x

আসন্ন সঙ্কলন


যারা নাকি অনন্তকাল মিছিলে হাঁটে, তাদের পা বলে আর বাকি কিছু নেই। নেই বলেই তো পালাতে পারেনা। পারেনা বলেই তারা মাটির কাছাকাছি। মাটি দ্যাখে, মাটি শোনে, গণনা করে মৃৎসুমারী। কেরলের মাটি কতটা কৃষ্ণগৌড়, বাংলার কতটা তুঁতে! কোন শ্মশানে ওরা পুঁতে পালালো কাটা মাসুদের লাশ, কোন গোরেতে ছাই হয়ে গেলো ব্রহ্মচারী বৃন্দাবন। কোথায় বৃষ্টি টা জরুরী এখন, কোথায় জলরাক্ষুসী গিলে খাচ্ছে দুধেগাভিনের ঢাউস পেট। মিছিলে হাঁটা বুর্বক মানুষ সেসবই দেখতে থাকে যেগুলো নাকি দেখা মানা, যেগুলো নাকি শোনা নিষেধ, যেগুলো নাকি বলা পাপ। দেশে পর্ণ ব্যন্ড হল মোটে এইতো ক'টা মাস, সত্য নিষিদ্ধ হয়েছে সেই সত্যযুগ থেকে। ভুখা মিছিল, নাঙ্গা মিছিল, শান্তি মিছিল, উগ্র মিছিল, ধর্ম মিছিল, ভেড়ুয়া মিছিল যাই করি না কেন এই জুলাইয়ের বর্ষা দেখতে দেখতে প্রেমিকের পুংবৃন্ত কিছুতেই আসবে না হে কবিতায়, কল্পনায়... আসতে পারে পৃথিবীর শেষতম মানুষগন্ধ নাকে লাগার ভালোলাগা। mail- submit@sobdermichil.com

ভালোবাসার  আষাঢ় শ্রাবণ

অতিথি সম্পাদনায়

সৌমিতা চট্টরাজ

সোমবার, জুলাই ৩১, ২০১৭

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

sobdermichil | জুলাই ৩১, ২০১৭ | |
মনসুন সোনাটা
টিপটিপ, টুপটাপ, ঝমঝম, ঝিরঝির... অপেক্ষার অবসান, বর্ষা এসেছে। আবার এসেছে জমকালো আষাঢ় আমাদের শহরে। তার পিছুপিছু শ্রাবণো এল বলে ! মেঘকালো করা সকালে মন বলে আয় কবিতা লিখি, উজাড় করি ফেসবুকের দেওয়ালে বৃষ্টিকাব্য। ওদিকে রান্নাঘর ডাকে আয়। টেষ্টবাড গুলো লকলক করে বলে খিচুড়ি আর ইলিশমাছ ভাজা। বিকেল বলে আয় মুড়ি-তেলেভাজা আর পা ছড়িয়ে বসে ভূতের গল্প। কিন্তু সময় নেই কারোর। বৃষ্টিতেও সকলে ছুটছে। স্কুল পড়ুয়াদের রেনকোট, কাজের মাসীর সেলাই করা আধপুরোণো রঙীন ছাতা, বাবার বাজার করার ফ্লোটার্স সব ভিজে টুসটুসে কাজের তাড়নায়। বৃষ্টি যে দেখবে সময় নেই কারোর। বৃষ্টিকে যে বরণ করবে খেয়াল নেই কারোর। এদিকে যতক্ষণ না সে আসছিল ততক্ষণ সকলের যেন ভাবখানা এলেই তাকে রূপোর আসনে বসিয়ে সোনার থালায় পাখার বাতাস করে জুঁইফুলের মত ভাত বেড়ে দেবে। বলবে,

"এসো বৃষ্টি, দাও দৃষ্টি, একি সৃষ্টি, বসো ভাই, ভাত বেড়ে দি, আসন পাতি, খাবে ভাই?" 

বর্ষা বড় স্মৃতিমেদুর জানো? বৃষ্টি দেখলেই মনে পড়ে যায় সে বছর জমা জলে কি হয়েছিল, তার দুবছর আগে কোথায় জমা শেওলায় পা হড়কেছিল কিম্বা কলেজবেলায় বৃষ্টির হাত থেকে রেহাই পেতে দুদন্ড কফিহাউসের ছাদের নীচে, এক ছাতার নীচে একটুকু ছোঁয়া লাগা প্যার হুয়ার স্মৃতি। মায়ের বৃষ্টিশাড়িগুলো ছিল ভরসা। আধ পুরণো ডেক্রণ, নতুন মার্বল শিফন কিম্বা পাতলা প্রিন্টেড উলি শাড়ি অথবা সেই সি-থ্রু ব্রাসো শাড়ি। এখন বাজারে ঢেলে পাওয়া যায়। কেউ বলে জর্জেট, কেউ বলে সিন্থেটিক। পরে জেনেছি যাহাই সিন্থেটিক তাহাই পলিমার। সে ডেক্রণ কি নাইলন অথবা শিফন কি টেরিলিন। ভিজে গেলেও শুখোয় তাড়াতাড়ি তাই বৃষ্টিতে এরাই ভরসা। তবে পিওর শিফন মানে কুড়ি-বাইশ গ্রামের ফুজি শিফন পরে বর্ষায় বেরুনো নৈব নৈব চ। জল পড়লেই তা হাঁটুর নীচে স্কার্ট । আমার মায়ের হয়েছিল। বরানগর থেকে ভাড়ার গাড়িতে আমরা শিবপুর গেছি নেমন্তন্ন খেতে। মুম্বাই থেকে আনা নতুন ফুজি শিফন পরে মা চলেছেন মুখেভাতের রিসেপশানে। গাড়ি থেকে নেমে নেমন্তন্ন বাড়ি খুঁজতে গিয়ে ভিজে গেছি আমরা। পৌঁছে দেখি মায়ের শাড়ি লং স্কার্টে পরিণত হয়েছে। পিওর শিফনের কি জ্বালা রে বাবা! 

আষাঢ়ের ক'দিন যেতে না যেতেই অম্বুবাচী, রথযাত্রা। তারপরেই প্যাচপ্যাচে অবস্থা। যেন বর্ষাকে তাড়িয়েই ছাড়ে লোকে। জামাকাপড় শুকোচ্ছে না, বাজার যেতে পাচ্ছিনা, চালে, ময়দায়, সুজিতে পোকা, ইলিশের দাম এখনো কমলনা, আলমারীতে কেমন গুমশুনি গন্ধ একটা, কালো জামদানীটা মসনে ধরে গেছে... এমন হাজার একটা অভিযোগ। 

তারপর ভালো মনসুন হল তো ফিদা দেশবাসী তথা সরকার নয়ত মাগ্যিগন্ডার শুরু আবার। হৈ হৈ সেনসেক্স পতন, মুদ্রাস্ফিতী, সোনার দাম, ইনফ্লেশন সব লাইন করে জায়গা করে নেবে অর্থনীতির শিরোনামে। এবার মনসুন স্পেশ্যাল ইস্যু হল জিএসটি। কারও পোষ মাস কারও সব্বোনাশ। 

তারপর কোথায় পিঁয়াজ পচে গেল, গমে ছাতা ফুটল অতিবৃষ্টিতে। লিচু মিষ্টি হলনা মোটেও, ধানচারা জল না পেয়ে মরে হেজে গেল অনাবৃষ্টিতে । এতসব বায়নাক্কা তো আছেই। 

তারপর বর্ষায় বদহজম, ক্ষুধামান্দ্য, অরুচি, বাতাসে অক্সিজেনের অভাবে হাঁফের কষ্ট সব নিয়ে অনেক অভিযোগ । সেই ফাঁকে বর্ষা মানে বৃষ্টি বলে পালাই, পালাই। বর্ষার তো ছাড়ান ছেড়েন নেই। আষাঢ়-শ্রাবণ এই দু-মাস তাকে থাকতেই হবে এ বঙ্গে। মুখ শুনতে হবে আমাদের। চোখরাঙানি দেখতে হবে।

কোন্‌দিন ইলশেগুঁড়ি কোন্‌দিন আবার কেরাণী খ্যাদানো ! বৃষ্টি মানেই যত্ত অনাসৃষ্টি। তা এসব আগে বলোনি কেন? তাহলে আর ওপথ দিয়ে যেত‌ই না আমাদের মানিকজোড় মেঘ-মৌসুমী। প্রতিবছর মেঘ-মৌসুমী দক্ষিণে আগেভাগে আসে। তখন থেকেই মন উশখুশ! কবে সে আসবে এপাড়ায়! আর যেই এলো সেইমাত্র‌ই কত সমালোচনা। যাকে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা। কম বৃষ্টি হলেও জ্বালা, বেশী হলেও জ্বালা। তাহলে ওরা এখন কি করবে বলতে পারো? এত কাঠখড় পুড়িয়ে এদিকে এসেছে আর তো ফিরে যেতে পারেনা। সেই ফিরবে আশ্বিনে। যা কথা আছে সেই মত কাজ করবে তারা। 

আবার এই বর্ষাতেই সবকিছু। 

আষাঢ়-শ্রাবণের পালপাব্বনীর রেহাই নেই। বাংলামায়েরা নাছোড়। কোথায় বিপত্তারিনী, মনসা পুজো, ঝুলন পূর্ণিমা...এসব নিয়েই আমাদের বেঁচে থাকা। শ্রাবণমাসের সোমবারে হুল্লোড়ে বাবা তারকনাথ। টুংটাং সারারাত, বাঁক কাঁধে চলে, ভোলে ব্যোম্‌, তারক ব্যোম্‌! মাইকে গান দিনভর। 

উইকএন্ডের নস্টালজিয়া। ট্রেনে যাবে দলবেঁধে সব পাড়ায় পাড়ায় । নতুন গেঞ্জী, গামছা কাঁধে । ভোলেবাবা পার করবে তাদের সেই আশায় পায়ে হেঁটেই পৌঁছে যাবে তারকেশ্বর। বাঁক কাঁধে, ঘট ভর্তি জল নিয়ে...পেছল সামলিয়ে, জলে কাদায়, বৃষ্টি মাথায়। ওরে কি পেলি তোরা এ মনসুনে? 

আর পাড়ার বুড়ো অবনীবাবুর পূর্বপুরুষের সত্তরবছরের পুরণো শক্তপোক্ত বাড়ি। কিন্তু বর্ষাকালে সে বাড়ির ছাদ ফেটে জল পড়ে ঘরদোর জলে থৈ থৈ। তাই অবনী বাবু দাঁড়িয়ে থেকে ঘোলা দেওয়ান ছাদে। কিছুদিন বন্ধ থাকে জলপড়া আবার শুরু হয়। নবনির্মিত স্কাইস্ক্রেপারের বাইরে স্নোসেমের তুলির পোঁচ । সিন্ডিকেটের কাছ থেকে কিনতেই হয়েছে রাশিরাশি নোনা বালির বস্তা। তাই জল বসে খুব। ভোলাদের বস্তির টালিগুলো দিয়েও জল পড়ে টসটস করে। বর্ষা এলেই ওদের প্রাণ বেরিয়ে যায় । কারো বরষা মাস, কারো নাভিশ্বাস।

বর্ষায় বাড়ী বন্দী হয়ে বৃষ্টিতে কলম ডুবিয়ে আর গরম পানীয়ে ঠোঁট ঠেকিয়ে মাঝেমাঝেই লেখায় পেয়ে বসে বাঙালীকে। বর্ষা মানেই বাঙালীর কবিতার ভ্রূণের জন্ম। 

বর্ষা মানেই ঝাঁকেঝাঁকে রূপোলী শস্যের জালে জড়িয়ে পড়া।কথায় বলে হালকা হাওয়া দেবে, ঝিরঝির করে অবিরাম ইলিশেগুঁড়ি বৃষ্টি পড়তেই থাকবে আর ঠিক তখনি ঝাঁকেঝাঁকে গভীর জলের এই ইলিশমাছ সমুদ্রের নোনা জল সাঁতরে, জোয়ারের অনুকূলে স্বল্প পরিশ্রমে, নদীর কাছে আসবে, আমাদের ধরা দিতে। 

ছোটবেলায় সবচেয়ে মজা ছিল রেনিডে তে হঠাত ইলিশের গন্ধটা। হঠাত ছুটির সাথে বৃষ্টি আর হঠাত পাওয়া ইলিশের গন্ধে মন একেবারে কানায় কানায় ! কখনো ভাপা, কখনো পাতলা ঝোল, কখনো তেল-ভাজা-ডিম, কখনো আবার মাথা দিয়ে ছ্যাঁচড়া। এই রূপোলী শস্য আমাদের বাঙালীর বর্ষার প্রধান অনুষঙ্গ। 

বর্ষা মানেই শহরের আনাচকানাচ জলে ট‌ইটুম্বুর। বর্ষা মানেই জলকাদায় শাড়ি-জিনস-সালোয়ারে থ্যাপথ্যাপ। কারোর বর্ষায় মনখারাপ তো কারোর শরীর খারাপ । কারোর ইলিশমাছ তো কারোর চারামাছ। চাষীর আনন্দ, চাষীবৌয়ের ঢলঢল কাঁচা যৌবন আর সবুজ ধানচারার লকলকে বাড়বৃদ্ধি অন্যদিকে জমা জলে ম্যালেরিয়া-ডেঙু-আন্ত্রিকের চোখরাঙানি। 

বৃষ্টির গন্ধে মন কানায় কানায় ভরপুর। মনে পড়ে যায় স্কুলের বনমহোত্সবের কথা। এখনো বর্ষায় রবীন্দ্রনাথকে আমার মত করে ফিরে পাই সেই বনমহোত্সবের গানে, কবিতায়। নিজের মনে আবৃত্তি করে উঠি.... ত্রস্তপায়ে চুপিচুপি চলে যাওয়া রাইকিশোরীর বনে-উপবনে অভিসার যাত্রার সাক্ষী হয়ে। আমার ভাবনাগুলো বর্ষার হাওয়ায় এখনো মেতে ওঠে মুকুলিত গাছের মত, কেঁপে ওঠে কচি কিশলয়গুলো, জলভেজা জুঁইয়ের গন্ধ, শ্রাবণের ধারার সাথে চুঁইয়ে পড়ে মনের কার্ণিশে। তার হাত ধরেই শ্রাবণের ভরাবর্ষায় কবিগুরুর তিরোধান দিবস-বাইশে শ্রাবণ, স্বাধীনতা দিবস উদযাপন। 

বর্ষা মনেই বর্ষামঙ্গলের তোড়জোড়। মেঘরঙা শাড়ি আর সবুজ উড়নি মাথায় পাড়ার কচিকাঁচাদের নাচের রিহার্সাল। রবিঠাকুরের ভাবনাগুলো যুগ যুগ ধরে বাঙালীর মধ্যে ইনজেকটেড হয়ে আসছে। এভাবেই আষাঢ় শ্রাবণ বরণ করি আমরা। বৃষ্টিকে স্বাগত জানাই বর্ষার নাচেগানে। আরো আছে কালিদাসের মেঘদূতম্‌, অতুলপ্রসাদের বিরহ-কাব্য, নজরুলের পরদেশী মেঘের জন্য কাতরতা অথবা বিদ্যাপতির ভরা ভাদ্রের রাধাকৃষ্ণের প্রেম-বিরহের মূর্ছণা। 

ভুলি কেমনে? আজো যে মনে, বেদনার সনে...বারে বারে বর্ষা, প্রেম, বিরহ মিলেমিশে একাকার তখন। 

এভাবেই আমাদের বর্ষা নিয়ে ভালোয় মন্দে বেঁচে থাকা। অতএব মনসুন তুমি আবারো এসো। মনসুন সোনাটার জন্য কান পেতে থাকবো আবারো।


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.