x

প্রকাশিত | ৯৪ তম মিছিল

কান টানলেই যেমন মাথা আসে, তেমন ভাষার প্রসঙ্গ এলেই মানুষের মুখের ভাষার দৈনন্দিন ব্যবহারের কথাও মনে পড়ে যায়, বিশেষত আজকের দিনে। ভাষা দিবস মানেই শুধু মাতৃভাষা নিয়ে আবেগবিহ্বল হয়ে থাকার দিন বুঝি আজ আর নেই!

কেননা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাঁরা মাথায় বসে আছেন, বিশেষত যাঁরা রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতাভােগী এবং লােভী, তাঁদের মুখের ভাষা এবং তার প্রয়ােগ আজ ঠিক কতটা শিক্ষণীয় এবং গ্রহণীয় সেটা শুধু ভাবার নয়, রীতিমতো শঙ্কার এবং সঙ্কটের।

সবই কি তবে মহৎ ভাবনা, অনুপ্রেরণার জোয়ার? নাকি রাজনৈতিক কারবারিরা 'সুভাষিত' শ্রবণাতীত বয়ানে নিজেদের অক্ষমতার মদমত্ত প্রকাশ করছেন? সাধারণ ছাপােষা মানুষ বিস্ফারিত চিত্তে এই ভাষাসন্ত্রাস,এই ভাষাধর্ষণ দেখতে শুনতে ক্লান্ত। এর থেকে উত্তরণের উপায় এখনও অবধি কোনাে ভাষা দিবস দেখাতে পারেনি। এবারের ভাষা দিবসের কাছেও কি সেই উপায় আছে? নাকি এই খেলা হবে, চলবে ... মেধাহীন গাধাদের দৌলতে?

চলুন মিছিলে 🔴

মঙ্গলবার, মে ০৯, ২০১৭

শিবাজী সেন

sobdermichil | মে ০৯, ২০১৭ | | মিছিলে স্বাগত
দাগ
‘হয় পরপর দু-দু’টো শো-এ আমার যা ক্ষতি হয়েছে সেই টাকা শোধ কর---না হয় জেলে যা...’

এই সবেমাত্র মায়ের সৎকার সেরে উঠেছে বাতাবী। এটা যদিও তার আসল নাম নয়; আসল নাম ঝুমুর। চেহারার গড়ন অনেকটা বাতাবীলেবুর মতো গোলগাল বলে দলের লোকেরা তাকে বাতাবী বলে ডাকে। 

‘এই ঝুপড়িটা ছাড়া আমার আর কিছুই নেই কত্তা...আমায় আপনি জেলেই দিন !’

কর্তা মোহন তিওয়ারি গলা চড়িয়ে, আঙ্গুল নাড়িয়ে হুমকি দিয়ে গেল, ‘তাইই দেব। তোকে আমি জেলই খাটাবো। আমায় তুই চিনিস না শালি। আমার নামও মোহন তিওয়ারি...সারা এলাকা আমায় এক নামে চেনে।’

বাতাবী সেই অর্থে লেখাপড়া না জানলেও তার অনুপস্থিতির ফলে শো-এর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ঠিক কত তা আন্দাজ করতে পারে। সার্কাসের একটি প্রদর্শনীতে বারো-তেরো জন বামনের মধ্যে মাত্র একজন সাড়ে তিন ফুটের বামন উপস্থিত না থাকলে যে সেটা কারো চোখেও পড়বে না তা বাতাবী তার এই দু’বছরের কর্মজীবনে বুঝেছে। 

তিওয়ারি চলে যাওয়ার পর আশপাশের শুভাকাঙ্খী-মহলে জোর আওয়াজ উঠল, ‘ঝুমুর, তুই পালা, বাঁচতে চাস তো এই বেলা ভেগে পড় ! ও ভালো লোক নয় রে; থানা-পুলিশ সব ওর কেনা...’

বাতাবী পালায়নি। সারা রাত মা-হারা ঝুপড়িটাতে একা জেগে কাটিয়েছে। সে অশিক্ষিত, মুর্খ---বেশি যুক্তি তার আসে না। তার একটাই কথা, ‘আমি তো অন্যায় করিনি ! পালাবো কেন ?’

একটু বেলায় নড়বড়ে দরজাটায় ঘা পড়ল। হাতের ধাক্কা না, লাঠির ঠক্ ঠক্। বাতাবীকে ধরার জন্য পুলিশকে বেগ পেতে হল না। সে আপন ইচ্ছায় গাড়িতে উঠে গেল। তার চেহারার গঠন ও গলার খ্যানখ্যানে স্বর সার্কাসের দর্শকদের হাসিয়ে এসেছে এত দিন। পুলিশকর্মীরাও আজ হাসছে। বাঁকা মন্তব্য করছে। রেখেঢেকেও নয়। বাতাবী কোন দিকে তাকালো না। পুলিশভ্যানের পিছনের খোলা দরজা দিয়ে একেবারে ভিতরে গিয়ে বসল। 

‘কি রে বাতাবী, তোর ভয় করে না জেলে যেতে...’

‘না গো দারোগা, ভয় কিসের ? আমি তো কোন অপরাধ করিনি !’

‘খবরদার এ কথা আদালতে বলবিনি...বলিছিস কি ঠ্যাঙিয়ে মাজা ভেঙে দেব। তিনফুটি বামন বলে রেয়াত হবে না কিন্তু !’

বাতাবী সেদিন চলন্ত গাড়ির মধ্যেই বুঝে গিয়েছিল তার সাথে ঠিক কি হতে চলেছে...

দুপুরের গনগনে তাপে হাজতের লোনা-ধরা পুরনো ঘরটা বেশ ঠান্ডা। কাল রাত থেকে পেট খালি। দু’টো পোড়া রুটি আর কি একটা সবজি দিয়ে গেছে। সামনেই পড়ে আছে থালাটা। বাতাবী সেদিকে ফিরেও তাকায়নি। এক মনে কি ভাবছিল। 

‘নিজেকে বড় চালাক ভাবিস...না ! ভেবেছিলি আমার দু-দু’টো শো-এর ক্ষতি করে দিয়ে পালিয়ে পার পাবি। রাতারাতি সার্কাস ছেড়ে পালিয়ে এলি মায়ের ছেরাদ্য করতি। এবার দেখি তোর মা তোকে বাঁচাতে আসে কিনা...’

গারদের বাইরে সাদা ফুলহাতা জামা আর সাদা ফুলপ্যান্ট পরা কালো, রোগা, লম্বা, দেহাতি চেহারার তিওয়ারি সদর্পে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাবী একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল, ‘আমার মা ছ’মাস ধরে বিছানায় পড়ে ছিল হুজুর, ম্যানেজারবাবু একটা বেলাও ছুটি দিলে না মাকে দেখার জন্য। তার পায়েও আমি ধরিচি। একটা শো-ও আমি বাদ দিইনি। কিন্তু যখন কত্তা, আমার মা মরে গেল তখন মায়ের মরা মুখটা দেখবার জন্যও ছুটি দিলে না ! আমি পালিয়ে না এলে তার সৎকার কে করত। আমার মায়ের যে আমি ছাড়া আর কেউ নেই...’

বাতাবী অনেকক্ষণ ধরে ক্ষীণ আলো থেকে অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে দেখল সাদা জামা আর সাদা প্যান্টটাকে। চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালো, শক্ত করে চেপে ধরল গরাদটাকে---চোয়াল শক্ত---দৃষ্টি স্থির...




Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ আপডেট পেতে,পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.