে। সেইসব পার্সোনাল চিঠিতে বাড়ির পোষা কুকুর-বিড়াল এমনকি বাড়িতে গরু থাকলে তার কথাও উল্লেখ থাকত। নিজের বাড়ির ধরে ধরে প্রত্যেকটা মানুষের খবর ছাড়া প্রতিবেশীদের খবরও থাকত। ডাকে আসা সেইসব চিঠি যত্ন করে তুলে রাখা হত কোন তোরঙ্গে বা সাইকেলের বাঁকানো স্পোকে গেঁথে অথবা বিছানার তোষকের নীচে।

তখন এই পার্সোনাল চিঠি আসত তিন রকম ফরম্যাটে। শুধুমাত্র টুকটাক কথা আর খবরাখবর আদানপ্রদানে ব্যবহার হত পোস্টকার্ড, আমার ছোটবেলায় যার দাম ছিল পনের পয়সা। আরেকটু বেশী কিছু লেখার থাকলে ব্যবহার হত আকাশী নীল রঙের ইনল্যাণ্ড লেটার, যার দাম ছিল পঁয়ত্রিশ পয়সা। আর ছিল পোস্ট অফিসের হলুদ রঙা খাম, যাতে স্ট্যাম্প ছাপানোই থাকত।

গ্রামেগঞ্জে পিওনের কাজ চিঠি পৌঁছে দিলেই শেষ হত না। অনেক বাড়িতেই উঠোনে পাতা জলচৌকিতে বা দাওয়ায় বেছানো চাটাইয়ে বসে শহর থেকে আসা ছেলের চিঠিটা যত্ন করে পড়ে শোনাতে হত। তাঁকে ঘিরে থাকতেন বাড়ির সদস্যরা। চিঠিতে পারিবারিক কোন সমস্যার উল্লেখ থাকলে সেই বিষয়ে পিওনের পরামর্শও চাওয়া হত। অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যুত্তরের চিঠিটাও পিওনকেই লিখে দিতে হত।

এই পার্সোনাল চিঠির বাইরে আরেকরকম পার্সোনাল চিঠির জন্যে পাড়াগাঁয়ের যুবসমাজ আকুল হয়ে থাকত। সেই চিঠির পোষাকি নাম ছিল প্রেমপত্র। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই প্রেমপত্রের বাহক বা পিওন হত পাড়ার ছোট ছোট ছেলে বা মেয়ে। রাঙাপিসী-ন'কা-ছোটকাদের প্রেমপত্র বয়ে বয়েই সেযুগের কচি কচি ছেলেমেয়েগুলো অল্পবয়সে প্রেম করা শিখে যেত। সহপাঠী হলে স্কুলের বন্ধু-বান্ধবীরাও পিওন হত। তখন তো হামেশাই এমনও শোনা যেত যে বান্ধবীর প্রেমিককে চিঠি পৌঁছে দিতে দিতে কোন ফাঁকে মেয়েটা নিজেই সেই প্রেমিকের প্রেমে পড়ে গেছে।

এই বিষয়ে তারাপদ রায় মহাশয়ের সেই বিখ্যাত গল্পটা স্মরণ করা যেতে পারে, যেখানে প্রেমিক কর্মসূত্রে প্রবাসী, কিন্তু সদ্যযৌবনে প্রেমে পাগল ছেলেটি ভিনরাজ্য থেকে প্রায় প্রত্যেক দিন তার প্রেয়সীকে একটা করে চিঠি লিখত। চিঠির উত্তরও আসত, প্রথমদিকে নিয়মিত... পরের দিকে অনিয়মিত। কিন্তু প্রেমিক ছেলেটির চিঠি লেখায় কোন খামতি ছিল না। বছর খানেক পর প্রথমবারের জন্যে ছুটিতে ছেলেটি বাড়ি ফিরেছে। কিন্তু হতভাগ্য ছেলেটি জানতে পারে যে তার প্রেমিকা ইতিমধ্যেই অন্য কারও সাথে প্রেম করে, বিয়ে-থা করে দিব্যি গুছিয়ে সংসার করছে। আর যার সাথে বিয়ে করেছে সে আর কেউ না, তারই প্রতিদিনকার চিঠি বয়ে নিয়ে আসা পোস্ট অফিসের পিওন ছোকরাটা।

প্রেমপত্র বহন করা নিয়ে আমারও ব্যক্তিগত একটা অভিজ্ঞতা আছে। তখন দিনের বেলায় বালিগঞ্জে এক অডিট ফার্মে কাজ করি, রাতে পড়াশুনো। ফার্ম মানে একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টের বাড়িতেই অফিস আর আমরা জনা তিনেক স্টাফ। আমার বন্ধুর প্রেমিকাটি পড়ত মুরলীধর কলেজে। যাওয়া আসা করত আমার অফিসের সামনে দিয়ে। তাই আমি হয়ে উঠেছিলাম তাদের পত্রবাহক।

সেদিন সকালে অফিসে এসেই কিছু কাজ নিয়ে বেলেঘাটা সেলস ট্যাক্সে গেছি। ফিরতে ফিরতে বিকেল। অফিসে ফেরার পর স্যার আমাকে ডাকলেন। সামনে বসিয়ে টানা আধঘন্টার লেকচার। বয়সটা জীবনে দাঁড়ানোর, পড়াশুনো করার। ঠারেঠোরে বোঝালেন যে জীবনে প্রেম-ট্রেম করার অনেক সময় পড়ে আছে ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। সমস্ত কথার শেষে ড্রয়ার থেকে বের করে দিলেন একটা রঙীন খাম, যার থেকে ভুরভুর করে সস্তা সেন্টের গন্ধ বেরোচ্ছে। আমার কাছে ততক্ষণে সব পরিষ্কার। বন্ধুর প্রেমিকাটি বন্ধুর চিঠি দিতে এসে আমাকে না পেয়ে একেবারে আমার স্যারের হাতেই দিয়ে গেছে সেই চিঠি আর বলে গেছে আমাকে দেওয়ার জন্যে। এখনও সেই বন্ধুর বাড়ি গিয়ে তার বৌয়ের হাতের চা খেতে খেতে ভাবি যে এই বুদ্ধি নিয়েও মেয়েটা প্রায় তেইশ বছর সংসার করে ফেলল!

তবে প্রেমপত্র লেখা নিয়ে আমার একটা মজার অভিজ্ঞতা আছে। সেটা বোধহয় আগে কখনও শেয়ারও করেছি, তাও যারা পড়েননি, তাঁদের জন্যে আরেকবার।

ক্লাস সিক্স-এ পড়ার সময় আমার প্রথম প্রেমপত্র লেখা। অবশ্য সে প্রেম খুব বেশিদিন টেঁকেনি, আর তার জন্যে দায়ী ছিলাম আমি নিজেই। আসলে তখনও একজন প্রেমিকাকে উদ্দেশ্য করে কি লেখা যেতে পারে, আর কি পারে না, সেই জ্ঞানটাই ছিলো না। মাত্র দুনম্বর চিঠি লেখার পরেই সেই প্রেমের করুণ পরিসমাপ্তি ঘটে। সেই ব্যর্থ প্রেমের ট্রাজিক নায়কের জন্যে আজও বুকের কোথাও যন্ত্রণা হয়, হাজার হোক আমার জন্যেই তো.....

ব্যাপারটা খুলেই বলি। প্রেমপত্র আমি লিখলেও প্রেমিক আমি ছিলাম না। তখন খিদিরপুরে থাকি। শাহ আমান লেন-এর এক মুদির দোকানে মাঝে মাঝে কিছু কিনতে যেতাম। সেখানেই আমাকে পাকড়াও করে সেই নিরক্ষর প্রেমিক, আসলাম। তার প্রেমিকা রোশেনারা-কে চিঠি লিখে দিতে হবে। কি কি লিখিয়েছিল আমাকে দিয়ে, তার কিছুই মনে নেই এখন। তবে খুব একটা ইন্টারেস্টিং কিছু ছিলো না। আমাকে তার বদলে ১০ পয়সার বাদাম আর এক টুকরো ভেলিগুড় খাইয়েছিলো, সেটা মনে আছে।

এরপর দিন কয়েকের মধ্যেই আমার ডাক পড়লো তার প্রেমিকা রোশেনারা-র পাঠানো প্রেমপত্র পড়ে দেওয়ার জন্যে। সেই চিঠি পড়তে গিয়ে আমার ভির্মি খাওয়ার জোগার। অত জঘন্য হাতের লেখা কারও হতে পারে আমার ধারণা ছিল না। যাই হোক বহু কষ্টে উদ্ধার করলাম সেই যাত্রা। কিন্তু দুঃখ পেলাম, আর ততোধিক রাগও ধরল যখন আসলাম ভাই আমাকে আরও মন দিয়ে পড়াশুনো করতে জ্ঞান দিল। কারণ আমার হাতেরলেখা বেশ ভালো হলেও আমার রিডিং পড়া নাকি বেশ দুর্বল, তাই সেদিকে আমার নজর দেওয়া উচিত।

যাই হোক, সেদিন বিকেলেই আমাকে নবাব আলি পার্কে আসতে বলে দিলো, সেই চিঠির উত্তর লিখে দিতে। আমিও হাজির যথাসময়ে। আসলাম ভাই যা যা বলল, সবই সুন্দর হাতের লেখায় লিখে দিলাম। শেষে কি মনে হল, যোগ করে দিলাম, "তোমার হাতের লেখা অতি জঘন্য। পড়াই যায় না। তুমিও পারলে আমার মত অন্য কাউকে দিয়ে লিখিয়ে নিতে পারো তো"।

আসলাম ভাই আর কোনদিন আমাকে চিঠি লেখার জন্যে বা পড়ার জন্যে ডাকেনি।


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.