x

প্রকাশিত | ৯২ তম মিছিল

মূল্যায়ন অর্থাৎ ইংরেজিতে গালভরে আমরা যাকে বলি ইভ্যালুয়েশন।

মানব জীবনের প্রতিটি স্তরেই এই শব্দটি অবিচ্ছেদ্য এবং তার চলমান প্রক্রিয়া। আমরা জানি পাঠক্রম বা সমাজ প্রবাহিত শিক্ষা দীক্ষার মধ্য দিয়েই প্রতিটি মানুষের মধ্যেই গঠিত হতে থাকে বহুবিদ গুন, মেধা, বোধ বুদ্ধি, ব্যবহার, কর্মদক্ষতা ইত্যাদি। এর সামগ্রিক বিশ্লেষণ বা পর্যালোচনা থেকেই এক মানুষ অপর মানুষের প্রতি যে সিদ্ধান্তে বা বিশ্বাসে উপনীত হয়, তাই মূল্যায়ন।

স্বাভাবিক ভাবে, মানব জীবনে মূল্যায়নের এর প্রভাব অনস্বীকার্য। একে উপহাস, অবহেলা, বিদ্রুপ করা অর্থই - বিপরীত মানুষের ন্যায় নীতি কর্তব্য - কর্ম কে উপেক্ষা করা বা অবমূল্যায়ন করা। যা ভয়ঙ্কর। এবং এটাই ঘটেই চলেছে -

চলুন মিছিলে 🔴

মঙ্গলবার, মে ০৯, ২০১৭

জয়িতা দে সরকার

sobdermichil | মে ০৯, ২০১৭ | | মিছিলে স্বাগত
বিবেক
ধর্ম-অধর্ম,পাপ-পুণ্য,ন্যায়-অন্যায় এইসবের হিসাব সঠিকভাবে জমা খরচ করতে করতে সারাটা জীবন কাটিয়ে ফেলেছেন নন্দদুলাল বাবু। এ তল্লাটে সবাই জানেন নন্দদুলাল বাবুর বিবেকবোধ খুবই সজাগ। উনি সহজে কোনও ভুল কাজ করেন না। কিন্তু আজ যখন মালতি,ওর বর, আর ওর দুই মেয়ে নন্দদুলাল বাবুর বাড়ি থেকে সোজা পুলিশ ভ্যানে না উঠে টাউন সার্ভিসে উঠে সকলের চোখের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছিল তখন সবার রক্তচক্ষু থেকে ক্রমশ আগুন ঝরে পড়ছিল। অথচ নন্দদুলাল বাবুর ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারছিল না। 

-ছেড়ে দিন কাকু আমরা গরীব মানুষ। আপনার এতগুলো টাকা কি করে ফেরত দেবো? যে ক’টা টাকা বোনের ব্যাগ থেকে পেয়েছি সাথে করেই নিয়ে এসেছি।

এই বলে নন্দদুলাল বাবুর পায়ের কাছে গার্ডার দিয়ে মোড়ানো কয়েকটা হাজার টাকার নোট আস্তে করে রেখে দেয় মালতীর বড় মেয়ে প্রমীলা। পাশে মাথা নিচু করে বসে আছে বাকিরা। এদের মধ্যে পুরো ঘটনার মুখ্য চরিত্র পনেরো বছরের ইন্দুও আছে।

দীর্ঘ তিরিশ-বত্রিশ বছরের কর্মজীবনে অনেক চুরির ঘটনাই দেখেছেন নন্দদুলাল বাবু। অনেক চোরকে উপযুক্ত শাস্তিও দিয়েছেন নিজের হাতে। তবে কাউকেই কখনো হাজতবাস করাননি উনি। হয়তো ওনার বিবেক এ বিষয়ে ওনাকে সচেতনভাবে অনুমতি দেয় নি। এবারেও তাইই করলেন। একমাস আগে উনি বুঝতে পারেন ওনার ঘরের আলমারি থেকে বেশ কিছু গয়না এবং টাকা চুরি গেছে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই প্রথম আঙুল ওঠে বাড়ির কাজের মেয়ের উপর। কারণ বাড়িতে উনি আর ওনার বৃদ্ধা মা,আর সবসময়ের কাজের মেয়ে ইন্দু ছাড়া কেউ থাকেন না। তবে হ্যাঁ বাইরে থেকে অনেক লোকের আনাগোনা আছে নন্দদুলাল বাবুর বাড়িতে। এদের মধ্যে ওনার পরিবারের লোকজন ছাড়াও ওনার ব্যবসার লোক আর বাইরে থেকে একটি কাজের মেয়ে আসে। তবে এদের প্রত্যেকের দিকেই সন্দেহ কম যাচ্ছে। অবশ্য তার যথেষ্ট কারণও আছে। এরা খুব অল্প সময়ের জন্য বাড়িতে আসে এবং চলেও যায়। আর কাজের মেয়ে বলেই তাদের সবথেকে পুরনো এবং বিশ্বাসী কাজের মেয়ে শিখা কে চুরির দায় চাপাতে হবে এমনটা নন্দদুলাল বাবু এবং ওনার বাড়ির লোকেরা ভাবতেই পারে না। তাহলে বাকি রয়ে যায় কে? হ্যাঁ। ইন্দুই চুরি করেছে।

নন্দদুলাল বাবু ইন্দুর বাড়ির লোকদেরও খবর দিয়েছে। সরাসরি ইন্দুকেই জিজ্ঞাসাবাদ করবেন বলে। ওনার জেরার কাছে খুব বেশীক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে নি ইন্দু। সব বলে দিয়েছে। গয়নাগুলো বেচে প্রায় সব টাকাই যে শেষ করে ফেলেছে এ কথাও স্বীকার করেছে ইন্দু। কিছুদিন আগে গ্রামের পূজোয় বাড়ি গিয়েছিল ইন্দু। তখনই এতগুলো টাকা আত্মসাৎ করেছে মেয়েটা। হতাশ গলায় নন্দদুলাল বাবু ইন্দুকে বলে ... 

-শুধু টাকার লোভে তুই এ কাজ করলি ইন্দু? আমার কাছে চাইতে পারতিস তো। তোর যত টাকা লাগতো আমি তোকে দিতাম। এই বয়সেই চুরি ধরলি তুই?

ইন্দু কেঁদে ফেলে। সাথে সাথে ওর মা এবং দিদিও নন্দদুলাল বাবুর পা ধরে কাঁদতে উদ্ধত হয়। নন্দদুলাল বাবু বাধা দেয়। এবং ওনাদের বলে ... 

-আমার যা ক্ষতি হবার তা তো হয়েই গেছে। এবার আপনারা আসুন। আর কোনোদিন এ তল্লাটে আপনাদের কাউকেই যেন আমি না দেখতে পাই। 

চারজন মানুষ মাথা নিচু করে বসার ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ওরা চলে যাওয়ার পর নন্দদুলাল বাবুর মা মুখ খোলেন।

-গরীব বলেই যে সবাইকে মায়া দেখাতে হবে এমনটা কোথাও লেখা আছে?

-মা তুমি কি বলতে চাইছ আমি জানি। তবে পুলিশকে খবর দিয়ে কি হবে? শুনলেই তো সব গয়না বিক্রি করে দিয়েছে।

-তুই থাম দেখি বাপু। দেখলি তো ওইটুকু মেয়ে কেমন সেয়ানা। বেশি মুখ খুলল না দেখতে পেলি না। শুধু মাত্র টাকার লোভে ও এই কাজ ও করেছে সেও আমি বুঝেছি। ওর বাবা-মাকেও তুই এতটা সহজ ভাবিস না। ওরা সবাই এ চুরির সঙ্গে যুক্ত। বাপটা কেমন কুঁকড়ে বসে ছিল দেখতে পেলি না? ওরা যদি যুক্ত নাই থাকবে তাহলে ওর ব্যাগ থেকে টাকাগুলো কিভাবে উদ্ধার হল শুনি? ব্যাপারটা খুব স্পষ্ট। ইন্দু একা নয় ওর বাড়ির সকলেরই এই চুরিতে হাত আছে। এখন বুঝতে পারছি আমার টাকাগুলো এতদিন তাহলে এই মেয়েই চুরি করেছে। ভাবতাম আমার বয়স হয়েছে হয়তো হিসাবে গোলমাল করে ফেলি। তাই কাউকে কখনও কিছু বলি নি।

-মা আমার আর এই বিষয়ে আলোচনা করতে ভালো লাগছে না। শরীরটা কেমন অসুস্থ লাগছে। নন্দিতাকে পুরো ঘটনাটা জানিয়েছিলাম। ও বলল আমি যা ভালো বুঝি তাই যেন করি। ওর মনটাও খুব খারাপ হয়ে গেছে। ওর মায়ের গয়নাগুলোর জন্য ওর বেশি কষ্ট হচ্ছে।

এই পর্যন্ত বলে দোতলার ঘরে চলে যান নন্দদুলাল বাবু।


গল্পের যবনিকা পতনের পরেও কিছু না দেখা দৃশ্য পর্দার আড়ালে ঘটে যায়। নন্দদুলাল বাবুর গয়না চুরির ঘটনাটিও বছর দুই পর এভাবেই মোড় নিয়েছিল। বেশ কয়েকবার বিভিন্নভাবে কথাগুলো কানে এলেও ঠিক মেনে নিতে পারেনি নন্দিতা। আবার মেনে নিলেও কখনও কোথাও এ বিষয়ে মুখ খোলেনি ও। আজ এতদিন পর যখন ফোনের ওপাড়ে কাঁদো কাঁদো গলায় তার কাছে সব সত্যি উগড়ে দিচ্ছিলো ইন্দু তখন ও মনে মনে শুধুই হেসেছিল। ইন্দু এতদিন পর সেই চুরির বিস্তারিত বর্ণনা দিচ্ছিলো নন্দিতা কে। সবটুকু শুনে নন্দিতা বলে,

-আমি সব জানি ইন্দু। তবে তুই সেদিন বাবাকে কেন কিছু বলিসনি এটা ভেবেই অবাক হয়েছি বারবার। সব দায় তো তোর ছিল না। তবে কেন সব দায় মাথা পেতে নিয়েছিলি তুই?

-জ্যাঠু মেনে নিতে পারতো না গো দিদি। তাই বলিনি। বুদ্ধি যারই হোক না কেন অন্যায়তো আমিও করেছি বলো দিদি? তাই আর কাউকে দোষ দিতে পারিনি কেমন যেন বিবেকে বেধেছিলো আমার।

অবাক হয় নন্দিনী। বিবেকের মত একটা ভারী শব্দ পনেরো বছরের অশিক্ষিত ইন্দুর মনেও জেগেছিল সেদিন! আর সেই জন্যই সারাজীবনের ‘চোর’ অপবাদ একা মাথা পেতে নিয়েছিল মেয়েটা! মনে হয় মেয়েটা মিথ্যে বলছে না। সত্যিই হয়তো ওর বিবেক ওকে সত্যিটা বলতে বারণ করেছিল সেদিন। প্রমীলাও তো এই একই কথা বলেছিল নন্দিতাকে, “বোন কিছুতেই সত্যিটা বলতে চাইছে না দিদি। বলছে কাজটা তো আমি করেছি। তাই আমারই শাস্তি হোক। দিদি তুমি ওকে বোঝাও জ্যাঠু যদি আমাদের জেলে ভরে দেয়?” অভিমানে,রাগে,লজ্জায়,ঘেন্নায় সেদিন বা এরপরেও ইন্দুর সাথে আর কোনওদিন কথা বলেনি নন্দিতা। তবে প্রমীলাকে সেদিন শান্ত করেছিলো, “দেবে না। তুই এত ভাবিস না।” এই বলে। কারণ নন্দিতা ওর বাবাকে চিনতো খুব কাছ থেকে।

-ও দিদি? কি ভাবছো? চুপ করে আছো কেন?

-কিছু না। বল?

-তুমি আমাকে কখনও ক্ষমা করতে পারবে না। জ্যাঠুও পারবে না জানি। সবই আমার কপাল। সেই সময় যদি এইসব ভাবতাম তাহলে এতবড় সর্বনাশ হত না।

-হুঁ।

ফোনের ওপাড়ে ইন্দুর হাসি শুনতে পায় নন্দিতা।

-কি রে অমন করে হাসছিস কেন?

-তোমাদের সর্ষে খেতের ভূতগুলো সব কেমন আছে দিদি।

ইন্দুর কথায় হেসে ফেলে নন্দিতাও।

-বড্ড পাকা হয়ে গেছিস দেখছি। সবাই বহাল তবিয়তে আছে রে।

-তুমি জ্যাঠু কে কিছু বলনি তো? কি লাভ বলে? শুধু শুধুই কষ্ট পাবে।

-না রে বলিনি। আর কখনও বলবোও না। কারণ অন্যের অন্যায়ের সাজা তো এই বয়সে আমি আর আমার মানসিকভাবে একা,অসুস্থ বাবাকে দেবো না। ওটা করতে আমাকেও আমার বিবেক বারণ করছে।

কথাগুলো বলতে বলতে নন্দিতা এবং ইন্দু দুজনের গলাই ভিজে আসছিল। অজান্তেই ফুরিয়ে যাচ্ছিল কথারা। এর কিছুক্ষণ পরে ফোন কেটে যায় আর কখনও নন্দিতার নম্বরে ইন্দুর ফোন আসে নি। হয়তো আর কখনও আসবেও না। 


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

�� পাঠক পড়ছেন

 

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

■ শব্দের মিছিলের সর্বশেষ আপডেট পেতে, ফেসবুক পেজটি লাইক করুন।
সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ | আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা
Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.