x

আসন্ন সঙ্কলন

গোটাকতক দলছুট মানুষ হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছে একে অপরের সামনে। কেউ পূব কেউ পশ্চিম কেউ উত্তর কেউ দক্ষিণ... মাঝবরাবর চাঁদ বিস্কুট, বিস্কুটের চারপাশে লাল পিঁপড়ের পরিখা। এখন দলছুট এক একটা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে চাঁদ বিস্কুটের দিকে। আলাদা আলাদা মানুষ এক হয়ে হাঁটছে সারিবদ্ধ পিঁপড়েদের বিরুদ্ধে। পথচলতি যে ক'জনেরই নজর কাড়ছে মিছিল তারাই মিছিল কে দেবে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি। আগুন নেভার আগেই ঝিকিয়ে দেবে আঁচ... হাত পোহানোর দিন তো সেই কবেই গেল ঘুচে, যেটুকু যা আলো বাকী সবটুকু চোখে মেখে চাঁদ বিস্কুট চেখে চেখে খাক এই মিছিলের লোক। মানুষ বারুদ কিনতে পারে, কার্তুজ ফাটাতে পারে, বুলেট ছুঁড়তে পারে খালি আলো টুকু বেচতে পারেনা... এইসমস্ত না - বেচতে পারা সাধারণদের জন্যই মিছিলের সেপ্টেম্বর সংখ্যা... www.sobdermichil.com submit@sobdermichil.com

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

মৌমিতা ঘোষ

সোমবার, জুলাই ৩১, ২০১৭

বনবীথি_পাত্র

sobdermichil | জুলাই ৩১, ২০১৭ |
শ্রাবণধারা
জানলার দিকে পাশ ফিরে শুয়ে আছে লিলি , বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে মুষলধারে । সকালে যখন আসে তখনও মেঘলা ছিল , তবে বৃষ্টি ছিল না । ভরা শ্রাবণ মাস , এমন মেঘ-বৃষ্টির আনাগোনা তো লেগেই থাকবে । শ্রাবণ মাস কি পড়ে গেছে, নাকি আষাঢ় !! ইংরাজী তারিখ নিয়েই তো সব কাজ বলে বাংলা তারিখের তো প্রয়োজনই হয় না । বাইরেটা দেখে বোঝা যাচ্ছে না বিকাল না সন্ধ্যে। মোহর বিকালে আসবে বলেছিল , এখনো তো এলো না ।

পাশ ফিরতে গিয়েই ব্যথায় নীচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে শক্ত করে । তখনি চোখে পড়ে দেওয়ালে টাঙানো বাচ্চা মেয়েটার ছবির দিকে । একথোকা গোলাপ হাতে নিয়ে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে । দ্রুত চোখদুটো বন্ধ করে নেয় লিলি । ফোঁটা ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে বন্ধ চোখের কোণা বেয়ে । শারীরিক যন্ত্রণাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে বুকের কষ্টটা । শেষ অবধি বাচ্চাটাকে নষ্টই করে ফেলতে হলো !!

মায়ের মৃত্যুর পর বাবা নতুন করে সংসার করেছে । তখন থেকেই হোস্টেলে মানুষ হচ্ছে লিলি। ছুটিছাটায় বাবা এসে বাড়ি নিয়ে যেত ঠিক-ই কিন্তু পরিবার কি কখনো বোঝেনি লিলি । তাই বোধহয় আর পাঁচটা স্বাভাবিক মেয়ের থেকে একটু অন্যরকম লিলি , একটু বেশি বেপরোয়া-সাহসী । তবে পড়াশুনোতে বরাবরই ভালো। তাই হায়ার সেকেন্ডারীর পর পছন্দমতো সাবজেক্ট নিয়ে কলকাতার কলেজে ভর্তি হতে কোনো সমস্যাই হয়নি । ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারিং নয় , লিলির পছন্দ জার্নালিজম্ । গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে পোস্ট-গ্রাজুয়েশন চলছে । প্রাইভেট টিভি চ্যানেলে পার্টটাইম একটা চাকরিও জুটিয়ে ফেলেছে এরমধ্যে । ফুলটাইম জবে কাজের কোন টাইম থাকেনা , ফিরতে রাত বিরিত হতেই পারে। লেডিস হোস্টেলগুলোতে যা কড়াকড়ি , এখনি ফুলটাইম জব সম্ভব নয় । ফিরতে রাত হলেই তো পরেরদিন তলব পাঠান সুপার ।

অ্যাপয়েন্টমেন্টের দিনই ডক্টর বলেছিলেন , দরকার হলে একরাত নার্সিংহোমে থাকতেও হতে পারে । সেই মতোই বন্ধুর বাড়িতে থাকবে বলে দরখাস্তও দিয়ে এসেছে লিলি । কিন্তু সুপার মহিলাটি বড্ড সন্দেহবাতিক । একটু উল্টোপাল্টা দেখলেই গার্জেনকে ফোন করেন । লিলি চায় না তার কোন কারণে বাবাকে অতিষ্ট করতে । যে বাবা শুধু অর্থ দিয়েই তাঁর কর্তব্য সারে , তাঁকে জীবনে কোনো প্রয়োজনে চাই না লিলির । বাবার ওপর সত্যিই যদি কোনো দাবি-কোনো ভালোবাসার অধিকার থাকতো , নিজের এই দুঃখের দিনে বেশি কিছু না, একটু ভালোবাসা চাইতে পারতো । কিন্তু বাবার সাথে সেই স্নেহের বন্ধন কোনদিন গড়েই ওঠেনি লিলির । মা বেঁচে থাকলে হয়তো এমনটা হতো না । মাকে তো মনেই পড়েনা । সবার মায়ের মত ওর মাও নিশ্চয় ভালোবাসতো ওকে ।

সেই তেরো বছর বয়স থেকে একটু ভালোবাসার লোভে কম জনের প্রেমে তো পড়েনি লিলি !! স্কুলের দারোয়ান কাকুর প্রেমে পড়েছিল তখন সবে সেভেনে পড়ে । টিফিনের সময় , বিকালে হোস্টেল থেকে লুকিয়ে ছুটে ছুটে যেত দারোয়ান কাকুর কাছে । ভালো লাগতো কাকুর সাথে গল্প করতে । শুধু দারোয়ানকাকুর শরীরে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে আদর করাটা ভালো লাগত না লিলির । তবু ভালোবাসার টানে যেন ছুটে যেত । একদিন কাকুর আদর করা দেখে ফেলেছিলেন ম্যাথমিস । হেডমিস্ট্রেসের ঘরে নিয়ে গিয়ে খুব বকেছিল, আর কখনো দারোয়ানকাকুর সাথে কথা বললে টিসি দিয়ে দেবে বলেছিলেন । তারপরেও প্রেমে পড়েছে লিলি । কলকাতায় এসে তো একপ্রকার বাঁধনছাড়া জীবন । তিনবছরে কম ছেলেকে তো দেখলো না, সবার ভালোবাসার প্রধান আকর্ষণ লিলির যৌবন । তবে লিলিও আর সেই তেরো বছরের লিলি নেই, পুরুষকে কি করে খেলাতে হয় শিখে গেছে । কিন্তু রুবেল তো তেমন ছিলনা । লিলির বাইশ বছরের জীবনে ভালোবাসার সব অভাব একাই মিটিয়ে দিয়েছিল। জাতের বাধাটুকুও না মেনে ঘরে নিয়ে যাবে বলেছিল । ওর আম্মির শুধু অমত ছিল হিন্দুমেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে দিতে । আম্মির অমতে গিয়েই বিয়ে করতে চেয়েছিল লিলিকে । কিন্তু লিলিই বলেছিল আম্মি দেখো একদিন ঠিক বুঝবে সেদিন বিয়েটা করবো । রুবেলের তো বাবা নেই , ওই যে ওর আম্মির সবকিছু । আসলে মাকে নিজে কখনো পায়নি তো , তাই রুবেলকে কেড়ে নিতে চায়নি ওর মায়ের থেকে ।

ডিপার্টমেন্ট থেকেই মাস তিন-চার আগে মন্দারমণি নিয়ে গিয়েছিল সবাইকে । ওখানেই রুবেলের কাছে সবার অলক্ষ্যে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিল লিলি । রুবেলের কোন দোষ ছিলনা, লিলি নিজের উৎসাহেই সমর্পন করেছিল নিজেকে । প্রথমটা বুঝতে পারেনি লিলি , কিন্তু বুঝতে পারার সাথে সাথেই জানিয়েছিল রুবেলকে । রুবেল এতো খুশি হয়েছিল যে মনের কোণের আশঙ্কাটুকু নিষেমে মুছে গিয়েছিল লিলির । আম্মির অমতেই লিলিকে বিয়ে করে আলাদা সংসার পাতবে রুবেল । 

সাজানো স্বপ্ন ভাঙতে বোধহয় বেশি সময় লাগেনা । নাহলে যে মানুষটা দশমিনিট আগেও কথা বলেছে , সেই মানুষটার মৃত্যুসংবাদ শুনতে হয় ! বাইক অ্যাক্সিডেন্টে স্পট ডেড রুবেল । ওর মোবাইলের কললিষ্ট থেকে রাস্তার কেউ ফোন করে খবরটা দিয়েছিল । লিলি হসপিটালে ছুটে গিয়েছিল , মোহরও গিয়েছিল সাথে । কিন্তু তার আগেই ওর বাড়ির লোকেরা পৌঁছে গিয়েছিল । দূর থেকে শেষবারের মতো দেখেছিল সাদা চাদরে মুখঢাকা রুবেলের দেহটা । রুবেলের আম্মি তো মেনে নিতে চায়নি লিলিকে । কোন্ পরিচয়ে যাবে সবার সামনে !

তিনমাস পেরিয়ে যাচ্ছে । সুপার সেদিন হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলেন , শরীর ভালো আছে কিনা । কিছু মাতৃত্বের লক্ষণ কি বোঝা যাচ্ছে লিলির শরীরে ? আজ বোঝা না গেলেও কদিন পর থেকে একটু একটু করে তো বোঝা যাবেই । এতো আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয় । একবার ভেবেছিল রুবেলের মায়ের কাছে গিয়ে সব সত্যি বলবে , কিন্তু মৃত ছেলের অবৈধ সন্তানকে কখনো মেনে নিতে পারবেন বলে মনে হয়না । সেদিনই মোহরের সাথে ডক্টরের কাছে এসেছে । সব সত্যি খুলে বলেছে ডক্টরকে । বয়স্ক ডাক্তার , অনেকটা লিলির বাবার বয়সীই হবেন হয়তো । উনিও বলেছেন বাচ্চাটাকে পৃথিবীতে আনার থেকে ওকে এখনি মুক্তি দেওয়া ভালো, এতো তোমার আর বাচ্চাটার দুজনেরই দুর্ভোগ কম হবে । 

তিনমাসে পেটের মধ্যে কতটুকু বড়ো হয়েছিল কি জানে । তবে পেটটার থেকে বুকটা যেন বেশি খালি খালি লাগছে । পৃথিবীতে আসার আগেই শিশুটাকে মেরে ফেলার জন্য সেই একমাত্র দায়ী । উফ্ কি অসহ্য এই সন্তান হারানোর যন্ত্রণা । রুবেলকে হারানোর দিনের থেকেও যেন বেশি কষ্ট হচ্ছে আজ । মাথার মধ্যে একটা ঠাণ্ডা হাতের স্পর্শে চোখ খোলে লিলি । বোধহয় মোহর এসেছে । ওর এতবড়ো বিপদের দিনে শুধু তো ঐ পাশে আছে । 

এক অচেনা ভদ্রমহিলা । তবে বোধহয় নার্সিংহোমের কোন স্টাফ হবে ।

আমি রুবেলের আম্মি ।

কথাটা শুনেই শরীরটাকে টেনে উঠে বসার চেষ্টা করে লিলি । উনি হাত ধরে শুইয়ে দেন ।

আন্টি তোকে খুঁজতে আমাদের হোস্টেলে গিয়েছিলেন। আমি ওনাকে সব বলার পরেও উনি তোর কাছে আসতে চাইলেন, তাই নিয়ে এলাম । মোহর কখন যে ঢুকেছে খেয়ালই করেনি লিলি ।

উঠতে হবে না বেটি। আজ আমার পাপে তোর এতবড়ো শাস্তি । তোদের ভালোবাসাকে মেনে নিইনি বলেই তো রুবেল আমার ওপর অভিমান করে চলে গেল । আমাকে ক্ষমা করে দিস্ বেটি । কদিন আগেও যাকে ছেলের বৌ বলে মানতে পারেননি , আজ তাকে জড়িয়েই সন্তান হারানোর যন্ত্রণায় আকুল নয়নে কাঁদছে রুবেলের আম্মি ।

লিলিও কাঁদছে , সন্তান হারানোর যে কি অসহ্য যন্ত্রণা তা তো তারও অজানা নয় । জাতপাত-মান-অভিমান ভুলে দুজনেই সন্তান হারানোর দুঃখে কেঁদে চলেছে সমানে । বাইরে অঝোরধারায় ঝরছে শ্রাবণধারা...........


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.