x

প্রকাশিত ৯৬তম সংকলন

শব্দের মিছিল শুরু থেকেই মানুষের কথা তুলে ধরতে চেয়েছে, মানুষের কথা বলতে চেয়েছে। সাহিত্যচর্চার পরিধির দলাদলি ও তেল-মারামারির বাইরে থেকে তুলে আনতে চেয়েছে অক্ষরকর্মীদের নিজস্বতা। তাই মিছিল নিজেও এক নিজস্বতা অর্জন করতে পেরেছে, যা আমাদের সম্পদ।

সমাজ-সচেতন প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে শব্দের মিছিল   প্রথম থেকেই নানা অন্যায়, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। এই বর্ষপূর্তিতে এসেও, সেই প্রয়োজন কমছে না। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরবর্তী বিভিন্ন হিংসাত্মক কাণ্ড আমাদের যথারীতি উদ্বিগ্ন করছে। যেখানে বিরোধী দলের হয়ে কাজ করা বা বিরোধী দলকে সমর্থন করার অধিকার এখনও নিরাপদ নয়, সেখানে যে গণতন্ত্র আসলে একটি শব্দের বেশি কিছু নয়, সেকথা ভাবলে দুঃখিত হতেই হয়। ...

চলুন মিছিলে 🔴

সুনীতি দেবনাথ

sobdermichil | মে ০৯, ২০১৭ |
সুনীতি দেবনাথ
 মাটি আর নারী 

সেদিন সেই যাযাবরী জীবনে শীতল সাইবেরিয়ায়
পশুপালক তোমাদের সাথে আমিও তো ছিলাম
প্রান্তরের পর প্রান্তরে সবুজের সে কী তরঙ্গ উদ্দাম!
সেদিনও বরফ ঠাণ্ডায় যখন আমি কুঁকড়ে যেতাম,
তোমাদের সন্তানগুলিকে বুকে চেপে শেষ উষ্ণতা
বিন্দু বিন্দু ওদের দেহে সঞ্চালন করে দিতে হবে
সেই সত্য সবার উপরে জেনেছি মেনেছি।
আর ইউরাল পর্বতের অরণ্য থেকে
বুনো ঘোড়াকে বশ মানিয়ে এপার ওপার
পিঙ্গল চুল উড়িয়ে টগবগ টগবগ ছুটতে তোমরা।
এই করে একদিন সব ঘাস শেষ হতো
পরম্পরায় সন্তান সন্ততি বেড়ে পরিণাম খাদ্যাভাব
নতুন এলাকায় দিতে হতো পাড়ি পশুর পাল
যাবতীয় অস্ত্রশস্ত্র শিশু নারী সহ ,
নিঃসন্দেহে জানি যেসব নারীর দেহে জোয়ারের খেলা নেই
ভাঁটার টানে কুঁজো হয়ে প্রতীক্ষার শেষ দিন গুনে যেতো
বর্জিত হতো তারা খাদ্যহীন তাঁবুহীন সাথীহীন সে প্রান্তরে।
সেই সব নারী পৃথিবীর অনাদৃতা অবাঞ্ছিতা কন্যা মাত্র।
সেই আদিম পৃথিবীর নাবাল মৃত্তিকায় কত বৃদ্ধা জননীর দেহ
ইউরেশীয় চিল শকুন বুনো ধূর্ত শেয়ালেরা ছিঁড়েখুঁড়ে আহ্লাদে খেয়েছে,
হাড়গোড় মিশে গেছে মৃত্তিকার স্তরে,
এসব করুণ গাথা ভূতাত্ত্বিক নৃতাত্ত্বিকের জ্ঞানের বিষয়।
গোষ্ঠীবদ্ধ জনসংখ্যা যখন লাগামছাড়া
অশ্বপৃষ্ঠে ছোট ছোট দলে পুরুষেরা ছুটলো
ইউরোপ আর মধ্যপ্রাচ্য বিজয়ে, তখন তাদের দলে
পরিত্যক্ত আমি নারী, বিজয় এনে দেবে
নবীনা নারীদের—
যোদ্ধা পুরুষের যুদ্ধক্ষেত্রে নারী বিবর্জিতা।
আর্যদের পূর্বপুরুষ এরা, এদেরই একটি শাখা
কালক্রমে পৌঁছে গিয়েছিল ইরান মরুর বুকে
রুক্ষ কঠোর জীবনে ওরা শক্ত পেশীর শরীরে
যুদ্ধ করে করে অপরিমেয় শক্তির আধার হলো।
ইঙ্গিতে ওদের ডাকছিল সুজলা সুফলা ভারতবর্ষ,
তাই অশ্বশক্তি অস্ত্রশক্তিতে বলীয়ান ওরা পৌঁছালো
গিরিপথ পেরিয়ে এদেশের অমল মধুর মাটিতে।
এবারও তাদের সাথে আমি নারী ঠাঁই পাইনি
ইতিহাস বলে।
ভূস্বর্গ কাশ্মীর দখল করে সিন্ধু অববাহিকায়
ইন্দোইরানীয় পুরুষ তোমরা উজ্জ্বল সূর্যালোকের মত
তেজোদীপ্ত আবির্ভাবে ক্ষমতার বলে বলীয়ান
পঞ্চ নদীর দেশ দখল করলে, দখল করলে আমাকে,
আমি অনার্য নারী সেদিন আর্য পুরুষের সম্পদ
এভাবে ঠিক এমনি করে পুরুষ তুমি আমার সমগ্র সত্তাকে
একবার নয় বারবার দখল করেছো, সম্পদ বানিয়েছো।
যোদ্ধা পুরুষ অমিত শক্তিশালী মাটির দখল
নেবার সাথে সাথে ভূমিকন্যাদের দখল করেছো।
এ তোমার যুগ যুগের সঞ্চিত অপরাধ আর
ভূমিকন্যাদের অশ্রুসিক্ত জীবনের অপমান।
আমি আর আমার মত নারীরা যেন বোবা পশু,
পশুশিকারী মদমত্ত পুরুষ বন্য পশুর মতই
আমার দখলদারী চালিয়ে গেলে চিরটা কাল।
তোমাদের অশ্বখুরে উত্থিত ধুলোয় ঢেকে গেল
আমার চোখের জলের স্বপ্নমাখা উত্তাল তরঙ্গ।
বিজয়ী আর্য সারাটি উত্তর ভারত দখল নিয়ে
এলো জলজঙ্গলের দেশ রূপবতী বাংলায়।
আবারো ভূমিপুত্র নিহত বিতাড়িত হলো আর
কোমলকান্তা লাবনীমাখা ভূমিকন্যা অপহৃতা
লাঞ্ছিতা।
শ্যামলী বঙ্গকন্যার হাতে লোহার শিকল আর
পুরুষ দেহের রক্ত টিকায় ব্যক্তি পুরুষের চিহ্নিত
সম্পত্তি হলো নারী।
আজো এতদিনের এপারে এসে আমি
নোয়া সিঁদুরের আনুগত্যের বন্ধন মুক্ত নারী হলাম না।
মাটি আর নারী বুঝি পুরুষের ঐতিহাসিক শাশ্বত সম্পদ!




 সে 

কাশ ছেনে বাছাইকরা কিছু নক্ষত্র
সে একদিন আমার আঁচলে ঢেলে দিয়েছিলো
পৃথিবীর সব অরণ্য তল্লাসী করে নীলকণ্ঠ পাখির
পালক এনে আমার খোলা চুলে সাজিয়ে দিলো
জল থৈথৈ বিলে অবিরাম সাঁতরে দু’টি হাতে শাপলার
বাজুবন্ধ পরিয়েছিলো, সে আমার প্রিয় ভাই।
আমি যখন কাগজ কলমে শব্দের আঁকিবুঁকিতে
সারিতে সারিতে আলপনা এঁকে যেতাম তখন সে
পাশটিতে চুপটি বসে হাঁকরা চোখে তাকিয়েই থাকতো।
উদাসী জানলায় বিবশ বিকেলে উদাস উদাস আমি
আমার চেতনায় তুমুল বৃষ্টি ভাবনা মত্ত বিক্ষুব্ধ সংলাপে
আকাশে ঝড়ো মেঘের ঝুঁটি চেপে আমি দুনিয়াটাকে
ওলোটপালোট করে চাইতাম সাজিয়ে নেবো ইচ্ছেখুশি।
হয়তো আমার দু’চোখে তখন বিদ্যুল্লেখা আগুনের ফুলকি
আর আমি আগুনের মত জ্বলে উঠে হতে চাইছি অগ্নিকন্যা,
সে পাথর মুখ কোঁচকানো ভুরু সুতীক্ষ্ণ  দৃষ্টিতে আমাকে দেখতো,
তার সেই নিঃশব্দ চাউনি অনুচ্চারিত প্রতিজ্ঞা হয়ে
আমাকে কাঁপিয়ে দিয়ে অন্দরমহলে তুলতো তোলপাড় ঝড়।
কখনো শান বাঁধানো ঘাটে একেলা আমি বসে
জলকেলিতে হাঁসগুলির খুনসুটি দেখছি পানকৌড়ির
টুপ টুপ ডুব  চমকালো রঙবাহারি মাছরাঙার রকমসকম-
আমি দ্বাদশী কিশোরী খিলখিল হাসির দমকে ভেঙ্গে পড়ি,
সে তখন হা হা হাসির অট্টরবে কাঁপিয়ে দিতো
সারাটা দিঘীর কালচে জলের ঘরসংসার
ওপাশের একঠ্যাঙা তালগাছটার পাতাগুলি উঠতো কেঁপে
বাঁশঝাড়ে সবুজ দীঘল পাতারা সন্ত্রস্ত, ঝুঁকে দেখতো
মাটি কেঁপে কেঁপে চৌচির হয়ে গেলো কিনা।
আমি বলতাম ভাই এমন হাসি হেসোনা
ভাই আমার বুক যে কাঁপছে থরোথরো।
আর ঠিক তখনই দু’টি মুঠো খুলে সে উজাড় করে
ঢেলে দিতো আমার হাতে গুচ্ছ লাল পলাশ,
আকাশে বাতাসে মৃত্তিকার রোমে রোমে কী লাল উল্লাস!
সে খুশিতে ডগোমগো ঘাসের সবুজ মখমলে সেকী গড়াগড়ি!
আমার দু’চোখে নতুন আনকোরা পৃথিবীর ছবি স্থির চিত্রলেখা!
তারপর দিনগুলি ডানা মেলে দিলো যে উড়াল
উড়তে উড়তে পার হলো পাকা সোনালী ধানের খেত
নীল গাছের ছায়ায় ছোট ছোট ঘর গেরস্তালি
অগুন্তি গ্রামের পর গ্রাম কত মানুষের পাড়া ঘরসংসার
পার হয়ে নগর প্রান্তর দিল পাড়ি না ফেরার দেশে।
খুব যে বেশীদিন খুব যে বেশী পরিসর এভাবে পার হলো
ঠিক এভাবেই কেটে গেলো বলাতো
চলে না
এসে গেলো ভয়াল আরেক বিপন্ন দিন বৈশাখী ডানায়।
সে কোথায় আমি কোথায়
মাঝে দিকশূন্যপুরের ক্ষিপ্ত ভয়ঙ্কর মাঠ পদচিহ্নহীন
এলো পঙ্গপালের মত শোষক দল নির্দয় নিষ্ঠুর
ভেঙ্গেচুরে তছনছ সব বহুকালের স্বপ্নের বাড়িঘর,
কৃষ্ণ ডানায় এলো দিনের উঠোনে বাদুড়ের দল
অন্ধকার ছড়িয়ে ছড়িয়ে তোমার আমার সকলের ঘরে।
জীবন্ত মানুষ লাশ হলো ভাষাহীন আশাহীন স্বপ্নহীন
স্বাধীনতা ছিন্নকন্থা দুয়ারে দুয়ারে কেঁদে ফেরে
ভিক্ষাপাত্র হাতে ক্ষতের বীভৎস দাগ সারা দেহে নিয়ে।
আর সে হেঁটে চলেছে হেঁটেই চলেছে তারপর,
তারপর সে কেঁদেই চলেছে কাঁদছে কেবলই
আমার চোখে ভরা কালো দিঘী অফুরন্ত জল টলোমল,
আমি দেখছি শূন্য দৃষ্টি শূন্যে মেলে সে
ফসলী মাঠের আলপথে হেঁটে চলে যাচ্ছে দূর থেকে
দূরে আরও দূরে উদ্ভ্রান্ত পাগলের মত
গন্তব্য না জেনে এই যাত্রা পরিণাম হীনতায় বিদ্ধ।
এ যুগের ক্রুশবিদ্ধ যীশু!
কতগুলো মানব চেহারাধারী পশু মত্ত জিঘাংসায়
ছুঁড়ছে কাদা , ইটপাটকেল সে আজ পাথর মানুষ
অনুভূতি লেশমাত্র নাড়ায় না তাকে, ক্রোধ তার
ভেসে গেছে মেঘনা পদ্মার স্রোতে ভেসে
বহুদূরে বঙ্গোপসাগরে।
আমি ডাকি ভাই কথা শোনো,
ফিরেও চায় না সে এলোমেলো পায়ে চলে যায়।



Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন


বিজ্ঞপ্তি
■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.