x

প্রকাশিত ৯৬তম সংকলন

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

পিনাকি চক্রবর্তী

sobdermichil | জুন ৩০, ২০১৭ |
শহীদের মা
১।
উত্তরাখণ্ডের রাজধানী শহর দেরাদুনের মালসি মহল্লায় খুব অল্প সংখ্যক মানুষ থাকেন । পাহাড় উপত্যকার খুব কাছেই ঝরঝরে একটা সরু সুতোর মতন নদী বয়ে চলেছে । সেই নদীর ধার ঘেঁষে শহর। খুব সকালেই জীবন নিজের চঞ্চলতা শুরু করে দেয় । খুব ভোরে যখন, শুভ্র রোদ আঁচলের মতন ছড়িয়ে থাকে, পাখি ডাকে ,আর মানুষজন ঘুরে বেড়ায় । তাঁদের মনে হিংসা নেই । চাহিদা খুব অল্প মাত্র। দিনেরবেলায় কাজ করে , রাতে ঘুম । এই সরল রেখার মতন মানুষ গুলো শুধুই হাসতে জানে । 

উধম সিং উঁচুর পাহাড়ি পথ বেয়ে নিচে ঢালুতে নেমে আসছে । তিনি বিশেষ কিছু করে না , কাঠের দোকানে আছে , ফার্নিচার  তৈরি করে । সেই ফার্নিচার এই শহরের গণ্ডি ছাড়িয়ে , উত্তরাখণ্ডের বাকী বড় শহরে চলে যায় । বলতে গেলে এই দোকানের সাথে তাঁর কয়েক পুরুষের যোগ । আগে ঠাকুরদা চালাতেন । তারপর বাবা । এখন উধম নিজেই বসছে । 

দোকানের পাল্লা তুলে গণেশের পাথরের মূর্তির সামনে লাড্ডু আর ধূপ জ্বালতেই , উধম দেখল ময়লা কাপড় পড়ে বৃদ্ধ বয়স্ক মহিলা এসে দাঁড়িয়ে । তাঁর চোখ লাড্ডুর দিকে । তাঁকে উদ্দেশ্য করে হিন্দিতে বলল - 

-নেবেন ?

-না । 

-আপনি নিন না মা । 

-তুমি কোথায় থাকো ? 

সামনে সূর্যের দিকে আঙুল দেখিয়ে , বলল - বিপরীতে একটা রাস্তা ডানদিক চলে গিয়েছে । হেঁটে পাঁচ কিমি হবে , সেইখানে থাকি । আপনি ?

-কখনো এই এখানে । কখনো দূরে আবার ধর্মশালায় থাকি । 

-দাঁড়ান , আপনাকে লাড্ডুটা দিচ্ছি । 

হাতে নিয়ে দামি বনস্পতিতে ভাজা , হলুদ রঙের লাড্ডুর দিকে তাকিয়ে রয়েছে । বলল ...

-তুমি নেবে না ।

-আপনি নিন , আমিতো প্রতিদিনই খাই । 

এমন সময় দোকানের ভিতর রাখা টেলিভিশনে নিউজ চ্যানেলে বলতে শুরু করল, প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সিজ্ ফায়ারিং ! অতর্কিতে বিশ্বাস ঘাতকের মতন আক্রমণ । ওঁরা দুজনেই তাকিয়ে দেখছে । বৃদ্ধা বলল ...

-আমি যাই বাবা । কাল আসব । 

-মা আপনি কাল অবশ্যই আসবেন । 

মাথা নেড়ে বৃদ্ধা চলে যাচ্ছেন । তাঁর ফিরে যাওয়া খুব মন্থর ! তাড়া না থাকলেও ফিরে যেতে হয় , সে ফেরায় বাধ্যবাধকতা থাকে । তেমন ভাবেই বৃদ্ধা হাঁটতে হাঁটতে সীমানা পেরিয়ে গেলেন । 

উধম দেখছে । বৃদ্ধার মাথার উপর মধ্য সকালের আলোর রেখা গুলো কাটাকুটি খেলছে ! 

#

-আরে , উধম ভাই ... 

উধম পিছনে তাকাতেই দেখল পণ্ডিত ঝতুলাল শর্মা । সৌগন্ধের জন্য নির্ঘাত আবার পাত্র এনেছে । 

-চাচা বলুন ।

-কি আর বলব । বলি এইবার আরও ভালো পাত্র এনেছি । তোমাদের বিরাদারির মধ্যেই । ছেলের দোকান আছে। তুমি রাজি হয়ে যাও । 

-চাচা আমি , আপনাকে কি বলেছি ? কথা আমার রাজি হওয়া নিয়ে নয় । কথা হল যার বিয়ে তাকে রাজি হতে হবে । আমি জবরদস্তি করতে পারিনা ।

-সে কি বলছে ?

-বলছে এখন বিয়ে নয় । পড়াই করে নেবে তারপর ।

-আরে ভাই মানলাম পড়ালেখা দরকার তাই বলে এত্ত বয়স অব্দি কুমারি রেখে দিবি ! 

-চাচা মেয়েটা যদি শাদি না করতে চায় আমি কি ভাবে তাঁকে জবরদস্তি করি ।

-তোর বউ । তাকে বল ।

-বিয়ের পর আমাদের কোন সন্তান হয়নি । আপনি সবইতো জানেন । মিছলি , আমার ছোট বোনটাকে নিজের মেয়ের মতন মানুষ করেছে । দোকানে আমার কথা চলে । ঘরে ওদের । আপনি যদি গিয়ে আপনার বৌমাকে রাজি করাতে পারেন , তবে এককথা ।

-আমি ! তোর বোন খুব ফটর ফটর করে । থাক । বলেছিলাম , বাড়ি গিয়ে দেখ । যদি রাজি থাকে । 

ঝতুলাল চলে যেতেই । উধম ভাবল , সত্যিই মেয়েটার বয়স কুড়ি হল । ওর সমবয়সী অনেকের বিয়ে হয়ে গিয়েছে । আজই বাড়ি গিয়ে কথাটা বলব ।

#

উধম সিং রাতে বারান্দায় খেতে বসে মিছলিকে বলল – তুমি একটু ওকে বোঝাও । ভালো পাত্র । ছেলেটাকে দেখতেও সুন্দর ছবিতো দেখলে । 

-তা দেখলাম । মেয়েকে বোঝাবে কে ? আরেকটা বছর কাটুক , তারপর দেখা যাবে ।

-চাচা বলছিলেন , এইবার বয়স বেড়ে গেলে আর পাওয়া যাবে না । 

-আমাদের মেয়ে ফেলনা নয় । কৃষাণজীউর আশীর্বাদ থাকলে নিশ্চয় হবে । এখনতো একটু ঘুরুক । আমি ওকে সংসারের কাজ শিখিয়ে দিচ্ছি । 

-ঘরে দেখছি নাতো , সে কোথায় ?

-গেছে মিনুর সাথে । 

-ঘড়িতে রাত আটটা । অনেক রাত হয়েছে । লোকে খারাপ বলবে ।

-কিচ্ছু বলবে না । মিনু আছে । তাছাড়া ওর উপর আমার বিশ্বাস রয়েছে , আমাদের মুখ কালো হয় এমন কাজ করবে না । 

-আচ্ছা , তা নাহয় বুঝলাম । ঠাণ্ডা নামছে । এত রাতে ঘোরাঘুরি শরীরের জন্য ঠিক নয় । 

খাওয়া হয়ে যেতেই মুখ ধুতে উঠে গেল ।  মিছলি ভাবল – মেয়েটা ঘরে ঢুকলে বকতে হবে । 

#

পাহাড়ি এলাকায় এক বাঁক থেকে অন্য বাঁকে যেতে হলে, কিছুটা পথ অন্ধকারে হাঁটতে হয় । বাঁকের মুখে আলোর ব্যবস্থা রয়েছে । সৌগন্ধরা দুজন । পাশের এলাকায় এক সহেলীর বাড়ি গিয়েছিল । পাথুরে টিলা , ধারে ধারে কাঁধে অন্ধকারের ঝোলা নিয়ে পাইন বাচ ওকের সারি দাঁড়িয়ে রয়েছে । অন্ধকারেও তাদের অভ্যর্থনায় এতটুকু খামতি নেই । মাঝে মাঝে আলো জ্বলা পোকা উড়ে উড়ে যাচ্ছে । আকাশে সাদা মাখনের ড্যালার মতন চাঁদ , সেখান থেকে আলো রাস্তায় গড়াগড়ি খায় । ওড়নাটা ভালো মতন মাথায় প্যাচিয়ে নিল । বাতাসে ঠাণ্ডা এসে মিশছে । 

মিনু বলল – ভয় লাগছে তোর ?

সৌগন্ধ বলল – ভয় লাগবে কেন ? মাঝে মাঝে এই অন্ধকার রাস্তাটায় কিছুটা বুক কেঁপে উঠছে । 

ওরা দুজনে বড় টিলাটা পেরিয়ে বাঁদিকে যেতেই , উল্টো দিকে একটা ছায়া দেখতে পেল । সেই অন্ধকারের ভিতর ছায়াটার হাতে লাঠি , আলো নেই , তাঁর উসকোখুসকো চুলের ফাঁকে , আকাশের ভাঙা অন্ধকার আটকে রয়েছে । শীতের জায়গা , জনশূন্য রাস্তায় এই ছায়া দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিল । সৌগন্ধ আঁতকে উঠল । মিনুর কনুই ধরে বলল – দেখ , ওই ছায়াটা কে !

মিনু কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল , রাস্তার অন্ধকারে পাছে তাদের অসুবিধা না হয় , হাতের টর্চের আলো মুখে ফেলল ।

-আরে ও তো বুড়ি ! পাশের পাড়ায় থাকে । একমাত্র ছেলে মারা যাওয়ার পরই ওইরকম , ঘুরে ঘুরে বেড়ায় ।

- ঘুরে বেড়ায় ! কেন বাড়ির লোক কোথায় ?

-বুড়ির স্বামী অনেকদিন আগেই মারা গিয়েছে । ছেলেটাকে বুকে করে মানুষ করেছিল । আমি শুনেছি । তারপর একদিন খবর পেল , ছেলেটা মারা গেছে ।

-কি ভাবে !! 

- সেনাবাহিনীতে কাজ করত । শত্রুর সাথে লড়াই করতে করতে শহীদ হয়েছে ।

-শহীদের মা ? 

- হ্যাঁ বলতে পারিস । সবাই সেই নামেই ডাকে । 

বৃদ্ধা ওদের সামনে এগিয়ে এসে বললেন – কি রে বেটিরা , এখনো বাড়ি যাসনি ? যা অনেক রাত হয়ে গেল ।

দুজনে কিছু বলল না । হাসল । 


#


বাড়ি পৌঁছাতে রাত নটা । সুনসান রাস্তায় উধম পায়চারি করছিল । সৌগন্ধকে দেখেই উত্তেজিত হয়ে বলল – এত রাত হল ! আমরা চিন্তা করছিলাম । 

-দাদা , বুঝতে পারিনি এতটা রাত হয়ে যাবে ! জানতো রাস্তাটা বেশ লম্বা । গল্প করতে করতে খেয়াল নেই । ভিতর থেকে উধমের বউ বেরিয়ে এল । বলল – আগে খেয়ে নেবে চল। 

খাওয়ার সময় , সৌগন্ধ বৌদিকে অনেক কথা বলল । বহুদিন বাদে দেখা । গল্প । মজা । রাস্তায় ফিরবার পথে সেই বুড়িটার কথাও । ছেলে হারিয়ে তাঁর সহায় সম্বলহীন অবস্থা । 

রাতে , বিছানায় শুয়ে শুয়ে , সেই মুখটাই মনে পড়ে যাচ্ছিল। ছেলে দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে, আজ সেই শহীদের মায়ের পাশে কেউ নেই ! প্রতিদিন এই এত দেশভক্তির কথা,  তাও শহীদের মাকে একাই ঘুরতে হয় । 


#

উধম দোকানেই ঠিক করে ফেলল । আর দেরী করা ঠিক হবে না। মেয়েটার বিয়ে দিয়ে দিতে হবে । সত্যিই দিনকাল যা পড়েছে , যদিও এলাকার পরিচিতরা এখনো কিছু বলেননি কিন্তু বলতে কতক্ষণ ! মনে মনে বলল –চাচাকে খবর দিতে হবে । 

সামনে সেই বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে । হাসল । মুখে বলিরেখা । দাঁতকটা পোকায় কাটা । হাসছে । পোশাকটা ছিঁড়ে গিয়েছে । 

বৃদ্ধা বলল – বেটা এত চিন্তা করছিলিস , আমকে খেয়াল করিসনি !

-তা নয় । মাথার উপরে কেউ নেই । বাপ মা অনেক আগেই চলে গিয়েছে । বোনটাকে নিয়ে চিন্তায় আছি ।

-কিসের চিন্তা । 

-শাদী করে দিতে পারলে , সবচেয়ে ভালো । সেই নিয়েই ভাবছিলাম মাইঝী । আপনি আসুন না , এসে বসুন । 

-বেহেন কি শাদীতে রাজি নয় ?

-ওকে এইবার বিয়ে করতেই হবে । অনেক হয়েছে । আর নয় । আমার বয়স হচ্ছে । 

-সে ঠিক বলেছিস ।

-আচ্ছা আপনার বাড়িতে কে আছে ?

কথাটা শুনেই বৃদ্ধা অন্যমনস্ক হয়ে গেল । বলল – ঘরের টান না থাকলেই , মানুষ ঘর ছাড়া হয় । আমার টান ছিল । এই তোর মতন একটা ছেলে । 

-কি হয়েছিল ?

-শত্রুদের হাতে শহীদ হয়েছে । 

-জওয়ান ছিল ?

- হু...

বৃদ্ধার চোখের দুই কোণে পাতলা জলের রেখা চকচক করছে , সেই জলীয় স্থানে সূর্যের আলো মেখে গিয়েছে , মুখের আঁকাবাঁকা পথে মিশে যাচ্ছে অনন্ত উষ্ণতা । বৃদ্ধা উঠে দাঁড়ালো । হাতের লাঠিটা শক্ত করে ধরে , কিছু না বলেই পিছনে হাঁটা লাগিয়েছে । 

উধম বুঝতে পারল , সে মস্ত ব্যাথার জায়গায় আঘাত করেছে । 



একটা দিন ঠিক হয়ে গেল । সৌগন্ধকে দেখবার জন্য পাত্র পক্ষের লোক এসেছে । মেয়েকে দেখেই তাদের পছন্দ হয়ে গেল । মেয়েটা যখন সরবতের গ্লাস নিয়ে ঘরের ভিতর এল উধম সিং তাকিয়ে ছিল । সেই ছোটবেলায় মা মরা মেয়েটাকে বড় করে তুলেছে । আজ সে পরীর মতন দেখতে হয়েছে । ঘাগরা , কানে দুল , গলায় হার , যেন রাজপুত দুলহানি । সব কিছু আছে , বাবামায়ের অভাব বোধ করছে। কিন্তু উধম এই শুভ দিনে মায়ের আশীর্বাদ চাইছে । সে ব্যবস্থা সেই করে রেখেছে । 

পাত্র পক্ষ চলে যেতেই , রাস্তায় নেমে উধম ঘোরাঘুরি করছিল । 

মিছলি বলল – কি হয়েছে বলতো ? 

উধম সামনের গলির দিকে তাকিয়ে বলল – না । একজনের আসবার কথা ছিল ।

সৌগন্ধ বলল – দাদা তুমি কার জন্য অপেক্ষা করছ ? 

উধমের কানে কোন কথা ঢুকছে না। সামনে সরু গলির মুখ , সাদা আলোয় আলোকিত । সেখানে তাকিয়ে বিড়বিড় করল – আছে কেউ । যে না এলে , আমার বোনের শুভদিন ভেস্তে যাবে। আমি ওঁকে আসতে বলেছিলাম । কথা দিল আসবে। আমি তাঁর জন্য সালোয়ার এনেছি । সে পড়বে। যেমন করে ছোটবেলায় মা পড়ত । 

সৌগন্ধ বুঝতে পারছে না। দাদা আবার কাকে ধরে আনল। সামনে তাকাতেই কোমর ঝোঁকা, সেই শহীদের মা কে দেখতে পেল! সেই বুড়ি । এরকথাই দাদা বলছিল ! 

উধম উৎকণ্ঠিত গলায় বলল ... 

-এত দেরী করলে কেন ?

- বাপু , আমি বুড়ি মানুষ পাশের শহরে গিয়েছিলাম । আসতে আসতে অনেক রাত হয়ে গেল । তা বিটিয়াকে পছন্দ তো ।

-হ্যাঁ মা। ওঁরা বলে গেছে । সামনের মাসেই বাগদান করে ফেলবে । 

-ভালো আমায় খাওয়াবিনা । 


উধম বৃদ্ধাকে ঘরের ভিতর নিয়ে এলো । খাবার দিল । বৃদ্ধা বলল ,- রাতের অন্ধকারে ওরা এলো । শয়তানরা । আমার ঘুমিয়ে থাকা ছেলেটাকে মেরে দিল । কোন যুদ্ধ ছিল না। মানুষের হিংসা আমার ব্যাটাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে । 

উধম বলল – তুমি কিছু সাহায্য পাওনি ?

-না । সরকার পক্ষের লোক নাকি আমায় খুঁজছে । ওদের একটা লম্বা পক্রিয়া আছে । আর কিছু পেয়েও বা কি হবে , কেউ তো নেই ! 

উধম , বৃদ্ধার কাঁপা হাত , নিজের মুঠোর মধ্যে নিয়ে বলল – আমি তোমায় একটা কিছু দেব , নেবে?

বৃদ্ধা বলল – দে , কি দিবি ?

উধম একটা মোলায়েম ফুলহাতার সালোয়ার কামিজ দিল । বলল – বাগদানের দিন এইটা পড়ে আসবে। মা পড়ত। আমাদের ছোটবেলায় , এখনো চোখে ভাসছে । আমি যত্নে রেখে দিয়েছি । তোমায় দিলাম । 

#

বাগদানের দিন , পাত্রপক্ষ দেনা পাওনা নিয়ে বসে পড়ল । হিসেব মতন পাওনার অগ্রিম তিন লক্ষ টাকা চাইছিল । উধম দিতে পারেনি । সঙ্গে সঙ্গে বাগদান পর্ব বন্ধ হয়ে গেল । বলা যায় পাত্র পক্ষের এই জুলুম নতুন কিছু নয় । এই তল্লাটে এমনটাই হয়ে চলেছে । 

যখন সবাই চলে গেল , শহীদের মা উধমের দেওয়া সালোয়ার কামিজ পড়ে ঢুকল । এই খালি হয়ে যাওয়া ঘর , বারান্দা , আর উধমদের মুখ দেখে বলল – কি হয়েছে ?

ঘরের ভিতর সৌগন্ধ কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল । মিছলি মেয়েটাকে সামলাতে লাগল । উধম দাওয়ায় বসে , মাথাটা দেওয়ালে হেলানো । উধম বলল – আমি কি করব বলো ? টাকা চেয়েছিল । আমি বলেওছিলাম বাগদানের পর । তখন কিছু বলল না। আচমকাই আজ এই সব ... 


২।

সাতদিন বাদে , এক সকালবেলা পিওন এসে উধমের বাড়ির দরজা ধাক্কালো । এই তল্লাটে বাগদান পর্ব ভেঙে যাওয়ায় , উধমরা বাড়ির বাইরে বেড়াতো না। সে নিজেও দোকানে যায়নি । 

-উধম সিং ?

-হ্যাঁ ।

-তোমার নামে সরকারি চিঠি আছে । এইখানে সই করে দাও । 

উধম সই করে দিল । 

পিওন চলে যেতেই , সৌগন্ধকে ডাকল , বলল পড়তো ।

চিঠিতে ইংরাজির নীচে , হিন্দি বয়ানে লেখা ...

-ভারতীয় সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত , দেশ সেবক উমর আলিকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হবে । দেশ সেবার জন্য পুরুষ্কৃত করা হবে । 

উধম বলল – কবে রে ?

-দাদা পরশুদিন । চিঠিটা দেরীতেই এসেছে । কিন্তু আমাদের বাড়ির ঠিকানা কেন ?

- বুড়ির নিজের বাড়ি বলতে ওই ভাঙা ঘর । তাও সবসময় থাকে না । তাই আমিই পোষ্ট অফিসকে বলে রেখেছিলাম, ওর নামে চিঠি আসলে জানাতে । যাই আজ একবার গিয়ে খোঁজ নেব । এতদিন বাদে ওঁর আশা পূরণ হবে । ছেলেকে সম্মান জানাবে । 


#

সন্ধ্যায় , উধম সিংকে দেখে মিছলি বুঝতে পারল কিছু একটা হয়েছে । উধম বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে রয়েছে । 

মিছলি বলল – কি হয়েছে ? তোমার মুখটা শুকনো লাগছে কেন ? 

উধম বাচ্চার মতন কাঁদতে শুরু করেছে । বলল – বাগদানের দুদিন বাদে , জ্বর এসেছিল । আমরা তো ব্যস্ত ছিলাম । বুড়িকে দেখবার মতন কেউ ছিল না । তিনদিন বেহুঁশ ছিল । তারপর সব শেষ । ওঁর এলাকার লোকেরাই চাঁদা তুলে কবর দেয় । আমি শেষ দেখা অব্দি , দেখতে পেলাম না ... 

মিছলির কথা গুলো বিশ্বাস হচ্ছিল না। একজন মানুষ এমন ভাবে চলে যাবে ! 



৩।

এই তল্লাটের সবচেয়ে বড় মাঠ । এখানেই সম্মান দেওয়া হবে শহীদের মা কে । মরবার আগে , সরকার পক্ষের লোকেরা খোঁজ খবরের জন্য এসেছিল । শহীদের মা তাঁদের জানিয়েছিল , তাঁর এই সমস্ত টাকা যেন সরাসরি উধম সিংয়ের নামে করে দেওয়া হয় । উধম জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে জানতে পারল । 

প্যান্ডেল । সামনে শতাধিক শ্রোতার মাথা । সবাই হাততালি দিচ্ছে । জেলা প্রশাসক আর সেনাবাহিনীর উচ্চ পদকর্তারা মঞ্চে বসে আছেন । সরকার পক্ষের একজন পঞ্চাশ লক্ষ টাকার চেক তুলে দেবে । উধমকে ডাকা হল ।

উধম মাইকটি হাতে নিল । হাসতে হাসতে বলল – ছেলের মৃত্যুর পর একবছর , একটা মা একা একাই ছিল । আমরা কেউ তাঁকে দেখতে আসিনি । সরকারের একবছর লেগে গেল ! আমার বোনের বিয়ে আটকে গিয়েছে টাকার জন্য। পণের টাকা। এই টাকা আমার খুব দরকার । বিশ্বাস করুন আমরা খুব সাধারণ মানুষ । টাকা আমাদের খুব দরকার । আমি হাতজোড় করে বলতে চাই এই টাকা আমি নিতে পারব না । যে মা নিজের জোয়ান ছেলের মৃত্যু দেখেও , প্রতিদিন নতুন করে বাঁচতে থাকে ।  আমি গর্বিত , আমি সেই মাকে পেয়েছি । আমার বোন নিজের পায়ে দাঁড়াবে । পণ দিয়ে বিয়ে দেবো না । এই টাকা নিলে , সেই মায়ের বলিদানকে ছোট করবে । টাকা দিয়ে মানুষকে সাহায্য করা যায় , তাঁকে সম্মানিত করা যায়না ...... 

এই প্রথমবার সভায় হাততালি পড়ল না। তামাশা হল না । সবাই মৌন হয়ে রইল । 



Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.