x

প্রকাশিত বর্ষপূর্তি সঙ্কলন

দেখতে-দেখতে ১০ বছর! শব্দের মিছিলের বর্ষপূর্তি সংকলন প্রকাশের সময় এ খুব অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু অজস্র লেখক, পাঠক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থনে আমরা অনায়াসেই পেরিয়ে এসেছি এই দশটি বছর, উপস্থিত হয়েছি এই ৯৫ তম সংকলনে।

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

জয়া চৌধুরী

sobdermichil | জুন ৩০, ২০১৭ |
আজাইরা বাজার কথন,  জয়া উবাচঃ পর্ব এক

তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে / বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক... মাথার মধ্যে ভোঁ ভোঁ করছে পঁচিশে বৈশাখের সদ্য রবীন্দ্রজয়ন্তী ভূরিভোজের অ্যাসিড। পার্স বগলে বাজারে বেরোতে বেরোতে ভাবনার ঢেঁকুর উঠল। আরেঃ ছোট থেকেই চক্ষু বুজিয়া এই ভাবেই না গানটা গাই... তাপ / সনি / শ্বাস বায়ে/ মুমুর / সুরে দাও / উড়ায়ে... ! এখানে তো তাপের কথা নয় তাপসের কথা বলা আছে! তপঃ প্রভাবে এতকাল কী সব বিল্লিচ্ছা উচ্চারণ করে গাইলাম! তা এই বোশেখে কলকাতা বিশেষতঃ প্রাক্তন গোড়ের হাট না অধুনা গড়িয়াহাট অঞ্চলের ডোভার লেনে প্রায় ভাপা মোমোর মত হাওয়া বাতাস। মানুষ ঘটি ঘটি জল খাচ্ছে আর একে অন্যকে সাবধান করে দিচ্ছে- এ আর কী গর্মি! এখনো মে পুরোটা, জুন, জুলাই পেরোলে তবে আসবে বিষ্‌টি! এখন পেট বাবা খান্ডব রাক্ষসের এলাকা। সেখেনে হড়ঘড়ি খিদের কড়াই চাপানো থাকে উনুনে। অতএব গুটি গুটি আলুর দোকানে গিয়ে দাঁড়ালাম। দিলীপদার বিশাল সাইজের চন্দ্রমুখীর হাতছানি এড়িয়ে জ্যোতির্ময় হবার জন্য থলে বাড়িয়েছি কানে এল স্বপনের গলা- “কী গাইব আমি কী শুনাইব আজি এই অখিল প্রভাতে...”। সুরটা এতটাই চেনা যে নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে না পেরে মাঝপথে থামিয়ে বললাম- 

- ও স্বপন কী গাইছ তুমি?

পাশ থেকে আধবয়সী এক হাফ পাঞ্জাবী পরা ভদ্রলোক আরো চেঁচিয়ে বলে উঠলেন

- এদিকে এখানে গরম গরম বলে সব্জির দাম নিচ্ছ, আর পেপারে দেখলাম বিহারে নাকি এমন বৃষ্টি হয়েছে যে সব ক্ষেত ভেসে বন্যার গতিক। লোক মরছে টপাটপ। 

- বেশ হয়েছে। কটা লোক মরলে এখানে থেকে বিহারিগুলো দেশে চলে গিয়ে গাদা হবে। এখেনে খালি হবে। তখন বাঙালি ছেলেগুলো সে জায়গায় বসে যাবে। জায়গা কি আর খালি থাকে দাদা? একজন গেলে তক্ষুনি আর পাঁচটা লোক এসে সেটাকে ভর্তি করে দেয়। 

রোগা পাতলা ঋত্বিক স্বপনকে দেখে এমন হিংস্র কখনও মনে হয় নি আমার। গতিক দেখে বুঝলাম রোদটা বড্ড বেশিই চড়েচ্ছে ডোভার লেনে। কিন্তু গানের ব্যাপারটা ফয়সালা করতে হয় তো। আবার গলা বাড়ালাম-

- ও স্বপন কি গান গাইলে আর একবার গাও দেখি

পাশ থেকে দিলীপদা তার দাঁড়িপাল্লায় পেঁয়াজ চাপিয়ে বলল-

- ওর গান শোনার জন্য দোকানে লোক ভিড় করে আসে। তা স্বপন বৌদিকে বলেছিস সেদিন পুলিশ নিয়ে কি করলি?

তখন বৌদি কেন বাকী সব দাদা, কাকা, দাদু, মিনতিরাও ঝুঁকে পড়ল স্বপনের দোকানে। নানা রকম প্রশ্নের কিচিরমিচির থেকে উদ্ধার করা গেল যে সেদিন আলুর দোকানে এক পুলিশ এসেছিল তোলা চাইতে। তা বাজার মানেই তোলা সে তো আমরা জানি। এখন কথা হচ্ছে এ বাজারে কেউ মুখে স্বীকার করে না তারা তোলা দেয়। আপাতত এ ওয়ার্ড ঘাসফুল পার্টির, আগে ছিল কাস্তে হাতুড়ি পার্টির। কারণ পাশেই আছে বিখ্যাত বা কুখ্যাত ১৬ নম্বর বস্তি। মুম্বাইয়ের ধারাভির চেয়ে সাইজে ছোট তবে গ্ল্যামারে ছোট নয় এ বস্তি। তা বছর পঁচিশ প্রায় হয়ে এল এ তল্লাটে। তোলার গল্প চিরকালীন ঠিক যেন - অনেক দিন আগে অযোধ্যা নগরে দশরথ নামে এক নৃপতি ছিলেন... এর মত অনাদি ব্যাপার। এটি শিক্কিত পাড়া বলে তোলার ব্যাপারটা ঢাকা দিয়েই রাখা হয় বরাবর দেখেছি। তা আজও দেখলাম দিলীপ বলল- 

- বুঝলেন বৌদি, হপ্তায় ১০০ টাকা তোলা চাইতে এসেছিল। তেড়ে বলে দিয়েছি- এ তো গাড়ি পারকিং করার জায়গা। টাকা দিতে হলে কর্পোরেশনকে দেব আপনাকে কেন দেব?- স্বপন মাঝে বলল-

- আমি তারপর নানান কটা বলে মাথা ঠান্ডা করি। দেখুন ব্যবসা করতে গেলে মাতা গরম করলে চলে না। শত্তুর কে তোয়াজ করে চলতে হয়।

- শত্রু!!! পুলিশকে শত্রু বলছ?

- ও ছোটবেলার বইয়ের কথা ছাড়ুন বৌদি। পুলিশ শত্তুরই তো। দিলীপদা সন্ধ্যায় চপের দোকান দেয়। তা মাঝে মদ্যে দোকানে ফোন করে কটা চপ মুড়ি চা দিতে বলে। সে তো দিতে হয় ই । দেকুন শত্তুরকে উঁচু আসন দিতে হয় বুঝলেন?

মনে মনে হ্যাঁ বললাম। কিন্তু গানের ব্যাপারটা তো ফয়সালা হল না। মরীয়া হয়ে ঝিঙে, বেগুন, কুমড়ো, কাঁচা আমের সাথে গানের আর্জিটাও ঢুকিয়ে দিলাম।–

- ও স্বপন গানটা শেষ করলে না?

- ওঃ এ তো চেনা গান বউদি- কী গাইব আমি কী শুনাইব আজি এই অখিল প্রভাতে... এটা রবিন্দ্রসঙ্গীত বৌদি। চোখ প্রায় আধবোজা, এক কিলো বলে ৮৫০/ ৯০০ গ্রাম ঝিঙে থলেতে ভরতে ব্যস্ত আধুনিক রবীন্দ্রনাথকে দেখে মনে মনে তৃপ্ত হলাম। যে যাই দোষ চাপাক রবীন্দ্রনাথকে বুর্জোয়া কবি বলে। মরে যাবার ৭৬ বছর পরেও যে লোক সব্জিওয়ালার মুখে মুখে ফেরেন তিনি সত্যিই গুরুর গুরু মহাগুরু! লেখালিখি করি বটে তবে মহাগুরু হওয়া কি মুখের কথা! সবাই কি আর মিঠুন চক্কোত্তি?

আজকের বাজারে আরও অনেক গল্প ছিল। কিন্তু আজ আর নয়। আর ওই ‘ঋত্বিক স্বপন’-এর ধাঁধাটা... আর এক দিন বলব’খন। আজ চলি...

কী গাইব আমি কী শুনাইব আজি এই অখিল প্রভাতে...


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.