x

প্রকাশিত

অর্জন আর বর্জনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলেই মানুষ সিদ্ধান্তের নিরিখে দোলাচলে।সেখানে প্রতিবাদও ভঙ্গুর।আর যথার্থ প্রতিবাদের থেকে উঠে আসে টায়ার পোড়ার গন্ধ।আঘাত প্রত্যাঘাতের মাঝখানে জন্মদাগও মুছে যায়।সংশোধনাগার থেকে ঠিকানার দূরত্ব ভাবেনি কেউ।ভাবেনি হাজার চুরাশির মা’র প্রয়াণ কোন কঠিন বাস্তবকে পর্যায়ক্রমিক প্রহসনে রূপান্তরিত করেছে।একটা চরিত্র কত বছর বেঁচে থাকে ?কলম যাকে চরিত্রের স্বীকৃতি দেয় তেমন পোস্টমর্টমের পড়ও আরও কয়েকযুগ বাঁচিয়ে রাখতে পারে কলমই। অভয়ারণ্যেও ঘেরাটোপ! সেই আপ্তবাক্য -

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

“মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” – স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে – প্রকৃত সারসই তাহলে উৎকৃষ্টতর।

ভাববার সময় এসেছে। প্রতিবাদটা কোথা থেকে আসে—বোধ ?মস্তিষ্ক ?মুঠো? না বাহুবল?

ছবিতে স্পর্শ করুন

শব্দের মিছিল

অতিথি সম্পাদনায়

বিদিশা সরকার

সোমবার, জুলাই ৩১, ২০১৭

অনিন্দিতা মন্ডল

sobdermichil | জুলাই ৩১, ২০১৭ | | মাত্র সময় লাগবে লেখাটি পড়তে।
জলের ফোঁটা
কদিন ছিল যখন বৃষ্টি এলেই জল জমে থাকা মাঠে হুটোপুটি খেলার আকর্ষণ এড়ানো অসম্ভব ছিল । সেই বয়সে যখন জমে থাকা জল আসলে নোংরা , তাইতে কাদা পাঁক আরও কতরকমের আবর্জনা থাকে কে জানে , ইত্যাদি ইত্যাদি উপদেশ আদেশ কানের কাছের অদৃশ্য দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে যেত উৎসে , সেসময় আষাঢ়ের প্রথম বর্ষা বড় প্রিয় ছিল । স্কুল থেকে ফেরার সময়ে বর্ষাতি চাপানো মহা অন্যায় কাজ ছিল । কেমন টপটপ করে প্রথমে একটু উষ্ণ আর তারপর শীতল জল নেমে আসত শরীরে সেই অনুভূতি এখনও ফিরে পাই । এখন অবশ্য বৃষ্টিতে ভেজা একদম বারণ । মায়ের কাছে ভিজে ঝুপুস হয়ে বাড়ি ফেরার জন্য কক্ষনো বকুনি খাইনি । মা দরজা খুলেই আগে পিঠের ব্যাগ নিয়ে নিত । তারপর ঠেলে বাথরুমে ঢুকিয়ে দিত । কল খুলে সোজা চান করিয়ে দিত । তারপর শুকনো টুকনো হয়ে বিছানার ওপর আরাম করে বসে আমরা ভাইবোনেরা দেখতাম কার হাতপায়ের চামড়া কতটা কুঁচকে গেছে জল লেগে । সেইসব দিন ক্যালেন্ডারে রেড লেটার ডে ছিল । কারণ সেদিন মা আমাদের গরম চা খেতে দিত । বেশি গরম চা বাহাদুরি করে চুমুক দিতে গিয়ে ভাই অবশ্যম্ভাবী ঠোঁট বা জিভ পুড়িয়ে ফেলত । আমি তাড়াহুড়ো না করে এমন সুখটুকু বেশ মৌতাত নিয়ে চুকচুক করে উপভোগ করতাম । তবে এসবই ঘটত স্কুল ছুটির সময়ে হঠাৎ বৃষ্টি এলে । নয়ত বাইরে যাবো কি করে ? শ্রাবণ আরও মজার । লাগাতার বৃষ্টির ফলে বাড়ির বাইরে বা স্কুলে কিংবা খেলার মাঠে , সর্বত্র জলের মাঝেই আনাগোনা । জুতো ডুবিয়ে ভারী করে বাড়ি ফেরা । সর্দি জ্বর । মিছরির ক্বাথ । বাবার শাসন । একবার রথের দিনে জেদ করে রথ টানছিলুম বৃষ্টিতেই । সে ছোট ছোট ফোঁটার বৃষ্টি ছিল । কিন্তু জোরে ঝেপে আসতেই আমার সব বন্ধুরা রথ কোলে তুলে দৌড়ে বাড়ির দিকে চলে গেলো । কিন্তু আমি তো বীর মেয়ে ! পালাবো কেন ? ওরই মধ্যে টানতে থাকলুম রথ । ততক্ষণে রথের গায়ে ফুল কাটা রঙীন কাগজ চুপসে গিয়েছে । চারপাশের খোলা দেওয়াল দিয়ে বেগে ঢুকেছে জল । নিট ফল , জগন্নাথ বলরাম সুভদ্রার রং ও গলতে শুরু করেছে । এবার চোখের জল আর বৃষ্টির জল মিশে গেছে । আর দুঃখ বাড়িয়ে দিয়ে বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে তিন মূর্তিই গলে গলে আরও ঠুঁটো । যেসব গুজিয়া জাতীয় মিষ্টি টিস্টি দেওয়া ছিল সেসবের কথা না তোলাই ভালো । ক্লাস থ্রির সেই রথযাত্রা আমার জীবনের শেষ রথযাত্রা । বাড়ি ঢুকে আমার ক্রন্দনরোল বাকি সকলের পিলে চমকে দিলেও মা সেবার আর ক্ষমা করেনি আমাকে । নিয়ম করে চান করে নিয়ে দেখি মা তিন মূর্তিকেই খবরের কাগজে মুড়ে তাকে তুলেছে । কাল নাকি ওদের বিসর্জন হবে । আর রথের গায়ের সমস্ত সাজসজ্জা নির্মম হাতে টেনে খুলে ফেলেছে । রথটাকে দেখাচ্ছে যেন সবে কাঠামো তৈরি হওয়া নতুন বাড়ি । সেদিন দুঃখে রাতের খাবার খাইনি । 

যতই বৃষ্টি মজার হোক না কেন আমি বড্ড ভয় পেতাম বাজ কে । বেশির ভাগ সময়ে শ্রাবণের কালো মেঘ স্তরের পর স্তর জমে এমন হত । বিদ্যুত চমকাত । আলোর ঝলকানির সঙ্গে কড়কড় করে বাজের আওয়াজ । বাবা তখন কাছে টেনে আমাকে বুকের মধ্যে চেপে রাখত । তখন মনে মনে জপ করতাম 'লেবুর পাতা করম চা , যা বৃষ্টি ধরে যা ' । শ্রাবণদিনে আমরা যেহেতু বেরোতে পারতাম না , তখন বাড়ির মধ্যেই ছোটাছুটি করে খেলতাম । না খেলতে পারলে পড়ায় মনই বসবেনা ! স্কুলবেলা যখন গড়িয়ে এসে কৈশোরের প্রায় শেষ , তখন এক শ্রাবণশেষে লাগাতার বৃষ্টি শুরু হলো । চলল বেশ কয়েকদিন । তখন বোধ হয় ভাদ্রও এসে গেছে । আস্তে আস্তে আমাদের একতলা বাড়ির উঠোন ডুবতে শুরু করল । রেডিওতে জরুরি ঘোষণা হতে থাকল যে চারিদিকে সব নদীর জল বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে । অতএব বাঁধের জল ছাড়া হবে । ফলে শহরে আরও জল ঢুকবে । প্রত্যেকে যেন দোতলায় শিফট করেন । ঘন ঘন বুলেটিন আসছে । এবার ক ইঞ্চি হলো । এবার ক ইঞ্চি । সত্যি বলতে ভয় তো দূরস্থান , বেশ একটা রোমাঞ্চকর ব্যাপার লাগছিল । একরাত্রে জল উঠে এলো দালানের দু ইঞ্চি নীচ পর্যন্ত । প্রথমে কষ্ট হলোনা । বাজার থেকে যথেষ্ট খাদ্য মজুত করা হয়েছে । কিন্তু ক্রমে মনে হতে লাগল এইযে দিনের পর দিন জলবন্দী , এ বড় বিরক্তিকর । জল স্বাধীনতা হরণ করেছে। ওদিকে সকলেই বাড়িতে। ছুটির মেজাজ । আমরা খবরে শুনছি বন্যা পরিস্থিতি । আবার একটা এমন ভয়ংকর নিম্নচাপ যদি আসে ? খবরে বলছে কোথায় কোথায় নাকি মানুষের ঘরবাড়ি সব ডুবে গেছে । উঁচু গাছের ডালে চেপে বসেছে কেউ কেউ । নৌকো নিয়ে সেনারা গিয়ে তাদের উদ্ধার করে এনেছে । তারপর একদিন জল নামল । সেই প্রথম টের পেলাম জমা জলের তলায় কি ভীষণ ক্লেদ ! নাকে কাপড় দিতে হয় ! সেদিন বন্যাশেষে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছি আমরা । পোষ্য কেটুও আর রাস্তায় ঘোরাঘুরি করতে অসুবিধে বোধ করছেনা । বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম আচ্ছা , বৃষ্টি তো ভালো ! বর্ষা নাহলে ধান চাল হয়না । কিন্তু এমন বন্যা হলে কি হবে ? অনেক মানুষ নাকি ভেসে গিয়েছে মরে গিয়েছে ? বৃষ্টিকে কন্ট্রোল করা যায়না ? বাবা বেশ হতভম্ব । এ প্রশ্নের কি উত্তর হয় ? কিন্তু বাবা জানে মেয়েটা একটু কেমন যেন । তাই উত্তর দিল - জল খেপে গিয়েছিল রে । মানুষ জলকে বড় হতচ্ছেদ্দা করে । দেখিসনা কেমন কলের জল পড়েই যায় ? আর নদীর পাড়ে পাড়ে অসংখ্য ঘরবাড়ি হয়েছে , গাছ কেটে দিয়েছে মানুষ । ব্যস , আর কি । নদীও রেগে গেছে । আগে যতটা জল সে ধরতে পারত এখন আর পারেনা । তারপর আমার চুলের মধ্যে বিলি কাটতে কাটতে বাবা খুব স্নেহ নিয়ে বলে চলল - দোহাই বাবা । কাউক্কে নিয়ন্ত্রণ করার কথা কক্ষনো ভেবনা । জল তুমি মনে করছ নরম । কিন্তু দেখো সেই নরম জিনিসও খেপে গেলে কেমন হয় ! 

এখন বাবা আর নেই । কিন্তু আমি ভাবি । সত্যিই তো আমরা বাঁধ দিই , খাল কাটি , নদীকে নিয়ন্ত্রণ করি । আর পরিবেশের ওপর নানা অত্যাচারে সেও তিতিবিরক্ত হয়ে তার খামখেয়ালি বর্ষাকাল শুরু করে দিয়েছে । আমরা যত আষ্টেপৃষ্ঠে তাকে বাঁধতে যাই সে তত নরম থেকে ভীষণ হয়ে উঠছে । আষাঢ় শ্রাবণের সেই চিরাচরিত ভেজা দিন হারিয়ে যাচ্ছে জীবন থেকে ।


Comments
0 Comments
 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.